শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩
শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩

কপ-৩১: প্রতিশ্রুতি না-কি বাস্তবায়ন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২ অক্টোবর, ২০২৬, ২:০৯ অপরাহ্ণ
কপ-৩১: প্রতিশ্রুতি না-কি বাস্তবায়ন

বাহলুল আলম

জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর দূর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়; এটি বর্তমান বিশ্বের অন্যতম বড় সংকট। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি, তাপপ্রবাহ, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন, খরা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, উপকূলীয় লবণাক্ততা, নিরাপদ পানির সংকট, কৃষি ও জীবিকার ক্ষতি এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ মানুষের জীবন ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কোনো দেশের সীমান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাই এই বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, সম্মিলিত সিদ্ধান্ত, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং কার্যকর বাস্তবায়ন। এই প্রয়োজন থেকেই জাতিসংঘের জলবায়ু প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে গড়ে উঠেছে কপ।

১৯৮৮ সালে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নের জন্য আইপিসিসি প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর ১৯৯২ সালে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক কাঠামো কনভেনশন বা ইউএনএফসিসিসি গৃহীত হয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল বায়ুমন্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের ঘনত্ব এমন পর্যায়ে স্থিতিশীল করা, যাতে জলবায়ু ব্যবস্থায় বিপজ্জনক মানবসৃষ্ট হস্তক্ষেপ প্রতিরোধ করা যায়। ইউএনএফসিসিসি -এর অধীনেই প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হয় কপ। এর মাধ্যমে বিশ্বের দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় যৌথ সিদ্ধান্ত নেয়, আগের সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন পর্যালোচনা করে এবং ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণ করে।

গত তিন দশকে কপ-এর মাধ্যমে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক অর্জন হয়েছে। ১৯৯৭ সালের কপ৩-এ কিয়োটো প্রটোকল গৃহীত হয়, যা উন্নত দেশগুলোর জন্য আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক গ্রিনহাউস গ্যাস কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণের প্রথম বড় আন্তর্জাতিক চুক্তি। ২০০১ সালের কপ৭-এ মারাকেশ অ্যাকর্ডের মাধ্যমে কিয়োটো প্রটোকল বাস্তবায়নের জন্য নির্গমন হিসাব, রিপোর্টিং ও কমপ্লায়েন্সের বিস্তারিত নিয়ম তৈরি হয়। ২০০৭ সালের কপ১৩-এর বালি অ্যাকশন প্ল্যান নতুন দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক জলবায়ু ব্যবস্থা তৈরির আলোচনার পথ তৈরি করে।

২০০৯ সালের কপ১৫ কোপেনহেগেন সম্মেলন জলবায়ু অর্থায়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। সেখানে উন্নত দেশগুলো ২০২০ সালের মধ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বছরে ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার জলবায়ু অর্থায়ন মোবিলাইজ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক উষ্ণতা ২ক্ক সেলসিয়াস -এর নিচে রাখার প্রয়োজনীয়তা এবং ১.৫ক্ক সেলসিয়াস সীমার গুরুত্ব আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পায়। পরবর্তী সময়ে ২০১০ সালের কপ১৬ কানকুন অ্যাকর্ডসের মাধ্যমে অভিযোজন, অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও বন সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো শক্তিশালী হয়।

২০১১ সালের কপ১৭ ডারবান প্ল্যাটফর্ম সব দেশের অংশগ্রহণে একটি নতুন আইনগত জলবায়ু চুক্তির দিকে আনুষ্ঠানিক আলোচনার পথ তৈরি করে। ২০১৩ সালের কপ১৯-এ প্রতিষ্ঠিত হয় ক্ষয়ক্ষতি বিষয়ক ওয়ারশ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা, যা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি করে। এরপর আসে ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক কপ২১ এবং প্যারিস চুক্তি। এই চুক্তির মাধ্যমে বৈশ্বিক উষ্ণতা ২ক্ক সেলসিয়াস -এর অনেক নিচে রাখা এবং ১.৫ক্ক সেলসিয়াস সীমায় রাখার প্রচেষ্টা চালানোর জন্য একটি নতুন বৈশ্বিক কাঠামো তৈরি হয়।

