সাতক্ষীরার জলবায়ু সংকট ও বৈশ্বিক অভিজ্ঞতায় টেকসই সমাধান
মো. মামুন হাসান
উপকূলের ভাঙন কোনো আকস্মিক দুর্যোগ নয়, বরং এটি একটি ধীরগতির নিঃশব্দ ঘাতক যা তিলে তিলে জীবনের ভিত নাড়িয়ে দেয়। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তের জেলা সাতক্ষীরা আজ সেই নীরব ধ্বংসলীলার এক জীবন্ত সাক্ষী। এককালের অবারিত সবুজ আর সুজলা-সুফলা এই জনপদে প্রকৃতি এখন আর আগের মতো নির্ভরযোগ্য নেই। বাতাসের আর্দ্রতা থেকে শুরু করে মাটির স্পর্শ সবখানেই এক অদ্ভুত অস্থিরতা বিরাজ করছে। ক্রমশ বাড়তে থাকা লবণাক্ততা, ঘনঘন ঘূর্ণিঝড়ের রুদ্ররূপ এবং বৃষ্টির খামখেয়ালি ধরন সাতক্ষীরার লাখ লাখ মানুষের জীবনকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। এটি কেবল একটি ভৌগোলিক সমস্যা নয়, বরং অস্তিত্ব রক্ষার এক কঠিন লড়াই।
জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক বৈজ্ঞানিক প্যানেল তথা আইপিসিসি তাদের সতর্কবার্তায় স্পষ্ট জানিয়েছে যে, বৈশ্বিক উষ্ণতা বর্তমান গতিতে বাড়তে থাকলে উপকূলীয় অঞ্চলে কৃষি উৎপাদন অন্তত ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে। বাংলাদেশের উপকূলীয় এই জনপদে ৩ কোটির বেশি মানুষের বসবাস, যাদের জীবনের স্পন্দন মিশে আছে এই মাটির সঙ্গে। সাতক্ষীরার বর্তমান চিত্র আরও ভয়াবহ। অনেক এলাকায় মাটির লবণাক্ততা এমন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ধানের ফলন ইতোমধ্যে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। জীবন ধারণের তাগিদে কৃষিজমির একটি বিশাল অংশ আজ চিংড়ি ঘেরে রূপান্তরিত হয়েছে। যদিও এই রূপান্তর সাময়িকভাবে কিছু মানুষের পকেটে টাকা আনছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা মাটির উর্বরতাকে বিষিয়ে তুলছে। এর চেয়েও বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে সুপেয় পানি। বিভিন্ন সমীক্ষা বলছে, সাতক্ষীরার প্রায় ৬০ শতাংশ পরিবার নিরাপদ পানির তীব্র সংকটে ভুগছে। এক কলস পানযোগ্য পানির জন্য এখানকার নারীদের প্রতিদিন মাইলের পর মাইল তপ্ত পথ পাড়ি দিতে হয়, যা কেবল শারীরিক শ্রম নয় বরং একটি সামাজিক ও মানসিক যন্ত্রণার নাম।
ঘূর্ণিঝড় আইলা থেকে শুরু করে আম্ফানের মতো বিধ্বংসী দুর্যোগগুলো সাতক্ষীরার মানুষের মেরুদ- ভেঙে দিয়েছে। আইলার প্রলয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ২০ লাখ মানুষ বছরের পর বছর পানির নিচে কাটিয়েছে। আম্ফানের সময় ২৫ লাখ মানুষের স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়েছে। এই ধারাবাহিক দুর্যোগ কেবল ঘরবাড়ি আর বাঁধ ভাঙে না, বরং মানুষের দীর্ঘদিনের সঞ্চয়, তিল তিল করে গড়া অবকাঠামো এবং মানসিক স্থিতিশীলতাকেও চুরমার করে দেয়। তবে এই অন্ধকার পরিস্থিতির মাঝেও আশার আলো দেখায় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের সফল কিছু উদাহরণ। সাতক্ষীরাকে বাঁচাতে হলে আমাদের সেই বৈশ্বিক অভিজ্ঞতাকে দেশীয় প্রেক্ষাপটে কাজে লাগাতে হবে।
