সংসদ চত্বরে আমেরিকার স্বাধীনতা দিবস: কূটনৈতিক সৌজন্যতা নাকি আত্মমর্যাদার সংকট?
গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ
একটি জাতির কিছু প্রতীক থাকে, যা কেবল ইট-পাথরের স্থাপনা নয়, বরং তার ইতিহাস, আত্মত্যাগ, স্বাধীনতা এবং জাতীয় চেতনার বহিঃপ্রকাশ। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ভবন তেমনই একটি প্রতীক। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা এবং স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অস্তিত্বের অন্যতম প্রধান প্রতীক এই জাতীয় সংসদ ভবন।
সেই সংসদ ভবনের সামনে বিদেশি কোনো রাষ্ট্রের জাতীয় দিবস উদযাপনের আয়োজন নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রশ্নের জন্ম দেয়। প্রশ্নটি কোনো দেশের বিরুদ্ধে নয়, কোনো জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধেও নয়; বরং প্রশ্নটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, জাতীয় আত্মসম্মান এবং পররাষ্ট্রনীতির ভারসাম্য রক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হলো “সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়।” এই নীতির অর্থ কখনোই কোনো পরাশক্তির প্রতি অতিরিক্ত অনুরাগ প্রদর্শন নয়, বরং সমমর্যাদা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে সম্পর্ক বজায় রাখা। কিন্তু জাতীয় সংসদের মতো একটি সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় প্রতীকের সামনে বিদেশি রাষ্ট্রের জাতীয় উৎসব আয়োজনের অনুমতি দেওয়া হলে সাধারণ মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে এটি কি কেবল কূটনৈতিক সৌজন্য, নাকি এর মাধ্যমে একটি ভিন্ন রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া হচ্ছে?
বিশ্বের অধিকাংশ স্বাধীন ও আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র তাদের জাতীয় প্রতীক, সংসদ ভবন কিংবা রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রকে বিশেষ মর্যাদার সঙ্গে সংরক্ষণ করে। এসব স্থান কেবল প্রশাসনিক কেন্দ্র নয়, বরং জাতীয় সার্বভৌমত্বের দৃশ্যমান প্রতীক। ফলে এসব স্থানের ব্যবহার নিয়ে জনগণের সংবেদনশীলতা থাকা স্বাভাবিক।
বাংলাদেশের জনগণ রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এই রাষ্ট্র। সেই ইতিহাসের প্রতি সম্মান দেখানো রাষ্ট্রের প্রতিটি দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের নৈতিক কর্তব্য। জাতীয় সংসদ ভবনের মতো একটি স্থানের ব্যবহারে তাই সর্বোচ্চ সতর্কতা ও বিচক্ষণতা প্রত্যাশিত।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে। বিশ্বের প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর জাতীয় সংসদ, প্রেসিডেন্সিয়াল কমপ্লেক্স কিংবা ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোর সামনে অন্য দেশের জাতীয় দিবস উদযাপনের কতটুকু নজির রয়েছে? যদি এমন নজির খুবই সীমিত হয়, তাহলে বাংলাদেশে এমন আয়োজনের যৌক্তিকতা ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।
ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় বর্তমান বিশ্ব ক্রমেই প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠছে। বড় শক্তিগুলোর কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। এ অবস্থায় রাষ্ট্রীয় প্রতীক ও জাতীয় প্রতিষ্ঠানের ব্যবহার এমন হওয়া উচিত, যাতে দেশের নিরপেক্ষতা, স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা এবং কৌশলগত ভারসাম্য সম্পর্কে কোনো বিভ্রান্তি সৃষ্টি না হয়।
জনগণের একটি অংশ মনে করে, জাতীয় সংসদ ভবনের মতো স্থানে বিদেশি রাষ্ট্রের জাতীয় উৎসব উদযাপনের সুযোগ দেওয়া হলে ভবিষ্যতে একই ধরনের দাবি অন্যান্য দেশও তুলতে পারে। তখন রাষ্ট্র কোন নীতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেবে, সেই প্রশ্নও সামনে আসবে। তাই এ ধরনের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নীতিমালা, জনজবাবদিহিতা এবং জাতীয় স্বার্থের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
রাষ্ট্রের মর্যাদা কখনো অর্থনৈতিক সহায়তা, উন্নয়ন সহযোগিতা কিংবা কূটনৈতিক সম্পর্কের বিনিময়ে পরিমাপ করা যায় না। একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি তার আত্মমর্যাদা, স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা এবং জনগণের আস্থা। জাতীয় প্রতীকসমূহের মর্যাদা রক্ষার মধ্য দিয়েই সেই শক্তি প্রতিফলিত হয়।
আজ প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা। জনগণ জানতে চায় কোন নীতির আলোকে জাতীয় সংসদ চত্বরে এ ধরনের আয়োজনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, ভবিষ্যতে একই সুযোগ কি অন্য দেশগুলোকেও দেওয়া হবে, এবং জাতীয় প্রতীকগুলোর মর্যাদা রক্ষায় সরকারের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান কী।
বাংলাদেশ কারও বিরোধী নয়, কারও শত্রুও নয়। বাংলাদেশ বন্ধুত্ব চায়, সহযোগিতা চায়, উন্নয়ন চায়। কিন্তু সেই বন্ধুত্ব হতে হবে সমমর্যাদার, সেই সহযোগিতা হতে হবে সম্মানের, আর সেই উন্নয়ন হতে হবে জাতীয় স্বার্থ ও আত্মসম্মান অক্ষুণœ রেখে। কারণ স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও যদি আমরা রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও জাতীয় প্রতীকগুলোর প্রশ্নে স্পষ্ট অবস্থান নিতে না পারি, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের অনেক প্রশ্নের জবাব দিতে হবে।
জাতীয় সংসদ ভবন বাংলাদেশের। এটি কোনো রাজনৈতিক দল, কোনো সরকার কিংবা কোনো বিদেশি শক্তির প্রতীক নয়; এটি ১৮ কোটি মানুষের আশা-আকাঙ্খা, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের প্রতীক। সেই মর্যাদা রক্ষা করা রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিক এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব।
লেখক: গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ, সাবেক ছাত্রনেতা ও উদ্যোক্তা