২০১৮ সালের কপ২৪-এ প্যারিস চুক্তির বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা, রিপোর্টিং ও অগ্রগতি পরিমাপের জন্য কাটোভিস প্যাকেজ বা প্যারিস রুলবুক -এর গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম-কাঠামো তৈরি হয়। ২০২১ সালের কপ২৬ প্লাসগো ক্লাইমেট প্যাক্টে প্রথমবারের মতো কপ-এর সিদ্ধান্তে অনিয়ন্ত্রিত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন -এর ধাপে ধাপে হ্রাস এবং অদক্ষ জীবাশ্ম জ্বালানিতে ভর্তুকি কমানোর আহ্বান অন্তর্ভুক্ত হয়। ২০২২ সালের কপ২৭-এ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য ক্ষয়ক্ষতি তহবিল প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ২০২৩ সালের কপ২৮-এ প্রথম বৈশ্বিক স্টকটেক সম্পন্ন হয় এবং জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে দূরে সরে যাওয়ার বৈশ্বিক আহ্বানসহ ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতা তিনগুণ করার লক্ষ্য সামনে আসে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের কপ২৯ বাকু সম্মেলনে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ২০৩৫ সালের মধ্যে বছরে অন্তত ৩০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার জলবায়ু অর্থায়নের নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয় এবং সব উৎস মিলিয়ে বছরে ১.৩ ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত জলবায়ু অর্থায়ন বাড়ানোর প্রচেষ্টার আহ্বান জানানো হয়।

তবে কপ-এর অর্জনের পাশাপাশি সীমাবদ্ধতাও কম নয়। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো-প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবায়নের ব্যবধান কতটা কমেছে? জলবায়ু অর্থায়নের ১০০ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যটি তার একটি বড় উদাহরণ। ২০২০ সালের মধ্যে এই লক্ষ্য অর্জনের কথা থাকলেও তা নির্ধারিত সময়ে অর্জিত হয়নি। ওইসিডি -এর হিসাবে ২০২২ সালে প্রথমবারের মতো উন্নত দেশগুলোর দেওয়া ও সংগৃহীত জলবায়ু অর্থায়ন ১১৫.৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। ২০২৩ সালে তা ১৩২.৮ বিলিয়ন এবং ২০২৪ সালে ১৩৬.৭ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়। অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ের দুই বছর পরে ১০০ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য অতিক্রম করা সম্ভব হয়েছে।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে-জলবায়ু অর্থায়নের অর্থ কি শুধুই অর্থের পরিমাণ? মোট অর্থের পাশাপাশি অর্থের ধরন, শর্ত, প্রবেশাধিকার এবং প্রকৃত সুবিধাভোগীও গুরুত্বপূর্ণ। কতটা অর্থ অনুদান, কতটা ঋণ, কতটা অভিযোজনের জন্য, কতটা প্রশমনের জন্য এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে কতটা পৌঁছাচ্ছে-এসব প্রশ্নের উত্তরও প্রয়োজন। কপ২৯-এর ৩০০ বিলিয়ন ডলারের নতুন লক্ষ্য তাই শুধু একটি সংখ্যাগত লক্ষ্য নয়; এর কার্যকর বাস্তবায়ন, অর্থের মান, সহজপ্রাপ্যতা এবং ন্যায্য বণ্টনও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