নেদারল্যান্ডসের দিকে তাকালে আমরা এক বিস্ময়কর সফলতার গল্প দেখি। সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে অবস্থান করেও দেশটি তাদের উন্নত বাঁধ ও বৈজ্ঞানিক পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রেখেছে। তাদের ডেল্টা প্ল্যান বা বদ্বীপ পরিকল্পনা অনুযায়ী জাতীয় আয়ের প্রায় ১ শতাংশ এই খাতে নিয়মিত বিনিয়োগ করা হয়, যার ফলে তাদের বন্যাজনিত আর্থিক ক্ষতি প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব হয়েছে। জাপানের উপকূলীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা আরেকটি চমৎকার উদাহরণ। জাপান তাদের উপকূলে সুপার লিভি বা অতি-শক্তিশালী বাঁধ নির্মাণ করেছে যা কেবল জলোচ্ছ্বাস নয়, বরং তীব্র কম্পন সহনশীল। সাতক্ষীরার গাবুরা বা পদ্মপুকুরের মতো জরাজীর্ণ বাঁধ কবলিত এলাকায় দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য জাপানি এই প্রকৌশলবিদ্যার আদলে গ্রিন বেল্ট বা সবুজ বেষ্টনীসহ বাঁধ নির্মাণ করা প্রয়োজন। এটি কেবল মাটির বাঁধ হবে না, বরং এর ওপর থাকবে ঘন ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল যা বাঁধের স্থায়িত্ব কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেবে।
অন্যদিকে ভিয়েতনামের মেকং বদ্বীপে লবণাক্ততা মোকাবিলায় যে সমন্বিত কৃষি পদ্ধতি চালু করা হয়েছে, তা সাতক্ষীরার জন্য একটি আদর্শ মডেল হতে পারে। সেখানে ধান ও চিংড়ির যৌথ চাষের মাধ্যমে কৃষকের আয় দুই থেকে তিনগুণ বেড়েছে। এই পদ্ধতির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর বহুমুখিতা যেখানে প্রকৃতি কোনো এক দিকে বিরূপ হলে অন্য খাতটি কৃষকের জীবিকা আগলে রাখে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশ কিরিবাতি এবং ফিজি সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি মোকাবিলায় ভাসমান কৃষি বা ফ্লোটিং এগ্রিকালচারকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। সাতক্ষীরার যেসব এলাকা বছরের অর্ধেক সময় জলাবদ্ধ থাকে, সেখানে মাটির ওপর নির্ভর না করে বাঁশ এবং কচুরিপানার স্তরের ওপর আধুনিক ভাসমান বেড তৈরি করে সারাবছর সবজি ও মশলা উৎপাদন করা সম্ভব। ফিলিপাইন আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকতে হয়। ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় তাদের আগাম সতর্কবার্তা ও তৃণমূল পর্যায়ে জনগণের নিবিড় প্রশিক্ষণ গত এক দশকে প্রাণহানির সংখ্যা ৭০ শতাংশ কমিয়ে এনেছে। একইভাবে প্রতিবেশী দেশ ভারতের গুজরাট ও পশ্চিমবঙ্গে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং লবণ সহনশীল ফসলের সম্প্রসারণ ঘটিয়ে সুপেয় পানির সংকট ও কৃষির ক্ষতি অন্তত ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।
সাতক্ষীরার সংকট নিরসনে এখন কিছু বৈপ্লবিক ও উদ্ভাবনী পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। প্রথমত ব্লু ইকোনমি বা নীল অর্থনীতির স্থানীয়করণ করতে হবে। উপকূলীয় লোনা পানিতে সামুদ্রিক শৈবাল বা সি-উইড চাষ একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় খাত হতে পারে যা লোনা পানিতে অনায়াসেই জন্মায় এবং এর বিশাল আন্তর্জাতিক বাজার রয়েছে।
