বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯ ভাদ্র ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯ ভাদ্র ১৪৩৩

সীমান্তে বিজিবি’র অভিযানে লাখ টাকার ভারতীয় ওষুধ আটক

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: রবিবার, ১২ এপ্রিল, ২০২৬, ১২:২৭ পূর্বাহ্ণ
সীমান্তে বিজিবি’র অভিযানে লাখ টাকার ভারতীয় ওষুধ আটক

পত্রদূত ডেস্ক: সাতক্ষীরা ও কলারোয়া সীমান্ত এলাকায় পৃথক বিশেষ অভিযান চালিয়ে প্রায় দুই লাখ ১০ হাজার টাকা মূল্যের ভারতীয় ওষুধ আটক করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। শনিবার (১১ এপ্রিল ২০২৬) সাতক্ষীরা ব্যাটালিয়নের (৩৩ বিজিবি) ঘোনা এবং কাকডাঙ্গা বিওপির সদস্যরা এই অভিযান পরিচালনা করেন।
বিজিবি সূত্র জানায়, সীমান্ত দিয়ে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে ভারতীয় মালামাল আনা হচ্ছেÑএমন খবরের ভিত্তিতে শনিবার বিশেষ অভিযান চালানো হয়। অভিযানে ঘোনা বিওপির একটি দল সাতক্ষীরা সদর থানার আমবাগান এলাকা থেকে ৭০ হাজার টাকা মূল্যের ভারতীয় ওষুধ জব্দ করে। স্থানটি সীমান্ত পিলার ৬/৫ এস থেকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রায় ৫ কিলোমিটার ভেতরে অবস্থিত।
অন্যদিকে, কাকডাঙ্গা বিওপির আভিযানিক দল কলারোয়া থানার গেড়াখালি নামক স্থানে অভিযান চালিয়ে আরও এক লাখ ৪০ হাজার টাকা মূল্যের ভারতীয় ওষুধ উদ্ধার করে। এই স্থানটি সীমান্ত পিলার ১৩/৩ এস-এর ৫ আরবি থেকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রায় ২০০ গজ দূরে।
৩৩ বিজিবি’র পক্ষ থেকে জানানো হয় জব্দকৃত ওষুধের মোট বাজারমূল্য আনুমানিক ২ লাখ ১০ হাজার টাকা। চোরাকারবারিরা শুল্ক ফাঁকি দিয়ে অবৈধ পথে এসব ওষুধ ভারত থেকে বাংলাদেশে নিয়ে এসেছিল। এসব অবৈধ তৎপরতার কারণে দেশীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি সরকার বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে।

Ads small one

অন্ধকার ভেঙে কৃষ্ণের আবির্ভাব/ সচ্চিদানন্দ দে সদয়

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:০৮ অপরাহ্ণ
অন্ধকার ভেঙে কৃষ্ণের আবির্ভাব/ সচ্চিদানন্দ দে সদয়

