শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬, ১৪ ভাদ্র ১৪৩৩
শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬, ১৪ ভাদ্র ১৪৩৩

জিএম নূর ইসলাম-দৃঢ়চেতা এক সফল মানুষ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬, ১০:৪৮ অপরাহ্ণ
জিএম নূর ইসলাম-দৃঢ়চেতা এক সফল মানুষ

আবুল কাসেম

কোথা থেকে শুরু করব, বুঝতে পারছিনা। হতবিহবল মানুষের কাছ থেকে স্বভাবজাত লেখা বা বক্তব্য আশা করাটা দুস্কর হয়। বৃহস্পতিবার দুপুরে দৃষ্টিপাত সম্পাদক জিএম নূর ইসলামের মৃত্যু সংবাদ পাই। মুহূর্তের মধ্যে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ি। সামেক হাসপাতালে তাঁর শারীরিক অবস্থা দেখে আগেই আশঙ্কা করা হয়েছিল, সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবন-যাপনে ফেরার সম্ভাবনা কম।

জিএম নূর ইসলাম। সাতক্ষীরায় পত্রিকাজগতে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। ব্যক্তিজগতে তিনি ছিলেন একজন সফল মানুষ। তবে তাঁর এই সফলতার পেছনে ছিল নিরবিচ্ছিন্ন সংগ্রামের ইতিহাস। প্রায় ৪০ বছর আগে যশোরের নাভারণ থেকে আব্দুল খালেক তার মেজ ভাই গোলাম মোস্তফা ও ছোট ভাই নূর ইসলামসহ তাদের সন্তানদের নিয়ে সাতক্ষীরার সুলতানপুরে বসতি গড়েন।

সেনাবাহিনীতে কর্মরত আব্দুল খালেকের সহায়তায় জিএম নূর ইসলাম সঙ্গীতা মোড় এলাকায় একটি মনোহরী দোকান করেন। মেয়েদের আলতা, স্নো, পাউডার আর রঙবেরঙের ভিউকার্ড বিক্রির মাধ্যমে তিনি কিছুটা স্বচ্ছল হলেন। কিন্তু প্রকৃতি যাকে ডাকে আরও বৃহ সরোবরে ঝাপ দেওয়ার জন্য ,তিনি কি কুযোর মধ্যে সাতার কাটতে পছন্দ করবেন! মনোহরী ব্যবসাটা ঠিক মনোপুত হলোনা তাঁর। বাস টার্মিনাল এলাকায় দোকান নিয়ে পত্রিকা বেঁচা শুরু করলেন তিনি।

 

আজকের সোশ্যাল মিডিয়ার ডিজিটাল প্লাটফর্মের তরুণ-তরুণীরা ভাবতেই পারবেননা, ২ দশক আগে প্রিন্ট পত্রিকার দাপটের কথা। দেশের যত নামী-দামি পত্রিকা রয়েছে, সাতক্ষীরায় তার প্রধান এজেন্ট জিএম নূর ইসলাম। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই, তিনি ব্যবসাসহ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কঠোর নিয়মানুবর্তিতা দেখিয়েছেন। পত্রিকার হকাররাও তাঁর বেঁধে দেওয়া শৃঙ্খলার বাইরে যেতে পারতেননা। পুরো সাতক্ষীরা জেলায় তিনি হয়ে উঠলেন পত্রিকার এজেন্সির ক্ষেত্রে এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী নাম। ঢাকা থেকে প্রকাশিত কোনো পত্রিকা বের হলে সার্কুলেশন ম্যানেজারদের মনে যার নামটাই প্রথমে আসত,তিনি হলেন জিএম নূর ইসলাম।