দ্বিতীয়ত প্রতিটি ইউনিয়নে সৌরচালিত সুপেয় পানি শোধনাগার বা সোলার ডেসালিনেশন প্ল্যান্ট স্থাপন করা যেতে পারে। সূর্যের তাপ ব্যবহার করে লোনা পানি থেকে বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহ করার এই প্রযুক্তি অত্যন্ত সাশ্রয়ী। তৃতীয়ত ডিজিটাল রিলায়েন্স নেটওয়ার্ক তৈরি করা প্রয়োজন যেখানে আধুনিক সেন্সরের মাধ্যমে মাটির লবণাক্ততা ও জোয়ারের উচ্চতা রিয়েল-টাইমে পরিমাপ করে কৃষকদের স্মার্টফোন বা স্থানীয় তথ্য কেন্দ্রের মাধ্যমে সচেতন করা হবে। চতুর্থত ম্যানগ্রোভ ভিত্তিক পর্যটন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার মাধ্যমে স্থানীয়দের জন্য বিকল্প আয়ের উৎস তৈরি করা সম্ভব। সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে অবস্থিত হওয়ায় সাতক্ষীরায় ইকো ট্যুরিজম গড়ে তোলা গেলে বননির্ভর মানুষের সংখ্যা কমবে এবং প্রকৃতির ওপর চাপ হ্রাস পাবে। পঞ্চমত উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা সহিষ্ণু কৃত্রিম ম্যানগ্রোভ নার্সারি স্থাপন করা যেতে পারে যা বাঁধের প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করবে।
বর্ষা মৌসুম সামনে রেখে এখনই কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন। দুর্বল বেড়িবাঁধ দ্রুত মেরামত করা এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন করে তাদের আধুনিক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। খাল ও ড্রেন পরিষ্কার করে পানি নিষ্কাশন নিশ্চিত করার পাশাপাশি আশ্রয়কেন্দ্রগুলো সচল রাখতে হবে। লবণ সহনশীল বীজ কৃষকদের মধ্যে দ্রুত বিতরণ করা এবং বৃষ্টির পানি সংগ্রহের জন্য প্রতিটি বাড়িতে সাশ্রয়ী হারভেস্টিং সিস্টেম প্রবর্তন করা দরকার। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই বিনিয়োগ অত্যন্ত লাভজনক কারণ বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে জলবায়ু অভিযোজন খাতে প্রতি ১ টাকা বিনিয়োগ করলে দীর্ঘমেয়াদে ৪ থেকে ৭ টাকা পর্যন্ত আর্থিক সুবিধা পাওয়া যায়। অর্থাৎ এটি কেবল পরিবেশ রক্ষার বিষয় নয় বরং একটি টেকসই অর্থনৈতিক কৌশল।
পরিশেষে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে সাতক্ষীরার এই সংকট আজ আমাদের সামনে এক কঠিন বাস্তবতা। কিন্তু এই সংকটই হতে পারে নতুন সম্ভাবনার সূচনা যদি আমরা বিশ্ব থেকে শিক্ষা নিয়ে তা নিজেদের বাস্তবতায় প্রয়োগ করতে পারি। সাতক্ষীরাকে বাঁচানো মানে কেবল একটি জেলাকে রক্ষা করা নয় বরং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বাংলাদেশের জয় নিশ্চিত করা। এখনই সময় সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ প্রকৃতি দ্রুত তার রূপ বদলাচ্ছে এবং আগামীকাল হয়তো আমাদের জন্য আরও কঠিন চ্যালেঞ্জ নিয়ে অপেক্ষা করছে। লেখক: শিক্ষক ও কলাম লেখক