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সনাতন ধর্মের এক অনন্য ও সর্বজনীন চরিত্র। তাঁকে ঘিরে যেমন রয়েছে অসংখ্য পুরাণকথা, তেমনি রয়েছে গভীর দার্শনিক চিন্তা এবং ভারতীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে তাঁর দীর্ঘ প্রভাব। কৃষ্ণকে বুঝতে হলে তাই শুধু ভক্তির চোখে দেখলেই হবে না; প্রয়োজন পুরাণ, দর্শন ও ইতিহাসÑএই তিনটি পৃথক স্তরকে পাশাপাশি রেখে দেখতে হবে। জন্মাষ্টমী সেই উপলক্ষ, যখন কোটি কোটি মানুষ শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব স্মরণ করেন। কিন্তু এই আবির্ভাবের অর্থ কী? কৃষ্ণের জন্মকাহিনির কোন অংশ পুরাণীয় আখ্যান, কোনটি দার্শনিক প্রতীক এবং কৃষ্ণভক্তি কীভাবে ইতিহাস ও সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠলÑএসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। শ্রীকৃষ্ণের জন্মের প্রধান কাহিনি পাওয়া যায় ভাগবত পুরাণ, হরিবংশ এবং বিষ্ণু পুরাণ-সহ বিভিন্ন বৈষ্ণব ঐতিহ্যের গ্রন্থে। পুরাণীয় বর্ণনা অনুযায়ী, মথুরার রাজা কংস তাঁর বোন দেবকী ও তাঁর স্বামী বাসুদেবকে কারাগারে বন্দি করেন। একটি দৈববাণী ছিলÑদেবকীর অষ্টম সন্তান কংসের মৃত্যুর কারণ হবে। এই আশঙ্কায় কংস দেবকীর সন্তানদের হত্যা করতে থাকেন। অষ্টম সন্তান হিসেবে কৃষ্ণের আবির্ভাব ঘটে কারাগারে। পুরাণের কাহিনিতে বলা হয়, কৃষ্ণ জন্মের সময় কারাগারের প্রহরীরা ঘুমিয়ে পড়েন, কারাগারের বন্ধন শিথিল হয় এবং বাসুদেব নবজাতক কৃষ্ণকে নিয়ে যমুনা পেরিয়ে গোকুলে নন্দ-যশোদার কাছে পৌঁছে দেন। সেই সময় প্রবল বৃষ্টি হচ্ছিল। অনন্তনাগ তাঁর ফণা বিস্তার করে কৃষ্ণকে বৃষ্টির হাত থেকে রক্ষা করেনÑএমন বর্ণনাও পুরাণে পাওয়া যায়। ভক্তের কাছে এগুলো ঈশ্বরীয় লীলা; গবেষকের কাছে এগুলো ধর্মীয় সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। বৃন্দাবনের কৃষ্ণকে কেন্দ্র করে অসংখ্য কাহিনি গড়ে উঠেছে। পুতনা বধ, তৃণাবর্ত, বকাসুর, অঘাসুর, কালীয়দমন, গোবর্ধন ধারণÑএসব কাহিনি কৃষ্ণের শৈশব ও কৈশোরের সঙ্গে যুক্ত। গোপাল কৃষ্ণের মাখনচুরি, গোপীদের সঙ্গে তাঁর লীলা, বাঁশির সুর এবং রাধার সঙ্গে প্রেমের আখ্যান পরবর্তী বৈষ্ণব ভক্তি-সাহিত্যকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।পুরাণের কৃষ্ণ তাই একই সঙ্গে বালক, প্রেমিক, রক্ষাকর্তা, অসুরবিনাশী ও ঈশ্বর।পুরাণের কৃষ্ণের সঙ্গে দর্শনের কৃষ্ণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। দর্শনের কৃষ্ণ আমাদের কাছে সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠেন শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায়।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের আগে অর্জুন যখন আত্মীয়-স্বজন, গুরু ও বন্ধুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে ভেবে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েন, তখন কৃষ্ণ তাঁর সারথি হিসেবে তাঁকে উপদেশ দেন। এই কথোপকথনই ভগবদ্গীতার মূল বিষয়। গীতায় কৃষ্ণ মানুষের সামনে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরেনÑমানুষের কর্তব্য কী? কর্ম কী? আত্মা কী? জ্ঞান কী? আসক্তি কী? মুক্তি কী? ন্যায় ও অন্যায়ের মধ্যে মানুষ কীভাবে সিদ্ধান্ত নেবে?গীতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো কর্মের প্রতি মানুষের দায়িত্ব। মানুষের হাতে সবসময় ফল থাকে না; কিন্তু নিজের কর্মের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল থাকা তার কর্তব্য। এই দর্শনকে কর্মযোগ বলা হয়। আধুনিক ভাষায় বলা যায়Ñফলের নিশ্চয়তা না থাকলেও সৎ ও দায়িত্বশীল কাজ থেকে পিছিয়ে যাওয়া উচিত নয়। কৃষ্ণ মানুষকে শুধু বাহ্যিক জ্ঞান অর্জন করতে বলেননি; নিজের অস্তিত্ব, কর্তব্য ও জীবনের প্রকৃতি বোঝার কথাও বলেছেন। নিজেকে জানা, নিজের দুর্বলতা চিনতে পারা এবং সত্যকে উপলব্ধি করার চেষ্টাÑগীতার জ্ঞানভাবনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কৃষ্ণের দর্শনে ভক্তিও একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। এখানে ঈশ্বরের প্রতি আত্মসমর্পণ, প্রেম ও বিশ্বাসের মাধ্যমে আত্মিক উন্নতির কথা বলা হয়। পরবর্তী বৈষ্ণব দর্শন ও ভক্তি আন্দোলনে এই ভাবনা আরও বিস্তৃত হয়েছে।

গীতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো ইন্দ্রিয় ও মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ।লোভ, ক্রোধ, মোহ ও অহংকার মানুষকে নিজের কাছ থেকেই বিচ্ছিন্ন করে। ফলে কৃষ্ণদর্শনে প্রকৃত যুদ্ধ শুধু বাইরের শত্রুর সঙ্গে নয়; মানুষের নিজের অন্তরের দুর্বলতার সঙ্গেও।এই কারণে কুরুক্ষেত্রকে একটি প্রতীক হিসেবেও পড়া যায়Ñমানুষের নিজের ভেতরের নৈতিক দ্বন্দ্বের ক্ষেত্র হিসেবে।কৃষ্ণকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাচীন সাহিত্যিক উৎসগুলোর মধ্যে মহাভারত, হরিবংশ, বিষ্ণু পুরাণ এবং ভাগবত পুরাণ উল্লেখযোগ্য। এগুলো বিভিন্ন সময়ে রচিত ও সংকলিত হয়েছে এবং কৃষ্ণের চরিত্র ও কাহিনিকে ক্রমে বিস্তৃত করেছে।

 