দৈনিক দৃষ্টিপাত। নূর ইসলামকে সুপরিচিত করেছে এই পত্রিকাটি। ২০০১ সালের শেষের দিকে এই পত্রিকাটি তাঁর সম্পাদনায় বের হয়। সার্কুলেশন ক্যাপাসিটির কারণে পত্রিকাটির প্রচার সংখ্যা ছিল ব্যাপক। জানা যায়,সারা রাত প্রেসে কাজ করার পর পত্রিকা ব্যান্ডেল করে গাড়ীতে তুলে দিয়ে বাসায় তিনি যখন যেতেন, তখন পূব আকাশে সূর্যের লাল আভা ফুটে উঠত। একদিন-দুইদিন নয়, বছরের পর বছর তিনি পত্রিকাটিকে এভাবে সন্তানসম লালন-পালন করে হৃষ্টপুষ্ট করে তারুণ্যে পৌঁছে দিয়েছেন। পত্রিকার নামে নামকরণকৃত তাঁর কাশেমপুরস্থ (মেহেদীবাগ) বাড়িতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে প্রস্তুতকৃত দৃষ্টি পিউর ড্রিংকিং ওয়াটারও বেশ সফলতা দেখিয়েছিল।

মসজিদে কুবা। মেহেদীবাগে অবস্থিত এই মসজিদটি শুধু জেলার মধ্যে নয়,সারা দেশের মধ্যে অনন্য একটি মসজিদ। যথার্থই এর নাম-ইসলামি সংস্কৃতি ও সেবা কেন্দ্র। ইসলামিক বিভিন্ন ইভেন্টে প্রতিযোগীতা, মেডিকেল ও ডেন্টাল ক্যাম্পসহ বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে মসজিদটি। এ প্রসঙ্গে বলে রাখা দরকার-মসজিদ শুধু নামাজ পড়ার জন্য নয়, সামাজিক ও মানবিক কর্মকান্ড পরিচালিত হওয়াও দরকার এখান থেকে।

আন্তর্জাতিক ফিফা রেফারি তৈয়ব হাসান বাবুর সঞ্চয়কৃত অর্থ দিয়ে মেহেদীবাগে মসজিদটির জায়গা কেনা হয়। পরে মসজিদটি প্রতিষ্ঠায় যাদের অবদান অনস্বীকারয, জিএম নূর ইসলাম তাদের মধ্যে অন্যতম। তিনি আমৃত্যু মসজিদটির সভাপতি ছিলেন। এছাড়া জেলা নাগরিক অধিকার ও উন্নয়ন কমিটির মাধ্যমে তিনি বিশিষ্ট নাগরিকদের একই প্লাটফর্মে এনে সাতক্ষীরার উন্নয়নে সচেষ্ট ছিলেন।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবে সৃষ্ট অনাকাঙ্খিত ঘটনার আগে-পরে ইসলাম ভাই আমাদের সাথে ছিলেন। এর আগে তাঁর সাথে অতটা নিবিড় সম্পর্ক আমার ছিলনা। মাত্র ২ বছরে আমি তাঁর দৃড়তা দেখেছি। কথা ও কাজে তিনি এক কথার লোক-এমন নমুনা বহুবার দেখেছি। সাংবাদিকতার নামে অসদুপায় অবলম্বন-এমন নজির ইসলাম ভাইয়ের মধ্যে কখনো কেউ দেখেনি। অনেকে বলতেন-ইসলাম ভাই একগুয়ে মানুষ। আমার মনে হয়েছে-একগুয়েমিতার মধ্যে যদি সততা ও আদর্শ থাকে,তবে তা বহুরুপী মানুষের চেয়ে হাজারগুন ভালো।

স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তাঁর মধ্যে খুবই অসহায়ত্ব দেখা যেত। মানষিক ও শারীরিকভাবে তিনি ভেঙে পড়েছিলেন। স্ত্রী সম্পর্কে তিনি প্রায়ই বলতেন-জীবীত থাকাকালে তাঁদের মধ্যে কোনদিন মনোমালিন্য হয়নি। কিছুদিন বেঁচে থাকলে তিনি হয়ত সাতক্ষীরার উন্নয়নে আরও অবদান রাখতে পারতেন। কিন্তু সেটা আর হলোনা। নিজ বাসভবনে পাচিলের পাশে প্রিয়তমা স্ত্রীর পাশে চিরদিনের জন্য সমাহিত হলেন তিনি।

Ads small one

কলারোয়ায় মাদক ব্যবসায়ের অভিযোগে ভ্রাম্যমান আদালতে ৬ মাসের কারাদন্ড

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬, ৮:২০ অপরাহ্ণ
কলারোয়ায় মাদক ব্যবসায়ের অভিযোগে ভ্রাম্যমান আদালতে ৬ মাসের কারাদন্ড

নিজস্ব প্রতিনিধি: সাতক্ষীরার কলারোয়ায় ভ্রাম্যমান আদালতে এক ব্যক্তিকে ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা প্রদান করা হয়েছে।

শনিবার (২৯ আগস্ট) দুপুরে গাঁজাসহ আব্দুল আলিম নামে ওই মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করা হয়।

এ সময় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলাম ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করে তাকে কারাদণ্ড ও জরিমানা প্রদান করেন। ভ্রাম্যমান আদালতের বেঞ্চ সহকারী ও থানা পুলিশের সদস্যরা সেখাানে উপস্থিত ছিলেন।

সাজাপ্রাপ্ত আসামি কলারোয়া পৌরসভার ১নং তুলশীডাঙ্গা ওয়ার্ডের জাবেদ আলী গাজীর ছেলে।

সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে সাতক্ষীরা জেলা কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মিজানুর রহমান। তিনি জানান, এই ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।

কলারোয়ায় পুকুরে ডুবে প্রাণ গেল দুই বছরের শিশুর

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬, ৮:০৪ অপরাহ্ণ
কলারোয়ায় পুকুরে ডুবে প্রাণ গেল দুই বছরের শিশুর
কলারোয়া প্রতিনিধি: কলারোয়ায় বাড়ির পাশের পুকুরের পানিতে ডুবে আব্দুর রহমান (২) নামে এক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। শনিবার (২৯ আগস্ট) দুপুরে উপজেলার যুগিখালি ইউনিয়নের তালুন্দিয়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
নিহত আব্দুর রহমান তালুন্দিয়া গ্রামের ইঞ্জিনিয়ার শাহজাহান কবিরের একমাত্র সন্তান। চাকরির সুবাদে শিশুটির বাবা ঢাকায় অবস্থান করছেন।
সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শনিবার দুপুরে বাড়ির লোকজনের অগোচরে কোনো একসময় শিশু আব্দুর রহমান বাড়ির পাশের পুকুরে পড়ে যায়। পরিবারের সদস্যরা তাকে দেখতে না পেয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে স্থানীয়রা পুকুরে শিশুটিকে ডুবন্ত অবস্থায় দেখতে পেয়ে উদ্ধার করেন।
তবে ততক্ষণে শিশুটির মৃত্যু হয়। পরে তাকে আর হাসপাতালে নেওয়া হয়নি।
মাত্র দুই বছরের শিশুর আকস্মিক ও মর্মান্তিক মৃত্যুতে পরিবার-স্বজনদের মধ্যে নেমে এসেছে গভীর শোক। এ ঘটনায় তালুন্দিয়া গ্রামজুড়ে শোকের ছায়া বিরাজ করছে।

আন্তর্জাতিক গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ দিবস: মানব মর্যাদা রক্ষার দাবি

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬, ৭:২১ অপরাহ্ণ
আন্তর্জাতিক গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ দিবস: মানব মর্যাদা রক্ষার দাবি

সাকিবুর রহমান বাবলা

মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জীবন, স্বাধীনতা ও আইনের সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার। কিন্তু যখন কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রীয় বাহিনী, সরকারি সংস্থা বা তাদের মদদপুষ্ট কোনো গোষ্ঠীর হাতে আটক বা অপহৃত হন এবং পরবর্তীতে তাঁর অবস্থান, ভাগ্য বা অস্তিত্ব সম্পর্কে তথ্য গোপন রাখা হয়, তখন তা কেবল একটি অপরাধ নয়-এটি মানবাধিকারের সবচেয়ে ভয়াবহ লঙ্ঘনগুলোর একটি। আন্তর্জাতিক আইনে একে বলা হয় জোরপূর্বক গুম।

বলপূর্বক গুমের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক সচেতনতা বাড়াতে ২০১০ সালের ২১ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ (রেজুলেশন ৬৫/২০৯) ৩০ আগস্টকে ‘আন্তর্জাতিক গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। ২০২৬ সালের এই দিবসে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস “বলপূর্বক গুম থেকে সকল ব্যক্তির সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক সনদ” গ্রহণের ২০তম বার্ষিকী উপলক্ষে এর সর্বজনীন অনুসমর্থন ও দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানান। ২০২৬ সালের বিশেষ স্লোগান ‘ক্ষতিগ্রস্তরা আগে, এখনই পদক্ষেপ নিন’-এর আলোকে তিনি গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সত্য, ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণের অধিকার সুনিশ্চিত করতে বিশ্ববাসীকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দেন।

জাতিসংঘের মতে, একটি গুমের ঘটনার মধ্য দিয়ে একযোগে বহু মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়। একজন মানুষকে স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা হয়, আদালতের আশ্রয় লাভের অধিকার অস্বীকার করা হয়, অনেক ক্ষেত্রে তিনি গোপন আটককেন্দ্রে নির্যাতনের শিকার হন এবং তাঁর জীবনের নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মুখে পড়ে। এ কারণেই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন গুমকে সবচেয়ে গুরুতর অপরাধগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

গুম শুধু একজন ব্যক্তিকে পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে না; এটি একটি পরিবারকে বছরের পর বছর অনিশ্চয়তা, শোক, ভয় এবং মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে নিক্ষেপ করে। প্রিয়জন জীবিত নাকি মৃত-এই প্রশ্নের উত্তর না পাওয়ার যন্ত্রণা মানবাধিকারের ভাষায় একটি ‘চলমান অপরাধ’ হিসেবে বিবেচিত হয়।

বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, গৃহযুদ্ধ, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের ফলে হাজার হাজার মানুষ গুমের শিকার হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সিরিয়া আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ উদাহরণ, যেখানে ২০১১ সালের পর থেকে লক্ষাধিক মানুষ নিখোঁজ হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। শ্রীলঙ্কার দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ, ইরাকের সংঘাতময় ইতিহাস, আলজেরিয়ার রক্তক্ষয়ী সময়, মেক্সিকোর মাদক-সহিংসতা এবং লাতিন আমেরিকার সামরিক শাসনামল গুমের করুণ ইতিহাস বহন করে।

দক্ষিণ এশিয়াতেও এই সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগের বিষয়। বিভিন্ন সময়ে শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, নেপাল এবং বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে গুমের অভিযোগ আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। একইভাবে ফিলিপাইন, বেলারুশ, জিম্বাবুয়ে ও উত্তর কোরিয়ার মতো দেশেও মানবাধিকার সংস্থাগুলো জোরপূর্বক নিখোঁজের ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

তবে পৃথিবীর সব দেশে পরিস্থিতি এক নয়। নরওয়ে, আইসল্যান্ড, ডেনমার্ক, বেলজিয়াম ও ভুটানের মতো দেশগুলোতে দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গুমের কোনো নথিভুক্ত অভিযোগ নেই। শক্তিশালী গণতন্ত্র, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, স্বচ্ছ প্রশাসন এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র কাঠামো এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা পালন করেছে। তবে মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কোনো দেশে অভিযোগ না থাকা মানেই যে সেখানে কোনো সমস্যা নেই-এমনটি সবসময় সত্য নয়। অনেক স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ভয়ের সংস্কৃতি ও তথ্যপ্রবাহের সীমাবদ্ধতার কারণে অভিযোগ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছায় না।

গুম প্রতিরোধে জাতিসংঘের সবচেয়ে শক্তিশালী আইনি হাতিয়ার হলো ‘জোরপূর্বক নিখোঁজ হওয়া থেকে সকল ব্যক্তির সুরক্ষার আন্তর্জাতিক কনভেনশন’, যা ২০০৬ সালে গৃহীত ও ২০১০ সাল থেকে কার্যকর হয়। এই কনভেনশন অনুযায়ী যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা বা জরুরি অবস্থা—কোনো অবস্থাতেই গুমকে বৈধতা দেওয়ার সুযোগ নেই এবং এটি পরিকল্পিতভাবে ঘটলে তা মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। এই সনদের অধীনে গঠিত ‘কমিটি অন এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্সেস’ এবং ‘ওয়ার্কিং গ্রুপ’ বিশ্বব্যাপী গুমের ঘটনা পর্যবেক্ষণ, অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তের দায়িত্ব পালন করে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আইনে ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের সত্য জানা, ন্যায়বিচার পাওয়া এবং ক্ষতিপূরণ লাভের অধিকারকে স্পষ্টভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

