আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস: দীর্ঘ জীবনের মর্যাদা ও নিরাপত্তা
সাকিবুর রহমান বাবলা
প্রবীণ-শব্দটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, স্মৃতি, শ্রম, ত্যাগ ও ভালোবাসার গল্প। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে জীবনের বড় একটি সময় ব্যয় করা এই মানুষগুলো বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নির্ভরশীলতা, একাকিত্ব, অসুস্থতা কিংবা আর্থিক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হন। তাই তাঁদের প্রতি সম্মান, অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা শুধু পারিবারিক দায়িত্ব নয়; এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক মানবিক ও সামাজিক দায়িত্ব। এই উপলব্ধি থেকেই প্রতি বছর ১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস পালিত হয়।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ১৯৯০ সালের ১৪ ডিসেম্বর ৪৫/১০৬ নম্বর প্রস্তাবের মাধ্যমে ১ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস ঘোষণা করে এবং ১৯৯১ সালে তা প্রথমবার উদযাপিত হয়। এর পেছনে ১৯৮২ সালের প্রবীণবিষয়ক ভিয়েনা আন্তর্জাতিক কার্যপরিকল্পনার বিশেষ ভূমিকা ছিল। জাতিসংঘের ঘোষিত নীতিগুলোর মধ্যে রয়েছে স্বাধীনতা, অংশগ্রহণ, যতœ, আত্মনির্ভরতা ও মর্যাদা।
২০২৬ সালের দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে-’দীর্ঘায়ুর যুগ: দীর্ঘতর জীবনের জন্য ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস’। মানুষের গড় আয়ু বাড়ছেÑযা মানব সভ্যতার অগ্রগতির এক বড় অর্জন। তবে দীর্ঘ জীবন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা সুস্থ, নিরাপদ, স্বচ্ছন্দ ও মর্যাদাপূর্ণ থাকে। তাই দীর্ঘায়ুর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা, পেনশন, আবাসন, কর্মসংস্থান, পরিবহন ও সামাজিক সেবাব্যবস্থাকে প্রবীণবান্ধব করে গড়ে তোলা আবশ্যক।
বিশ্বে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিশ্বে ৬০ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ১১০ কোটি; ২০৩০ সালে তা ১৪০ কোটিতে এবং ২০৫০ সালে প্রায় ২১০ কোটিতে পৌঁছাতে পারে। ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বের প্রতি ছয়জন মানুষের মধ্যে একজনের বয়স ৬০ বছর বা তার বেশি হবে। অর্থাৎ প্রবীণ জনগোষ্ঠীর কল্যাণ ভাবনা ভবিষ্যতের কোনো দূরবর্তী বিষয় নয়; এটি বর্তমান বিশ্বের এক তাৎক্ষণিক ও গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা।
প্রবীণদের কেবল সাহায্যপ্রার্থী হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা জরুরি। তাঁরা পরিবারে নাতি-নাতনিদের যতœ নেন, তরুণদের অভিজ্ঞতা ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দেন, সামাজিক কর্মকা-ে অংশ নেন এবং অনেকেই কর্মজীবনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা উল্লেখ করেছেÑস্বেচ্ছাসেবা, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়া, পারিবারিক দেখভাল এবং কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রবীণরা সমাজে এক অপরিসীম অবদান রেখে চলেন।
বাংলাদেশেও প্রবীণদের অধিকার ও সুরক্ষায় বিভিন্ন সাংবিধানিক, আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি রয়েছে। সংবিধানের ১৫(ঘ) অনুচ্ছেদে বার্ধক্যজনিত কারণে অভাবগ্রস্ত নাগরিকদের সামাজিক নিরাপত্তার অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ‘জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা, ২০১৩’ প্রবীণদের সার্বিক কল্যাণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি সুদৃঢ় ভিত্তি তৈরি করেছে। পারিবারিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আইন অনুযায়ী সন্তানদের জন্য পিতা-মাতার খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা, বাসস্থান ও সঙ্গ প্রদান বাধ্যতামূলক। এই আইন লঙ্ঘিত হলে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা অর্থদ- কিংবা অর্থদ- অনাদায়ে সর্বোচ্চ তিন মাস কারাদ-ের আইনি বিধান রয়েছে।
সরকারের সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে পরিচালিত বয়স্ক ভাতা কর্মসূচি দরিদ্র ও অসহায় প্রবীণদের জন্য এক আশার আলো। এর পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন ও সামাজিক সুরক্ষায় কাজ করছে। তবে শুধু ভাতা বিতরণ বা আইনি সেবার মধ্যেই আমাদের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; প্রয়োজন এমন এক পরিবেশ, যেখানে প্রবীণরা নিজেদের সম্মানিত নাগরিক হিসেবে অনুভব করতে পারেন।
প্রবীণ জীবনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো একাকিত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা। শারীরিক অসুস্থতার পাশাপাশি বয়স বৃদ্ধির সাথে সামাজিক যোগাযোগও সংকুচিত হয়ে আসে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা প্রবীণদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে। তাই তাঁদের সঙ্গে কথা বলা, সময় দেওয়া, মতামতকে মূল্য দেওয়া এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মকা-ে যুক্ত রাখার সুযোগ তৈরি করা অত্যন্ত প্রয়োজন।
জাপান, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুরের মতো এশীয় দেশগুলোতে প্রবীণ জনসংখ্যা অত্যন্ত দ্রুত গতিতে বাড়ছেÑযার মধ্যে জাপানে ৬৫+ বয়সী মানুষ ইতোমধ্যে প্রায় ২৯ শতাংশ। বাংলাদেশে ২০২৫ সালে এই হার প্রায় ৭ শতাংশ থাকলেও আগামী ২৪ বছরে তা দ্বিগুণ হয়ে ১৪ শতাংশে পৌঁছাবে। তাই আগামী দিনের প্রবীণদের জন্য আমাদের এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। প্রয়োজন প্রবীণবান্ধব হাসপাতাল, গণপরিবহন, সহজলভ্য চিকিৎসাসেবা, নিরাপদ আবাসন, প্রযুক্তি ব্যবহারে সহায়তা এবং সক্ষম প্রবীণদের জন্য উপযুক্ত কাজ বা মেন্টরশিপের ব্যবস্থা। একই সঙ্গে পরিবারে আন্তঃপ্রজন্মীয় সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে হবেÑযেখানে তরুণরা প্রবীণদের প্রজ্ঞা থেকে শিখবে এবং প্রবীণরাও নতুন প্রজন্মের ভাবনার সাথে যুক্ত থাকার সুযোগ পাবেন।
আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস শুধু একটি আনুষ্ঠানিক উদযাপন নয়; এটি আমাদের নিজস্ব ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ভাবার এক অনন্য সুযোগ। কারণ আজকের তরুণ ও মধ্যবয়সীরাই আগামী দিনের প্রবীণ। আমরা যে সমাজ আজ গড়ে তুলব, ভবিষ্যতে সেই সমাজেই আমাদের বসবাস করতে হবে। তাই প্রবীণদের জন্য নিরাপদ, মানবিক ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করার অর্থ হলো নিজেদের ভবিষ্যৎকেই সুরক্ষিত করা। দীর্ঘ জীবন যেন একাকিত্বের না হয়ে মর্যাদার হয়; বার্ধক্য যেন বোঝা না হয়ে অভিজ্ঞতার শক্তি হয়ে ওঠেÑএই হোক আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসের মূল অঙ্গীকার।






