আশাশুনি: প্রতি নিয়ত দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে যে জনপদের মানুষ
সচ্চিদানন্দ দে সদয়, আশাশুনি: সাতক্ষীরার উপকূলীয় উপজেলা আশাশুনি। নদী-খাল, জলাভূমি আর বিস্তীর্ণ জনপদ নিয়ে গড়ে ওঠা এ এলাকার মানুষের জীবন প্রকৃতির সঙ্গে প্রতিদিনের এক সংগ্রামের গল্প। একদিকে নদীভাঙন, দুর্বল বেড়িবাঁধ, লবণাক্ততা ও সুপেয় পানির সংকট; অন্যদিকে জীবিকা ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা। তবুও প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে টিকে আছেন এখানকার মানুষ।
বর্ষা এলেই বেড়িবাঁধ নিয়ে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়। নদীর পানি বাড়লে বাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলো নিয়ে বাড়ে উদ্বেগ। কোথাও বাঁধ ভেঙে গেলে মুহূর্তেই প্লাবিত হয় বসতবাড়ি, ফসলের জমি ও মাছের ঘের। দুর্যোগের পর ঘর মেরামত, জীবিকা পুনর্গঠন এবং ঋণের বোঝা সামলাতে গিয়ে অনেক পরিবারকে দীর্ঘদিন কষ্ট করতে হয়। স্থানীয় কৃষক ও মৎস্যজীবী মো. রবিউল ইসলাম (৪৭) বলেন, “বর্ষা এলেই বেড়িবাঁধ ভাঙার ভয় থাকে। বাঁধ ভেঙে গেলে ঘরবাড়ি ও মাছের ঘের পানিতে তলিয়ে যায়। সবচেয়ে বড় কষ্ট সুপেয় পানি নিয়ে। রান্না ও খাওয়ার পানির জন্য অনেক দূরে যেতে হয়।”
উপকূলীয় লবণাক্ততা আশাশুনির কৃষি ও জনজীবনে বড় প্রভাব ফেলেছে। অনেক এলাকায় মাটির লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় আগের মতো ধান, শাকসবজি ও ফলমূল উৎপাদন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে কৃষির পাশাপাশি চিংড়ি, কাঁকড়া ও মাছ চাষের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা সুরাইয়া বেগম (৩৮) বলেন, “নোনা পানির কারণে আগের মতো ফসল হয় না।
কাজের সুযোগও কম। পরিবারের অনেক পুরুষ কাজের সন্ধানে শহরে চলে যান।” পরিবেশকর্মী কাজল দেবনাথ বলেন, “আশাশুনির সংকটকে শুধু দুর্যোগের সময়ের সমস্যা হিসেবে দেখলে হবে না। নদী-খালের স্বাভাবিক প্রবাহ, টেকসই বেড়িবাঁধ, লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ ও সুপেয় পানির স্থায়ী সমাধানÑসবকিছুকে সমন্বিতভাবে দেখতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া উপকূলের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।”
আশাশুনির অনেক এলাকায় সুপেয় পানির সংকট দীর্ঘদিনের। কোথাও দূরবর্তী উৎস থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়, আবার কোথাও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ কিংবা বিভিন্ন প্রকল্পের পানির ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন নারী ও শিশুরা। স্থানীয় শিক্ষক সুবর্ণা মুখার্জি বলেন, “পানির সংকট শুধু মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে কষ্টকর করছে না, শিক্ষার্থী ও নারীদের সময়ও নষ্ট হচ্ছে। একটি পরিবারকে নিরাপদ পানি নিশ্চিত করতে যদি প্রতিদিন অনেকটা সময় ব্যয় করতে হয়, তাহলে সেই পরিবার কখনোই স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে না।” তিনি আরও বলেন, “শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের জন্য শুধু স্কুল-কলেজের অবকাঠামো নয়, নিরাপদ পানি ও দুর্যোগসহনীয় পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে।”
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মতে, আশাশুনির মানুষের নিরাপত্তার জন্য টেকসই বেড়িবাঁধের বিকল্প আর কিছু নেই। ২ নং বুধহাটা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাহবাবূল হক ডাবলু বলেন, “প্রতি বছর বর্ষা ও জলোচ্ছ্বাসের সময় বেড়িবাঁধ নিয়ে আমাদের বাড়তি সতর্ক থাকতে হয়। কোথাও ভাঙন দেখা দিলে স্থানীয়ভাবে তাৎক্ষণিকভাবে রক্ষার চেষ্টা করা হয়। তবে স্থায়ী সমাধানের জন্য পরিকল্পিতভাবে বাঁধ সংস্কার ও মজবুত করা প্রয়োজন।
ইউপি সদস্য শীষ মোহাম্মদ জেরি বলেন, “বাঁধ ভেঙে গেলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ মানুষ। ঘরবাড়ি, ফসল ও মাছের ঘেরÑসবকিছু একসঙ্গে ক্ষতির মুখে পড়ে। বাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো আগে থেকেই চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।” স্থানীয় সাংবাদিক ইয়াছিন আরাফাত ডেনিস বলেন , “আশাশুনির মানুষের দুর্ভোগ নতুন কোনো বিষয় নয়। প্রতিবছর দুর্যোগের সময় এসব সমস্যা সামনে আসে, পরে আবার অনেকটাই আড়ালে চলে যায়। অথচ বেড়িবাঁধ, পানি ও নদী-খালের সমস্যা স্থায়ী। এসব বিষয়ে ধারাবাহিক নজরদারি ও জবাবদিহি প্রয়োজন।” তিনি বলেন, “উপকূলের মানুষকে শুধু দুর্যোগের শিকার হিসেবে দেখলে চলবে না। তারা কৃষক, মৎস্যজীবী, শ্রমিক ও উদ্যোক্তাÑঅর্থনীতিতে তাদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তাদের নিরাপদ জীবন ও টেকসই জীবিকার নিশ্চয়তা দিতে হবে।”
আশাশুনির সমস্যা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে সম্ভাবনাও। মৎস্যসম্পদ, কৃষি, স্থানীয় শ্রমশক্তি, নদী-খাল ও জলাভূমিকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো গেলে এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন গতি আসতে পারে। লবণসহিষ্ণু কৃষি সম্প্রসারণ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, বিকল্প কর্মসংস্থান এবং দুর্যোগসহনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার মাধ্যমে মানুষের জীবনমান উন্নত করা সম্ভব।
স্থানীয়দের দাবি, দুর্যোগের সময় ত্রাণ দেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। টেকসই বেড়িবাঁধ, নদী-খালের প্রবাহ সচল রাখা, সুপেয় পানির স্থায়ী ব্যবস্থা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা আশাশুনির মানুষের গল্প আসলে বাংলাদেশের উপকূলেরই গল্প। প্রতিটি জলোচ্ছ্বাসের পর তারা ঘর বাঁধেন, প্রতিটি ভাঙনের পর নতুন করে জীবন শুরু করেন। তাদের প্রয়োজন শুধু সহানুভূতি নয়Ñপ্রয়োজন নিরাপদ বাঁধ, সুপেয় পানি, টেকসই জীবিকা এবং ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা। পরিকল্পিত উদ্যোগ ও স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে দুর্যোগের এই জনপদই একদিন সম্ভাবনার শক্তিশালী উপকূলীয় জনপদে পরিণত হতে পারে।









