ভারতীয ভিসা: কেন্দ্র, স্লট সংকট ও অদৃশ্য প্রশ্ন
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক শুধু সীমান্তের ভৌগোলিক বাস্তবতা নয়; এটি ইতিহাস, সংস্কৃতি, আত্মীয়তা, অর্থনীতি ও মানবিক যোগাযোগের এক দীর্ঘ পথ। চিকিৎসা নিতে যাওয়া রোগী, শিক্ষা বা ব্যবসার প্রয়োজনে যাতায়াতকারী মানুষ, কিংবা ধর্মীয় তীর্থযাত্রীÑসব মিলিয়ে ভারতের ভিসা বাংলাদেশের মানুষের কাছে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সেবা।কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই ভিসা ব্যবস্থা ঘিরে যে চিত্র তৈরি হয়েছে, তা অনেকের কাছেই স্বস্তির নয়। আবেদন জমা দেওয়া থেকে শুরু করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্লট পাওয়া পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটিই যেন এক ধরনের প্রতিযোগিতামূলক যুদ্ধ।
প্রশ্ন উঠছেÑএই সেবা কি সত্যিই সবার জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত, নাকি এটি ধীরে ধীরে একটি নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে? ভিসা কোনো বিলাসিতা নয়। বাংলাদেশের অনেক মানুষের জন্য এটি জীবনরক্ষাকারী একটি মাধ্যম। বিশেষ করে চিকিৎসার ক্ষেত্রে ভারতের ওপর নির্ভরশীলতা এখনো উল্লেখযোগ্য। ঢাকায় বা দেশের ভেতরে চিকিৎসা না পেয়ে অনেক রোগীই সীমান্ত পেরিয়ে চিকিৎসা নিতে যান। এই বাস্তবতায় ভিসা আবেদন প্রক্রিয়া সহজ, দ্রুত ও স্বচ্ছ হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, এই প্রক্রিয়া অনেকের জন্যই এখন দীর্ঘসূত্রতা, অনিশ্চয়তা এবং অতিরিক্ত খরচের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একজন সাধারণ মানুষ যখন দিনের পর দিন অনলাইনে চেষ্টা করেও স্লট পান না, তখন তার মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগেÑসেবা কি সত্যিই সবার জন্য উন্মুক্ত? বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোতে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রবণতা স্পষ্টÑসেবা রাজধানী কেন্দ্রিক। ভিসা আবেদন জমা কেন্দ্রগুলোর ক্ষেত্রেও সেই চিত্র ব্যতিক্রম নয়।ফলে দেশের বিভিন্ন জেলাÑবিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, উত্তরাঞ্চল ও উপকূলীয় এলাকার মানুষকে ভিসা আবেদন জমা দিতে বড় শহরে যেতে হয়। এতে যে ভোগান্তি তৈরি হয় তা শুধু আর্থিক নয়; এটি সময়, শ্রম এবং মানসিক চাপেরও বিষয়।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সাতক্ষীরার আশাশুনির মতো এলাকার একজন আবেদনকারীকে অনেক সময় ভোরে রওনা দিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। একদিনে কাজ শেষ না হলে থাকতে হয় অতিরিক্ত দিন। এতে বাড়ে খরচ, নষ্ট হয় কর্মদিবস, ক্ষতিগ্রস্ত হয় দৈনন্দিন জীবিকা। এ প্রশ্ন তাই স্বাভাবিকভাবেই ওঠেÑরাষ্ট্রীয় সেবা কি ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করবে? সাতক্ষীরা, যশোর, কুষ্টিয়া, নড়াইল কিংবা উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘদিনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। অনেক পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক বজায় রেখেছে।
চিকিৎসা, আত্মীয়তা কিংবা ব্যবসায়িক কারণে এসব অঞ্চলের মানুষ নিয়মিত ভারতে যান। অথচ ভিসা আবেদন কেন্দ্রের সীমাবদ্ধতা তাদের জন্য এক ধরনের কাঠামোগত বাধা তৈরি করে। যেখানে চাহিদা বেশি, সেখানে সেবা সহজ হওয়ার কথা; কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় উল্টোÑযেখানে চাহিদা বেশি, সেখানেই সেবা পাওয়া কঠিন। বর্তমান ভিসা ব্যবস্থার সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত বিষয় হলো অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্লট সংকট। অনলাইনে স্লট উন্মুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা শেষ হয়ে যায়Ñএমন অভিযোগ বহুদিনের। সাধারণ আবেদনকারীরা বলেন, তারা দিনের পর দিন চেষ্টা করেও স্লট পান না। অথচ একই সময়ে কিছু নির্দিষ্ট এজেন্ট বা দালাল চক্রের মাধ্যমে অর্থের বিনিময়ে স্লট পাওয়া যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এখানেই প্রশ্নটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেÑস্লট কি সত্যিই মুহূর্তে শেষ হয়ে যায়, নাকি একটি নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার মাধ্যমে শেষ করে দেওয়া হয়? যদি প্রথমটি সত্য হয়, তবে এটি চাহিদা ও সরবরাহের সমস্যা। কিন্তু যদি দ্বিতীয়টি সত্য হয়, তবে এটি কেবল প্রশাসনিক নয়Ñএকটি নৈতিক ও কাঠামোগত সংকট। স্লট সংকটকে কেন্দ্র করে যে অভিযোগ সবচেয়ে বেশি শোনা যায়, তা হলো “স্লট বাণিজ্য”। এখানে একটি মধ্যস্বত্বভোগী চক্র সক্রিয় বলে ধারণা করা হয়, যারা সাধারণ মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে।
একদিকে সাধারণ আবেদনকারী, যারা নিয়ম মেনে চেষ্টা করেও স্লট পান নাঅন্যদিকে আর্থিকভাবে সক্ষম বা সংযোগসম্পন্ন গোষ্ঠী, যারা দ্রুত সেবা পানএই বিভাজন শুধু অর্থনৈতিক বৈষম্য নয়; এটি একটি সেবাব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকট তৈরি করে। যেখানে নাগরিক মনে করেন, “নিয়ম মেনে চেষ্টা করলে পাওয়া যাবে না, কিন্তু টাকা দিলে পাওয়া যাবে”Ñসেখানে রাষ্ট্রীয় সেবার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। ভিসা আবেদন প্রক্রিয়া এখন ডিজিটাল হলেও বাস্তবে সমস্যার সমাধান হয়নি। বরং অনেক ক্ষেত্রে প্রযুক্তিই নতুন জটিলতা তৈরি করেছে।
স্লট বুকিং সিস্টেম, সার্ভার লোড, বট ব্যবহার, অটোমেটেড স্ক্রিপ্টÑএসব মিলিয়ে একটি জটিল কাঠামো তৈরি হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। প্রযুক্তি তখনই কার্যকর, যখন তা সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করে। কিন্তু যদি প্রযুক্তি ব্যবহার করে কিছু গোষ্ঠী সুবিধা পায় এবং সাধারণ মানুষ বঞ্চিত হয়, তবে সেটি প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নয়Ñবরং প্রযুক্তিনির্ভর বৈষম্য। যেখানে সেবা সীমিত এবং জটিল, সেখানে দালালচক্র সক্রিয় হয়Ñএটি নতুন কিছু নয়। ভিসা ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। অনেকেই অভিযোগ করেন, তারা নিজেরা চেষ্টা করে ব্যর্থ হওয়ার পর দালালের শরণাপন্ন হন। কারণ দালালরা “নিশ্চিত স্লট” দেওয়ার দাবি করে, যদিও তার জন্য দিতে হয় অতিরিক্ত অর্থ।
এই অবস্থায় প্রশ্ন ওঠেÑএই চক্র কি কেবল স্থানীয় স্তরে সীমাবদ্ধ, নাকি এর পেছনে আরও বড় কোনো কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে? বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই সমস্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ সমাধান হতে পারে সেবার বিকেন্দ্রীকরণ। যদি বিভাগীয় শহর ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ জেলা শহরে ভিসা আবেদন কেন্দ্র স্থাপন করা হয়, তাহলেÑআবেদনকারীর চাপ কমবে, যাতায়াত ব্যয় হ্রাস পাবে, দালালচক্রের সুযোগ কমবে, সেবা আরও স্বচ্ছ হবে, স্লট ব্যবস্থার ওপর চাপ কমবে, বিশেষ করে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোকে অগ্রাধিকার দিলে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে সাধারণ মানুষ।
যেকোনো সেবা ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা। ভিসা সেবার ক্ষেত্রেও এই দুটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি স্লট বণ্টন, আবেদন গ্রহণ এবং প্রক্রিয়াকরণে স্বচ্ছতা না থাকে, তবে সেখানে আস্থার সংকট তৈরি হবেই। নিয়মিত প্রযুক্তিগত অডিট, স্বাধীন পর্যবেক্ষণ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা ছাড়া এই সমস্যার সমাধান কঠিন। ভিসা সমস্যা শুধু প্রশাসনিক জটিলতা নয়; এটি মানবিকও। একজন অসুস্থ রোগী, একজন বৃদ্ধ পিতা-মাতা, কিংবা জরুরি পারিবারিক প্রয়োজনে যাত্রা করতে চাওয়া মানুষÑতাদের জন্য প্রতিটি দিন গুরুত্বপূর্ণ।
এই অবস্থায় ভিসা প্রক্রিয়ার বিলম্ব বা অনিশ্চয়তা অনেক সময় ব্যক্তিগত জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। নীতিগতভাবে বলা হয়Ñসেবা সবার জন্য সমান। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা অনেক সময় সেই ঘোষণার সঙ্গে মেলে না। যখন একজন নাগরিক নিয়ম মেনে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন, আর অন্য কেউ অর্থের বিনিময়ে সফল হন, তখন নীতির চেয়ে বাস্তবতার প্রভাব বেশি হয়ে ওঠে। এই পার্থক্যই শেষ পর্যন্ত আস্থার সংকট তৈরি করে। ভিসা সেবা এখন শুধু একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়; এটি একটি সামাজিক প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।
এখানে প্রশ্ন শুধু কেন্দ্র কতটি বা স্লট কতটিÑতা নয়; প্রশ্ন হলো, সেবা কি সত্যিই সবার জন্য সমান? যদি সেবা কেবল নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে সহজলভ্য হয়, তবে সেটি আর সেবা থাকে নাÑতা হয়ে ওঠে নিয়ন্ত্রিত সুযোগ। আজ প্রয়োজনÑসেবার বিকেন্দ্রীকরণ, স্লট ব্যবস্থার স্বচ্ছতা,দালালচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, প্রযুক্তির ন্যায্য ব্যবহার। কারণ শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুব মৌলিকÑএকই দেশের নাগরিক হয়ে কেন কেউ সেবা পাবে সহজে, আর কেউ পাবে না?
লেখক: সংবাদকর্মী