জলবায়ু অর্থায়নের প্রশ্ন থেকেই সামনে আসে-ঋণ নাকি ক্ষতিপূরণ? বাংলাদেশসহ জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ অনেক উন্নয়নশীল দেশের জন্য বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছে, তাদের যদি অভিযোজন ও ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলার জন্য অতিরিক্ত ঋণ নিতে হয়, তাহলে একদিকে জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা করতে গিয়ে অন্যদিকে ঋণের বোঝা বাড়তে পারে। বিশেষ করে ক্ষয়ক্ষতি -এর ক্ষেত্রে অর্থায়নকে সাধারণ উন্নয়ন ঋণের সঙ্গে এক করে দেখলে জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি দুর্বল হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের জন্য তাই পর্যাপ্ত, পূর্বানুমানযোগ্য, সহজপ্রাপ্য এবং বিশেষ করে ক্ষয়ক্ষতি ও অভিযোজনের ক্ষেত্রে অনুদানভিত্তিক অর্থায়নের দাবি গুরুত্বপূর্ণ।

আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় গতির ঘাটতি। একাধিক কপ-এ উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.৫ক্ক সেলসিয়াস সীমার মধ্যে রাখার জন্য যে দ্রুত ও ব্যাপক নির্গমন হ্রাস প্রয়োজন, তা এখনও একটি বড় বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ। জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসার বিষয়ে কপ২৬-এ শক্তিশালী ভাষা আসতেও দীর্ঘ সময় লেগেছে। একইভাবে ক্ষয়ক্ষতি তহবিল প্রতিষ্ঠিত হলেও প্রয়োজনের তুলনায় পর্যাপ্ত অর্থ সংগ্রহ ও দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে অর্থ পৌঁছানো এখনও গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
এই বাস্তবতার মধ্যেই সামনে আসছে কপ৩১। ২০২৬ সালের ৯ থেকে ২০ নভেম্বর তুরস্কের আনতালিয়ায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া কপ৩১ বাংলাদেশের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশকে এবার শুধু জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে নিজের দুর্দশার কথা তুলে ধরলেই হবে না; বরং আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবায়নযোগ্য সিদ্ধান্তে রূপ দেওয়ার জন্য সুস্পষ্ট, তথ্যভিত্তিক ও পরিমাপযোগ্য দাবি নিয়ে এগোতে হবে।

কপ৩১-এ বাংলাদেশের প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত অভিযোজন অর্থায়নে ন্যায্যতা। বাংলাদেশের উপকূলীয় লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, বন্যা, খরা, তাপপ্রবাহ ও নিরাপদ পানির সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন প্রয়োজন। এই অর্থায়ন হতে হবে পর্যাপ্ত, পূর্বানুমানযোগ্য, সহজপ্রাপ্য এবং স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের উচিত ঋণনির্ভর জলবায়ু অর্থায়নের পরিবর্তে অনুদান ও সহজশর্তের অর্থায়নের দাবি জোরালো করা। বিশেষ করে ক্ষয়ক্ষতি -এর অর্থ যেন নতুন ঋণের বোঝা সৃষ্টি না করে, সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইতোমধ্যে যে ক্ষতি ও ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে, তার জন্য কার্যকর আন্তর্জাতিক সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, ক্ষয়ক্ষতি তহবিল-এর কার্যকর অর্থপ্রবাহ বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি হওয়া উচিত। ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ভূমি ও জীবিকার ক্ষতি এবং জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতির মতো বিষয়গুলোকে ক্ষয়ক্ষতি -এর আওতায় এনে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর কাছে অর্থ ও সহায়তা পৌঁছানোর কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।

চতুর্থত, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুতি ও নিরাপদ পুনর্বাসনকে আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় আরও গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু মানুষকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরিয়ে নেওয়া যথেষ্ট নয়; তাদের জীবিকা, সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পানি, কর্মসংস্থান ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে।

পঞ্চমত, বাংলাদেশকে প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি সামনে আনতে হবে। জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, নিরাপদ পানি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, আগাম সতর্কতা, পানি ব্যবস্থাপনা, উপকূল সুরক্ষা ও স্থানীয় গবেষণার ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তি ও জ্ঞান সহজলভ্য করা প্রয়োজন।

