৩ মণ ধানের বিনিময়ে এক টুকরো ইলিশ!
এম.এম হায়দার আলী
ইলিশের সঙ্গে বাঙালির সম্পর্ক কেবল রসনার নয়, এ সম্পর্ক আবেগের, স্মৃতির আর ভালোবাসার। বর্ষার মেঘলা দুপুরে ধোঁয়া ওঠা ভাতের পাশে সরষে ইলিশ কিংবা কড়কড়ে ভাজা ইলিশ, বাঙালির ঘরোয়া সুখের ছবিতে এই মাছটির উপস্থিতি বহু পুরোনো। নদী, বর্ষা আর ইলিশ যেন বাংলার জীবনের অবিচ্ছেদ্য ৩টি শব্দ। কিন্তু সেই ইলিশই আজ বাংলাদেশের অসংখ্য মানুষের কাছে ক্রমেই দূরের কোনো স্বপ্ন হয়ে উঠছে।
সম্প্রতি দেশের একটি স্বনামধন্য পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পড়তে গিয়ে এই বাস্তবতাটি নতুন করে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। সেই খবরটি হলো, লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার হামছাদী গ্রামের কৃষক মোঃ হাসানের গল্পটি হয়তো খুব ছোট একটি খবর। কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের দীর্ঘশ্বাসের এক বিশাল গল্প। বহুদিন পর ঢাকার শহর থেকে বাবার বাড়িতে বেড়াতে এসেছেন তাঁর মেয়ে।
মেয়ের আসা মানেই বাবার ঘরে আনন্দ। মেয়েটি ঢাকায় থাকেন, সংসারের ব্যস্ততায় নিয়মিত বাবার কাছে আসার সুযোগ হয় না। আর লক্ষ্মীপুরের বিখ্যাত ইলিশের স্বাদও তাঁর নেওয়া হয় না। তাই মেয়ের আসার খবর পেয়েই বাবা মনে মনে একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, এবার মেয়েকে ইলিশ খাওয়াবেন। একজন বাবার কাছে এটি খুব সাধারণ একটি ইচ্ছা।
মেয়ের জন্য একটি ভালো মাছ কিনবেন, নিজের হাতে কিংবা পরিবারের সঙ্গে বসে মেয়েকে খাওয়াবেন, এতে অসাধারণ কিছু নেই। কিন্তু সেই সাধারণ ইচ্ছাটিই যখন পূরণ করতে হয় তিন মণ ধান বিক্রি করে, তখন বিষয়টি আর সাধারণ থাকে না। মোঃ হাসান হাটে গিয়ে তিন মণ ধান বিক্রি করেছেন ৩ হাজার ৫০০ টাকায়। সেই টাকা থেকে মেয়ের জন্য এক কেজি ওজনের একটি ইলিশ কিনেছেন ২ হাজার ৮০০ টাকায়।
এই বছর এটাই তাঁর প্রথম ইলিশ কেনা। ভাবুন একবার, একজন কৃষকের ঘাম ঝরানো ৩ মণ ধান আর একটি ইলিশ মাছের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের বাজার অর্থনীতির কতগুলো নির্মম প্রশ্ন! যে মানুষটি মাঠে ধান ফলান, সেই ধান বিক্রি করেই তাঁকে পরিবারের জন্য মাছ কিনতে হয়। কিন্তু ৩ মণ ধান বিক্রির পরও হাতে থাকে মাত্র ৭০০ টাকা।
সেই টাকা দিয়ে তাঁকে চলতে হবে আরও কতদিন, তার হিসাব কে রাখে? ধানের বীজ কিনতে টাকা লাগে। সার কিনতে টাকা লাগে। কীটনাশক লাগে। সেচের খরচ আছে। শ্রমিকের মজুরি আছে। জমি চাষের খরচ আছে। কখনো বৃষ্টি বেশি, কখনো কম, কখনো রোগবালাই, কখনো পোকামাকড়। এতসব প্রতিকূলতা পেরিয়ে কৃষক যখন ধান ঘরে তোলেন, তখন তাঁর সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা থাকে, ফসলের ন্যায্য দাম পাবেন। কিন্তু সেই ন্যায্য দাম কি তিনি পান? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে মোঃ হাসানের ইলিশ কেনার গল্পটি আরও গভীর হয়ে ওঠে।
আমরা বাজারে গিয়ে যখন ইলিশের দাম শুনে বিস্মিত হই, তখন হয়তো শুধু মাছটির দামটিই দেখি। কিন্তু একজন কৃষক যখন সেই মাছ কিনতে যান, তখন তাঁকে মাছের দাম মেলাতে হয় তাঁর উৎপাদিত ধানের সঙ্গে। একজন শ্রমজীবী মানুষকে মেলাতে হয় দিনের মজুরির সঙ্গে। একজন নিম্ন-মধ্যবিত্তকে মেলাতে হয় মাসের সংসার খরচের সঙ্গে।
সেখানেই দেখা যায়, ইলিশের দাম শুধু টাকা দিয়ে মাপা যায় না। কারও কাছে এক কেজি ইলিশ কয়েক হাজার টাকার একটি মাছ, আর কারও কাছে সেটি কয়েক দিনের সংসারের হিসাব। একটি মাছের বাজারদর যখন একটি পরিবারের আনন্দের সঙ্গে প্রতিযোগিতা শুরু করে, তখন অর্থনীতির হিসাবের পাশাপাশি সমাজের মানবিক হিসাবটিও সামনে আসে। আজ বাংলাদেশের বহু পরিবার বছরের পর বছর ইলিশ কিনতে পারে না।
বাজারে ইলিশ দেখে তাঁরা দাঁড়ান, দাম জিজ্ঞেস করেন, তারপর নিঃশব্দে অন্য মাছের দিকে চলে যান। সন্তান হয়তো বলে, বাবা, ইলিশ নাও। বাবা হয়তো হেসে বলেন, আজ না, আরেকদিন নেব। সেই ‘আরেকদিন’ অনেক সময় আর আসে না। কোনো কোনো পরিবারে ইলিশ এখন আর মাসিক বাজারের তালিকায় থাকে না। থাকে উৎসবের তালিকায়। কারও বিয়েতে, কারও বিশেষ অতিথি এলে, কারও প্রবাসী সন্তান বাড়ি ফিরলে,তখন হয়তো বাজারে ইলিশের সন্ধান শুরু হয়। আর সাধারণ দিনে? সাধারণ মানুষের পাতে তখন ছোট মাছ, চাষের মাছ কিংবা অপেক্ষাকৃত কম দামের মাছ।
এতে কোনো লজ্জা নেই। মাছের প্রকারভেদে মানুষের ভালোবাসারও কোনো শ্রেণি-বিভাগ নেই। কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায়, যে দেশের নদী-জেলে ইলিশ ধরে, যে দেশের কৃষক সেই ইলিশ কেনার টাকা জোগাতে নিজের ধান বিক্রি করেন, সেই দেশের সাধারণ মানুষের কাছে ইলিশ কেন এতটা দুর্লভ? ইলিশ আমাদের জাতীয় ঐতিহ্য। এই মাছ নিয়ে আমাদের গর্বের শেষ নেই। ইলিশের উৎপাদন, সংরক্ষণ, রপ্তানি, সবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ইলিশের গল্পে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটি কে ? জেলে। আর সেই জেলে যেমন ইলিশ ধরেন, তেমনি কৃষক ধান ফলান। দু’জনেই দেশের খাদ্য ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অথচ তাঁদের জীবনেই খাদ্যের নিশ্চয়তা অনেক সময় সবচেয়ে কম।
এই বৈপরীত্য আমাদের ভাবায়। একদিকে শহরের কোনো রেস্টুরেন্টে কয়েক হাজার টাকা দিয়ে অনায়াসে ইলিশের পদ খাওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে লক্ষ্মীপুরের একজন কৃষক মেয়েকে ইলিশ খাওয়াতে তিন মণ ধান বিক্রি করছেন। একই দেশ, একই মাছ, কিন্তু দুই মানুষের জীবনে তার অর্থ দুই রকম। প্রায় দেড় যুগ যাবৎ কারও কাছে ইলিশ একটি স্বাভাবিক খাবার, কারও কাছে একটি উৎসব। কারও কাছে ইলিশের কাঁটা বিরক্তির কারণ, আর কারও কাছে একটি টুকরো ইলিশও বহুদিনের আকাঙ্ক্ষা।
এই বৈষম্য শুধু আয়-বৈষম্যের কথা বলে না, এটি আমাদের বাজার ব্যবস্থার কথাও বলে। কৃষক তাঁর উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পান কি না, জেলে তাঁর ধরা মাছের সঠিক দাম পান কি না, ভোক্তা যুক্তি সঙ্গত দামে পণ্য কিনতে পারেন কি না, এই তিনটি প্রশ্নের সমন্বিত উত্তর ছাড়া একটি সুস্থ বাজার ব্যবস্থা তৈরি হয় না। বাজারে মধ্যস্বত্ব ভোগীর স্তর যত বাড়ে, উৎপাদক ও ভোক্তার দূরত্ব তত বাড়ে। কৃষক কম দামে ফসল বিক্রি করেন, অথচ ভোক্তা বেশি দামে কিনতে বাধ্য হন।
এই ব্যবধানের সবচেয়ে বড় শিকার হন সীমিত আয়ের মানুষ। তাঁদের স্বপ্ন গুলোও তখন ছোট হতে থাকে। একজন মা হয়তো সন্তানের জন্য নতুন জামা কেনার আগে দশবার ভাবেন। একজন বাবা হয়তো চিকিৎসা করাতে গিয়ে সংসারের অন্য খরচ কমান। কেউ হয়তো ঈদের বাজার ছোট করেন। কেউ হয়তো সন্তানের আবদার মেটাতে পারেন না। আর কোনো কোনো বাবা তিন মণ ধান বিক্রি করে মেয়ের জন্য এক কেজি ইলিশ কিনে আনেন।
মোঃ হাসানের গল্পের সবচেয়ে সুন্দর দিকটি তাই তাঁর আর্থিক কষ্ট নয়, তাঁর ভালোবাসা।তিনি মেয়ের জন্য ইলিশ কিনেছেন। হয়তো মাছটি রান্না হওয়ার সময় তাঁর ঘরে ইলিশের ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়েছিল। মেয়েটি হয়তো বাবার পাশে বসে খেয়েছেন। হয়তো বাবা মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে তৃপ্তি পেয়েছেন। হয়তো তাঁর নিজের পাতে ইলিশের টুকরো ছিল না, কিংবা থাকলেও খুব সামান্য। কিন্তু মেয়ের মুখে হাসি দেখেই হয়তো তাঁর তিন মণ ধানের কষ্ট কিছুটা ভুলে গিয়েছিলেন। এই ভালোবাসার মূল্য কোনো বাজারদর দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না।
তবু রাষ্ট্র, সমাজ ও বাজারের কাছে প্রশ্ন থেকেই যায়, একজন বাবাকে কি মেয়েকে ইলিশ খাওয়াতে তিন মণ ধান বিক্রি করতে হবে? মানুষের জীবনে সব খাবার প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় খাবার নয়। কিছু খাবার আনন্দের। কিছু খাবার স্মৃতির। কিছু খাবার প্রিয়জনকে ঘিরে ভালোবাসার। ইলিশ তেমনই একটি খাবার। তাই ইলিশের দাম কমানোর প্রশ্নের পাশাপাশি মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বাড়ানোর প্রশ্নটিও জরুরি। কৃষকের উৎপাদন খরচ ও ন্যায্য আয় নিশ্চিত করা জরুরি। বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।
উৎপাদক ও ভোক্তার মাঝখানে অপ্রয়োজনীয় দামের স্তর কমানো জরুরি। কারণ একটি দেশের উন্নয়ন শুধু বড় সেতু, উঁচু ভবন কিংবা বড় বড় পরিসংখ্যানে মাপা যায় না। উন্নয়ন তখনই মানুষের জীবনে অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন একজন কৃষক তাঁর মেয়ের জন্য একটি ইলিশ কিনে বাড়ি ফিরতে গিয়ে তিন মণ ধান বিক্রি করার হিসাব করতে বাধ্য হন না। যখন একজন বাবা সন্তানের আবদারে বলতে পারেন, চলো, আজ ইলিশ রান্না হবে।
যখন ইলিশ শুধু বিত্তবানদের টেবিলের বিলাসিতা নয়, বরং বাংলার সাধারণ মানুষের রান্না ঘরেরও পরিচিত ঘ্রাণ হয়ে ওঠে। মোঃ হাসানের তিন মণ ধানের গল্প তাই আমাদের সামনে একটি আয়না তুলে ধরে। সেই আয়নায় আমরা শুধু একজন কৃষককে দেখি না, দেখি বাংলাদেশের অসংখ্য বাবাকে, যাঁরা নিজেদের প্রয়োজন ভুলে সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে চান। দেখি অসংখ্য মাকে, যাঁরা বাজারের হিসাব মেলাতে মেলাতে নিজের পছন্দের খাবারটি তালিকা থেকে বাদ দেন।
দেখি অসংখ্য সন্তানকে, যারা ইলিশের স্বাদকে ধীরে ধীরে বিশেষ দিনের স্মৃতিতে পরিণত হতে দেখে। আর দেখি একটি প্রশ্ন,বাঙালির জাতীয় মাছ ইলিশ যদি বাঙালিরই ঘরে দুর্লভ হয়ে যায়, তবে সেই ইলিশের প্রাচুর্যের গল্প কার জন্য? হয়তো একদিন আবার বর্ষার দুপুরে বাংলার ঘরে ঘরে ইলিশের ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়বে। কোনো বাবা তখন তিন মণ ধান বিক্রির হিসাব না করেই মেয়ের জন্য একটি ইলিশ কিনে আনবেন। সেদিন ইলিশ শুধু মাছ থাকবে না,হয়ে উঠবে সত্যিকারের মানুষের খাবার, মানুষের আনন্দ, মানুষের অধিকার। ততদিন পর্যন্ত লক্ষ্মীপুরের কৃষক মোঃ হাসানের সেই ২ হাজার ৮০০ টাকার ইলিশ আমাদের বিবেকের দরজায় কড়া নাড়তেই থাকবে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট









