ইউনিয়ন পরিষদ: গ্রামীণ উন্নয়নের প্রাণকেন্দ্র ও আমাদের প্রত্যাশা
দীপঙ্কর বিশ্বাস
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ, আর এ দেশের প্রাণের স্পন্দন লুকিয়ে আছে তার গ্রামগুলোতে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়া এবং স্থানীয় নেতৃত্ব বিকাশের সবচেয়ে শক্তিশালী ও প্রাচীনতম মাধ্যমটি হলো ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি)। স্থানীয় সরকারের সবচেয়ে তৃণমূলের এই স্তরটি কেবল একটি প্রশাসনিক ইউনিট নয়, বরং গ্রামীণ মানুষের সুখ-দুঃখ, শান্তি-কৃঙ্খলা এবং উন্নয়নের এক ভরসাস্থল। তবে আজ সময় এসেছে ইউনিয়ন পরিষদের সম্ভাবনা, সংকট এবং এর ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়ে একটু খোলাখুলি কথা বলার।
১. সেবার পরিধি ও সম্ভাবনা
একটি ইউনিয়ন পরিষদ গ্রামীণ জীবনের প্রায় সব বিষয়ের সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এর কাজের পরিধি বিশাল। জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, চারিত্রিক সনদ, ওয়ারিশন সনদসহ প্রতিদিন শত শত মানুষ তাদের মৌলিক কাগজপত্রের জন্য ছুটে আসেন ইউনিয়ন পরিষদে।
ভিজিডি, ভিজিএফ, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা এবং প্রতিবন্ধী ভাতার মতো রাষ্ট্রের কল্যাণমূলক কাজগুলো ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমেই প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে পৌঁছায়।
ছোটখাটো দেওয়ানি ও ফৌজদারি বিরোধ নিষ্পত্তিতে গ্রাম আদালত এক অনন্য ভূমিকা পালন করে, যা গ্রামীণ গরিব মানুষকে আদালতের দীর্ঘসূত্রতা ও বিপুল খরচ থেকে রক্ষা করে এই ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে। গ্রামীণ রাস্তাঘাট, কালভার্ট নির্মাণ ও সংস্কার এবং লুপ-লাইন ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে ইউপি সরাসরি ভূমিকা রাখে।
২. সংকটের অন্ধকার দিক
ইউনিয়ন পরিষদের খাতা-কলমে যত ক্ষমতা ও দায়িত্বের কথা বলা আছে, বাস্তবে তার প্রয়োগের ক্ষেত্রে বেশ কিছু দৃশ্যমান সংকট রয়েছে। অনেক সময়ই দেখা যায়, যোগ্য ও প্রকৃত দুস্থ ব্যক্তিরা সরকারি অনুদান বা কার্ড থেকে বঞ্চিত হন, কারণ সেখানে দলীয় আনুগত্য বা স্বজনপ্রীতি ভর করে।
অধিকাংশ ইউনিয়ন পরিষদের নিজস্ব আয়ের উৎস (যেমন-হাটবাজার, ট্যাক্স) খুবই সীমিত। ফলে তাদের পুরোপুরি সরকারি বরাদ্দের ওপর নির্ভর করতে হয়, যা চাহিদার তুলনায় নগণ্য।
বছরে অন্তত দুবার ‘ওয়ার্ড সভা’ এবং ‘উন্মুক্ত বাজেট’ ঘোষণার নিয়ম থাকলেও, বহু ইউনিয়নে তা কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে। সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণ সেখানে নিশ্চিত করা হয় না।
৩. নারীদের অংশগ্রহণ: আলো নাকি ছায়া?
সংরক্ষিত নারী আসনের মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদে নারী নেতৃত্ব নিশ্চিত করা হয়েছে, যা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেক নারী সদস্যই পুরুষ চেয়ারম্যান বা সাধারণ পুরুষ সদস্যদের আধিপত্যের কারণে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন না। তাদের কেবল ‘নামেমাত্র’ জনপ্রতিনিধি করে না রেখে, সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব ও বাজেট দিয়ে ক্ষমতায়ন করা জরুরি।
৪. কেমন ইউনিয়ন পরিষদ আমরা চাই? (ভবিষ্যতের পথরেখা)
একটি আদর্শ এবং জনবান্ধব ইউনিয়ন পরিষদ গঠনে আমাদের কয়েকটি বিষয়ে নজর দিতে হবে।
ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারগুলোকে আরও সচল ও দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষকে একটি সনদের জন্য দিনের পর দিন ঘুরতে না হয়।
বাজেট প্রণয়ন থেকে শুরু করে প্রকল্পের তদারকিতে সাধারণ মানুষের মতামত নেওয়া বাধ্যতামূলক করতে হবে। তথ্য অধিকার আইনের সঠিক বাস্তবায়ন ঘটাতে হবে।
টিআর, কাবিখা বা ভিজিএফ-এর চাল-গম চুরির মতো ঘটনা গ্রামীণ উন্নয়নকে পঙ্গু করে দেয়। এর জন্য কঠোর প্রশাসনিক নজরদারি প্রয়োজন।
ইউনিয়ন পরিষদ হলো রাষ্ট্রের একদম গোড়ার ভিত্তি। ভিত্তি দুর্বল হলে যেমন পুরো দালান ধসে পড়ে, তেমনি ইউনিয়ন পরিষদকে অকার্যকর বা দুর্নীতিগ্রস্ত রেখে সামগ্রিক দেশের উন্নয়ন অসম্ভব। দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে ইউনিয়ন পরিষদকে যদি সত্যিকার অর্থেই একটি স্বশাসিত, জবাবদিহিমূলক এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়া যায়, তবেই আমাদের ‘সোনার বাংলা’ গড়ার স্বপ্ন তৃণমূল থেকে বাস্তবায়িত হবে।
আসুন, সচেতন নাগরিক হিসেবে আমরাও ইউনিয়ন পরিষদের কাজে নজর রাখি এবং একে একটি আদর্শ সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে সহযোগিতা করি।