ষষ্ঠত, বাংলাদেশকে প্রকৃতিনির্ভর অভিযোজনকে গুরুত্ব দিতে হবে। সুন্দরবন, ম্যানগ্রোভ, নদী, খাল, জলাভূমি, উপকূলীয় বন ও মিঠাপানির উৎস শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ নয়; এগুলো জলবায়ু অভিযোজনেরও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। তাই উন্নয়ন পরিকল্পনায় প্রকৃতি ধ্বংস না করে প্রকৃতিকে অভিযোজনের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি।

সপ্তমত, জলবায়ু অর্থায়নকে স্থানীয় মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। ইউনিয়ন, উপজেলা, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, নারী, যুব, কৃষক, জেলে ও স্থানীয় সংগঠনকে অভিযোজন পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে কার্যকরভাবে যুক্ত করতে হবে। শুধু বড় জাতীয় প্রকল্প নয়, স্থানীয়ভাবে পরিচালিত অভিযোজন উদ্যোগেও অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।

অষ্টমত, কপ৩১-এ জলবায়ু অর্থায়নের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি হওয়া উচিত। কোন দেশ কত অর্থ দিচ্ছে, অর্থের কতটা অনুদান ও কতটা ঋণ, কোন খাতে ব্যয় হচ্ছে, কতটা অভিযোজন ও ক্ষয়ক্ষতি -এ যাচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষ কতটা সুবিধা পাচ্ছে-এসব তথ্য স্বচ্ছভাবে প্রকাশের ব্যবস্থা প্রয়োজন।

এই জায়গায় রাষ্ট্রের পাশাপাশি সিভিল সোসাইটির দায়িত্বও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সিভিল সোসাইটির কাজ শুধু ঈঙচ-এ দাবি তোলা নয়; বরং কপ-এর প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণ করা। জলবায়ু অর্থায়নের উৎস ও ব্যবহার অনুসরণ করা, জাতীয় বাজেট ও প্রকল্পের সামাজিক নিরীক্ষা করা, স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতা ও ক্ষয়ক্ষতির তথ্য নথিবদ্ধ করা এবং সেই তথ্য নীতিনির্ধারকদের কাছে তুলে ধরা-এসব কাজ আরও জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে নারী, যুব, কৃষক, জেলে, উপকূলীয় জনগোষ্ঠী ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের কণ্ঠস্বর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় পৌঁছে দিতে হবে।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব আরও বিস্তৃত। কপ-এর সিদ্ধান্তকে জাতীয় নীতি, বাজেট ও উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করতে হবে। জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা, এনডিসি এবং বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০-এর লক্ষ্য বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত অর্থ, দক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় সরকারকে শুধু দায়িত্ব দিলে হবে না; প্রয়োজনীয় অর্থ, ক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও দিতে হবে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে নিরাপদ পানি, লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ, নদী-খাল পুনরুদ্ধার, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, জীবিকা, দুর্যোগ প্রস্তুতি এবং প্রকৃতি সংরক্ষণকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে।

সবশেষে বলা যায়, কপ-এর গত তিন দশকের অর্জনকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিয়োটো প্রটোকল, প্যারিস চুক্তি, ১.৫ক্ক সেলসিয়াস লক্ষ্য, ক্ষয়ক্ষতি তহবিল, বৈশ্বিক স্টকটেক এবং জলবায়ু অর্থায়নের নতুন কাঠামো-এসবই আন্তর্জাতিক জলবায়ু রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। কিন্তু জলবায়ু সংকটের বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, চুক্তি ও প্রতিশ্রুতি তখনই অর্থবহ, যখন তা মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনে।

তাই কপ৩১-এ বাংলাদেশের বার্তা হওয়া উচিত-নতুন প্রতিশ্রুতি নয়, পুরোনো প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন চাই। ঋণনির্ভর জলবায়ু অর্থায়ন নয়, ন্যায্য, পর্যাপ্ত, সহজপ্রাপ্য ও অনুদানভিত্তিক অর্থায়ন চাই। ক্ষয়ক্ষতি -এর অর্থ দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে। জলবায়ু ন্যায়বিচার মানে শুধু বেঁচে থাকা নয়; নিরাপদ পানি, খাদ্য, জীবিকা, মর্যাদা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার নিশ্চিত করাও জলবায়ু ন্যায়বিচারের অংশ।

কপ৩১-এর সামনে তাই বাংলাদেশের মূল প্রশ্ন একটাই-বিশ্ব কি এবার প্রতিশ্রুতির রাজনীতি থেকে বাস্তবায়নের পথে এগোবে?

