আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস: স্বীকৃতি, সমতা ও টেকসই উন্নয়নে নারীর অগ্রযাত্রা
সাকিবুর রহমান বাবলা
বিশ্বের প্রতিটি জনপদের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে গ্রামীণ নারীদের শ্রম, মেধা ও স্বপ্ন গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে কৃষিকাজে ব্যস্ত হয়ে পড়া, পরিবারের জন্য খাদ্য উৎপাদন, গবাদিপশু পালন, সন্তানদের লালন-পালন কিংবা লোকজ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ-সব ক্ষেত্রেই তাঁদের অবদান অনস্বীকার্য। অথচ সমাজ ও অর্থনীতির ভিত গড়ে তোলা এই নারীদের অনেকের শ্রমই যথাযথ স্বীকৃতি পায় না। তাঁদের অধিকার, মর্যাদা ও উন্নয়নের প্রশ্নকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতেই প্রতিবছর ১৫ অক্টোবর পালিত হয় আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস।
১৯৯৫ সালে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলনের প্রেক্ষাপটে গ্রামীণ নারীদের অবদানকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি আরও জোরালো হয়। পরবর্তী সময়ে ২০০৭ সালের ১৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত ৬২/১৩৬ নম্বর প্রস্তাবের মাধ্যমে ১৫ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ২০০৮ সালে প্রথমবারের মতো দিবসটি আনুষ্ঠানিকভাবে পালিত হয়। এর মূল লক্ষ্য কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নে নারীদের ভূমিকার স্বীকৃতি, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, দারিদ্র্য বিমোচন এবং গ্রামীণ নারীদের আর্থসামাজিক ক্ষমতায়ন।
দিবসটি কেবল আনুষ্ঠানিক উদ্যাপনের উপলক্ষ নয়; বরং গ্রামীণ নারীদের অধিকার, সুযোগ ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্র, সমাজ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২২ শতাংশ গ্রামীণ নারী। ২০২৩ সালের বৈশ্বিক পরিসংখ্যান অনুসারে, কৃষিশ্রমশক্তির প্রায় ৪০ শতাংশই নারী; আফ্রিকা ও এশিয়ার কিছু অঞ্চলে এই হার আরও বেশি। বীজ সংরক্ষণ, চারা রোপণ, ফসলের পরিচর্যা, ফসল কাটা, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বাজারজাতকরণ-কৃষির প্রায় প্রতিটি পর্যায়েই তাঁদের অংশগ্রহণ রয়েছে।
কৃষির বাইরেও হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশু পালন, মৎস্যচাষ, হস্তশিল্প, কুটিরশিল্প এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার মাধ্যমে তাঁরা কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও পারিবারিক আয় বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখেন। উৎপাদিত খাদ্য পরিবারের পুষ্টি নিশ্চিত করে; আর উদ্বৃত্ত পণ্য বিক্রি থেকে অর্জিত অর্থ সন্তানদের শিক্ষা, চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে সহায়তা করে। এভাবেই গ্রামীণ নারীদের শ্রম স্থানীয় অর্থনীতিকে সচল রাখার পাশাপাশি দারিদ্র্য হ্রাস ও টেকসই উন্নয়নের পথ প্রশস্ত করে।
গ্রামীণ নারীরা শুধু অর্থনীতির কর্মী নন, তাঁরা ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারকও। লোকগান, লোকশিল্প, নকশিকাঁথা, ঐতিহ্যবাহী খাদ্য প্রস্তুত, বীজ সংরক্ষণ এবং প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনায় তাঁদের অভিজ্ঞতা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত হয়। বিশেষত আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারীরা নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও প্রথাগত জ্ঞান সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
পরিবারের শিশু, প্রবীণ ও অসুস্থ সদস্যদের পরিচর্যা, স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও তাঁদের অবদান অপরিসীম। কিন্তু রান্না, পানি ও জ্বালানি সংগ্রহ, সন্তান লালন-পালন এবং পরিবারের সদস্যদের সেবার মতো অবৈতনিক কাজ অর্থনৈতিক হিসাবের বাইরে থেকে যায়। ফলে তাঁদের প্রকৃত শ্রম ও অবদান অনেক সময় অদৃশ্যই থেকে যায়।
অবদানের তুলনায় গ্রামীণ নারীরা এখনো ভূমির মালিকানা, ঋণ, আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও বাজারসুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছেন। জাতিসংঘের তথ্যমতে, বিশ্বে কৃষিজমির মালিকদের মধ্যে নারীর অংশ প্রায় ১৫ শতাংশ। কৃষি খাতে মজুরিভিত্তিক কাজে নিয়োজিত নারীরা পুরুষদের প্রতি এক ডলারের বিপরীতে গড়ে প্রায় ৮২ সেন্ট আয় করেন। অর্থাৎ সমান সুযোগ ও ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনো উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে।
এ ছাড়া বাল্যবিবাহ, শিক্ষার সীমিত সুযোগ, স্বাস্থ্যসেবার অপ্রতুলতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে কম অংশগ্রহণ এবং সামাজিক কুসংস্কার তাঁদের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিলে কৃষি, জীবিকা ও পারিবারিক খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে। বিশেষ করে দরিদ্র ও প্রান্তিক গ্রামীণ নারীদের জন্য এই সংকট মোকাবিলা আরও কঠিন হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ধান ও সবজি চাষ, বীজ সংরক্ষণ, ফসল-পরবর্তী প্রক্রিয়াজাতকরণ, হাঁস-মুরগি পালন, মৎস্যচাষ এবং কুটিরশিল্পে তাঁদের অংশগ্রহণ গ্রামীণ পরিবারের জীবিকা ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করে। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা ও ঘূর্ণিঝড়, হাওরাঞ্চলে আকস্মিক বন্যা এবং নদীভাঙনপ্রবণ এলাকায় বসতভিটা ও জীবিকা হারানোর ঝুঁকি তাঁদের জীবনকে আরও কঠিন করে তোলে।
তাই গ্রামীণ নারীদের উন্নয়নে জমি ও সম্পত্তির অধিকার কার্যকর করা, ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা, সহজ শর্তে ঋণ ও কৃষি উপকরণ সরবরাহ, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি মানসম্মত শিক্ষা, মাতৃস্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সুরক্ষা এবং স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থা, গণমাধ্যম ও সামাজিক সংগঠনগুলোকেও এ ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, গ্রামীণ নারীদের উন্নয়ন কোনো বিচ্ছিন্ন কল্যাণমূলক কর্মসূচি নয়; এটি ক্ষুধামুক্ত বিশ্ব, দারিদ্র্য বিমোচন, লিঙ্গসমতা এবং পরিবেশগত স্থিতিশীলতা অর্জনের অপরিহার্য শর্ত। ২০২৬ সাল জাতিসংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক নারী কৃষক বর্ষ হওয়ায় কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থায় নারীদের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়ার গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
গ্রামীণ নারীদের কেবল পরিশ্রমী কর্মী হিসেবে নয়, অধিকারসম্পন্ন নাগরিক, উদ্যোক্তা, উদ্ভাবক ও নেতৃত্বদাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তাঁদের শ্রমের ন্যায্য মূল্য, সম্পদের ওপর অধিকার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সমান সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবাই উপকৃত হবে। যে সমাজ তার গ্রামীণ নারীদের মর্যাদা দেয়, সেই সমাজই সমতা, মানবিকতা ও টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে পারে।
গ্রামীণ নারীর ক্ষমতায়ন মানে শুধু নারীর অগ্রগতি নয়; এটি সমৃদ্ধ, ন্যায়ভিত্তিক ও টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণের অঙ্গীকার।