ইতিহাসের দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলোÑকৃষ্ণের চরিত্র ভারতীয় সাংস্কৃতিক ইতিহাসে অত্যন্ত প্রাচীন এবং তাঁর উপাসনা ও ভক্তি বহু শতাব্দী ধরে বিকশিত হয়েছে।প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্য থেকে শুরু করে গুপ্ত যুগ, মধ্যযুগের বৈষ্ণব আন্দোলন, বাংলা পদাবলি, চৈতন্যভক্তি এবং আধুনিক যুগ পর্যন্ত কৃষ্ণভক্তির ধারাবাহিক বিস্তার দেখা যায়।অর্থাৎ কৃষ্ণের ঐতিহাসিক গুরুত্ব কেবল তাঁর জন্মের নির্দিষ্ট তারিখ প্রমাণ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং ভারতীয় সমাজ ও সংস্কৃতির ওপর তাঁর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবই ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।কৃষ্ণকে দেবকীর অষ্টম সন্তান বলা হয়।

 

এটি কৃষ্ণজন্মের পুরাণীয় কাহিনির একটি মৌলিক অংশ। তবে ‘অষ্টম’ শব্দকে কেন্দ্র করে পরবর্তী আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যাও রয়েছে।ভগবদ্গীতার সপ্তম অধ্যায়ে কৃষ্ণ তাঁর ‘অপরা প্রকৃতি’র আটটি উপাদানের কথা বলেছেনÑপৃথিবী, জল, অগ্নি, বায়ু, আকাশ, মন, বুদ্ধি ও অহংকার।এই আট উপাদানকে কেন্দ্র করে মহাবিশ্ব ও মানবসত্তার প্রকৃতি ব্যাখ্যা করা হয়। সুতরাং কেউ যদি ‘অষ্টম’কে এই আট প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত করে কৃষ্ণতত্ত্বের ব্যাখ্যা দেন, সেটি দার্শনিক বা আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা হিসেবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে। এখানে পুরাণ ও দর্শনের পার্থক্যটি বোঝা জরুরি।পুরাণ বলেÑকৃষ্ণ দেবকীর অষ্টম সন্তান। দর্শন ব্যাখ্যা করতে পারেÑকৃষ্ণকে প্রকৃতি ও পরমচেতনার সম্পর্কের প্রতীক হিসেবে।

 

কৃষ্ণের শ্যামবর্ণ: রূপের বাইরে তত্ত্ব কৃষ্ণের নামের সঙ্গে ‘শ্যাম’ ও ‘ঘনশ্যাম’ শব্দ গভীরভাবে যুক্ত। ভারতীয় শিল্প ও ভক্তি-সাহিত্যে তাঁকে কখনো নীল, কখনো শ্যামবর্ণ হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। এখানেও পুরাণ, শিল্প ও দর্শনের নিজস্ব ব্যাখ্যা রয়েছে।তাঁর ‘কৃষ্ণ’ পরিচয়ের সাংস্কৃতিক অর্থ। তিনি এমন এক চরিত্র, যাঁর মধ্যে একই সঙ্গে শিশুর সরলতা, প্রেমের আকর্ষণ, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, যুদ্ধের কৌশল এবং দার্শনিক গভীরতা মিলেছে। বাংলাদেশে জন্মাষ্টমী শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি দীর্ঘদিনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও অংশ। মন্দিরে পূজা, উপবাস, কীর্তন, ধর্মীয় আলোচনা, পঞ্চামৃত নিবেদন এবং প্রসাদ বিতরণের পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে শোভাযাত্রার আয়োজন হয়ে থাকে। ঢাকার জন্মাষ্টমীর শোভাযাত্রা বিশেষভাবে ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে।

 

সময়ের সঙ্গে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাংলার লোকশিল্প, সংগীত, সাজসজ্জা ও জনসম্পৃক্ততা। এখানে জন্মাষ্টমী একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণÑকীভাবে একটি ধর্মীয় বিশ্বাস সময়ের প্রবাহে একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে পরিণত হয়।পঞ্চামৃত: ধর্মীয় আচার ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। জন্মাষ্টমীর পূজা ও কৃষ্ণভক্তির বিভিন্ন আচারে পঞ্চামৃতের ব্যবহার প্রচলিত। সাধারণত দুধ, দই, ঘি, মধু ও চিনি দিয়ে এটি প্রস্তুত করা হয়।‘পঞ্চ’ অর্থ পাঁচ এবং ‘অমৃত’ অর্থ অমৃত বা অমরত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত ধারণা।

 

পঞ্চামৃতকে মূলত ধর্মীয় নিবেদন ও প্রসাদ হিসেবে দেখা হয়। এর সঙ্গে নানা লোকবিশ্বাস ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ধারণা যুক্ত থাকলেও ধর্মীয় আচার হিসেবে এর পবিত্রতা ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বই প্রধান। তিনটি স্তর একসঙ্গে দেখলে কৃষ্ণকে কীভাবে বোঝা যায়?শ্রীকৃষ্ণকে বোঝার জন্য তিনটি স্তরকে আলাদা করা অত্যন্ত জরুরি। পুরাণের কৃষ্ণ আমাদের দেন কাহিনিÑজন্ম, গোকুল, বৃন্দাবন, কংসবধ, রাধা, গোপী, গোবর্ধন ও অসুরবধের আখ্যান। দর্শনের কৃষ্ণ আমাদের দেন প্রশ্নের উত্তরÑকর্তব্য কী, কর্ম কী, জ্ঞান কী, ভক্তি কী, আত্মসংযম কী এবং জীবনের সংকটে কীভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