বাহলুল আলম, প্রধান নির্বাহী-সিভিক ভয়েজ বাংলাদেশ

Ads small one

যশোর-চুকনগর আঞ্চলিক মহাসড়ক সংস্কারের তিন বছরেই খানা-খন্দ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২ অক্টোবর, ২০২৬, ৪:০৩ অপরাহ্ণ
যশোর-চুকনগর আঞ্চলিক মহাসড়ক সংস্কারের তিন বছরেই খানা-খন্দ

এম আব্দুল করিম, কেশবপুর (যশোর): যশোর-চুকনগর আঞ্চলিক মহাসড়কের নির্মাণ কাজ তিন বছর যেতে না যেতেই কেশবপুর শহরের প্রায় দেড় কিলোমিটার সড়কের সিসি ঢালাই বিভিন্ন স্থানে ভেঙ্গেচুরে ছোট বড় শতাধিক গর্তে পরিণত হয়েছে। সড়কটি দ্রুত সংস্কারক করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জন্য মোংলা ও ভোমরা স্থল বন্দরের সাথে সহজ যোগাযোগের জন্য সড়কটি গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখে চলেছে।

বিগত সরকারের শেষের দিকে ১শ ৬৬ কোটি টাকা ব্যায়ে সড়কের সংস্কার কাজ করা হয়। সংস্কারের ৩ বছর যেতেই ৩৮ কিলোমিটার সড়কে বিভিন্ন অংশে ৬ ইঞ্চি থেকে ৮/১০ ইঞ্চি গর্ত হওয়ায় মারাত্মক ঝুকি নিয়ে যানবাহন চলাচল করছে। বিশেষ করে গত বর্ষা মৌসুমে অবস্থা আরো খারাপ হয়। এরফলে কেশবপুর এবং মনিরামপুর পৌরশহরের মধ্যে ও কেশবপুর থেকে চুকনগরমুখি সড়কে বড় বড় গর্ত ভারি যান চলাচলে দূর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

যশোরের রাজারহাট খেকে খুলনার চুকনগর পর্যন্ত ৩৮কিলোমিটার সড়কের নির্মাণ কাজের বিটুমিন উঠে গর্ত হয়ে পানি জমে অবস্থা নাজুক হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে কেশবপুর ও মনিরামপুর পৌর শহরের মধ্য দিয়ে যাওয়া অংশের অবস্থা সব থেকে খারাপ। কংক্রিট এর ঢালাই উঠে বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। সড়ক ও জনপদ বিভাগ জরুরী মেরামত করলেও কদিন না যেতেই পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসে।

এছাড়া সড়কটিতে নেই পর্যাপ্ত গাইড ওয়াল বা রাস্তার সীমানা মার্কিং রঙ্গিন খুঁটি। যার ফলে প্রতিনিয়ত সড়কের বিভিন্ন স্থানে ছোট বড় দুর্ঘটনা ঘটেই চলেছে।

এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে সড়কটিকে দ্রুত সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
এ বিষয়ে সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তর যশোরের প্রধান প্রকৌশলী (চঃ দাঃ) শাম্মী সুলতানা বলেন, সম্প্রতি ৩৮কিঃ সড়ক পরিদর্শনের পর দ্রুত স্বল্প মেয়াদী সংস্কারের জন্য টেন্ডার প্রক্রিয়ায় পাঠানো হয়ছে। আগামী ২/৩ সপ্তাহের মধ্যে টেন্ডার সম্পান্ন হলে সংস্কার কাজ শুরু হবে।

 

