আন্তর্জাতিক অহিংসা দিবস: সহিংসতার পৃথিবীতে শান্তির প্রতীক
সাকিবুর রহমান বাবলা
বিশ্বজুড়ে শান্তি, সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মানবিক সহাবস্থানের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার আহ্বান নিয়ে প্রতি বছর ২ অক্টোবর পালিত হয় আন্তর্জাতিক অহিংসা দিবস। দিনটি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা এবং অহিংস দর্শনের প্রবক্তা মহাত্মা গান্ধীর জন্মদিন। ২০০৭ সালের ১৫ জুন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ৬১/২৭১ নম্বর রেজুলেশনের মাধ্যমে ২ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক অহিংসা দিবস ঘোষণা করে। রেজুলেশনটি ভোট ছাড়াই গৃহীত হয় এবং ভারতসহ ১৪০টি দেশ এর সহপৃষ্ঠপোষক ছিল।
জাতিসংঘের ঘোষণার মূল উদ্দেশ্য হলো শিক্ষা ও জনসচেতনতার মাধ্যমে অহিংসার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া এবং বিশ্বব্যাপী শান্তি, সহনশীলতা, পারস্পরিক বোঝাপড়া ও অহিংসার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষাকে এগিয়ে নেওয়া। অর্থাৎ অহিংসা কেবল যুদ্ধ না করার নাম নয়; বরং অন্যায়, বৈষম্য ও বিরোধের মোকাবিলায় সহিংসতার পরিবর্তে সংলাপ, নৈতিক দৃঢ়তা, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ ও পারস্পরিক সম্মানের পথ অনুসরণ করা।
মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী ১৮৬৯ সালের ২ অক্টোবর ভারতের গুজরাটের পোরবন্দরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা করমচাঁদ গান্ধী ছিলেন পোরবন্দরের দেওয়ান এবং মা পুতলিবাঈ ছিলেন ধর্মপ্রাণ ও নীতিবোধসম্পন্ন নারী। ১৮৮৮ সালে আইন পড়তে তিনি লন্ডনে যান এবং ১৮৯১ সালে ব্যারিস্টারি সম্পন্ন করে ভারতে ফিরে আসেন। ১৮৯৩ সালে আইনগত কাজের সূত্রে দক্ষিণ আফ্রিকায় যাওয়ার পর বর্ণবৈষম্যের নানা অভিজ্ঞতা তাঁর চিন্তা ও রাজনৈতিক দর্শনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। সেখানে ভারতীয়দের অধিকার রক্ষার আন্দোলনে তিনি সত্যাগ্রহ ও অহিংস প্রতিরোধের ধারণাকে বিকশিত করেন।
১৯১৫ সালে ভারতে ফিরে তিনা ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসে যোগ দেন এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতায় পরিণত হন। ১৯৩০ সালের লবণ সত্যাগ্রহ ও ডান্ডি অভিযান এবং ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনের মাধ্যমে তিনি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে গণসম্পৃক্ততা ও অহিংস প্রতিরোধের শক্তিকে সামনে আনেন। তাঁর দর্শনের কেন্দ্রে ছিল সত্য, আত্মসংযম, নৈতিক সাহস, অসহযোগ এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান।
গান্ধীর কাছে অহিংসা দুর্বলতার প্রতীক ছিল না; বরং এটি ছিল মানুষের নৈতিক শক্তির প্রকাশ। জাতিসংঘে আন্তর্জাতিক অহিংসা দিবসের প্রস্তাব উপস্থাপনের সময় তৎকালীন ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আনন্দ শর্মাও গান্ধীর অহিংসাকে মানবজাতির এক অসাধারণ শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছিলেন।
অহিংস আন্দোলনের বিভিন্ন কৌশলের মধ্যে শান্তিপূর্ণ মিছিল, গণসমাবেশ, জনমত গঠন, বয়কট, অসহযোগ, অবস্থান ও নাগরিক অবাধ্যতার মতো পদ্ধতি ইতিহাসে ব্যবহৃত হয়েছে। এসব কৌশলের লক্ষ্য সহিংস সংঘাত সৃষ্টি করা নয়; বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগঠিত, দৃঢ় ও শান্তিপূর্ণ সামাজিক চাপ তৈরি করা। তবে অহিংসা মানে অন্যায়ের কাছে আত্মসমর্পণ নয়, বরং অন্যায়ের প্রতিবাদ করেও প্রতিহিংসা ও অপ্রয়োজনীয় ক্ষতির পথ পরিহার করা। তাই ব্যক্তিগত আচরণ থেকে শুরু করে ‘সামাজিক আন্দোলন ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক’ সব ক্ষেত্রেই অহিংসার প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে।
