শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৯ কার্তিক ১৪৩৩
শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৯ কার্তিক ১৪৩৩

কয়রায় মৎস্য ঘেরে লুটপাট, বাধা দেওয়ায় গৃহবধূকে বিবস্ত্র করে শ্লীলতাহানির অভিযোগ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬, ৯:৫০ অপরাহ্ণ
কয়রায় মৎস্য ঘেরে লুটপাট, বাধা দেওয়ায় গৃহবধূকে বিবস্ত্র করে শ্লীলতাহানির অভিযোগ

কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধি: খুলনার কয়রা উপজেলার মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের ৬৩ নম্বর মহেশ্বরীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পশ্চিম পাশে ইউনুস আলী মোড়লের মৎস্য ঘেরে লুটপাটের সময় বাধা দেওয়ায় রোজিনা খাতুন নামের এক গৃহবধূকে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে মারধর ও পরিধেয় বস্ত্র টেনেহিঁচড়ে বিবস্ত্র করে শ্লীলতাহানির অভিযোগ উঠেছে।

 

কালিকাপুর গ্রামের মো. সোহেল গাজী, মৃত জহর আলী গাজীর দুই পুএ মো. কুদ্দুস গাজী ও মো. আছাদুল গাজী, দেয়াড়া গ্রামের মো. আ. হাই এবং মাদারবাড়িয়া গ্রামের মো. রবিউল ইসলামের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ করা হয়েছে। এ ঘটনায় মহেশ্বরীপুর গ্রামের মোবারেক মোড়লের পুএ মো. ইউনুস মোড়ল কয়রা থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, পূর্বপরিকল্পিতভাবে অভিযুক্তরা দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র, লোহার রড, শাবল, হাতুড়ি, ধারালো দা ও চাইনিজ কুড়াল নিয়ে মৎস্য ঘেরে প্রবেশ করে মাছ লুটপাট করতে থাকে। এ সময় পরিবারের সদস্য মোছা. রোজিনা খাতুন বাধা দিতে গেলে সোহেল গাজী তাঁর হাতে থাকা লোহার রড দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে এলোপাতাড়ি মারধর করে গুরুতর জখম করেন। কুদ্দুস গাজী চুলের মুঠি ধরে হত্যার উদ্দেশ্যে পানিতে চুবিয়ে নাক, মুখ ও চোয়ালে আঘাত করেন।

 

অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে রোজিনা খাতুন অচেতন হয়ে পানিতে পড়ে গেলে আছাদুল গাজী পরিধেয় কাপড় টেনেহিঁচড়ে শ্লীলতাহানি ঘটান। এ ছাড়া রবিউল ইসলাম গলার স্বর্ণের চেইন ও কানের দুল ছিনিয়ে নেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। স্থানীয়রা এগিয়ে এলে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হলে অবস্থার অবনতি ঘটায় চিকিৎসকের পরামর্শে খুলনায় পাঠানো হয়। কয়রা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) নাজমুল জানান, তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Ads small one

অবসাদ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:১০ পূর্বাহ্ণ
অবসাদ

 

ফারুক আহম্মেদ জীবন
রিক্ত জীবনের টানাপোড়েনে
দৈনন্দিন নিত্য আজ প্রতিটা ক্ষণে ক্ষণে
তিক্তকর জ্বালা-যন্ত্রণার
আর অসহ্য, অসহনীয় দুর্বিষহ বিষাদে
আজ কি যে ভীষণ

অবসাদ নেমেছে এ দেহ-মন জুড়ে!
অকল্পনীয়, অভাবনীয় আঘাত সয়ে সয়ে
নিদারুণ কষ্ট, করুণ দুঃখ বয়ে বয়ে
তুষের মতো জ্বলে জ্বলে
আজ আমার অন্তরটা ছাই হয়েছে পুড়ে।
অশান্তির জ্বলন্ত দগ্ধ দহন ক্রোধে
চিত্ত জুড়ে বেঁধেছে ক্ষত,
সে ক্ষত নিয়ে চিত্ত আজ নিভৃতে কাঁদে।
এ যে বুকভাঙা জল
ভাসাই যুগল নেত্রদ্বয় মৃত্তিকা অতল!
সঞ্চিত মনের যত পীড়া
পাহাড় সম হয় যখন একসাথে বেঁধে দল,
কোন বাঁধাতে সে জল বাঁধে?
এখন আমি কী করে করিব রোধ,
নিয়তি নিচ্ছে এ কোন জনমের প্রতিশোধ?
দেহ-মনে নেমেছে বড় যে ক্লান্তি,
নেমেছে জীবনে অবসাদ।
জীবন তো একটা বৃত্ত সীমার রেখার মতো,
সে বৃত্ত সীমায় জীবন পড়েছে বাঁধা।
এ গ-ি পেরিয়ে এখন
কী করে পাব মুক্ত স্বস্তি, জীবনের স্বাদ?
ক্লান্ত, শ্রান্ত, পরিশ্রান্ত এ দেহ-মনের
আজ একটু শান্তি দরকার,
একটু দরকার আরাম-আয়েশ আর বিশ্রাম।
আহা! এ কি করুণ অযাচিত ঘাত,
যা কেড়ে নেয় জীবনের সাধ!
এই কি স্বপ্নময়ী জীবন! জীবনের স্বাদ?

বুদ্ধির মুক্তি: একশ বছর পরও যে প্রশ্নগুলো আমাদের তাড়া করে

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:০৯ পূর্বাহ্ণ
বুদ্ধির মুক্তি: একশ বছর পরও যে প্রশ্নগুলো আমাদের তাড়া করে

অমিত রঞ্জন দে
আজ আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন তথ্যের কোনো অভাব নেই। একটি মুঠোফোনের পর্দায় কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পৃথিবীর নানা প্রান্তের খবর, মতামত ও জ্ঞান আমাদের সামনে হাজির হয়। কিন্তু তথ্যের এই বিস্ফোরণের মধ্যেই তৈরি হচ্ছে আরেক সংকট; কোনটি সত্য, কোনটি মিথ্যা, কোনটি যুক্তিসংগত আর কোনটি নিছক গুজব বা অপতথ্য, তা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাই না করা তথ্য মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। কুসংস্কার, অন্ধ অনুসরণ, বিদ্বেষ ও অসহিষ্ণুতাও নতুন প্রযুক্তির হাত ধরে দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।

এই বাস্তবতায় প্রায় একশ বছর আগের একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের দিকে ফিরে তাকানো জরুরি। কারণ ওই আন্দোলনের মূল প্রশ্ন ছিল, মানুষ কি নিজের বুদ্ধি দিয়ে চিন্তা করবে? প্রচলিত বিশ্বাস ও সামাজিক অনুশাসনকে কি প্রশ্ন করা যাবে? জ্ঞান, যুক্তি ও মানবিকতার আলোকে সমাজকে কি নতুনভাবে দেখা সম্ভব? এই প্রশ্নগুলো থেকেই বাংলায় গড়ে উঠেছিল ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’। ১৯২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি ঢাকার মুসলিম হলে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সভাপতিত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘মুসলিম সাহিত্য-সমাজ’। কাজী আবদুল ওদুদ, কাজী মোতাহার হোসেন, আবুল হুসেন, আবুল ফজল, মোতাহের হোসেন চৌধুরী, আবদুল কাদিরসহ একদল প্রগতিশীল সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবী এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মুসলিম সাহিত্য-সমাজকে কেন্দ্র করে যুক্তিবাদ, মুক্তচিন্তা, মানবতাবাদ ও আধুনিক জ্ঞানচর্চার যে ধারা গড়ে ওঠে, সেটিই পরবর্তীকালে ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’ নামে পরিচিত হয়।

তৎকালীন বাংলার মুসলিম সমাজের একটি বড় অংশ আধুনিক শিক্ষা, বিজ্ঞানমনস্কতা ও সমকালীন জ্ঞানচর্চা থেকে পিছিয়ে ছিল। অশিক্ষা, কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও সামাজিক রক্ষণশীলতা মানুষের স্বাধীন চিন্তাকে বাধাগ্রস্ত করেছিল। এই বাস্তবতায় আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত চিন্তাবিদেরা উপলব্ধি করেছিলেন, সমাজ বদলাতে হলে মানুষের চিন্তার জগতেও পরিবর্তন আনতে হবে। প্রশ্ন করার সাহস, যুক্তি দিয়ে বিচার করার ক্ষমতা এবং নতুন জ্ঞান গ্রহণের মানসিকতা তৈরি করতে হবে।
বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন কোনো ধর্মবিরোধী আন্দোলন ছিল না। ধর্মীয় গোঁড়ামি, অন্ধ শাস্ত্রানুগত্য ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে যুক্তি ও মানবিকতার পক্ষে অবস্থান নেওয়াই ছিল এর অন্যতম লক্ষ্য। তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজ অবশ্য এই অবস্থান সহজভাবে নেয়নি। আন্দোলনের নেতৃস্থানীয় লেখকদের ধর্মবিরোধী আখ্যা দেওয়া হয়েছে, তাদের ওপর অপপ্রচার ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়েছে। কিন্তু তাদের মূল অবস্থান ছিল অন্ধ অনুসরণ নয়, বরং যুক্তি ও মানবকল্যাণের আলোকে জীবন ও সমাজকে দেখা।
কাজী মোতাহার হোসেনের ‘আনন্দ ও মুসলমান গৃহ’ প্রবন্ধে এমন এক সামাজিক বাস্তবতার সমালোচনা করা হয়েছিল, যেখানে গান, ছবি আঁকা, খেলাধুলা ও আনন্দের জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়েছিল। মানুষের জীবনে শিল্প, সৌন্দর্য, আনন্দ ও সৃজনশীলতার প্রয়োজন আছে, এই মানবিক বোধকে তিনি সামনে এনেছিলেন। আজও এই প্রশ্ন অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। গান, কবিতা, নাটক, চিত্রকলা ও সংস্কৃতিচর্চা মানুষের অনুভূতি, কল্পনা ও মননকে বিকশিত করে। সংস্কৃতির পরিসর সংকুচিত হলে মানুষের প্রশ্ন করার ক্ষমতা ও সহনশীলতার জায়গাটিও সংকুচিত হয়ে পড়ে।

বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের চিন্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে ‘শিখা’ পত্রিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। এর বিখ্যাত বাণী ছিল, ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব’। এই বাক্যের মধ্যেই আন্দোলনের মূল দর্শন নিহিত রয়েছে। জ্ঞান ছাড়া স্বাধীন চিন্তা সম্ভব নয়। আবার প্রশ্ন করার স্বাধীনতা ছাড়া জ্ঞানও মানুষের মুক্তির পথ তৈরি করতে পারে না।

এই আন্দোলন কোনো একজন মানুষের চিন্তার ফসল ছিল না। কাজী আবদুল ওদুদ বিশ্বজ্ঞান, সাহিত্য, দর্শন ও সংস্কৃতির বৃহত্তর ধারার সঙ্গে বাঙালি মুসলমান সমাজকে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। কাজী মোতাহার হোসেন ছিলেন বিজ্ঞানমনস্কতা ও যুক্তিবাদের প্রবক্তা। আবুল হুসেন প্রচলিত কর্তৃত্ব ও সামাজিক বিশ্বাসকে প্রশ্ন করার সাহসী কণ্ঠ ছিলেন। আবুল ফজল মুক্তচিন্তাকে সাহিত্য ও মানবিক জীবনবোধের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। মোতাহের হোসেন চৌধুরীর চিন্তার কেন্দ্রে ছিল মানুষ ও মানুষের মুক্তি। আবদুল কাদির সাহিত্য, গবেষণা ও সম্পাদনার মাধ্যমে উদার ও অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক পরিসর গড়ে তুলতে কাজ করেছিলেন।

বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের সাংগঠনিক তৎপরতা ১৯৩০-এর দশকে স্তিমিত হয়ে পড়লেও এর চিন্তা সেখানেই শেষ হয়ে যায়নি। পরবর্তী সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সামাজিক আন্দোলনের নানা ধারায় তা প্রবাহিত হয়েছে। ১৯৪০ সালে প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘের প্রথম সম্মেলনের উদ্বোধক ছিলেন কাজী আবদুল ওদুদ। পরবর্তীকালে ভাষা আন্দোলন, সাংস্কৃতিক আন্দোলন এবং অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশের মধ্য দিয়েও মুক্তচিন্তার এই ধারা নতুন শক্তি পায়। তবে আন্দোলনের একটি সীমাবদ্ধতা ছিল, রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত না থাকায় এর মুক্তচিন্তার আদর্শ বৃহত্তর সমাজে প্রত্যাশিত পরিসরে বিস্তার লাভ করতে পারেনি।
আজকের বাংলাদেশ একশ বছর আগের বাংলাদেশের চেয়ে অনেক দিক থেকেই ভিন্ন। শিক্ষার বিস্তার ঘটেছে, প্রযুক্তি মানুষের হাতে পৌঁছেছে, জ্ঞানের সুযোগ বেড়েছে। কিন্তু অজ্ঞতা, কুসংস্কার, অসহিষ্ণুতা, নারীবিদ্বেষ, সাম্প্রদায়িকতা এবং শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি বিরূপ মনোভাবও বিভিন্নভাবে টিকে আছে।

আগে তথ্যের অভাব ছিল; এখন তথ্যের অতিরিক্ত প্রবাহ। আগে গুজব ছড়াতে সময় লাগত; এখন একটি পোস্ট বা ভিডিও কয়েক মিনিটে হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। মানুষ অনেক সময় এমন তথ্যই বিশ্বাস করে, যা তার আগের ধারণাকে সমর্থন করে। ফলে তথ্যের প্রাচুর্য থাকলেও মুক্তচিন্তার পরিসর সংকুচিত হতে পারে।
এই জায়গাতেই বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের শিক্ষা আজ নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো তথ্য পেলেই বিশ্বাস নয়; প্রশ্ন করতে হবে, উৎস যাচাই করতে হবে, যুক্তি দিয়ে বিচার করতে হবে। নিজের বিশ্বাসকেও প্রয়োজনে প্রশ্ন করতে হবে। যে মত আমার পছন্দ নয়, সেটিও শুনতে হবে। কারণ ভিন্নমত মানেই শত্রুতা নয়। বুদ্ধির মুক্তির সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো প্রশ্ন করার সাহস। কোনো ধারণা দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত বলেই তা সত্য হয়ে যায় না। আবার নতুন কোনো ধারণা শুধু নতুন বলেই সত্য নয়। দুটোকেই যুক্তি, তথ্য ও মানবিকতার আলোকে যাচাই করতে হবে।
আজ বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের একশ বছর নিয়ে কথা বলা মানে একশ বছর আগের সংগঠন বা ভাষা হুবহু ফিরিয়ে আনা নয়; বরং তার মূল চেতনাকে নতুন বাস্তবতায় প্রয়োগ করা। আমাদের প্রয়োজন এমন শিক্ষা, যা শুধু পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য নয়, বরং প্রশ্ন করতে শেখায়। প্রয়োজন এমন গণমাধ্যম, যেখানে যাচাই করা তথ্যকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। প্রয়োজন এমন সাংস্কৃতিক পরিবেশ, যেখানে গান, নাটক, সাহিত্য, চিত্রকলা ও বিতর্ককে সমাজের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে দেখা হবে।

সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এমন একটি সামাজিক পরিবেশ, যেখানে মানুষ নিজের বিশ্বাস ধারণ করতে পারবে, আবার প্রয়োজন হলে ওই বিশ্বাসকে যুক্তির আলোয় পরীক্ষা করার স্বাধীনতাও পাবে। কারণ চিন্তার মুক্তি ছাড়া মানুষের সামগ্রিক মুক্তি অসম্পূর্ণ।

প্রায় একশ বছর আগে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন যে প্রশ্ন তুলেছিল, আজও আমাদের সামনে সেই প্রশ্নগুলো ফিরে আসেÑআমরা কি প্রচলিত ধারণাকে যুক্তির আলোকে বিচার করতে প্রস্তুত? আমরা কি ভিন্নমত শুনতে পারি? সত্য জানার প্রয়োজনে নিজের ধারণাকেও প্রশ্ন করতে পারি? ধর্মকে কি মানবিকতা, যুক্তি ও উদারতার আলোকে দেখতে পারি?

শতবর্ষ পরও তাই বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন অতীতের কোনো বিচ্ছিন্ন অধ্যায় নয়। এটি আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এমন একটি প্রবাহ, যার প্রয়োজন আজও ফুরিয়ে যায়নি। ‘শিখা’-এর ওই ঐতিহাসিক বাণী তাই আজও প্রাঞ্জল ও প্রাসঙ্গিকÑ*“জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব”।
বুদ্ধির মুক্তি মানে শুধু স্বাধীনভাবে চিন্তা করার অধিকার নয়; সত্যকে জানার, প্রশ্ন করার, তথ্য যাচাই করার, ভিন্নমত শোনার এবং মানবিকতার পক্ষে দাঁড়ানোর স্বাধীনতাও। অন্ধ অনুসরণের বদলে যুক্তি, সংকীর্ণতার বদলে উদারতা, অসহিষ্ণুতার বদলে সংলাপ এবং কুসংস্কারের বদলে জ্ঞানÑএই চর্চাই বুদ্ধির মুক্তির পথকে এগিয়ে নিতে পারে।

এক মধুমালা, দুই স্রষ্টা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:০৮ পূর্বাহ্ণ
এক মধুমালা, দুই স্রষ্টা

সৌহার্দ সিরাজ
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এমন ঘটনা বিরল নয়Ñএকই লোককাহিনি, একই চরিত্র, এমনকি একই নাম ভিন্ন ভিন্ন কবি-সাহিত্যিকের সৃষ্টিশীল হাতে ভিন্ন শিল্পরূপ লাভ করেছে। কিন্তু কাজী নজরুল ইসলাম ও জসীমউদ্দীনের ‘মধুমালা’ বিশেষ তাৎপর্যের অধিকারী। কারণ এখানে শুধু একই নামের দুটি নাটক নয়; একই লোকঐতিহ্যের দুই মহৎ শিল্পরূপ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সংগীত, কাব্য, নাট্যরস ও রোমান্টিক কল্পনার সমন্বয়ে নির্মিত গীতিনাট্য ‘মধুমালা’; অন্যদিকে পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের লোকজীবন, পল্লিগাথা, মুখে-মুখে চলা কেচ্ছা এবং বাংলার মাটির গন্ধে সিক্ত লোকনাট্য ‘মধুমালা’।
সুতরাং একই নাম দেখে প্রশ্ন জাগতেই পারেÑকে আগে? কে কার কাছ থেকে নিয়েছেন? একজন কি অন্যজনের সৃষ্টি আত্মসাৎ করেছেন?
এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে আবেগ নয়, ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে।
দলিল বলছে, ‘মদনকুমার ও মধুমালা’ কাহিনি দুই কবির আগেই পূর্ববঙ্গের লোকসমাজে প্রচলিত ছিল। দীনেশচন্দ্র সেন সম্পাদিত পূর্ববঙ্গ-গীতিকার দ্বিতীয় খ-ের দ্বিতীয় সংখ্যায় ১৯২৬ সালে ‘মদনকুমার ও মধুমালা’ নামে লোকগাথাটি প্রকাশিত হয়। সেখানে বলা হয়েছে, গঙ্গার উপকূল থেকে পদ্মা, ধলেশ্বরী, ব্রহ্মপুত্র ও শীতলক্ষ্যাবিধৌত বিস্তীর্ণ অঞ্চলে মধুমালার কাহিনি প্রচলিত ছিল। চন্দ্রকুমার দে ময়মনসিংহ অঞ্চল থেকে পালাটি সংগ্রহ করেছিলেন।
অর্থাৎ ‘মধুমালা’ প্রথমে ছিল লোকের, পরে তা কবির। নজরুল তাকে আধুনিক গীতিনাট্যের শিল্পে রূপ দিয়েছেন; জসীমউদ্দীন তাকে লোকনাট্যের প্রাণে পুনর্গঠিত করেছেন। অতএব দুই কবির মধ্যে ‘আত্মসাৎ’-এর অভিযোগ তোলার আগে এই মৌলিক সত্যটি স্বীকার করতেই হবেÑউভয় কবিরই সৃষ্টির গভীরে রয়েছে বৃহত্তর বাংলার লোকঐতিহ্য।
১. মধুমালার জন্ম কবির কলমে নয়, লোকস্মৃতিতে
বাংলা লোকসাহিত্যের একটি বৈশিষ্ট্য হলোÑতার স্রষ্টার নাম অনেক সময় অজ্ঞাত থাকে, কিন্তু কাহিনি বেঁচে থাকে মানুষের স্মৃতিতে। এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে গল্প, গান, পালা ও কেচ্ছার মাধ্যমে তা প্রবাহিত হয়। ‘মদনকুমার ও মধুমালা’ তেমনই একটি লোককাহিনি।
পূর্ববঙ্গ-গীতিকা-য় সংরক্ষিত কাহিনিতে দেখা যায়Ñমদনকুমার ও মধুমালার পরিচয়, স্বপ্ন, প্রেম, বিচ্ছেদ, পুনর্মিলন এবং নানা বিপদের মধ্য দিয়ে প্রেমের পরীক্ষা ঘটে। সেখানে মদনকুমার মধুমালার পরিচয় জানতে চাইলে যে গানটি গায়, তার অংশÑ
উজানি নগরে ঘর
নামে রাজা দ-ধর,
আমি তার পুত্র মদনকুমার।
মধুমালার উত্তরÑ
কাঞ্চন নামেতে ঘর
তার রাজা হীরাধর,
আমি তার কন্যা মধুমালা।
এই সংলাপ-গানই প্রমাণ করে যে, মদনকুমার-মধুমালার কাহিনি দুই কবির সৃষ্টির বহু আগেই বাংলার লোকসমাজে নাটকীয় সংলাপ ও গানের আকারে প্রচলিত ছিল।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো জসীমউদ্দীনের নিজের জীবনস্মৃতি। শৈশবে তিনি তাঁর অন্ধ দাদার মুখে মদনকুমার ও মধুমালার কেচ্ছা শুনতেন। তাঁর দাদা গান ধরতেনÑ
“ও আমি যাব মা ধন
মধুমালার দেশে হে।
মদনকুমারের বিদায়ের সময় আবার গাওয়া হতোÑ
“ও আমার যায়রে মদন
মধুমালার দেশে হে।”
এখানে জসীমউদ্দীনের ‘মধুমালা’র উৎস সম্পর্কে একটি অত্যন্ত মূল্যবান আত্মসাক্ষ্য পাওয়া যায়। অর্থাৎ জসীমউদ্দীন কোনো বই দেখে হঠাৎ ‘মধুমালা’ নির্মাণ করেননি; তাঁর শৈশবস্মৃতির লোককথা তাঁর সাহিত্যিক চেতনায় বহুদিন ধরে বাস করছিল।
এই তথ্য ‘আত্মসাৎ’ প্রসঙ্গের আলোচনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২. নজরুলের ‘মধুমালা’: লোককথা থেকে আধুনিক গীতিনাট্য
কাজী নজরুল ইসলাম লোকঐতিহ্যকে কখনো নিছক জাদুঘরের বস্তু হিসেবে দেখেননি। তাঁর সৃষ্টিশীল স্বভাব ছিল পুরাতনকে গ্রহণ করে তাকে নতুন শিল্পরূপ দেওয়া। লেটোর পালাগান থেকে তাঁর নাট্যপ্রতিভার সূচনা; ফলে গান, কাব্য, অভিনয় ও নাট্যরীতির সমন্বয় তাঁর শিল্পসত্তায় স্বাভাবিকভাবেই এসেছিল।
নজরুলের ‘মধুমালা’ সেই ঐতিহ্যেরই পরিণত রূপ।
নাটকটি গীতিনাট্য; কাহিনি, সংলাপ, গান ও কাব্য একসঙ্গে এগিয়েছে। প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী এতে ৪৩টি গান রয়েছে এবং মদনকুমার, মধুমালা ও কাঞ্চনমালাকে কেন্দ্র করে একটি ত্রিকোণ প্রেমের নাট্যসংঘাত তৈরি হয়েছে। নজরুলের সংস্করণে লোককাহিনি কেবল মদনকুমার-মধুমালার মিলন-বিরহের গল্প হয়ে থাকেনি; তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কাঞ্চনমালার চরিত্র। ফলে লোককাহিনির সরল প্রেমকাহিনি আধুনিক নাট্যসংঘাতে পরিণত হয়েছে।
মধুমালা ও মদনকুমারের প্রথম সাক্ষাৎ তাই কেবল লোকরূপকথার বিস্ময় নয়; সেখানে প্রেমের আকস্মিকতা ও স্বপ্নের আবেশ রয়েছে।
মদনকুমার প্রশ্ন করেÑ
আমি সত্য বলছিÑআমায় বিশ্বাস কর দেবী, আমি চোর নইÑদেব নই, মায়াবী নইÑআমি এই পৃথিবীর মানুষ।
তারপর সে নিজের পরিচয় দেয় এবং মধুমালাকে প্রশ্ন করেÑ
“তুমি কি চাঁদের দেশের রাজকন্যা?”
মধুমালার উত্তরও নাটকের কাব্যিক আবহ তৈরি করেÑ
“স্বপ্নই যদি হয়Ñতবে এ মধুর স্বপ্নকে মধুরতর করে নিতে বাধা কি বন্ধু?”

এই সংলাপ লোককথার সরল বর্ণনার তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক কাব্যিক আবহ সৃষ্টি করে। এখানে নজরুলের মধুমালা শুধু লোককন্যা নয়; সে স্বপ্ন, সৌন্দর্য ও প্রেমের প্রতীক।
৩. জসীমউদ্দীনের ‘মধুমালা’: লোকের মুখ থেকে মঞ্চে
জসীমউদ্দীনের শক্তি অন্য জায়গায়। তিনি লোককাহিনিকে আধুনিক শহুরে নাটকের ছাঁচে ঢেলে তার লোকস্বভাব নষ্ট করেননি। বরং লোকমুখে প্রচলিত কাহিনির ভঙ্গি, গান, সরলতা ও কল্পলোককে ধরে রেখে মঞ্চোপযোগী করেছেন।
জসীমউদ্দীনের ‘মধুমালা’কে তাই আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক নাটকের মানদ-ে বিচার করলে তার প্রকৃত স্বরূপ ধরা পড়বে না। এটি মূলত লোকনাট্যÑযেখানে কাহিনি দ্রুত এগোয়, চরিত্রগুলো আর্কিটাইপ্যাল বা আদি রূপধর্মী, গান ও বর্ণনা নাট্যক্রিয়ার অংশ, আর রূপকথার বিস্ময় বাস্তবতার নিয়মকে অতিক্রম করে।
জসীমউদ্দীনের ‘মধুমালা’র মদনকুমার ষোল বছর পাতালে কাটানো এক রাজকুমার; একদিন সে স্বপ্নে মধুমালাকে দেখে এবং সেই স্বপ্নের প্রেমে বাস্তব সংসার ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে। একটি সমকালীন পাঠ-আলোচনাতেও উল্লেখ করা হয়েছে যে, নাটকের কাহিনিটি পল্লির প্রচলিত রূপকথা থেকে নেওয়া এবং জসীমউদ্দীন সেটিকে নিজের ভঙ্গিতে নাট্যরূপ দিয়েছেন।
এখানে জসীমউদ্দীনের মৌলিকতা কাহিনির উদ্ভাবনে নয়; রূপান্তরের শিল্পে।
৪. দুই মধুমালার প্রধান পার্থক্য: প্রেমের প্রকৃতি
নজরুলের মধুমালায় প্রেম এক প্রবল রোমান্টিক শক্তি। প্রেম চরিত্রগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে, তাদের ভাগ্য বদলায় এবং শেষ পর্যন্ত ট্র্যাজেডির দিকে ঠেলে দেয়। মদনকুমার মধুমালাকে দেখে প্রেমে পড়ে; মধুমালাও তাকে গ্রহণ করে। কিন্তু কাঞ্চনমালার আবির্ভাবে প্রেম জটিল হয়ে ওঠে।
কাঞ্চনমালা জানে না যে, মদনকুমারের হৃদয়ে অন্য নারী আছে। সে স্বামী হিসেবে মদনকুমারকে গ্রহণ করে। তার ঘোষণাÑ
“এই ত্রিভুবনে আমার স্বামী আর কেউ নেই, হবে না, হতে পারে না।
এই সংলাপ নজরুলের নাটকের একটি গুরুত্বপূর্ণ নাট্যবিন্দু। কারণ এখানে প্রেম কেবল আকর্ষণ নয়Ñঅধিকার, সামাজিক সম্পর্ক, দাম্পত্য, কর্তব্য এবং আত্মসমর্পণের প্রশ্নও হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে জসীমউদ্দীনের মধুমালায় প্রেম বেশি সরল ও লোকজ। সেখানে প্রেমের কেন্দ্রে রয়েছে আকুলতা, অভিযান, বিচ্ছেদ, অপেক্ষা ও পুনর্মিলন। লোককাহিনির সহজ বিশ্বাসই তার শক্তি।
৫. নজরুলের মধুমালা: গীতিনাট্যের সাফল্য
নজরুল ছিলেন কবি, সুরকার ও গীতিকারÑএই তিন সত্তার এক বিরল সমন্বয়। ফলে তাঁর ‘মধুমালা’র প্রধান শিল্পশক্তি নাট্যসংলাপের পাশাপাশি গান।
নজরুলের নাটকে গান কখনো কেবল বিরতির বিনোদন নয়; গান চরিত্রের অনুভূতি প্রকাশ করে, দৃশ্যের আবহ নির্মাণ করে এবং কাহিনিকে এগিয়ে নেয়।
মধুমালার সৌন্দর্য নিয়ে পরীদের গান, মদনকুমারের প্রেম, কাঞ্চনমালার বিরহÑসবই সংগীতের মাধ্যমে বিস্তৃত হয়েছে। এখানে তাঁর লেটো-অভিজ্ঞতার দীর্ঘ ঐতিহ্য কাজ করেছে। গান ও সংলাপের মধ্য দিয়ে চরিত্র গড়ে ওঠেÑনজরুলের নাট্যশৈলী সম্পর্কে নাট্যসমালোচনাতেও এই বৈশিষ্ট্যটি বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। একটি সংলাপ দৃশ্যের হাস্যরসও লক্ষ্য করার মতো। অয়স্কান্ত মদনকুমারকে বলেÑ
“পা গোল নয় যুবরাজ, পেট গোল হয়ে উঠছে।”
তারপর সে শিকারের কষ্টকে হাস্যরসে পরিণত করে।
এই অয়স্কান্ত-পর্ব প্রমাণ করে, নজরুল শুধু রোমান্টিক আবেগে নাটক ভারী করেননি; হাস্যরস, কৌতুক ও চরিত্রের বৈচিত্র্যও এনেছেন।

৬. জসীমউদ্দীনের মধুমালা: লোকরস ও মাটির ভাষা
জসীমউদ্দীনের নাট্যভাষা নজরুলের তুলনায় অনেক বেশি লোকজ। তাঁর ভাষায় পূর্ববাংলার মুখের স্বাদ আছে। লোককথার সেই স্বাভাবিকতা নাটকের সংলাপেও প্রবেশ করেছে।
লোকগাথার মদনকুমার যখন মধুমালাকে দেখে পরিচয় জানতে চায়, তখন তার বক্তব্যÑ
“কার পুরী বা কার ঘর-কন্যা কিবা নামটি তোমার?”
আর মধুমালার উত্তরÑ
“আমি তার কন্যা মধুমালা।”
এখানে কোনো জটিল কাব্যিক অলংকার নেই, আছে লোকজ সরলতা।
জসীমউদ্দীনের শিল্পবোধ এখানেইÑতিনি জানেন কোথায় ভাষাকে উঁচু করতে হয়, আর কোথায় তাকে মানুষের মুখে ফিরিয়ে দিতে হয়।
৭. নাট্যমানের তুলনা
এখন প্রশ্নÑদুই নাটকের মধ্যে নাট্যমানের পার্থক্য কোথায়?
নজরুলের নাট্যকাঠামো তুলনামূলকভাবে জটিল। তাঁর ‘মধুমালা’য় একাধিক রাজ্য, একাধিক চরিত্র, পরী, রাজপরিবার, মদনকুমার-মধুমালা-কাঞ্চনমালার ত্রিভুজ প্রেম, হাস্যরস এবং গানের বিস্তৃত পরিসর রয়েছে।
অন্যদিকে জসীমউদ্দীনের নাটক কাহিনিনির্ভর এবং লোকপালার কাছাকাছি। তাঁর নাট্যশক্তি বেশি প্রকাশ পেয়েছে সংলাপের প্রাণবন্ততা, লোকভাষা, মঞ্চযোগ্যতা এবং কাহিনির দ্রুত গতিতে।
একজনের শক্তি নাট্য-সংগীত ও কাব্যিক কল্পনায়; অন্যজনের শক্তি লোকজ আখ্যান ও স্বাভাবিক সংলাপে।
তবে নজরুলের নাটকও সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। তাঁর ‘মধুমালা’ সম্পর্কে সমালোচনায় বলা হয়েছে, শেষদিকে মধুমালার আত্মহত্যা আকস্মিক এবং নাট্যগতভাবে যথেষ্ট প্রস্তুত নয়।
অর্থাৎ নজরুলের নাটক গীতিনাট্য হিসেবে শক্তিশালী হলেও নাট্যসংহতির কিছু জায়গায় দুর্বলতা রয়েছে।
জসীমউদ্দীনের নাটকেও কাহিনির সরলতা কখনো নাট্যগভীরতার সীমা তৈরি করে। তাঁর কাহিনি মূলত লোকরূপকথার কাঠামোর ওপর দাঁড়ানো। ফলে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক চরিত্র-নির্মাণ সেখানে প্রধান উদ্দেশ্য নয়।
৮. কে বেশি জনপ্রিয়?
জনপ্রিয়তার প্রশ্নে একক সিদ্ধান্ত দেওয়া কঠিন। কারণ দুই নাটকের জনপ্রিয়তার ক্ষেত্র আলাদা।
নজরুলের ‘মধুমালা’ পেশাদার নাট্যমঞ্চে অভিনীত হয়েছে। নাট্যভারতী রঙ্গমঞ্চে এর অভিনয়ের উল্লেখ পাওয়া যায়; গীতিনাট্য হিসেবে পেশাদার মঞ্চে এর চাহিদা তৈরি হয়েছিল।
পরবর্তীকালেও নজরুলের ‘মধুমালা’ মঞ্চ ও যাত্রায় ফিরে এসেছে। ২০২২ সালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকারা তাঁর ‘মধুমালা’ অবলম্বনে যাত্রাপালা মঞ্চস্থ করেন।
অন্যদিকে জসীমউদ্দীনের ‘মধুমালা’ পূর্ববাংলার লোকসমাজে বিশেষভাবে জনপ্রিয় হয়েছে। রেডিও, মঞ্চ ও যাত্রাপালার মাধ্যমে কাহিনিটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েÑএমন অভিজ্ঞতার উল্লেখও পাওয়া যায়।
বিশেষত বাংলাদেশের গ্রামীণ ও লোকজ সংস্কৃতির পরিসরে জসীমউদ্দীনের ‘মধুমালা’ একটি দীর্ঘস্থায়ী সাংস্কৃতিক স্মৃতি তৈরি করেছে।
সুতরাং বলা যায়Ñনজরুলের মধুমালা পেশাদার গীতিনাট্য ও সংগীতনাট্যের পরিসরে শক্তিশালী; জসীমউদ্দীনের মধুমালা লোকনাট্য, রেডিও ও যাত্রার জনপ্রিয় ধারায় গভীরভাবে প্রোথিত।
৯. ‘আত্মসাৎ’ প্রসঙ্গ: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
এবার আসা যাক মূল বিতর্কেÑজসীমউদ্দীন কি নজরুলের ‘মধুমালা’ আত্মসাৎ করেছিলেন?
প্রাপ্ত দলিলের ভিত্তিতে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর কারণ নেই। বরং এর বিপরীত প্রমাণই শক্তিশালী।

প্রথমত, ১৯২৬ সালে পূর্ববঙ্গ-গীতিকায় ‘মদনকুমার ও মধুমালা’ লোকগাথা প্রকাশিত হয়েছে। অর্থাৎ কাহিনিটি নজরুল ও জসীমউদ্দীনÑদুজনেরই আগে প্রচলিত ছিল।
দ্বিতীয়ত, জসীমউদ্দীন তাঁর শৈশবস্মৃতিতে জানিয়েছেন যে, তিনি দাদার মুখে এই কাহিনি শুনেছেন। তিনি এমনকি মদনকুমারের যাত্রার গানও শুনেছেন।
তৃতীয়ত, নজরুলের ‘মধুমালা’ পেশাদার মঞ্চে ১৯৩৯ সালের কাছাকাছি সময়েই মঞ্চস্থ হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়।
অন্যদিকে জসীমউদ্দীনের ‘মধুমালা’ সাধারণত ১৯৫১ সালের নাটক হিসেবে তালিকাভুক্ত।
এখানে একটি আপাত জটিলতা তৈরি হয়। যদি নজরুলের নাটক আগে হয়ে থাকে, তাহলে জসীমউদ্দীন কি নজরুলের কাছ থেকে নিয়েছিলেন?
এ প্রশ্নের উত্তরও সরলÑকেবল পরবর্তী প্রকাশনা বা মঞ্চায়নের তারিখ দিয়ে আত্মসাৎ প্রমাণ করা যায় না। কারণ জসীমউদ্দীনের নিজের আত্মসাক্ষ্য আছে যে, তিনি ছোটবেলা থেকেই এই লোককাহিনি জানতেন। তার ওপর ১৯২৬ সালের মুদ্রিত লোকগাথা তাঁর বক্তব্যকে ঐতিহাসিকভাবে সমর্থন করে।
অতএব অধিক যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা হলোÑদুই কবিই একটি প্রচলিত লোককাহিনিকে নিজেদের শিল্পবোধ অনুযায়ী রূপ দিয়েছেন। এখানে ‘আত্মসাৎ’ শব্দটি ব্যবহার করতে হলে সরাসরি প্রমাণ প্রয়োজনÑযেমন একজনের নাটকের নির্দিষ্ট সংলাপ, দৃশ্যবিন্যাস, গান, চরিত্র-সংঘাত বা কাঠামো অপরজন হুবহু বা প্রায় হুবহু গ্রহণ করেছেন এবং উৎস গোপন করেছেন। নির্ভরযোগ্য উপাদানে এমন কোনো প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয় না।
১০. তবে কি দুই নাটকের কোনো মিল নেই?
মিল অবশ্যই আছেÑএবং সেই মিল অত্যন্ত গভীর।
দুই নাটকেইÑ
মদনকুমার ও মধুমালা কেন্দ্রীয় প্রেমিক-প্রেমিকা;
স্বপ্ন বা অতিপ্রাকৃত উপাদান রয়েছে;
রাজপরিবারের পটভূমি আছে;
প্রেমের জন্য বিচ্ছেদ ও অভিযান রয়েছে;
মধুমালার সৌন্দর্য কাহিনির কেন্দ্র;
পরী বা অলৌকিক শক্তি গুরুত্বপূর্ণ;
লোকরূপকথার কাঠামো ব্যবহৃত হয়েছে।
কিন্তু এগুলো মূল লোককাহিনিরও উপাদান। ১৯২৬-এর লোকগাথায় মদনকুমার-মধুমালার সাক্ষাৎ, পরীদের ভূমিকা, আংটি-বদল, বিচ্ছেদ ইত্যাদি ইতিমধ্যে ছিল।
তাই এই মিলকে ‘চুরি’ বলা ইতিহাসের সঙ্গে সুবিচার হবে না।
বরং বলা যায়Ñএকই নদী থেকে দুই কবি দুই ঘাটে জল তুলেছেন।
১১. দুই মধুমালার নায়িকা
নজরুলের মধুমালা অত্যন্ত সচেতন প্রেমিকা। সে নিজের প্রেমের কথা প্রকাশ করতে সংকোচ করে না। প্রথম সাক্ষাতেই তার কণ্ঠে আসেÑ
স্বপ্নই যদি হয়Ñতবে এ মধুর স্বপ্নকে মধুরতর করে নিতে বাধা কি বন্ধু?
এই মধুমালা আধুনিকতার স্পর্শ পাওয়া নারী। সে প্রেমের আকাক্সক্ষা প্রকাশ করতে পারে।
জসীমউদ্দীনের মধুমালা লোককাহিনির নারী। তার প্রেমের ভিতর অপেক্ষা, ত্যাগ ও দুঃখ বেশি। সে লোকস্মৃতির চিরচেনা বধূরূপের সঙ্গে যুক্ত।
ফলে দুই মধুমালা একই নামের হলেও একই নারী নয়।

নজরুলের মধুমালা রোমান্টিক নায়িকা, আর জসীমউদ্দীনের মধুমালা লোককাহিনির নায়িকা।
১২. মদনকুমার: একই নাম, দুই শিল্পরূপ
দুই নাটকের মদনকুমারও এক নয়। লোকগাথার মদনকুমার প্রেমের টানে ঘর ছাড়ে। তার প্রেম রূপকথার সরল নৈতিকতায় নির্মিত। নজরুলের মদনকুমার আরও নাটকীয়। তার পাশে অয়স্কান্তের মতো চরিত্র আছে, কাঞ্চনমালার সঙ্গে জটিল সম্পর্ক আছে, রাজপরিবারের দ্বন্দ্ব আছে। অর্থাৎ নজরুল লোককাহিনির মদনকুমারকে নিয়ে নাট্যচরিত্র তৈরি করেছেন, আর জসীমউদ্দীন লোককাহিনির মদনকুমারকে নিয়ে লোকনাট্যের নায়ক তৈরি করেছেন।
১৩. দুই কবির শিল্পদর্শন
এখানেই দুই ‘মধুমালা’র প্রকৃত পার্থক্য।
নজরুলের শিল্পীসত্তা বহুমুখী। তাঁর কাছে গান, সুর, কবিতা, নাটক ও রোমান্টিক কল্পনা পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়। ফলে ‘মধুমালা’ একটি গীতিনাট্য হিসেবে তার পূর্ণতা খোঁজে।
জসীমউদ্দীনের শিল্পীসত্তার কেন্দ্র গ্রামবাংলা, লোকসাহিত্য ও পল্লিমানুষ। তাই ‘মধুমালা’ তাঁর হাতে লোকনাট্য হয়ে ওঠে।
একই কাহিনি নজরুলের হাতে হয়ে যায় মঞ্চের সংগীতময় স্বপ্নলোক; জসীমউদ্দীনের হাতে তা হয়ে ওঠে বাংলার লোকস্মৃতির জীবন্ত কেচ্ছা।
১৪. কে বেশি উৎকৃষ্ট?
‘কে শ্রেষ্ঠ’Ñএই প্রশ্নের উত্তর সাহিত্যিকভাবে খুব ফলপ্রসূ নয়। কারণ দুই নাটকের শিল্পলক্ষ্য এক নয়।
যদি বিচার করি গীতিনাট্যের সংগীত, কাব্যিক ভাষা, রোমান্টিক আবহ, নাট্যদৃশ্য ও চরিত্রসংঘাতের বিচারে, নজরুলের ‘মধুমালা’র নিজস্ব শক্তি স্পষ্ট।
যদি বিচার করি লোকভাষা, লোকঐতিহ্য, কাহিনির সহজ প্রবাহ, পল্লিজীবনের সাংস্কৃতিক স্মৃতি এবং লোকনাট্যের মঞ্চযোগ্যতার বিচারে, জসীমউদ্দীনের ‘মধুমালা’র স্বাতন্ত্র্য অনস্বীকার্য।
অতএব একজনকে অন্যজনের মাপকাঠিতে বিচার করা ঠিক হবে না।
সাহিত্যে কখনো কখনো একই বীজ থেকে দুটি গাছ জন্মায়। একটি ফুলে-ফলে রাজপ্রাসাদের বাগানকে অলংকৃত করে, অন্যটি গ্রামের উঠোনে ছায়া দেয়। কোনটির মূল্য বেশিÑএই প্রশ্নের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, দুই গাছের স্বভাব আলাদা।
১৫. এক মধুমালা থেকে দুই বাংলা
আরও গভীরভাবে দেখলে দেখা যায়, দুই ‘মধুমালা’র মধ্যে যেন দুই বাংলার সাহিত্যিক মানসও প্রতিফলিত হয়েছে। নজরুলের মধুমালায় আছে মঞ্চ, সংগীত, রোমান্টিকতা, রাজপ্রাসাদ, পরী, কাব্যিক সংলাপ এবং নাটকীয় সংঘাত। জসীমউদ্দীনের মধুমালায় আছে লোককথা, মুখে-মুখে চলা কেচ্ছা, গ্রামীণ স্মৃতি, লোকগান এবং পল্লির সহজ কল্পনা। একজন লোককথাকে নিয়ে গড়ে তুলেছেন আধুনিক গীতিনাট্যের স্বপ্ন, অন্যজন লোককথার ভিতর থেকেই ফিরিয়ে এনেছেন লোকনাট্যের প্রাণ।
তাই এই দুই মধুমালা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; তারা বরং একই সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের দুই উত্তরসূরি।
উপসংহার: মধুমালা কার?
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি দাঁড়ায়Ñমধুমালা কার? নজরুলের? নাকি জসীমউদ্দীনের?
উত্তর হলোÑদুই কবির সাহিত্যিক মধুমালা তাঁদের নিজ নিজ সৃষ্টি; কিন্তু মধুমালার মূল কাহিনি বৃহত্তর বাংলার লোকসমাজের।১৯২৬ সালের *পূর্ববঙ্গ-গীতিকা* তার লিখিত সাক্ষ্য বহন করে। জসীমউদ্দীনের শৈশবস্মৃতি তার মৌখিক ঐতিহ্যের সাক্ষ্য দেয়। নজরুল সেই লোকঐতিহ্যকে পেশাদার গীতিনাট্যের ভাষায় রূপ দিয়েছেন; জসীমউদ্দীন তাকে লোকনাট্যের মাটিতে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছেন।

সুতরাং ‘আত্মসাৎ’ শব্দটির পরিবর্তে ‘লোকঐতিহ্যের সৃজনশীল পুনর্র্নিমাণ’ কথাটি অধিক যথার্থ।
এখানে চুরি নেই; আছে উত্তরাধিকার। অনুকরণ নেই; আছে রূপান্তর।
একই গল্প আছে; কিন্তু একই শিল্প নেই। নজরুলের ‘মধুমালা’ যখন মঞ্চে গান হয়ে ওঠে, তখন লোককথা আধুনিক কাব্যিক স্বপ্নে উত্তীর্ণ হয়। জসীমউদ্দীনের ‘মধুমালা’ যখন পল্লির কণ্ঠে ফিরে আসে, তখন সেই লোককথা আবার তার জন্মভূমির মাটির গন্ধ পায়।
একজনের মধুমালা যেনÑ“স্বপ্নই যদি হয়Ñতবে এ মধুর স্বপ্নকে মধুরতর করে নিতে বাধা কি বন্ধু?”*
অন্যদিকে লোকগাথার মধুমালা-মদনকুমারের মুখে আমরা শুনিÑ
“উজানি নগরে ঘর
নামে রাজা দ-ধরÑ
আমি তার পুত্র মদনকুমার।
একটির ভাষা কাব্যিক, অন্যটির ভাষা লোকজ; একটি মঞ্চের আলোয় দীপ্ত, অন্যটি লোকস্মৃতির অন্ধকারে জ্বলন্ত প্রদীপের মতো।
আর এই দুই আলোকে পাশাপাশি রাখলে বোঝা যায়Ñবাংলা সাহিত্য শুধু কবির ব্যক্তিগত প্রতিভার ইতিহাস নয়; এটি লোকসমাজের দীর্ঘ স্মৃতি, কবির কল্পনা এবং শিল্পীর পুনর্র্নিমাণের সম্মিলিত ইতিহাস।
সেই অর্থে ‘মধুমালা’ কোনো একজন কবির একার সম্পত্তি নয়। মদনকুমার ও মধুমালার কাহিনি বাংলার লোকমনের; কিন্তু নজরুলের মধুমালা নজরুলের, জসীমউদ্দীনের মধুমালা জসীমউদ্দীনের।
একই নদী থেকে জল তুলে দুই কবি দুটি ভিন্ন পাত্র নির্মাণ করেছেন। এক পাত্রে বিদ্রোহী কবির সংগীতের ঝংকার, অন্য পাত্রে পল্লীকবির মাটির গন্ধ। এই দুই পাত্র পাশাপাশি রাখলেই বাংলা সাহিত্যের ‘মধুমালা’ পূর্ণ হয়।