আগরদাঁড়ী মাদ্রাসা ছাত্রশিবিরের প্রীতি ফুটবল ম্যাচ অনুষ্ঠিত

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:৫০ অপরাহ্ণ
আগরদাঁড়ী মাদ্রাসা ছাত্রশিবিরের প্রীতি ফুটবল ম্যাচ অনুষ্ঠিত

‎মাসুদ রানা: ‎বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির সাতক্ষীরা শহর শাখার অন্তর্গত আগরদাঁড়ী মাদ্রাসা থানা শাখার উদ্যোগে প্রীতি ফুটবল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

‎শুক্রবার (২ অক্টোবর) সকাল ৭:৩০ মিনিটে আগরদাঁড়ী বল ফিল্ডে আগরদাঁড়ী মাদ্রাসা থানা শাখার সভাপতি মোঃ মহিবুল্লাহ’র সভাপতিত্বে এবং সেক্রেটারি মারুফ হোসেনের সঞ্চালনায় আয়োজিত এ খেলায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাতক্ষীরা শহর ছাত্রশিবিরের সমাজসেবা সম্পাদক হাফেজ এবাদুল ইসলাম।

‎বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক মোঃ ইউনুস আলী ছোটন।

‎উদ্বোধনী বক্তব্যে প্রধান অতিথি হাফেজ এবাদুল ইসলাম বলেন, “শিক্ষার্থীদের শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; সৎ, যোগ্য ও আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে শারীরিক সুস্থতা ও মেধা বিকাশের বিকল্প নেই। মাদক ও অনৈতিক কর্মকান্ড থেকে যুবসমাজকে দূরে রাখতে খেলাধুলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শিক্ষার্থীদের নৈতিক চরিত্রের পাশাপাশি শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ইসলামী ছাত্রশিবির সর্বদা এ ধরনের গঠনমূলক উদ্যোগ অব্যাহত রাখবে।”

‎উক্ত খেলায় আগরদাঁড়ী মাদ্রাসা থানা শাখার বিভিন্ন জনশক্তি সহ সাধারণ শিক্ষার্থীরা উৎসবমুখর পরিবেশে অংশ নেয়। খেলা দেখতে স্থানীয় শিক্ষার্থী ও যুবসমাজের উপস্থিতি মাঠে এক প্রাণবন্ত পরিবেশের সৃষ্টি করে

মুক্তমত/ দলের ঊর্ধ্বে দেশ: পদ নয় অপরাধের লাইসেন্স

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:৩৩ অপরাহ্ণ
মুক্তমত/ দলের ঊর্ধ্বে দেশ: পদ নয় অপরাধের লাইসেন্স

এম.এম হায়দার আলী

রাজনীতিতে ক্ষমতা আসে, ক্ষমতা যায়। পদ আসে, পদও একদিন চলে যায়। কিন্তু মানুষের কাছে একটি রাজনৈতিক দলের যে দায়, তার মেয়াদ কোনো নির্বাচনী সময় সূচিতে বাঁধা নয়। সেই দায়ের নাম জবাবদিহি। আর সেই জবাবদিহি যখন নিজের দলের মানুষটির ক্ষেত্রেও সমান ভাবে কার্যকর হয়, তখন রাজনীতির প্রতি মানুষের আস্থার জায়গাটি কিছুটা হলেও শক্ত হয়।

 

রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা মা ও শিশু স্বাস্থ্য কেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় বিএনপির সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং ঘটনার সঙ্গে নিজের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলেও জানিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে আইনগত তদন্তও চলছে। কিন্তু এর মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পক্ষ থেকে তাকে সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয় এবং গত ১ অক্টোবর তার জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে পদত্যাগ পত্র জমা দেওয়ার ঘটনা রাজনৈতিকভাবে একটি তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা সামনে এনেছে।

 