 

ইতিহাসের কৃষ্ণ আমাদের দেখানÑকীভাবে একটি ধর্মীয় চরিত্র শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভারতীয় সাহিত্য, শিল্প, সংগীত, ধর্মীয় আন্দোলন ও লোকসংস্কৃতিকে প্রভাবিত করেছে। এই তিনটি স্তরকে এক করে ফেললে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। আবার তিনটিকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করলেও কৃষ্ণের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক গুরুত্ব বোঝা যায় না। আজ মানুষ প্রযুক্তিতে এগিয়েছে, কিন্তু নৈতিক সংকট থেকে মুক্ত হতে পারেনি। অর্থ ও ক্ষমতার প্রতিযোগিতা বাড়ছে, অথচ মানুষের মধ্যে শান্তি ও সহমর্মিতার প্রয়োজনও বাড়ছে।

কৃষ্ণের শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয়Ñকর্তব্য থেকে পালিয়ে যাওয়া সমাধান নয়; অন্যায়ের সঙ্গে আপস করাও নৈতিকতার পরিচয় নয়; আর জ্ঞান যদি অহংকার বাড়ায়, তবে সেই জ্ঞান অসম্পূর্ণ।

তাঁর দর্শনে কর্ম আছে, কিন্তু কর্মের অহংকার নেই। জ্ঞান আছে, কিন্তু জ্ঞানের দম্ভ নেই। ভক্তি আছে, কিন্তু ভক্তির সঙ্গে আত্মশুদ্ধির কথাও আছে।তাই জন্মাষ্টমীকে শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব হিসেবে না দেখে আত্মজিজ্ঞাসার দিন হিসেবেও দেখা যায়। কারাগারের অন্ধকারে কৃষ্ণের জন্মের পুরাণকথা আমাদের মনে করিয়ে দেয়Ñঅন্ধকারের মধ্যেই আলোর জন্ম হতে পারে। আর গীতার কৃষ্ণ আমাদের শেখানÑজীবনের কুরুক্ষেত্র থেকে পালিয়ে নয়, নিজের কর্তব্য ও বিবেককে সঙ্গে নিয়ে তার মোকাবিলা করতে হয়। শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে বিশ্বাসের জায়গা একান্তই ব্যক্তিগত ও ধর্মীয়।

 

কিন্তু তাঁর দর্শন ও সাংস্কৃতিক প্রভাবের জায়গাটি অনেক বিস্তৃত।তাঁকে কেউ ভগবান হিসেবে পূজা করেন, কেউ দার্শনিক হিসেবে পাঠ করেন, কেউ প্রেমের প্রতীক হিসেবে অনুভব করেন, আবার কেউ ভারতীয় সভ্যতার এক গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক চরিত্র হিসেবে বিশ্লেষণ করেন। এই বহুমাত্রিকতাই কৃষ্ণকে যুগের পর যুগ জীবন্ত রেখেছে। জন্মাষ্টমীর প্রকৃত তাৎপর্য তাই শুধু কৃষ্ণের জন্মস্মরণে নয়; বরং নিজের জীবনের অন্ধকার, অন্যায়, অহংকার ও বিভ্রান্তির বিরুদ্ধে আলো, ন্যায়, প্রেম ও বিবেককে জাগ্রত করার মধ্যেও নিহিত।

 

পুরাণ আমাদের কৃষ্ণের কাহিনি দেয়, দর্শন দেয় তাঁর বাণীর অর্থ, আর ইতিহাস দেখায়Ñকীভাবে সেই কৃষ্ণ মানুষের সভ্যতা ও সংস্কৃতির দীর্ঘ যাত্রায় এক অবিনাশী উত্তরাধিকার হয়ে উঠেছেন। জন্মাষ্টমীর পবিত্র তিথিতে প্রার্থনা হোকÑ অন্যায়ের বিনাশ হোক, শুভবুদ্ধির উদয় হোক; মানুষের হৃদয়ে জেগে উঠুক প্রেম, সত্য, ন্যায় ও মানবিকতার আলো।

লেখক: সংবাদকর্মী

 

বিশ্ব যৌন স্বাস্থ্য দিবস: সচেতনতা, অধিকার ও সুস্থ জীবন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:০১ অপরাহ্ণ
বিশ্ব যৌন স্বাস্থ্য দিবস: সচেতনতা, অধিকার ও সুস্থ জীবন

