অন্ধদ্বীপের আজব পাঠশালা
মোঃ মামুন হাসান
এক যে ছিল দ্বীপ যার নাম অন্ধদ্বীপ। সেই দ্বীপে একটি প্রকান্ড অট্টালিকা ছিল যেখানে প্রজাদের সন্তানদের তলোয়ার চালানো আর কারিগরি বিদ্যা শেখানো হতো। অট্টালিকার প্রধান তোরণেই ঝোলানো ছিল এক মস্ত বড় আয়না। তাতে লেখা ছিল চরিত্রই মানুষের অলঙ্কার। কিন্তু সেই আয়না এতই ধুলোবালি আর কালিমাখা ছিল যে তাতে নিজের চেহারা দেখা যেত না কেবল আবছা অন্ধকার চোখে পড়ত।
সেই অট্টালিকার মহাপ্রধান ছিলেন এক অদ্ভুতুড়ে মানুষ। তার কাছে তলোয়ারবাজি জানা ওস্তাদদের চেয়ে সেইসব চন্ডাল আর দ্বারপালদের কদর ছিল বেশি যারা সারাদিন নর্দমার খবর রাখত। মহাপ্রধান মহাশয় সেইসব নিচুপদস্থ অনুচরদের সাথে নিয়ে বনের ঝোপঝাড়ে বসে আয়েশ করে লিকার চা গিলতেন আর ফন্দি আঁটতেন কীভাবে রাজভান্ডার থেকে আসা মোহরগুলো সিন্দুক অব্দি পৌঁছানোর আগেই মাঝপথে উধাও করে দেওয়া যায়।
সেই দপ্তরে মোহর গুনে রাখার দায়িত্বে ছিলেন এক কুবের বাবু। তার সাথে গলায় গলায় ভাব ছিল রণসজ্জা বিভাগের এক জাঁদরেল কর্তার। তারা দুজন মিলে রাজদরবারকে দেখাতেন যে তারা খাঁটি ইস্পাতের তলোয়ার কিনছেন কিন্তু আসলে ঝুড়ি বোঝাই করে আনতেন পচা কাঠ আর টিনের পাত। মহাপ্রধান সেই নকল মালের ওপর নিজের মোহর মেরে দিতেন আর বদলে তার থলেতে জমা হতো ভারী ভাগ।
আবার ওস্তাদদের মধ্যে একজন ছিলেন মৌনী বাবা। তিনি পাশের জনপদ থেকে প্রতিদিন আসার নামগন্ধও করতেন না। তিনি জানতেন মহাপ্রধানের অপকর্মে নীরব সমর্থন দিলে ঘরে বসেই দক্ষিণা পাওয়া যায়। তার অনুপস্থিতিই ছিল সেই অপরাধের রাজপথ।
আরেকজন ওস্তাদ ছিলেন যার নেশা ছিল কেবল মোহর আর মোহর। তিনি নবীন যোদ্ধাদের বলতেন ময়দানে লড়তে শেখার চেয়ে আমার বাড়িতে এসে তিল তিল করে সোনা দান করা বেশি জরুরি। যে সোনা দেবে না তার তলোয়ার ভোঁতা করে দেওয়া হবে। বেচারা শিক্ষার্থীরা ভয়ে তাদের শেষ সম্বলটুকুও সেই ওস্তাদের পায়ে সঁপে দিত।
এদিকে মহাপ্রধানের প্রধান সহকারী ছিলেন এক অদ্ভুত কিপটে রাম। তার কাজ ছিল সারা অট্টালিকার হাঁড়ির খবর রাখা। কে কয়টা ভাত খেল কার ঘরে ঘি কম পড়ল এইসব তিলকে তাল করে তিনি মহাপ্রধানের কানে বিষ ঢালতেন। তার মূল পেশা ছিল কানাকানি আর নেশা ছিল অন্যের পাত থেকে খাবার চুরি করা।
এরই মধ্যে একদিন অট্টালিকার পেছনে লঙ্কাকান্ড ঘটে গেল। দেখা গেল সেই কুবের বাবুর লালসায় এক পরিচারিকার সম্মান ধুলোয় মিশেছে। চারিদিকে যখন ঢি-ঢি পড়ে গেল তখন মহাপ্রধান এক সালিশি সভা ডাকলেন। সেখানে ন্যায়ের বদলে যা হলো তাকে বলে কাকস্য পরিবেদনা। মহাপ্রধান সেই কুবেরকে বাঁচাতে সব দায় পরিচারিকার ঘাড়ে চাপিয়ে দিলেন। লোকে আড়ালে বলাবলি করত মহাপ্রধান নিজেও তো এক কন্যাকল্প ওস্তাদের সাথে নিভৃতে মোহমায়ার খেলা খেলেন তাই চোরের ওপর রাগ করে তিনি গৃহত্যাগী হতে চাননি।
সবচেয়ে তাজ্জব ব্যাপার ছিল সেই অট্টালিকার শৃঙ্খলা। সেখানে দ্বারপালেরা ওস্তাদদের সম্মান করা তো দূরে থাক তাদের দিকে এমনভাবে তাকাত যেন ওস্তাদরাই তাদের ভৃত্য। কোনো পন্ডিত যদি নিজের সম্মান নিয়ে একটু উচ্চবাচ্য করতেন অমনি মহাপ্রধান হুঙ্কার দিয়ে বলতেন আমার আদরের দ্বারপালদের সাথে যারা ঝগড়া করবে তাদের এই দুর্গ থেকে বের করে দেওয়া হবে।
ফল যা হওয়ার তাই হলো। কিছু পন্ডিত বাঁচার তাগিদে মহাপ্রধান আর ওই দ্বারপালদের জুতো পালিশে লেগে গেলেন। আর যারা সত্যিকারের বিদ্যার্থী ছিল তারা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দেখল যেখানে সরস্বতীর আসন থাকার কথা সেখানে উইপোকা আর ছুঁচোদের মিলনমেলা বসেছে।
সেই জনপদের বৃদ্ধরা আজও সেই অট্টালিকার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় নাক চেপে ধরেন। তারা বলেন অন্ধকারে প্রদীপ জ্বালালে যদি ধোঁয়া বেশি বের হয় তবে বুঝে নিও তেলের চেয়ে কালিই ছিল বেশি।
লেখক: ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।