বার্তাটি হলো, দলের পরিচয় কারও জন্য দায়মুক্তির ঢাল হতে পারে না। এখানেই রাজনীতির আসল পরীক্ষা। কারণ নিজের দলের মানুষকে শাসন করা সহজ নয়। বিরোধী দলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার রাজনৈতিক সুবিধা থাকে, কিন্তু নিজের দলের জনপ্রতিনিধি কিংবা প্রভাবশালী নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া মানে নিজের ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে নিজের ঘরকেই প্রশ্ন করা। সেই জায়গায় নেতৃত্বের দৃঢ়তা শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও একটি পরীক্ষা। রাড্ডার ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুধু একজন সংসদ সদস্যের পদত্যাগের বিষয়টিই সামনে আসেনি।

 

সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি ও যুবদলের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। বিভিন্ন পর্যায়ের ১৪ জন নেতা-কর্মীকে বহিষ্কারের কথাও এসেছে। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করবে তদন্ত ও আইন। কিন্তু সাংগঠনিক পর্যায়ে যে বার্তা সামনে এসেছে, সেটি স্পষ্ট, পদ-পদবি মানেই অপরাধের লাইসেন্স নয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই বার্তাটিই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। কারণ ক্ষমতার সঙ্গে মানুষের দূরত্ব তৈরি হয় তখনই, যখন দলের নাম ব্যবহার করে কেউ সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে।

 

চাঁদাবাজি, দখল, ভয়ভীতি, নৈরাজ্য কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ যখন রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে চাপা পড়ে যায়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু একজন ব্যক্তি নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো রাজনৈতিক দলের ভাবমূর্তি। একজন কর্মীর অন্যায়ের দায় অবশ্যই পুরো দলের ওপর চাপানো যায় না। কিন্তু দলের নাম, পদ কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে কেউ অন্যায় করলে দল যদি দ্রুত সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়, তাহলে সাধারণ মানুষের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা যায়, অন্যায় করলে পরিচয় রক্ষা করবে না। এখানে আরেকটি বিষয়ও মনে রাখা জরুরি। অভিযোগ উঠলেই কেউ অপরাধী হয়ে যান না।

 

রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অভিযোগ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রচারণা কিংবা সংবাদে প্রকাশিত কোনো তথ্য, কোনোটিই আদালতের রায়ের বিকল্প নয়। তদন্তের নিরপেক্ষতা, প্রমাণের মূল্য এবং আইনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াই শেষ কথা। কিন্তু একই সঙ্গে অভিযোগ উঠলে তদন্ত না করে বসে থাকাও সমাধান নয়। অভিযোগের তদন্ত হবে, সত্য-মিথ্যা যাচাই হবে, প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা হবে, এই তিনটি ধাপই একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ। আজ দেশের মানুষ রাজনীতির কাছে শুধু বড় বড় প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না। তারা দেখতে চায় বাস্তব আচরণ। তারা দেখতে চায়, ক্ষমতায় থাকা মানুষটির জন্য যে আইন, সাধারণ মানুষের জন্যও সেই আইন। তারা দেখতে চায়, দলের পতাকা কারও অন্যায়ের আড়াল নয়। রাজনীতির সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য এখানেই, ক্ষমতা মানুষকে বড় করে না; মানুষের প্রতি দায়িত্বই একজন রাজনীতিককে বড় করে।

 

যে নেতা নিজের দলের অন্যায়কে অন্যায় বলতে পারেন, তার কাছেই সাধারণ মানুষ জবাবদিহির আশা করতে পারে। আর যে সংগঠন নিজের ঘরের অনিয়মকে আড়াল না করে তদন্ত ও সাংগঠনিক ব্যবস্থার মুখোমুখি করে, সেই সংগঠনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা করার সুযোগ তৈরি হয়। আজ যদি দলের নাম ব্যবহার করে কেউ কোনো সাধারণ মানুষের জমি দখল করে, কাল কেউ ব্যবসায়ীর কাছ থেকে চাঁদা দাবি করে, অন্য কেউ ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে সরকারি সম্পদে হস্তক্ষেপ করে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে দলীয় পরিচয় বিবেচনা না করে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। কারণ রাজনৈতিক দল জনগণের জন্য, জনগণ কোনো দলের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়।