গান্ধীর অহিংস দর্শন ভারতের সীমানা অতিক্রম করে বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক ও মানবাধিকার আন্দোলনের আলোচনায় স্থান করে নেয়। মার্কিন নাগরিক অধিকার আন্দোলনের নেতা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র অহিংস প্রতিরোধের ধারণা থেকে গভীরভাবে প্রভাবিত হন। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী সংগ্রামের ইতিহাসেও গান্ধীর প্রভাব নিয়ে ব্যাপক আলোচনা রয়েছে। নেলসন ম্যান্ডেলা ও দালাই লামাসহ বিভিন্ন বিশ্বনেতা ও চিন্তাবিদের সঙ্গে গান্ধীর অহিংস দর্শনের সম্পর্কও আলোচিত হয়েছে।
তবে বিশ্বের প্রতিটি গণআন্দোলনের ইতিহাস ও রাজনৈতিক বাস্তবতা আলাদা। তাই পরবর্তী সব অহিংস আন্দোলনকে সরাসরি গান্ধীর আন্দোলনের অনুকরণ বলা যথার্থ নয়। বরং বলা যায়, সত্যাগ্রহ, নাগরিক অবাধ্যতা ও অহিংস প্রতিরোধের ধারণা পরবর্তী অনেক আন্দোলনের চিন্তাজগতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে।
অহিংসা বর্তমানে শুধু নৈতিক বা রাজনৈতিক দর্শনের বিষয় নয়; এটি পিস অ্যান্ড কনফ্লিক্ট স্টাডিজ, কনফ্লিক্ট রেজোলিউশন, হিউম্যান রাইটস এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মতো একাডেমিক ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগ শান্তি, যুদ্ধ ও বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার কারণ নিয়ে আন্তঃবিষয়ক শিক্ষা ও গবেষণা পরিচালনা করে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ‘ইউনিভার্সিটি অব পিস’ শান্তি ও সংঘর্ষ বিষয়ে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান।
অহিংসার প্রকৃত চর্চা শুরু হতে পারে আমাদের নিজেদের জীবন থেকেই। পরিবারে মতবিরোধ, বন্ধুত্বে ভুল বোঝাবুঝি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দ্বন্দ্ব কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতের পার্থক্যÑএসব ক্ষেত্রে রাগ, অপমান ও প্রতিশোধের পরিবর্তে যুক্তি, ধৈর্য, শ্রবণ ও সংলাপ বেছে নেওয়া অহিংস সংস্কৃতির অংশ। অহিংস আচরণ পারস্পরিক আস্থা ও সম্মান তৈরিতে সহায়তা করে, সংঘাতের বিস্তার রোধ করতে পারে এবং মানুষকে সহনশীল ও সহানুভূতিশীল হতে শেখায়। তবে অহিংসা মানে নিজের অধিকার বিসর্জন নয়; বরং অধিকার ও ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার পাশাপাশি অন্যের মানবিক মর্যাদাকেও সম্মান করা।
আজকের পৃথিবীতে যুদ্ধ, সংঘাত, অসহিষ্ণুতা, ঘৃণা, সামাজিক বিভাজন ও নানা ধরনের সহিংসতার বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক অহিংসা দিবসের তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। ২ অক্টোবর আমাদের মনে করিয়ে দেয়Ñশান্তি শুধু অস্ত্রের অনুপস্থিতি নয়; শান্তি হলো ন্যায়, মানবিক মর্যাদা, সহনশীলতা, সংলাপ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার প্রতিষ্ঠা। এটি নিজেদের চিন্তা, ভাষা ও আচরণকে নতুন করে মূল্যায়নের দিন। ঘৃণার পরিবর্তে সহমর্মিতা, প্রতিহিংসার পরিবর্তে ন্যায়, সংঘাতের পরিবর্তে সংলাপ এবং সহিংসতার পরিবর্তে মানবিকতার পথ বেছে নেওয়াই হতে পারে এই দিবসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার।