‘আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রোম সংবিধি অনুযায়ী ব্যাপক বা সুপরিকল্পিত গুমের ঘটনায় রাষ্ট্রপ্রধান কিংবা সামরিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও আন্তর্জাতিক বিচারের আওতামুক্ত নন। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ গুমবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদে (আইসিপিপিইডি) যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধ, তদন্ত ও ভুক্তভোগীদের সুরক্ষায় আইনগত সংস্কারের এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। ফলে এখন আন্তর্জাতিক মানদন্ড মেনে স্বাধীন গুমবিরোধী আইন প্রণয়ন, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অপরাধের কার্যকর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।

জোরপূর্বক গুমের ঘটনায় প্রমাণ সংগ্রহ, অবস্থান ট্র্যাকিং এবং আইনি প্রতিকার পেতে আধুনিক ডিজিটাল ডিভাইস ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অত্যন্ত কার্যকর। ঘটনার তাৎক্ষণিক প্রমাণ রক্ষায় ক্লাউড লাইভ স্ট্রিমিং, স্বয়ংক্রিয় ‘ডেড ম্যানস সুইচ’, ফোনের এসওএস ফিচার এবং গুগল বা অ্যাপলের লোকেশন হিস্ট্রি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি, এআই প্রযুক্তির সাহায্যে ঝাপসা সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে গাড়ি বা মুখমন্ডল স্পষ্টভাবে শনাক্ত করা যায়। তথ্য নিরাপদ রাখতে পাসকী এবং সিগন্যাল বা হোয়াটসঅ্যাপের মতো এনক্রিপ্টেড অ্যাপ ব্যবহার করা জরুরি। পরবর্তী সময়ে সংগৃহীত এসব ডিজিটাল ফরেনসিক উপাত্ত উচ্চ আদালতে ‘হেবিয়াস কর্পাস’ রিট দায়ের করতে কিংবা জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থায় জমা দিয়ে আইনি প্রতিকার ও বৈশ্বিক চাপ সৃষ্টিতে অকাট্য প্রমাণ হিসেবে কাজ করে।

গুম প্রতিরোধে কেবল আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, বরং জনগণের সচেতনতা, নাগরিক সাহস এবং সামাজিক প্রতিরোধও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ব্যক্তিকে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করা হলে পরিচয় যাচাই, তথ্য-প্রমাণ সংরক্ষণ, দ্রুত আইনি পদক্ষেপ (যেমন জিডি বা হেবিয়াস কর্পাস রিট) নেওয়া এবং ভুক্তভোগী পরিবারের পাশে দাঁড়ানো নাগরিকদের প্রধান দায়িত্ব। মূলত সমাজে ভয় ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই গুম করা হয়; তাই একটি সোচ্চার ও সংগঠিত নাগরিক সমাজ যখন সত্য ও ন্যায়বিচারের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হয়, তখনই এই জঘন্য ও গোপন অপরাধ প্রতিহত করা সম্ভব।

প্রতি বছর ৩০ আগস্ট পালিত ‘আন্তর্জাতিক গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ দিবস’ কেবল অতীতের ভুক্তভোগীদের স্মরণ করার দিন নয়, বরং গুমমুক্ত ভবিষ্যৎ গড়ার এক বৈশ্বিক অঙ্গীকার। এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, কোনো মানুষকে গোপনে অদৃশ্য করা যাবে না এবং কোনো পরিবারকেও স্বজন হারানোর অনিশ্চয়তায় দিন কাটাতে হবে না। রাষ্ট্র পরিচালনায় আইনের শাসন ও মানব মর্যাদাকে সর্বোচ্চ ভিত্তি হিসেবে ধরে নিয়ে সত্য, ন্যায়বিচার এবং মানবাধিকারের পক্ষে বিশ্বজুড়ে সোচ্চার হওয়ার মাধ্যমে একটি নিরাপদ পৃথিবী গড়ে তোলাই এই দিবসের মূল বার্তা।