স. ম. আলাউদ্দীন: এক অপূর্ণ ইতিহাসের নাম
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
যে মাটিতে জন্ম নেয় কালজয়ী মানুষ, সে মাটির বুক চিরে কখনো কখনো বয়ে যায় অন্তহীন বেদনার নদী। সাতক্ষীরার বেতনা নদী, কপোতাক্ষের স্রোত আর সুন্দরবনের সবুজ কোলঘেঁষা এই জনপদ তেমনই এক বেদনার সাক্ষী। যে মানুষটি এই জনপদকে নিজের মেধা, শ্রম, স্বপ্ন ও রক্ত দিয়ে তিলোত্তমা করে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন, তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা স. ম. আলাউদ্দীন।
তিনি কেবল একজন রাজনীতিক ছিলেন না। তিনি ছিলেন একটি দর্শন, একটি আন্দোলন এবং সাতক্ষীরার উন্নয়নের এক চলমান স্বপ্ন। আজও তাঁর নাম উচ্চারিত হয় শ্রদ্ধা, বিস্ময় ও বেদনার মিশেলে। কারণ, যে মানুষটি সারাজীবন অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়েছেন, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সোচ্চার ছিলেন, তাঁর জীবন প্রদীপ নিভে যায় ১৯৯৬ সালের এক নির্মম রাতের অন্ধকারেÑঘাতকের বুলেটের আঘাতে।
আজ তিন দশক পরেও সেই শূন্যতা পূরণ হয়নি। বরং সময় যত এগিয়েছে, ততই স্পষ্ট হয়েছেÑতিনি ছিলেন কেবল একজন ব্যক্তি নন; ছিলেন এক যুগের প্রতিনিধি। ১৯৪৫ সালের ২৯ আগস্ট (১৩৫২ বঙ্গাব্দের ১৫ ভাদ্র) সাতক্ষীরার তালা উপজেলার নগরঘাটা ইউনিয়নের মিঠাবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন স. ম. আলাউদ্দীন। পিতা সৈয়দ আলী সরদার এবং মাতা সখিনা খাতুনের জ্যেষ্ঠ সন্তান হিসেবে তিনি বেড়ে ওঠেন এক শিক্ষানুরাগী ও নৈতিক মূল্যবোধ সম্পন্ন পরিবারে। গ্রামের মাটি, নদী আর সাধারণ মানুষের জীবনই ছিল তাঁর প্রথম পাঠশালা।
শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী, প্রশ্নপ্রবণ এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিতে সাহসী। শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপে তিনি নিজের সক্ষমতার প্রমাণ রাখেন। কলারোয়া হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক, সাতক্ষীরা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং খুলনার ঐতিহ্যবাহী বিএল কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। এই শিক্ষাই তাঁর ভেতরে গড়ে তোলে একটি প্রগতিশীল, মানবিক এবং সমাজমুখী চিন্তার ভিত্তি।
ছাত্রজীবনেই তিনি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশনবিরোধী আন্দোলন তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রথম বড় অভিজ্ঞতা। এরপর ছয় দফা, এগারো দফা ও ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে তিনি ছিলেন সক্রিয় রাজপথের সৈনিক। ১৯৬৭ সালে ছাত্রলীগে যোগদানের মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা আনুষ্ঠানিক রূপ পায়। পরবর্তীতে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হন।
তাঁর সবচেয়ে আলোচিত অর্জন আসে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে। মাত্র ২৫ বছর বয়সে তিনি তালা-কলারোয়া এলাকা থেকে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। এটি শুধু একটি নির্বাচন জয় ছিল নাÑএটি ছিল জনগণের আস্থার প্রতীক। ১৯৭১ সালের মার্চে পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণের পর তিনি আর ঘরে বসে থাকেননি। মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়েন তিনি। ৮ ও ৯ নম্বর সেক্টরের অধীনে তিনি সক্রিয়ভাবে যুদ্ধ করেন। অস্ত্র সংগ্রহ, মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করা এবং প্রশিক্ষণ দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
তাঁর সাহসিকতা এতটাই ছিল যে, সামরিক আদালত তাঁকে অনুপস্থিতিতে ১৪ বছরের সশ্রম কারাদ- দেয় এবং সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে। কিন্তু এই শাস্তি তাঁকে থামাতে পারেনি। তিনি বিশ্বাস করতেনÑস্বাধীনতা কোনো আপসের বিষয় নয়, এটি সংগ্রামের ফসল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও তাঁর লড়াই থামেনি। এবার যুদ্ধ ছিল উন্নয়ন, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক মুক্তির।তিনি শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। কিন্তু খুব দ্রুতই বুঝতে পারেন, প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা বেকারত্ব বাড়াচ্ছে। তখনই তিনি কর্মমুখী শিক্ষার ধারণা নিয়ে কাজ শুরু করেন।
১৯৯৫ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন “বঙ্গবন্ধু পেশাভিত্তিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ”। এখানে তিনি একটি নতুন শিক্ষা দর্শন প্রবর্তন করেনÑশিক্ষার সঙ্গে দক্ষতা, উৎপাদন এবং আত্মনির্ভরতা যুক্ত করা। তিনি চাইতেনÑএকজন শিক্ষার্থী শুধু ডিগ্রি নয়, একটি পেশা নিয়ে বের হবে।স. ম. আলাউদ্দীনের সবচেয়ে বড় অবদান সম্ভবত অর্থনৈতিক উন্নয়নে।
তিনি বিশ্বাস করতেন, উন্নয়ন শুধু দাবি করে হয় না, উদ্যোগ নিতে হয়। কাপাসডাঙ্গায় প্রতিষ্ঠা করেন “আলাউদ্দীন ফুডস অ্যান্ড কেমিক্যাল”। এটি স্থানীয় কর্মসংস্থানের একটি বড় কেন্দ্র হয়ে ওঠে। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্বপ্ন ছিল ভোমরা স্থলবন্দর। তাঁর নেতৃত্ব ও উদ্যোগেই ভোমরা আজ বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান স্থলবন্দর হিসেবে পরিচিত। এই বন্দর শুধু অর্থনৈতিক কেন্দ্র নয়Ñএটি সাতক্ষীরার ভাগ্য পরিবর্তনের একটি মাইলফলক। তিনি সাতক্ষীরা চেম্বার অব কমার্স ও ভোমরা স্থলবন্দর ব্যবহারকারী সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন।
সাতক্ষীরার কৃষি ও জলাবদ্ধতা সমস্যা তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিত। তিনি গুচ্ছ সেচ ব্যবস্থা, পরিকল্পিত চিংড়ি চাষ, হ্যাচারি উন্নয়ন এবং বেতনা নদী খননের মতো উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তিনি জানতেন, নদী বাঁচলে কৃষি বাঁচবে, কৃষি বাঁচলে মানুষ বাঁচবে। ১৯৯৫ সালের ২৩ জানুয়ারি তিনি প্রতিষ্ঠা করেন দৈনিক পত্রদূত। এই পত্রিকা ছিল শুধু সংবাদমাধ্যম নয়Ñছিল গণমানুষের কণ্ঠস্বর। দুর্নীতি, অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে এই পত্রিকা ছিল আপসহীন। কিন্তু এই সত্য উচ্চারণই একদিন তাঁর জীবনের জন্য হয়ে ওঠে ঝুঁকিপূর্ণ।
স. ম. আলাউদ্দীনকে নিয়ে ইতিহাস অনেক কিছু বলে, কিন্তু স্মৃতি বলে আরও গভীর সত্য।
প্রেস ক্লাবের সামনে পত্রদূত অফিসÑসেখানে আমি তখন লেখালেখি শুরু করেছি। নবীন একজন লেখক হিসেবে প্রতিদিন নতুন কিছু শিখছি। একদিন তিনি আমাকে ডেকে বললেন,
“লেখ, তোমার লেখার গতি আরও বাড়াতে হবে।” কথাটি খুব সাধারণ, কিন্তু তার প্রভাব ছিল অসাধারণ। তিনি সমালোচনা করেননি, নিরুৎসাহ করেননিÑতিনি পথ দেখিয়েছেন। সেই একটি বাক্য আজও অনুপ্রেরণা হয়ে আছে।
পত্রদূত কেবল একটি অফিস ছিল নাÑএটি ছিল সাংবাদিক তৈরির পাঠশালা। আজ অনেক প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিকের শুরুর গল্প এই পত্রদূতের সঙ্গে জড়িত। আরেকটি ঘটনা আজও স্পষ্ট মনে পড়ে। আলাউদ্দীন ফুডসের ডিলার ছিলেন চম্পক দেবনাথ। বুধহাটা বেতনা নদীর খেয়াঘাট দিয়ে ট্রলারে মালামাল যেত বড়দল বাজারে। তখন নদীপথই ছিল যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। এক শনিবার গভীর রাতেÑপ্রায় ভোর চারটা। আমাকে খবর দেওয়া হলো বুধহাটা খেয়াঘাটে যেতে। সেখানে গিয়ে যা দেখলাম, তা আজও ভুলিনি। হাঁটুসমান কাদার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন স. ম. আলাউদ্দীন। কোনো গার্ড, কোনো গাড়ি, কোনো প্রটোকল নয়Ñতিনি নিজে মাঠে। তিনি আমাকে কাছে ডেকে বললেন, “চম্পক ও মানুদের ডিলারশিপটা দিয়েছি, এদের দিকে একটু খেয়াল রেখ।”
এই একটি বাক্য তাঁর পুরো চরিত্রকে ব্যাখ্যা করে দেয়। তিনি শুধু নেতা ছিলেন নাÑছিলেন অভিভাবক। ১৯৯৬ সালের ১৯ জুন রাত ১০টা ২৩ মিনিট। সাতক্ষীরা শহরের দৈনিক পত্রদূত কার্যালয়ে তিনি কাজ করছিলেন। চারপাশ ছিল নীরব।হঠাৎ অন্ধকার ভেদ করে আসে ঘাতকের বুলেট। তিনি লুটিয়ে পড়েন নিজের অফিসের মেঝেতে। রাত ১০টা ২৩ মিনিটে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। সেই মুহূর্তে থেমে যায় সাতক্ষীরার এক উজ্জ্বল অধ্যায়।সময়ের পরিবর্তনে অনেক নেতা বিস্মৃত হন, কিন্তু কিছু মানুষ সময়ের ঊর্ধ্বে উঠে যান। স. ম. আলাউদ্দীন তেমনই একজন।কারণ তিনি শুধু কথা বলেননি, কাজ করেছেন। তিনি শুধু স্বপ্ন দেখেননি, স্বপ্ন বাস্তবায়ন করেছেন।
ভোমরা বন্দর, কর্মমুখী শিক্ষা, শিল্পায়ন, গণমাধ্যম, কৃষি উন্নয়নÑসবখানে তাঁর পদচিহ্ন স্পষ্ট।
স. ম. আলাউদ্দীন আজ নেই, কিন্তু তাঁর স্বপ্ন বেঁচে আছে। সাতক্ষীরার বাতাসে, নদীর জলে, মানুষের কথায়, উন্নয়নের প্রতিটি ধাপে তাঁর উপস্থিতি অনুভূত হয়। তিনি শিখিয়ে গেছেনÑএকজন মানুষ চাইলে একটি অঞ্চল বদলে দিতে পারে। তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন কোনো পদ বা ক্ষমতা নয়Ñমানুষের ভালোবাসা। আজও ১৯ জুন এলে মানুষ তাঁর কবরের পাশে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানায়।
কিন্তু প্রকৃত শ্রদ্ধা হবে তাঁর অসমাপ্ত স্বপ্নগুলো বাস্তবায়ন করা।স. ম. আলাউদ্দীনÑএকটি নাম, একটি ইতিহাস, একটি অমর প্রেরণা।
লেখক: সংবাদ কর্মী



