সাতক্ষীরা কেন কক্সবাজার বা সিলেট হতে পারল না
মো. মামুন হাসান
বাংলাদেশের মানচিত্রে পর্যটনের কথা উঠলেই প্রথম সারিতে আসে কক্সবাজার, সিলেটের চা-বাগান কিংবা হাওরাঞ্চলের নাম। অথচ খুলনা বিভাগের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত সাতক্ষীরা জেলার সম্পদ ও বৈচিত্র্য কোনো অংশেই কম নয়। বিশ্বের একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের সিংহভাগই এই জেলায় অবস্থিত, যাকে বলা যায় সুন্দরবনের প্রকৃত প্রবেশদ্বার। এছাড়া রয়েছে মান্দারবাড়িয়া সমুদ্রসৈকত, ঐতিহাসিক যশোরেশ্বরী কালীমন্দির, কপোতাক্ষ নদ, আকাশলীনা ইকোট্যুরিজম কেন্দ্র, রূপসী ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট এবং শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী গুড়পুকুরের মেলা। তবে বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও জাতীয় পর্যটন মানচিত্রে এখনো কাঙ্ক্ষিত স্থান করে নিতে পারেনি জেলাটি। কক্সবাজার বা সিলেট সফল হতে পারলেও সাতক্ষীরা কেন পিছিয়ে রয়েছে এবং এই দুই জেলার উন্নয়ন মডেল এখানে কীভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব—তা নিয়ে একটি সুস্পষ্ট বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
কক্সবাজার ও সিলেটের পর্যটন খাতের সাফল্যের পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে যোগাযোগ অবকাঠামো। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ‘ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্স’ অনুযায়ী, আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা এবং পর্যটকবান্ধব পরিবেশই যেকোনো গন্তব্যের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির প্রধান ভিত্তি। বিমানবন্দর, রেল সংযোগ এবং প্রশস্ত মহাসড়কের কল্যাণে কক্সবাজার আজ ঢাকা থেকে কয়েক ঘণ্টার দূরত্বে পরিণত হয়েছে। সিলেটের চিত্রও একই রকম; সুসংগঠিত সড়ক ও আকাশপথের কারণে ছুটির দিনগুলোতেও সেখানে বিপুল দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে। পক্ষান্তরে, সাতক্ষীরায় অবকাঠামোগত ঘাটতি প্রকট। জেলার প্রায় ৮০ শতাংশ সড়ক এখনো অনুন্নত। বিশেষ করে শ্যামনগরের গাবুরা ও পদ্মপুকুরের মতো উপকূলীয় ইউনিয়নগুলোতে পাকা রাস্তা, মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা এবং বিশুদ্ধ পানির সংকট বিদ্যমান। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মৌলিক সুবিধাই যেখানে নিশ্চিত নয়, সেখানে পর্যটনবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা কঠিন।
দ্বিতীয়ত, বর্তমান যুগের ভ্রমণপিপাসুরা কেবল প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেন না; তারা চান পূর্ণাঙ্গ এক অভিজ্ঞতা। যার মধ্যে রয়েছে মানসম্মত আবাসন, নিরাপদ খাবার, বিনোদনের বিকল্প ব্যবস্থা এবং সার্বিক নিরাপত্তা। কক্সবাজারে বহু বছরের সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে এই পূর্ণাঙ্গ সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। অন্যদিকে সাতক্ষীরায় মান্দারবাড়িয়া সৈকতের মতো মনোরম স্থান থাকলেও সেখানে পর্যটকদের রাত্রিযাপনের উপযোগী হোটেল বা রিসোর্ট নেই। ফলে দর্শনার্থীদের দিনে গিয়ে দিনেই ফিরে আসতে হয়, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে বিশেষ কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না।
তৃতীয় মূল কারণ জাতীয় পর্যায়ে কার্যকর প্রচারণার অভাব। সুন্দরবন বললেই সাধারণ মানুষের মনে প্রথমে বাগেরহাটের মংলা বা বাগেরহাট সদরের ছবি ভেসে ওঠে; সাতক্ষীরার নাম সেখানে উপরিভাগে আসে না। ভ্রমণ গাইড, সরকারি প্রচার-প্রচারণা এবং গণমাধ্যমের কেন্দ্রবিন্দু দীর্ঘদিন অন্য জেলার দিকে থাকায় সাতক্ষীরা তার নিজস্ব ব্র্যান্ডিং গড়ে তুলতে পারেনি। এর পাশাপাশি সীমান্ত সংলগ্ন জেলা হওয়ার কারণে নিরাপত্তা সম্পর্কিত এক ধরনের অমূলক সংশয়ও পর্যটকদের মধ্যে দ্বিধা তৈরি করে।
তবে কক্সবাজার বা সিলেটের উন্নয়ন মডেল সরাসরি সাতক্ষীরায় অনুকরণ করা যুক্তিযুক্ত নয়। কক্সবাজারের মতো অতিরিক্ত পর্যটক ও বহুতল ভবনের উপস্থিতি সুন্দরবনের সংবেদনশীল ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্রের জন্য মারাত্মক হুমকি হতে পারে। পরিবেশগতভাবে স্পর্শকাতর এই অঞ্চলে বড় ধরনের অবকাঠামোগত নির্মাণ বিপর্যয় ডেকে আনবে। তাই সাতক্ষীরার জন্য প্রয়োজন একটি বিশেষায়িত টেকসই পরিকল্পনা, যেখানে প্রকৃতি সংরক্ষণ এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি পাশাপাশি চলবে। সম্প্রতি সরকার যে ‘কমিউনিটি বেসড ট্যুরিজম’ গাইডলাইন তৈরি করেছে—যেখানে স্থানীয় অধিবাসীদের পর্যটন কর্মকা-ে সরাসরি যুক্ত করার কথা বলা হয়েছেÑতা সাতক্ষীরার জন্য অত্যন্ত উপযোগী। সিলেটের চা-বাগানের মতো এখানেও নদীভ্রমণ, স্থানীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্যবাহী খাবার ও ছোট পরিসরের ইকো-রিসোর্টভিত্তিক মডেল গড়ে তোলা যেতে পারে। যেমনটা দেখা যায় মালদ্বীপে; বিশাল স্থাপনার বদলে বুটিক ইকো-রিসোর্ট ও নান্দনিক অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে তারা বিশ্বমানের পর্যটন গড়ে তুলেছে।
এই সম্ভাবনাকে বাস্তবায়নে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি:
যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন: জেলা সদরের সঙ্গে শ্যামনগরসহ উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর সড়ক ও নৌপথের যোগাযোগ আধুনিকীকরণ করা।
পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগ: বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের প্রণোদনা দিয়ে ক্ষুদ্র পরিসরের টেকসই ইকো-রিসোর্ট নির্মাণে উৎসাহিত করা।
সমন্বিত পর্যটন সার্কিট: মান্দারবাড়িয়া সৈকত, যশোরেশ্বরী মন্দির ও গুড়পুকুরের মেলাকে একই সুতোয় বেঁধে দর্শনার্থীদের জন্য সহজ পরিকল্পনা তৈরি করা।
জাতীয় ব্র্যান্ডিং: সুন্দরবনের প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাতক্ষীরাকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচার করা।
সাতক্ষীরার প্রয়োজন অন্য কোনো জেলার অন্ধ অনুকরণ নয়, বরং নিজস্ব প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদী টেকসই মডেল গড়ে তোলা। পরিকল্পিত পদক্ষেপ ও ধারাবাহিক বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে এটি কেবল পর্যটন খাতেই নয়, সামগ্রিকভাবে জেলার অর্থনৈতিক চিত্রে এক দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে। লেখক: মো. মামুন হাসান, ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ,সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, সাতক্ষীরা






