জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পল্লী উন্নয়ন দিবস: টেকসই আগামীর ভিত্তি ও গ্রামীণ সমৃদ্ধি
সাকিবুর রহমান বাবলা
মানবসভ্যতার শেকড় প্রোথিত রয়েছে গ্রামীণ জনপদে। কৃষি, খাদ্য উৎপাদন, সংস্কৃতি এবং সামাজিক সংহতির প্রাথমিক কেন্দ্রবিন্দু হলো গ্রাম। আধুনিক নগরায়ণের যুগেও পৃথিবীর বিশাল জনগোষ্ঠী গ্রামাঞ্চলে বসবাস করে, যারা বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রধান চালিকাশক্তি। এই বাস্তবতাকে স্বীকৃতি দিয়ে জাতিসংঘ প্রতি বছর ৬ জুলাইকে ‘বিশ্ব পল্লী উন্নয়ন দিবস’ হিসেবে পালনের ঘোষণা দিয়েছে।
এই দিবসের সাথে বাংলাদেশের এক গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। ১৯৭৯ সালের ৬ জুলাই ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘সেন্টার অন ইন্টিগ্রেটেড রুরাল ডেভেলপমেন্ট ফর এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিক’। এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে সম্মান জানিয়েই ৬ জুলাইকে বেছে নেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালের ৬ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৮তম অধিবেশনে বাংলাদেশসহ ছয়টি দেশের সমন্বয়ে গঠিত কোর গ্রুপের প্রস্তাবটি ৪৩টি সদস্য রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় গৃহীত হয়। এটি বহুপাক্ষিক সহযোগিতার এক অনন্য নিদর্শন।
বিশ্বের প্রায় ৮০ শতাংশ দরিদ্র মানুষ গ্রামে বাস করে, অথচ তারাই বিশ্বের ৮০ শতাংশ খাদ্য উৎপাদন করে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, দেশে মোট গ্রামের সংখ্যা ৮৭,৩১৯টি এবং মোট জনসংখ্যার ৬৮.৩৪ শতাংশ মানুষ গ্রামে বসবাস করে। জাতীয় জিডিপিতে কৃষিখাতের সরাসরি অবদান প্রায় ১১.২ শতাংশ। দেশের মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের প্রায় ৬৩ শতাংশ গ্রামাঞ্চলে অবস্থিত। যদিও মোট কর্মসংস্থানের ৪০.৫৩ শতাংশ কৃষি ও প্রাণিজ খাতে যুক্ত, তথাপি কুটির শিল্প, গ্রামীণ ব্যবসা-বাণিজ্য ও প্রবাসী আয়ের মাধ্যমে অকৃষি খাত গ্রামীণ অর্থনীতিতে ক্রমশ বড় ভূমিকা রাখছে।
জলবায়ু পরিবর্তন, প্রযুক্তিগত বৈষম্য এবং বিনিয়োগ সংকটের কারণে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী নানা প্রতিকূলতার সম্মুখীন। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পল্লী উন্নয়ন অপরিহার্য। দারিদ্র্য বিমোচন, ক্ষুধা মুক্তি, জেন্ডার সমতা এবং জলবায়ু অভিযোজনের প্রতিটি লক্ষ্যই সরাসরি গ্রামীণ উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত। বর্তমানে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি; তাই শহর ও গ্রামের মধ্যকার ডিজিটাল বিভাজন কমিয়ে তথ্যপ্রযুক্তি ও অনলাইন সেবার প্রসারে এই দিবস বিশেষ গুরুত্ব দেয়। কৃষি খাতে নারীদের অংশগ্রহণ দীর্ঘদিন ধরেই স্বীকৃত, তথাপি ৪৩ শতাংশ অবদান থাকা সত্ত্বেও ভূমি, ঋণ ও প্রযুক্তিতে তাদের সমান সুযোগ নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।”
“দিবসটির আন্তর্জাতিক প্রস্তাবক হিসেবে বাংলাদেশ আজ গর্বিত। সরকারের ‘আমার গ্রাম-আমার শহর’ রূপকল্প, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, সমন্বিত উদ্যোগ ও কৃষি আধুনিকায়ন এই দিবসের দর্শনের সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ৬ জুলাইকে ‘জাতীয় পল্লী উন্নয়ন দিবস’ হিসেবে ‘খ’ শ্রেণিভুক্ত করে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। সেই ধারাবাহিকতায় এবারই প্রথম দিবসটি পালিত হচ্ছে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিভিন্ন অধিদপ্তর মাঠপর্যায়ে দিবসটি পালনের মাধ্যমে পল্লী উন্নয়নের তাৎপর্য তৃণমূল মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে।”
আজ যখন পৃথিবী জলবায়ু সংকট ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখে, তখন পল্লী উন্নয়নকে প্রান্তিক বিষয় হিসেবে দেখার অবকাশ নেই। টেকসই উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায্যতা ও সমৃদ্ধ বিশ্ব গড়ে তুলতে গ্রামকে উন্নয়নের মূল কেন্দ্রে আনতেই হবে। বিশ্ব ও জাতীয় পল্লী উন্নয়ন দিবস আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ন্যায্যতা, সম্ভাবনা এবং ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধির পক্ষে একটি বলিষ্ঠ বৈশ্বিক অঙ্গীকার। গ্রামের মানুষের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করার মাধ্যমেই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক বিশ্ব গঠন সম্ভব।