সাকিবুর রহমান বাবলা

প্রতি বছর ৪ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব যৌন স্বাস্থ্য দিবস। যৌন স্বাস্থ্য, যৌন অধিকার, ন্যায়বিচার এবং সবার জন্য নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ যৌন কল্যাণ নিশ্চিত করার গুরুত্ব তুলে ধরতেই এ দিবসের সূচনা। বর্তমান বিশ্বে স্বাস্থ্য, মানবাধিকার ও সামাজিক উন্নয়নের আলোচনায় যৌন স্বাস্থ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও অনেক সমাজে এটি এখনও সংকোচ, কুসংস্কার এবং ভুল তথ্যের আড়ালে রয়ে গেছে। ফলে এই দিবসের গুরুত্ব দিন দিন আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বিশ্ব যৌন স্বাস্থ্য দিবস প্রথম উদযাপিত হয় ২০১০ সালের ৪ সেপ্টেম্বর। আন্তর্জাতিক সংগঠন ‘ওয়ার্ল্ড অ্যাসোসিয়েশন ফর সেক্সুয়াল হেলথ’ এ দিবসটির প্রবর্তন করে। প্রথম বছরের প্রতিপাদ্য ছিল “আসুন এটি নিয়ে কথা বলি”, যার মূল লক্ষ্য ছিল যৌনতা সম্পর্কিত সামাজিক ভয়, সংকোচ ও ট্যাবু ভাঙা। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে “এভরি বডি”, যা প্রত্যেক মানুষের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক মর্যাদার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের বার্তা বহন করে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, যৌন স্বাস্থ্য বলতে কেবল যৌন রোগ বা শারীরিক সমস্যার অনুপস্থিতিকে বোঝায় না; বরং এটি যৌনতার সঙ্গে সম্পর্কিত শারীরিক, মানসিক, আবেগগত এবং সামাজিক সুস্থতার একটি ইতিবাচক ও সমন্বিত অবস্থা। অর্থাৎ যৌন স্বাস্থ্য মানুষের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করার কথা বলে যেখানে ব্যক্তি জোর-জবরদস্তি, বৈষম্য ও সহিংসতা থেকে মুক্ত থেকে নিরাপদ, সম্মানজনক ও দায়িত্বশীল সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে যৌন স্বাস্থ্যের প্রধান কয়েকটি ভিত্তি রয়েছে। শারীরিক সুস্থতাÑযেখানে প্রজননতন্ত্রের সঠিক কার্যকারিতা, হরমোনের স্বাভাবিক ভারসাম্য এবং রোগমুক্ত অবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। মানসিক ও আবেগগত সুস্থতাÑযেখানে নিজের শরীর ও যৌনতা সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব, আত্মবিশ্বাস এবং মানসিক স্বস্তি প্রয়োজন। সামাজিক সুস্থতাÑযেখানে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সম্মতি এবং সুস্থ যোগাযোগকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। অধিকার ও নিরাপত্তাÑযেখানে ব্যক্তি তার শরীর ও প্রজননসংক্রান্ত বিষয়ে স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ পায় এবং সহিংসতা ও বৈষম্য থেকে সুরক্ষা লাভ করে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, পৃথিবীতে প্রতিদিন ১০ লক্ষেরও বেশি মানুষ ক্ল্যামাইডিয়া, গনোরিয়া, সিফিলিস ও ট্রাইকোমোনিয়াসিসের মতো যৌনবাহিত সংক্রমণে আক্রান্ত হন এবং এইচপিভি সংক্রমণের কারণে নারীদের জরায়ুমুখের ক্যান্সার হয়, যা সঠিক সময়ে টিকাদান ও স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে প্রতিরোধযোগ্য। গবেষণায় দেখা যায়, অনিরাপদ যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যের কারণে নারীদের সামগ্রিক অসুস্থতার ২০% এবং পুরুষদের ১৪% ঘটে থাকে, পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩১% পুরুষ ও ৪৩% নারী জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে যৌন কার্যকারিতাজনিত সমস্যার মুখোমুখি হন; যা প্রমাণ করে যৌন স্বাস্থ্য কোনো ব্যক্তিগত বা সীমিত বিষয় নয়, বরং এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য ইস্যু।

যৌন স্বাস্থ্য সমস্যার পেছনে শারীরিক সংক্রমণ বা জটিলতার পাশাপাশি মানসিক চাপ, উদ্বেগ, স্থূলতা ও অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন অন্যতম প্রধান কারণ, যা শরীরবৃত্তীয় হরমোন ও রক্ত সঞ্চালনের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করে। তাই যেকোনো ধরনের সামাজিক কুসংস্কার বা অপচিকিৎসার ফাঁদে না পড়েÑনিরাপদ যৌন আচরণ, নিয়মিত ব্যায়াম, পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস, ধূমপান বর্জন এবং মানসিক প্রশান্তি বজায় রাখার মাধ্যমে জীবনধারা সংশোধন করা প্রয়োজন; আর যেকোনো স্বাস্থ্যগত সমস্যায় প্রশিক্ষিত ও নিবন্ধিত চিকিৎসকের সময়োপযোগী পরামর্শ গ্রহণ করাই একটি সুস্থ ও সমৃদ্ধ জীবন গঠনের মূল চাবিকাঠি।

