ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণ: সাতক্ষীরার প্রাণের গুড়পুকুর মেলা
দীপঙ্কর বিশ্বাস
সাতক্ষীরা জেলার ইতিহাস, সামাজিক রূপরেখা আর সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে জড়িয়ে রয়েছে গুড়পুকুরের মেলা। তিন শত বছরের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী এই উৎসব কেবল পণ্য কেনাবেচার কোনো বাণিজ্যিক হাট নয়; এটি এ অঞ্চলের মানুষের আবেগ, সামাজিক সম্প্রীতি এবং শিকড়ের টানের এক অনন্য প্রতিচ্ছবি।
দীর্ঘ কয়েক বছর বন্ধ থাকার পর অবশেষে ১ অক্টোবর থেকে শুরু বহুল প্রতীক্ষিত এই আয়োজন, যা চলবে আগামী ২০ অক্টোবর পর্যন্ত। থমকে যাওয়া এই মেলা পুনরায় ফিরে আসায় পুরো সাতক্ষীরা জেলাজুড়ে স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে এক অভূতপূর্ব উৎসব-উদ্দীপনা ও প্রাণের স্পন্দন। গৃহস্থের আঙিনা থেকে শুরু করে শহরের অলিগলি সর্বত্রই এখন আনন্দের গুনগুন সুর।
কালের আবর্তে ও পারিপার্শ্বিক নানা পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এবারের মেলায় হয়তো আগের মতো বিস্তীর্ণ পরিসর কিংবা সার্কাস, যাত্রা, হাউজি, জাদুপদ্যা, মৃত্যুকূপ কিংবা বিচিত্রা অনুষ্ঠানের মতো বিনোদনের সেই গমগমে রূপ দেখতে পাওয়া যাবে না। তবে বিনোদনের অনুষঙ্গে কিছুটা কাটছাঁট হলেও শত বছরের প্রাচীন ঐতিহ্যটি বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পেয়ে পুনর্জীবিত হতে চলেছে, এতেই অত্যন্ত সন্তোষ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের মতে, জাঁকজমকের চেয়ে মেলার আসল সত্তা ও মূল চেতনাকে টিকিয়ে রাখাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বাণিজ্যিক লেনদেনের পাশাপাশি গুড়পুকুর মেলা যুগ যুগ ধরে কাজ করে আসছে সামাজিক মেলবন্ধনের এক অদৃশ্য সুতো হিসেবে।
গুড়পুকুরের মেলার দিনগুলোতে সাতক্ষীরার সামাজিক চিত্রে এক দারুণ রূপান্তর ঘটে। জেলা ও জেলার বাইরের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আত্মীয়স্বজনেরা এ সময় সাতক্ষীরায় সমবেত হন। ঘরে ঘরে যেন এক অচেনা অতিথিপরায়ণতার ধুম পড়ে যায়। পরিবারের ছোট-বড় সবাইকে নিয়ে মেলা প্রাঙ্গণে ঘুরে বেড়ানো, নিত্যপ্রয়োজনীয় গৃহস্থালি পণ্য থেকে শুরু করে মাটি ও কাঠের তৈরি লোকশিল্পের কেনাকাটা এবং মেলা থেকে জিলাপি-খাজা কিংবা মন্ডা কিনে নেওয়ার যে আনন্দ, তা আধুনিক ডিজিটাল বিনোদনের যুগেও অতুলনীয়। সবচেয়ে বড় কথা, আধুনিক প্রযুক্তির কৃত্রিম দুনিয়ায় বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের সামনে আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্য, মৃৎশিল্প ও নিজস্ব লোকজ সংস্কৃতিকে প্রত্যক্ষভাবে তুলে ধরার সবচেয়ে চমৎকার ক্ষেত্র তৈরি করে দেয় এই মেলা।
দীর্ঘ বিরতির পর আয়োজিত এই মিলনমেলা যেন কোনোভাবেই যেন বিশৃঙ্খলা বা অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো ঘটনায় মলিন না হয়ে যায়, সে বিষয়েও সতর্ক নজর রয়েছে। মেলা প্রাঙ্গণে অপ্রীতিকর ঘটনা এড়ানো, চাঁদা আদায়, ইভটিজিং কিংবা মব সৃষ্টির মতো অপচেষ্টা রুখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে কঠোর ও বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। মেলা কমিটি ও স্থানীয় প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে দর্শনার্থী ও ব্যবসায়ীদের জন্য একটি নিরাপদ, স্বাভাবিক ও ভীতিহীন পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। সকলের প্রত্যাশা সুরক্ষিত ও আনন্দঘন পরিবেশে এই আয়োজন রূপ নেবে একটি সার্থক সামাজিক উৎসবে, যা আমাদের হারিয়ে যেতে বসা গ্রামীণ সংস্কৃতিকে আবারও স্বমহিমায় পুনরুজ্জীবিত করবে।