 

ক্ষমতার রাজনীতিতে সবচেয়ে ভয়ংকর শব্দ ছাড়। একবার ছাড় দেওয়া হলে দ্বিতীয়বার অন্যায় করার সাহস বাড়ে। তৃতীয়বার সেটি সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। আর এক সময় মানুষ ধরে নেয়, রাজনীতির ছায়ায় থাকলে আইনকে পাশ কাটানো যায়। এই ধারণাটিই ভাঙতে হবে। প্রয়োজনে নিজের দলের এমপি, চেয়ারম্যান, নেতা কিংবা কর্মী, যেই হোক, অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত হতে হবে। সত্য প্রমাণিত হলে আইন ও সাংগঠনিক বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। আবার অভিযোগ প্রমাণিত না হলে তাকেও সম্মানের সঙ্গে নির্দোষ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এটাই ন্যায়বিচারের সৌন্দর্য। একটি রাজনৈতিক দলের শক্তি শুধু তার জনসমর্থনে নয়; তার আত্মশুদ্ধির ক্ষমতার মধ্যেও। ভুল হলে ভুল স্বীকার করা, অন্যায় হলে ব্যবস্থা নেওয়া এবং নিজের মানুষকেও জবাবদিহির আওতায় আনা, এসবই রাজনৈতিক পরিপক্বতার লক্ষণ।

 

আজ দেশের মানুষ এমন রাজনীতি দেখতে চায়, যেখানে দল ক্ষমতার সিঁড়ি নয়, মানুষের সেবার প্রতিষ্ঠান; যেখানে পদ মর্যাদার অলংকার নয়, দায়িত্বের প্রতীক; যেখানে দলীয় পরিচয় নিরাপত্তার দেয়াল নয়, বরং আরও বড় জবাবদিহির কারণ। তারেক রহমানের নির্দেশে একজন সংসদ সদস্যের পদত্যাগ এবং রাড্ডার ঘটনাকে ঘিরে সাংগঠনিক ব্যবস্থাগুলো সেই বৃহত্তর আলোচনার দরজা খুলে দিয়েছে। এসব পদক্ষেপের আইনগত ও রাজনৈতিক মূল্যায়ন অবশ্যই সময় ও তদন্তের ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে। তবে নীতিগত ভাবে একটি কথা পরিষ্কার, রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থের ওপরে কোনো দল, কোনো পদ, কোনো ব্যক্তি থাকতে পারে না। শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার চেয়ারটি কারও জন্য চিরস্থায়ী নয়।

 

আজ যে চেয়ারকে ঘিরে এত আলো, কাল সেখানে অন্য কেউ বসবেন। কিন্তু মানুষের মনে একজন রাজনীতিকের যে পরিচয়টি থেকে যায়, তা হলো, তিনি ক্ষমতার সময়ে কেমন আচরণ করেছিলেন। তাই সময়ের দাবি একটাই, দলের আগে দেশ, পদের আগে দায়িত্ব, পরিচয়ের আগে আইন। রাজনীতির এই তিনটি শব্দ যদি বাস্তবে প্রতিষ্ঠা পায়, তবে ক্ষমতার চেহারা বদলাবে না শুধু, বদলাবে মানুষের রাজনীতির প্রতি আস্থার ভাষাটাও। সর্বোপরি, প্রধানমন্ত্রীর এমন মহতী ও জনকল্যাণ মুখী উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। মানুষের কল্যাণ, সামাজিক উন্নয়ন ও জনস্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে নেওয়া এ ধরনের উদ্যোগ সাধারণ মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার করে। রাষ্ট্রের নেতৃত্ব যখন মানুষের প্রয়োজন ও প্রত্যাশাকে গুরুত্ব দিয়ে ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তখন তা শুধু একটি সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা হয়ে ওঠে পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। এমন জনবান্ধব উদ্যোগের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে সাধুবাদ জানাতেই হয়।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট