শাপলার ডাটা থেকে ঢ্যাপের ভাত : নিম্নবিত্তের স্মৃতিকাতরতা
আখলাকুর রহমান
আমাদের সাতক্ষীরার বিস্তীর্ণ বিল, ঘের আর গ্রামীণ খালের দিকে তাকালে আজ বুকটা এক তীব্র হাহাকারে মোচড় দিয়ে ওঠে। যে জলমহালগুলো একসময় শরতের ভোরে হাজারো সাদা শাপলার শুভ্র চাদরে ঢেকে থাকত, যেখানে চোখ মেললেই মনে হতো আকাশের নক্ষত্রগুলো বুঝি মাটির বুকে নেমে এসেছে, আজ সেখানে শুধুই বাণিজ্যিক মৎস্য ঘেরের নিস্প্রাণ কড়া পাহারা আর কৃত্রিম রাসায়নিকের গন্ধ। আমাদের শৈশবের সেই চিরচেনা শুভ্রতার প্রতীক, জাতীয় ফুল সাদা শাপলা আজ সাতক্ষীরার বুক থেকে প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ইছামতী’ বা ‘আরণ্যক’ উপন্যাসের সেই প্রান্তিক চরিত্রগুলোর কথা মনে পড়ে, যারা প্রকৃতির এই অকৃপণ দানকে ভালোবেসে বুক পেতে নিত। ঠিক তেমনি আমাদের গ্রামের ডানপিটে ছেলেরাও সাতক্ষীরার মেঘলা দিনে বিলের জলে ডুব দিয়ে শাপলা তুলতে গিয়ে মায়ের কড়া বকুনি খেত। কিন্তু সেই বকুনিকে এক কান দিয়ে উড়িয়ে দিয়ে, বুকসমান জল পেরিয়ে, কাঁপুনি ধরা শরীরে যখন একগুচ্ছ ভেজা শাপলা হাতে তারা মেঠোপথ ধরে বাড়ির পানে ছুটত, তখন তাদের চোখেমুখে থাকত এক স্বর্গীয় বিজয়ের আনন্দ। এই শাপলা তো কেবল ফুল ছিল না, ওটা ছিল আমাদের গ্রামীণ সাতক্ষীরার রূপের আসল অলংকার, আমাদের নিঃশ্বাসের সাথে জড়িয়ে থাকা এক অবিচ্ছেদ্য অস্তিত্ব।
আজ সেই চিরন্তন স্বপ্নিল দৃশ্যগুলো আমরা আর দেখি না, যার প্রধান কারণ হলো অপরিকল্পিত ও অতি-বাণিজ্যিক মৎস্য ঘেরের আগ্রাসন। ঘেরের মালিকরা নিজেদের ক্ষণস্থায়ী মুনাফার স্বার্থে পুকুর ও ঘেরের জলজ উদ্ভিদ সম্পূর্ণ পরিষ্কার করে ফেলে, যার ফলে শাপলার কন্দ বা মূল মাটির নিচে অঙ্কুরিত হওয়ার সুযোগই পায় না। অথচ একটি পুকুর বা ঘেরের প্রাকৃতিক ভারসাম্য এবং তার চিরন্তন সৌন্দর্য ধরে রাখতে শাপলা ফুলের কোনো বিকল্প ছিল না। শুধু কি চোখের আরাম? আমাদের রসনাবিলাসেও এই ফুলটির ডাটা এক অনন্য জায়গা দখল করে ছিল। বর্ষার দিনে বিল থেকে তুলে আনা তাজা শাপলার ডাটা আঁশ ছাড়িয়ে, ছোট ছোট কুচি চিংড়ি মাছ দিয়ে যখন মা মাটির চুলোয় রান্না করতেন, তখন সেই তরকারির যে অমৃত স্বাদ হতো, তার সাথে আজকের কোনো দামি রেস্তোরাঁর খাবারের তুলনা চলে না। কত শত দিন যে ঘ্যানঘ্যান করে মায়ের কাছে এই শাপলা-চিংড়ির আবদার করেছি এবং তৃপ্তি ভরে খেয়েছি, তার কোনো ইয়ত্তা নেই।
শাপলা ফুলের এই মহাকাব্যে সবচেয়ে মধুর আর বেদনার অংশটি জুড়ে আছে তার ফল, যাকে আমাদের সাতক্ষীরার আঞ্চলিক ভাষায় আমরা ‘ঢ্যাপ’ বলে ডাকি। এই ঢ্যাপের ভেতরে থাকা ছোট ছোট কালো বীজগুলোকে রোদে শুকিয়ে, খড়খড়ে করে ভেজে যখন মুড়ির মতো ফোটানো হতো, তখন তাকে বলা হতো ‘ঢ্যাপের খৈ’। সেই খৈয়ের সুবাস আর নলেন গুড়ের মোয়া ছিল গ্রামীণ শৈশবের পরম বিলাসিতা। তবে এই ঢ্যাপের আরেকটি নির্মম পিঠও ছিল, যা আমাদের গ্রামীণ সমাজের চিরন্তন অভাব আর লড়াইয়ের অমোঘ সাক্ষী। এই সাতক্ষীরারই বহু নিম্নবিত্ত পরিবারে যখন চালের হাঁড়ি শূন্য থাকত, ঘরের কোণে এক ছটাক চালও জুটত না, তখন এই ঢ্যাপের বীজকে চালের মতো করে ফুটিয়ে ভাতের বিকল্প হিসেবে রান্না করা হতো। কত শত পরিবার যে এই ঢ্যাপের ভাত খেয়ে দিনের পর দিন, বেলার পর বেলা পার করে দিয়েছে, তার নীরব সাক্ষী হয়ে আজো দাঁড়িয়ে আছে আমাদের বিলের কালো মাটি।
দুর্ভাগ্যবশত, আজকের নতুন প্রজন্ম এই ঢ্যাপের স্বাদ তো দূরের কথা, এর নামটুকুও চেনে না। সাতক্ষীরার মানুষ আজ তাদের সেই অতি চেনা, অতি আবেগের সুদিনগুলোকে বড্ড বেশি মিস করে। একটি ফুল কীভাবে একটা গোটা প্রজন্মের শৈশব, তাদের আনন্দ, তাদের ক্ষুধা আর তাদের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের ইতিহাসকে নিজের বুকে ধারণ করে রাখতে পারে, শাপলা ফুল তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। স্থানীয় প্রশাসনের কাছে এবং আমাদের সচেতন সমাজের কাছে আজ বিনীত অনুরোধ, কেবল বাণিজ্যের অন্ধ মোহে অন্ধ না হয়ে, আমাদের সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী জলাশয় ও পুকুরগুলোর প্রাকৃতিক রূপ ফিরিয়ে দিন। ঘেরের এক কোণে হলেও শাপলা ফুটতে দিন, যেন আমাদের আগামী প্রজন্ম আবার খনার বচনের মতো প্রকৃতির সান্নিধ্যে বড় হতে পারে। এই স্থানীয় পত্রিকার পাতার মাধ্যমে সাতক্ষীরার প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে এই সুপ্ত বিবেক জাগিয়ে তোলা আজ বড় বেশি প্রয়োজন, যাতে আমাদের ঘরের শাপলা আবার আমাদের বিলের চাদর হয়ে ফিরে আসে।
লেখা: আখলাকুর রহমান, উদ্যোক্তা ও স্বপ্নদ্রষ্টা : আসিফা