বাংলাদেশে রক্ষণশীল সামাজিক মানসিকতার কারণে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়টি এখনো চরম অবহেলিত, যার ফলে পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে কিশোর-কিশোরীরা সঠিক দিকনির্দেশনা পাচ্ছে না। শ্রেণীকক্ষে প্রজনন স্বাস্থ্যের অধ্যায় এড়িয়ে যাওয়া, মাসিকসংক্রান্ত কুসংস্কার, বাল্যবিবাহ, অল্প বয়সে গর্ভধারণ এবং প্রান্তিক ও অবহেলিত জনগোষ্ঠীর অপর্যাপ্ত ও সংবেদনশীলতাহীন স্বাস্থ্যসেবা এ ক্ষেত্রে বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করেছে।

যৌন স্বাস্থ্য কেবল স্বাস্থ্যগত বিষয় নয়; এটি মানবাধিকারের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোতে যৌন স্বাস্থ্য ও প্রজনন স্বাস্থ্যকে মানুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেক মানুষের নিজের শরীর সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রয়েছে। একইসঙ্গে সহিংসতা, জবরদস্তি ও বৈষম্য থেকে মুক্ত থাকার অধিকারও নিশ্চিত করা জরুরি। সঠিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য পাওয়ার সুযোগ, মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা লাভ এবং সম্মানজনক আচরণ পাওয়াও এই অধিকারের অন্তর্ভুক্ত।

আইনের ক্ষেত্রেও যৌন স্বাস্থ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, পারিবারিক সহিংসতা এবং অন্যান্য যৌন অপরাধ প্রতিরোধে কঠোর আইন বিদ্যমান। পাশাপাশি মাতৃস্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা এবং প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা অনেক রাষ্ট্র তাদের জাতীয় নীতিমালার অংশ। তবে এখনও অনেক সমাজে যৌন স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা সামাজিক ট্যাবুর কারণে বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে মানুষ প্রয়োজনীয় তথ্য ও সেবা থেকে বঞ্চিত হয়, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং সামাজিক সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তোলে।

বিশ্ব যৌন স্বাস্থ্য দিবসের অন্যতম লক্ষ্য হলো এই সামাজিক নীরবতা ভাঙা। যৌন স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা, দায়িত্বশীল এবং বিজ্ঞানভিত্তিক আলোচনা সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধি করে, কুসংস্কার দূর করে এবং তরুণ প্রজন্মকে সঠিক তথ্য জানতে সহায়তা করে। একইসঙ্গে এটি পারস্পরিক সম্মান, সমতা, দায়িত্ববোধ এবং নিরাপদ আচরণের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সাহায্য করে।

বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার এবং তথ্যপ্রবাহের যুগে সঠিক যৌন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসচেতনতা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভুল তথ্য, গুজব এবং সামাজিক সংকোচ অনেক সময় মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করে। তাই পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে বিজ্ঞানসম্মত যৌন স্বাস্থ্য শিক্ষা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।

বিশ্ব যৌন স্বাস্থ্য দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে যৌন স্বাস্থ্য কোনো বিলাসিতা নয়, বরং মানবকল্যাণ, সামাজিক উন্নয়ন এবং টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণের একটি অপরিহার্য উপাদান। একটি সুস্থ, সচেতন, বৈষম্যহীন ও মানবিক সমাজ গঠনের জন্য যৌন স্বাস্থ্য সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান, সম্মানজনক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।

নদীদূষণ দখল ভরাট, প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:৫১ অপরাহ্ণ
নদীদূষণ দখল ভরাট, প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

শ্যামল শীল

প্রকৃতি ও পরিবেশ বদলে গেছে। পশু-পাখির জন্য অরণ্য নেই। নদীতে নেই পানি। তারপরও নদী আছে। আছে নদীর জন্য কান্না। একদিকে নদীদূষণ, অন্যদিকে নদী খনন কাজে দক্ষতার অভাবে নদ-নদীগুলোর পলি অপসারণ করার পরপরই নদ-নদীগুলো আবার ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এভাবে বছরের পর বছর নদীতে পলি ও বালু এবং আবর্জনা পড়ে ডুবোচরের সংখ্যা ও দূষণ বেড়েছে। নদী খনন কাজে জবাবদিহি ও পরিকল্পনার অভাবে নদ-নদীগুলোর আজ বেহাল দশা। বাংলাদেশ যখন মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার পথে এগিয়ে চলেছে তখনও আমাদের জানা নেই, আমাদের দেশের অনেক নদীর অস্তিত্ব মানচিত্রে আছে, অথচ বাস্তবে নেই।

অনেকের লোভ-লালসা পড়েছে নদীর ওপর। নদী অবৈধ দখল করে অনেকে মাছ চাষ করছেন, বিভিন্ন স্থাপনা তৈরি করছেন, নদীর জমি দখল করে গড়ে উঠেছে শিল্প প্রতিষ্ঠান, দূষণের জন্য জুড়ে দিয়েছে বর্জ্যরে লাইন। সব ধরনের বর্জ্য গিয়ে পড়ছে নদীতে। আবার কোনো কোনো স্থানে শহরের সিটি করপোরেশনের ময়লা-আবর্জনা গিয়ে পড়ছে নদীতে। শিল্পকারখানার বর্জ্যে নদী সবচেয়ে বেশি দূষিত হচ্ছে। নদ-নদী দূষণ-দখল আর ভরাটের সঙ্গে যারা জড়িত তারা অত্যন্ত প্রভাবশালী। বিভিন্ন সময় তারা দলের নাম ভাঙিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করে নদ-নদীগুলোকে ধ্বংসের দিকে ঠৈলে দিচ্ছে। যুগের পর যুগ নদ-নদীগুলো আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে সচল রেখেছে। নদীগুলো আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ধারণ করে চলেছে। নদীতে বছরের পর বছর অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে, উৎসমুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। খাল-বিল, শাখানদী, উপনদীগুলো ধীরে ধীরে মেরে ফেলা হয়েছে। বড় বড় নদ-নদীতে পানি সরবরাহের উৎসে এখন টান পড়েছে। নদী থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন করা হয়েছে এবং হচ্ছে।

 

সরকার বছরের পর বছর নদ-নদী বাঁচাতে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দিলেও সেসব অর্থের যথার্থ ব্যবহার হয়নি। সময়মতো নদীগুলো খনন করা হয়নি। নৌপথ ক্রমাগত কমতে কমতে এখন নেমে এসেছে চার হাজার কিলোমিটারে। তথ্য মতে, এখন দেশে নদ-নদীর সংখ্যা প্রায় ২৩০টির মতো। ব্রিটিশ শাসনামলে দেশে নৌপথের দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ১৪ হাজার কিলোমিটার। পাকিস্তানি আমলে বর্ষা মৌসুমে নৌপথের দৈর্ঘ্য দাঁড়ায় প্রায় ১২ হাজার কিলোমিটার। আমাদের মতো নদীমাতৃক দেশে নৌপথের সুবিধা অনেক। পরিবহন খরচ কম, জ্বালানি সাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ। একজন মানুষের যেমন আইনগত অধিকারের সুযোগ আছে, তেমনি নদ-নদীর সে ধরনের অধিকার আছে। হাইকোর্ট ‘জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন’কে নদ-নদীর অভিভাবক ঘোষণা করেছে। তাই সময় এসেছে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে আরও লোকবল, সুযোগ-সুবিধা ও প্রয়োজনীয় স্বাধীন ক্ষমতা দেওয়ার। এছাড়া নদী বিষয়ে আলাদা ট্রাইব্যুনাল করলে তা নদ-নদী রক্ষার্থে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারবে। নদী পুলিশও গঠন করা যেতে পারে। নদ-নদী তথা প্রকৃতির ওপর বছরের পর বছর অত্যাচার করে কোন সভ্যতা টিকেনি। তাই আমাদের সম্পদ, অর্থনৈতিক ক্ষেত্র নদ-নদীগুলোকে সুরক্ষা, সংরক্ষণ ও সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে মনোযোগ দিতে হবে।

 

মনে রাখতে হবে, এক একটি নদী এক একটি পর্যটন ক্ষেত্রও বটে। পর্যটনের এ সম্ভাবনার দ্বার যত বেশি সুস্থ থাকবে নদ-নদী রক্ষাসহ পর্যটনের বিকাশ তত ত্বরান্বিত হবে। দেশের সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কাছে নদ-নদীর গুরুত্ব তুলে ধরে ভবিষ্যৎ রক্ষক হিসেবে তাদের সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ, নদী ঝরনা জলপ্রপাত প্রকৃতির এক অসাধারণ অনুষঙ্গ। মানববসতি গড়ে উঠেছে এ অসাধারণ প্রকৃতি ঘিরে। তবে মানুষ এর ওপর অনাচার করেছে। শত শত বছর ধরে এতে বিপর্যয় সৃষ্টি করা হয়েছে। বর্তমানে মানুষ উপলব্ধি করতে শুরু করেছে কাজটি ঠিক হয়নি। নদী না থাকলে তাদের জীবন উপভোগ্য ও মসৃণ থাকবে না।

 

ইউরোপে নদীকে জীবন্ত সত্তার মর্যাদা দেয়া হয়েছে। কোনো কোনো দেশে একে প্রাণের আলাদা অস্তিত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে আইন করা হয়েছে। আমাদের দেশের সর্বোচ্চ আদালতও নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ ঘোষণা করেছেন। একে প্রাণ ফিরিয়ে দিতে রক্ষণাবেক্ষণের তাগিদ দিয়েছেন। বাস্তবে এখনো আমাদের নদ-নদী রক্ষায় কার্যকর কিছু করা যায়নি। প্রতিনিয়ত খবর আসছে সারাদেশের নদীগুলো করুণ অবস্থায় পতিত হচ্ছে। জালের মতো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা নদী জনপদের অধিবাসীদের বহুবিধ উপকারে এসেছে। সেজন্য বাংলাদেশকে বলা হয় নদীমাতৃক দেশ। মাছে ভাতে বাঙালি- এ প্রবাদটির মূল কারণ এ নদী। এটি ছিল অফুরন্ত মাছের ভা-ার। শুকনো মৌসুমে ফসলের জন্য পানির উৎস ও যোগাযোগের সহজ মাধ্যম। এখন প্রতিনিয়ত খবর প্রকাশ হচ্ছে, নদী মরে যাচ্ছে। এ কারণে মরুকরণের পথে চলছে দেশ। এর পেছনে আমাদের সীমাহীন লোভ-লালসা একদিকে দায়ী; অন্যদিকে দায়ী প্রতিবেশী দেশের একচেটিয়া পানি প্রত্যাহার।

 

প্রভাবশালীরা যারা যেখানে পারছে নদী দখল করছে। এর ওপর নির্মাণ করছে অবৈধ স্থাপনা। কোথাও নদীতে সরাসরি বাঁধ দিয়ে মাছের ঘের তৈরি করা হয়েছে। নদীরক্ষা কমিশন তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারছে না। আরেক দিকে চলছে ভয়াবহ দূষণ। কলকারখানার ক্ষতিকর বর্জ্য ও শহরের পয়ঃনিষ্কাশন হচ্ছে সরাসরি নদীতে। বহু নদীতে পানি থাকলেও এখন আর কোনো মাছ নেই। এসব নদীর পানি ব্যবহার দূরের কথা, রাসায়নিকের প্রভাবে অন্যান্য জলজপ্রাণী এবং উদ্ভিদ নদীতে টিকতে পারছে না।

 

এগুলো রক্ষায় আইনের অভাব নেই, কিন্তু এর সফল প্রয়োগ দেখা যায় না। আবার অভিন্ন নদীগুলো থেকে একচেটিয়া পানি প্রত্যাহার করছে ভারত। এক ফারাক্কা বাঁধ পরীক্ষামূলক চালু হওয়ার পর সেটি আর বন্ধ হয়নি; বরং নতুন নতুন চ্যানেল করে দেশটি পানি সরিয়ে নিচ্ছে। তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে শুধু আলোচনা আছে। এখন সেই আলোচনাও সম্ভবত আর টেবিলে নেই। সরকারি হিসাবে নদ-নদীর সংখ্যা ৭০০ থেকে কমে এখন ৪০০ হয়েছে। বেসরকারি হিসাবে নদী দেড় সহগ্রাধিক ছিল, এখন ২৫০-এর মতো হয়েছে। দেশের আনাচে-কানাচে থাকা ৫৫০টি নদী বিলীন হয়ে গেছে। প্রধান নদীর মধ্যে ৫৯টি আন্তর্জাতিক। এগুলোর মধ্যে আবার ৫৪টি ভারত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। নদী-নদীর অবস্থা কেমন সেটি নৌপথের বর্তমান অবস্থা থেকে অনুমান করা যায়।

 

স্বাধীনতার পরপর বিআইডব্লিউটিএর এক জরিপ অনুযায়ী, দেশের নদীপথের দৈর্ঘ্য ছিল ২৪ হাজার কিলোমিটার। এখন কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র সাত হাজার কিলোমিটার। অর্থাৎ ৭০ শতাংশের বেশি সঙ্কুচিত হয়েছে নদীপথ। পরিবেশবাদীদের হিসাবে, গত চার দশকে ৫০ থেকে ৮০টি নদী, শাখা ও উপনদী বিলীন হয়ে গেছে। এর প্রভাব সরাসরি নদীর পাড়ের জনবসতিতে পড়েছে। এর ওপর নির্ভরশীল জেলে ও কৃষকরা হয়েছে বিপন্ন। মানুষ বঞ্চিত সুস্বাদু মিঠা পানির মাছ থেকে। সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হচ্ছে। যা প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিনষ্ট করছে। এভাবে নদী ধ্বংস করে দেয়ার মূল উৎসগুলো চিহ্নিত করে তা মোকাবেলার কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। দখল ও দূষণ রোধে সামান্য কিছু প্রশাসনিক উদ্যোগ বিচ্ছিন্নভাবে দেখা যায়।

 

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক নদীর পানি হিস্যা আদায়ে সরকারের কোনো জোরালো উদ্যোগ বিগত এক যুগে দেখা যায়নি। অথচ সরকার আন্তরিক হলে নদীর জীবন রক্ষায় এগিয়ে আসতে পারে, যা আমাদের প্রাণ ও পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর হতে পারে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নিজ নিজ এলাকার নদী রক্ষার দায়িত্ব বুঝে নিলে ওই এলাকার নদী দখল-দূষণ আর ভরাট করতে কেউ সাহস পাবে না। এছাড়া কোন প্রভাবশালী ব্যক্তি ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে আর নদী দখল করতে পারবে না। সর্বোপরি, নদীর দখল-দূষণ রোধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করতে হবে। ফলে নদী বাঁচবে, মানুষ বাঁচবে। প্রকৃতি বাঁচবে, বাঁচবে আমাদের পরিবেশও।

লেখক: সাবেক জবি শিক্ষার্থী ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা