সম্পাদকীয়/ পাটের ফলনে নতুন আশা: উপকূলীয় কৃষি ও টেকসই সুরক্ষা
সাতক্ষীরা জেলায় চলতি বর্ষা মৌসুমে পাটের বাম্পার ফলন এবং অনুকূল আবহাওয়ায় বিস্তীর্ণ জলাশয়ে ‘জাক দেওয়া’ ও আঁশ ছাড়ানোর কর্মব্যস্ততা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ১১ হাজার ৬৭৫ হেক্টর জমিতে এবার প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার বেল পাট উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য দুইশত কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। বড় ধরনের রোগবালাই না থাকা এবং খালের জমা পানিতে সুষম পচনের সুযোগ মেলায় চাষিরা ভালো মানের আঁশ পাওয়ার প্রত্যাশা করছেন। সোনালী আঁশের এই সুদিন গ্রামীণ মেহনতি মানুষের জীবনের অচলাবস্থা কাটানোর বড় এক উপলক্ষ।
তবে এই উজ্জ্বল সম্ভাবনার পেছনে লুকিয়ে রয়েছে এক দীর্ঘমেয়াদি ও গভীর সংকট। একদিকে সার, সেচ ও শ্রমিকের বাড়তি মজুরির কারণে এক বিঘা জমিতে উৎপাদন খরচ ২০ হাজার টাকা ছুঁয়েছে; অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা এবং ভূগর্ভস্থ লবণাক্ততার আগ্রাসনে উপকূলীয় জেলাটিতে পাটের আবাদ হুমকির মুখে পড়েছে। গত তিন বছরেই কেবল সাতক্ষীরা জেলায় পাটের আবাদি জমি কমেছে ১ হাজার ২১০ হেক্টর। তা ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজার ও দেশীয় হাটে ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিয়ে চাষিদের মধ্যে প্রতিনিয়ত যে শঙ্কা কাজ করে, তা কাটিয়ে উঠতে না পারলে চাষিরা দিন দিন ঐতিহ্যবাহী এই ফসল আবাদে আগ্রহ হারাবেন।
এই ভৌগোলিক ও জলবায়ুজনিত প্রতিকূলতা মোকাবিলায় বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই) উদ্ভাবিত ‘লবণসহিষ্ণু দেশি পাট-৮’ এক যুগান্তকারী উদ্ভাবন হতে পারে। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও প্রচারণার অভাবে এই নতুন ও সহনশীল জাত উপকূলের সাধারণ চাষিদের দোরগোড়ায় পৌঁছায়নি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোকে কেবল প্রথাগত পরামর্শের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, লবণসহিষ্ণু জাতের পর্যাপ্ত বীজ সরবরাহ, সরকারিভাবে ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ ও বাজারজাতকরণে সরাসরি তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে উপকূলীয় শস্যনিবিড়তা বৃদ্ধি এবং কৃষকদের ঘামের যথাযথ মূল্য নিশ্চিত করা সম্ভব হলেই সাতক্ষীরার মাটিতে সোনালী আঁশের এই জয়যাত্রা দীর্ঘস্থায়ী রূপ পাবে।











