বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬, ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬, ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩

কয়রার কাশিয়াবাদ স্টেশনের বাউন্ডারিতে জাম ও লিচু গাছের চারা রোপন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:০৬ অপরাহ্ণ
কয়রার কাশিয়াবাদ স্টেশনের বাউন্ডারিতে জাম ও লিচু গাছের চারা রোপন

কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধি: সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের খুলনা রেঞ্জের কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশনের বাউন্ডারি এলাকায় জাম ও লিচু গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে।

বুধবার (৭ অক্টোবর) সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এজেডএম হাছানুর রহমান এবং খুলনা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক ও রেঞ্জ কর্মকর্তা মোঃ সাজমিনুল ইসলামের নির্দেশনায় কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশনের বাউন্ডারি এলাকায় এসব ফলদ গাছের চারা রোপণ করা হয়।

 

কাশিয়াবাদ স্টেশন কর্মকর্তা ডেপুটি রেঞ্জার মোঃ নাসির উদ্দীনসহ তার স্টেশনের স্টাফরা এ সময় উপস্থিত থেকে জাম ও লিচুর চারা রোপণ করেন। স্থানীয় বাসিন্দা মোঃ ইয়াছিন আলী বলেন, বন বিভাগের বাউন্ডারি এলাকায় ফলদ গাছের চারা রোপণের মাধ্যমে সবুজায়ন বৃদ্ধি, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং ভবিষ্যতে ফলদ গাছের সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এতে করে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা হবে। কাশিয়াবাদ স্টেশন কর্মকর্তা ডেপুটি রেঞ্জার মোঃ নাসির উদ্দীন বলেন, সরকারের ঘোষণা মোতাবেক এই গাছের চারা রোপন করা হয়েছে। এগুলোর যথাযথ পরিচর্যা ও সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। এ ধরনের মহতী উদ্যোগকে এলাকাবাসী সাধুবাদ জানিয়েছে।

Ads small one

৭৬তম আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস: নির্দেশনামূলক বিশ্ব প্রেক্ষিত

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৫০ অপরাহ্ণ
৭৬তম আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস: নির্দেশনামূলক বিশ্ব প্রেক্ষিত

মো. হুমায়ুন খালিদ

বাংলাদেশের বিজ্ঞজনদের ভাষ্য দেশের প্রবীনরা ভালো নেই। পাড়া প্রতিবেশি আত্মীয় স্বজনকে বয়োজষ্ঠদের ব্যাপারে উদাসীন থাকতে দেখাযায়। যথাযথ মানবিক দৃষ্টিতে তারা প্রবীনদের আদর করে না। অবজ্ঞা বিংবা লঞ্ছনা যেন প্রবীনদের ভাগ্যলিপি। বাংলাদেশে বিরজমান এ প্রেক্ষাপটেই ৬ই অক্টোবর ২০২৬ তারিখে উদযাপিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক ৭৬তম প্রবীণ দিবস। নিজস্ব নীতি আদর্শ বজায় রেখে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর প্রায় সকল দেশ দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরে পালন করে আসছে। সরকারি-বেসরকারি নির্বিশেষে বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান দিবসটি পালনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।

দিবসটির গুরুত্ব, তাৎপর্য, সময়কাল এবং অধিক্ষেত্র বিবেচনা বিবেচনা করে একটি সময়োপযোগী প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়ে থাকে। ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসটির জন্য একটি যথোপযুক্ত প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়েছে। প্রতিপাদ্যটি হচ্ছে :“এইজ অফ লঞ্জিভিটি: রি থিঙ্কিং সিস্টেমস ফর লংগার লাইভস”। বাংলায় এ প্রতিবাদ্যটির মর্মার্থ দাঁড়ায়-দীর্ঘায়ু প্রাপ্তির এ যুগেও আয়ুষ্কাল আরো দীর্ঘতর করার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সিস্টেমগুলো সম্পর্কে আরো চিন্তাভাবনা করা প্রয়োজন।

বিশ্বের মানুষের গড় আয়ু ইতোমধ্যে আগের তুলনায় তাৎপর্যপূর্ণভাবেই বৃদ্ধি পেয়েছে। এ অগ্রগতির ক্ষেত্রে জীবন যাপনের সাথে অবিচ্ছেদ্য কিছু সিস্টেম সামগ্রিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। এতদসত্বেও সিস্টেমগুলোর কার্যকারিতা এ বছরের জন্য নির্ধারিত প্রতিপাদ্য ও বিশ্বের অন্যান্য নির্দেশনার আলোকে আরো বৃদ্ধি ও জোরদার করার জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে আন্তর্জাতিক এবং রিজিওনাল সংগঠনসহ অনেকের পক্ষ থেকে। এ নির্দেশনার সাথে জড়িয়ে আছে বয়োবৃদ্ধদের স্বাস্থ্যসম্মত, উৎপাদনশীল, মর্যাদাপূর্ণ ও বৈষম্যহীন জীবন ব্যবস্থা। উল্লেখ্য, এ বিষয়গুলো শুধু বয়স্কদের বা বয়োবৃদ্ধদের সঙ্গেই সম্পৃক্ত নয়; বরং স্থান-কাল- পাত্র-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল শ্রেণী ও পেশার মানুষের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। দিবসটি পালন উপলক্ষে বয়স্কদের বা বৃদ্ধদের স্বার্থের জন্য প্রয়োজনীয় সিস্টেমগুলোকে চারটি এরিয়াতে ভাগ করা যেতে পারে । যেমন- (১) সামাজিক সুরক্ষা; (২) স্বাস্থ্য ও যতœাদি; (৩) শোভনীয় কাজ ও জীবনব্যাপী শিক্ষা; এবং (৪) সহায়ক পরিবেশ পরিস্থিতি ।

উপরোক্ত ক্ষেত্রসমূহভিত্তিক কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে- বৃদ্ধ ব্যক্তিগণ যাতে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ,সুস্বাস্থ্য ও উপযুক্ত ক্ষেত্রে সক্রিয় অংশগ্রহণসহ অবদান রেখে বাঁচতে পারে।
এ প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট কমিটি উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় বয়স বৃদ্ধদের গুরুত্ব দেওয়ার লক্ষ্যে চারটি ক্ষেত্রকে চিহ্নিত করেছে। যথা- (১) সকল প্রকার ও সকল মাত্রার দরিদ্রতা দূরীভূত করার কার্যকর পন্থা গ্রহণ; (২) অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বিস্তৃত পরিসরের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা; (৩) বয়োবৃদ্ধ কালের সাথে সংশ্লিষ্ট সকল প্রক্রিয়ার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রবণতাকে আরো জোরদার এবং স্বাস্থ্যসম্মত করা; (৪) বয়স্কদের জন্য প্রয়োজনীয় সেবা যতœ কাজটিকে একটি পেশার মর্যাদায় নিয়ে আসা এবং এ সেবাকে অর্থনীতির সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করা,এবং এ সেবা খাতকে আর্থিক বিনিয়োগের অন্যতম খাত হিসেবে গড়ে তোলা।

জাতিসংঘের আঞ্চলিক সংস্থাগুলো আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস উপলক্ষে বিবেচনাপ্রসূত বিভিন্ন আয়োজন করে থাকে। যেমন, এসকাপ এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চলের জন্য দিবসের প্রতিপাদ্য ভিত্তিক বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ কনফারেন্সের আয়োজন করছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মধ্যে আছেÑ (১) টেকনোলজি, (২) কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এবং (৩) বয়োবৃদ্ধ জনসমাজ। এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে এসডিজি অর্জনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি থাকলেও বাধা হিসেবে দাড়িয়েছে দরিদ্রতা দূরীকরণ এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মতো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জসমূহ।

 

চ্যালেঞ্জগুলো হচ্ছে বহুমাত্রিক দরিদ্রতা,বৈষম্যতা, ডেমোগ্রাফিক পরিবর্তন,এবং শিক্ষা,স্বাস্থ্য সেবা, এবং সামাজিক সুরক্ষা খাতে অনধিগম্ম্যতা ও বৈষম্যতা। এসবের জন্য দরকার রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার বিস্তৃতি। মনে রাখতে হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবারিত উত্থান ও দ্রুত ডিজিটাল রূপান্তর সরকারি সেবা পাওয়া এবং প্রদান উভয় ক্ষেত্রেই নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকির সৃষ্টি করছে। আবার এর মধ্য দিয়ে নতুন নতুন সুযোগও সৃষ্টি হচ্ছে। টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের জন্য এ সকল চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকি মোকাবেলা করা খুবই জরুরী।

প্রসঙ্গত চলতি বছর দৈনিক যুগান্তরের ১লা অক্টোবর তারিখে প্রকাশিত সংবাদেসূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশে বর্তমানে ষাটোর্ধ জনগণের হার প্রায় ১০ শতাংশ। ২০২২ রালে ছিল ৯.২৮ শতাংশ। ২০২৬ সাল শেষে এ সংখ্যা ২ কোটিতে পৌছাবে। ২০৪১ সালে প্রবীনদের সংখ্যা ৩ কোটির বেশি এবং ২০৬১ সালে প্রায় ৬ কোটিতে দাড়াবে। অর্থ্যাৎ চার দশক পর দেশের প্রায় এক চতুর্থাংশের বেশি মানুষ প্রবীন হয়ে পড়বে।

ইএসসিএপি কর্তৃক উল্লেখিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে বৃদ্ধ মানুষের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে এ রিজিয়নে ৬০ এবং ৬০ উর্ধ লোকের সংখ্যা ২০২০ সালে ছিল মোট জনসংখ্যার শতকরা ১৩.৬ ভাগ। এই হিসাবে আগামী ২০৫০ সালে এ হার দাঁড়াবে শতকরা ২৪ দশমিক ৯ ভাগ। একই সাথে এসডিজি বা ২০৩০ সালের উন্নয়ন এজেন্ডা প্রসঙ্গে বলা যায় যে এজেন্ডা যদি হয় প্ল্যান ফর পিপল, প্লানেট এন্ড প্রসকারিটি জন্য। তাহলে এজেন্ডার কোনোটাতেই বৃদ্ধদের প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত না হওয়ার কোনো অবকাশই নেই। এছাড়া, এ জেন্ডার আদর্শের বাণীতে রয়েছে, “লিভ নো ওয়ান বিহাইন্ড।” সূতরাং দীর্ঘ অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ও দক্ষতা সম্পন্ন বয়োবৃদ্ধগণ একই সাথে এ উন্নয়ন এজেন্ডা বাস্তবায়নের উপকারভোগী এবং অবদান রাখার যোগ্যতম ব্যক্তিবর্গ।

বায়োবৃদ্ধদের সুস্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হু এতটাই উদগ্রীব যে বৃদ্ধদের জীবন ব্যবস্থার তাৎপর্যপূর্ণ উন্নয়নের নিমিত্ত বিশ্বব্যাপী বিরাজমান সরকার, সিভিল সোসাইটি, আন্তর্জাতিক এজেন্সি, পেশাদার, একাডেমিক এবং প্রাইভেট সেক্টর কে এক কাতারে নিয়ে আসতে ২০২০ সালে “দি ডিকেড অব হেলদি এবং শিরোনামে একটি কর্মসূচিরও সূত্রপাত করে। এ সূত্র ধরেই খোদ জাতিসংঘ ২০২০ সালের সাধারণ পরিষদের ৭৫ /১৩১ নম্বর রেজুলেশনের মাধ্যমে সকল সদস্য রাষ্ট্রকে সম্পৃক্ত করে ঘোষণা দেয় যে ‘২০২০২১- ২০৩০’ হবে: the decade of healthy aging”. জাতিসংঘ এই ডিকেভ বাস্তবায়নে নেতৃত্বের দায়িত্ব দেয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে। সুতরাং ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসটি জাতিসংঘ ঘোষিত ডিকেডের সঙ্গে একাকার হয়ে গেছে। আবার জাতিসংঘ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং জাতিসংঘের রিজিওনাল সংগঠনগুলো সম্মিলিত হয়েই রিজিয়ন ভেদে কাস্টমাইজড সাপেক্ষে সাতটি কৌশলেরও ঘোষণা দেয়।

উল্লেখ, বয়োবৃদ্ধ সংক্রান্ত বিশ্ব নির্দেশনা কে উদ্দেশ্যভিত্তিক সুনির্দিষ্ট ভাবে তিনটি ক্যাটাগরিতে ফেলা যেতে পারে। যেমন- (১)এনেবল ইন সোশ্যাল রিটার্ন; (২) সাপোর্ট; এবং, (৩) রিসার্চ, মনিটরিং এন্ড ইভালুয়েশন। এক্ষেত্রে কয়েকটি শর্তপূরণ অপরিহার্য । শর্তগুলো হচ্ছে: (১) সুদৃঢ় রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি; (২) সক্ষমতা তৈরি ও যোগ্য নেতৃত্ব; (৩) স্বাস্থ্য সুরক্ষা সেবা নিশ্চিত করার জন্য অপরিহার্য; কিন্তু সুবিন্যাসিত নীতি-পরিকল্পনা; (৪) বিভিন্ন সেক্টর ও স্টকহোল্ডার ভিত্তিক পরিকল্পনা; (৫) সাধারণ জনগণের ইতিবাচক ধারণা; এবং (৬) কার্যকর সকল পদ্ধতি এবং (৭) উপযুক্ত পরিমাণ আর্থিক ও মানবসম্পদদের সংস্থান।

এ অবস্থায় বাংলাদেশসহ জাতিসংঘের প্রতিটি সদস্য দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠান,বেসরকারি সংগঠন, সিভিলসোসাইটির উচিত বিশ্ব গাইডগুলোর আলোকে নিজস্ব নীতি, নির্দেশনা, আদর্শ দর্শন ও সক্ষমতার ভিত্তিতে উপযুক্ত পরিকল্পনা ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা। উল্লেখ্য, বয়স্কদের জন্য যা কিছু করা প্রয়োজন তা যদি কেবলমাত্র বয়স্কদের উপরে ছেড়ে দেওয়া হয় তাহলে ঠিক হবে না; বরং বৃদ্ধদের নিয়েই বৃদ্ধদের জন্য যা করার তা করতে হবে। মনে রাখতে হবে আজকে যারা বৃদ্ধ একসময় দেশ ও জাতির জন্য তারাই মেধা ও শ্রম দিয়েছেন এবং সুযোগ পেলে এখনো তারা তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারেন। এ লক্ষ্যে অন্তত বয়োবৃদ্ধদের কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য বয়োবৃদ্ধদেরকে কাজে লাগাতে হবে।

লেখক: মো. হুমায়ুন খালিদ, সাবেক সচিব

 

ডাকব্যবস্থার বিবর্তন মানবসভ্যতার অগ্রগতি

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৩৯ অপরাহ্ণ
ডাকব্যবস্থার বিবর্তন মানবসভ্যতার অগ্রগতি

প্রকাশ ঘোষ বিধান

ডাকব্যবস্থার বিবর্তন মানবসভ্যতার অগ্রগতির এক অনবদ্য দলিল। প্রাচীনকালে গুহাচিত্র বা ধোঁয়ার সংকেত থেকে শুরু করে আজকের ডিজিটাল ইমেইল বা ই-কমার্স লজিস্টিকস-যোগাযোগের এই মাধ্যমটি সমাজ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
ডাক ও ডাকব্যবস্থার বিবর্তন মানবসভ্যতার অগ্রগতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সেকালের ডাক ব্যবস্থা আর একালের আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ডাক ব্যবস্থার মাঝে রয়েছে এক বিরাট রূপান্তর। সময়ের বিবর্তনে মানুষের বার্তা পৌঁছানোর মাধ্যম কীভাবে রানার বা ডাকহরকরা থেকে আজকের ডিজিটাল ই-মেইল কিংবা কুরিয়ার সার্ভিসে রূপান্তর হয়েছে, এটি তারই এক বাস্তব চিত্র।

একসময় খবরের প্রধান মাধ্যম ছিল হাতে লেখা চিঠি, যা কাগজে কলমে লিখে পাঠানো হতো। পিঠে চিঠির ব্যাগ, হাতে লণ্ঠন বা বর্ষা নিয়ে মাইলের পর মাইল হেঁটে চিঠি পৌঁছে দিতেন ডাকহরকরা বা রানার। সুকান্ত ভট্টাচার্যের রানার কবিতায় এবং তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাক হরকরা গল্পে তাঁদের এই সংগ্রামী ও রোমাঞ্চকর জীবনের চিত্র ফুটে উঠেছে।

হলুদ খাম, পোস্টকার্ড কিংবা ইনল্যান্ড লেটারে মানুষ তার সুখ-দুঃখের কথা লিখে দূর-দূরান্তে পাঠাত। ডাকপিয়নের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করা এবং চিঠি হাতে পেয়ে অশ্রুবিসর্জন কিংবা আনন্দের প্রকাশ ছিল সেকালের চিরাচরিত দৃশ্য।

রাতের অন্ধকারে ডাক নেওয়ার সময় রানারদের হাতের লণ্ঠনের আলো আর ঝুমঝুম ঘণ্টার আওয়াজ ছিল চেনা দৃশ্য। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চিঠি পৌঁছাতে দিন থেকে সপ্তাহ বা মাস পর্যন্ত সময় লাগত। রানারদেরও আগে রাজা-বাদশাদের আমলে প্রশিক্ষিত পায়রা কিংবা দ্রুতগামী ঘোড়া ব্যবহার করে রাজকীয় বার্তা পাঠানো হতো।

১৭শ ও ১৮শ শতকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সরকারিভাবে ডাক বিভাগ গড়ে ওঠে। ১৬৩৫ সালে ইংল্যান্ডে প্রথম সাধারণ জনগণের জন্য ডাকসেবা উন্মুক্ত করা হয়। ১৮৪০ সালে যুক্তরাজ্যে পেনি ব্ল্যাক প্রবর্তনের মাধ্যমে ডাকব্যবস্থায় বিপ্লব আসে। এর ফলে চিঠি পাঠানোর খরচ সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে চলে আসে।

আধুনিক প্রযুক্তির প্রভাবে ইন্টারনেট, ই-মেইল, স্মার্টফোন এবং ম্যাসেজিং অ্যাপের যুগে কাগজের চিঠির প্রচলন প্রায় হারিয়ে গেছে। অনেক ডাকঘর এখন আধুনিক পাকা ভবনে রূপান্তরিত হয়েছে, অনেক স্থানে সোলার প্যানেল ও ডিজিটাল সেবা চালু হয়েছে। শুধু চিঠি নয়, বর্তমানে ডাক বিভাগ পার্সেল আদান-প্রদান, ই-কমার্স ডেলিভারি, মানি অর্ডার এবং ব্যাংকিং সেবা দিয়ে থাকে।

রানারদের সেই পায়ে হাঁটা রূপ আজ রূপ নিয়েছে মোটর সাইকেল, ট্রাক ও কার্গোবাহী আধুনিক কুরিয়ার সার্ভিসে। সময়ের পরিবর্তনে চিরাচরিত রানার বা হাতে লেখা চিঠির রূপ বদলালেও, দাপ্তরিক ও জরুরি পার্সেল আদান-প্রদানে ডাকঘর এখনো তার নিজস্ব প্রয়োজনীয়তা নিয়ে টিকে আছে।

সময়ের সাথে সাথে যোগাযোগের গতি বাড়লেও হারিয়ে গেছে চিঠির সেই পুরোনো সুবাস আর রানারের ঘণ্টার চিরচেনা আওয়াজ। প্রযুক্তির এই রূপান্তর মানুষের জীবনকে করেছে অনেক বেশি গতিশীল ও সহজ।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

বিশ্ব ডাক দিবস: চিঠির সীমানা ভূবনজুড়ে

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৩৪ অপরাহ্ণ
বিশ্ব ডাক দিবস: চিঠির সীমানা ভূবনজুড়ে

সাকিবুর রহমান বাবলা

৯ অক্টোবর বিশ্ব ডাক দিবস পালিত হয়। ১৮৭৪ সালের এই দিনে সুইজারল্যান্ডের বার্নে প্রতিষ্ঠিত হয় ইউনিভার্সাল পোস্টাল ইউনিয়নÑআন্তর্জাতিক ডাক যোগাযোগকে একটি অভিন্ন কাঠামোর মধ্যে আনার ঐতিহাসিক উদ্যোগ। ১৯৬৯ সালে জাপানের টোকিওতে অনুষ্ঠিত ইউপিইউ কংগ্রেসে ৯ অক্টোবরকে প্রথমে ইউপিইউ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়; ১৯৮৪ সালে এর নাম পরিবর্তন করে বিশ্ব ডাক দিবস করা হয়। দিবসটির মূল লক্ষ্য হলো মানুষের দৈনন্দিন জীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য, সামাজিক সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে ডাকব্যবস্থার অবদানকে তুলে ধরা।

ডাকব্যবস্থার ইতিহাস মূলত মানুষের দূরত্ব জয় করার ইতিহাস। আধুনিক যোগাযোগ প্রযুক্তির আবির্ভাবের বহু আগে সংবাদ, ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রশাসনিক নির্দেশ, ব্যবসায়িক নথি ও রাষ্ট্রীয় বার্তা পৌঁছে দেওয়ার প্রধান মাধ্যম ছিল চিঠি। বাংলার ডাকব্যবস্থার ঐতিহ্যেও রয়েছে ‘রানার’ বা ডাকহরকরার স্মৃতিÑদুর্গম পথ পেরিয়ে মানুষের কাছে সংবাদ পৌঁছে দেওয়ার সেই শ্রমনির্ভর সংস্কৃতি আজও আমাদের সাহিত্য ও লোকস্মৃতিতে জীবন্ত। প্রযুক্তির অগ্রযাত্রায় সেই রানারের জায়গা নিয়েছে মোটরযান, আধুনিক পরিবহন, ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও ই-কমার্স লজিস্টিকস; কিন্তু মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগ স্থাপনের মৌলিক দায়িত্বটি বদলায়নি।

বিশ্বপরিসরে ইউপিইউ ডাক যোগাযোগের ক্ষেত্রে একটি অভিন্ন আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। বিশ্ব ডাক দিবস তাই শুধু পুরোনো চিঠি বা ডাকটিকিটের স্মৃতিচারণ নয়; এটি যোগাযোগের সার্বজনীন অধিকার, সেবা-প্রাপ্তির সুযোগ এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির কথাও মনে করিয়ে দেয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ উপলক্ষে নতুন ডাকটিকিট ও পণ্য প্রকাশ, ডাকটিকিট প্রদর্শনী, উন্মুক্ত দিবস, কর্মীদের সম্মাননা এবং তরুণদের চিঠি লেখার মতো আয়োজন করা হয়। ইউপিইউ-এর আন্তর্জাতিক চিঠি লেখার প্রতিযোগিতাও শিশু-কিশোরদের সৃজনশীলতা ও লেখার দক্ষতা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বাংলাদেশের ইতিহাসেও ডাকব্যবস্থা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, জাতীয় পরিচয় ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অংশ। ১৯৭১ সালের ২৯ জুলাই মুজিবনগর সরকারের উদ্যোগে আটটি স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গঠনে প্রতীকী ভূমিকা রাখে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ ডাকব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। পরবর্তীকালে ডাকটিকিটে ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, জাতীয় ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের স্মৃতি ধারণ করা হয়েছে। ডাক অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ডাকটিকিট এখন শুধু ডাকমাশুলের প্রতীক নয়; ফিলাটেলির মাধ্যমে এগুলো ইতিহাস ও জাতীয় ঐতিহ্যেরও দলিল হয়ে উঠেছে।

বর্তমান বাংলাদেশে ডাকব্যবস্থার পরিধি চিঠির গ-ি ছাড়িয়ে বহুমুখী সেবায় বিস্তৃত। চিঠি ও নথিপত্রের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি পার্সেল, এক্সপ্রেস মেইল, ইএমএস, ইলেকট্রনিক মানি ট্রান্সফার, পোস্টাল ক্যাশ কার্ড, সঞ্চয় ও বীমাসংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা এর আওতায় রয়েছে। ডাক অধিদপ্তরের অনলাইন ব্যবস্থায় পোস্টকোড অনুসন্ধান, ইএমএস ট্র্যাকিং এবং অন্যান্য ই-সেবাও রয়েছে।

বিশ্ব ডাক ইতিহাসে দীর্ঘ বিলম্বে চিঠি পৌঁছানোর ঘটনাও বিস্ময়কর। ফ্রান্সে ১৮৭৭ সালে পাঠানো একটি চিঠি ২০১৫ সালে গন্তব্যে পৌঁছেÑপ্রায় ১৩৮ বছর পর; এটি দীর্ঘতম বিলম্বের উল্লেখযোগ্য অনানুষ্ঠানিক ঘটনা। অন্যদিকে, গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস অনুযায়ী, ১৯১৯ সালে যুক্তরাজ্যের ডরসেট থেকে পাঠানো একটি চিঠি ৮৯ বছর পর, ২০০৮ সালে পৌঁছে অফিসিয়াল রেকর্ড গড়ে। এছাড়া ১৯১৬ সালে লন্ডন থেকে পাঠানো একটি চিঠি প্রায় ১০৫ বছর পর এবং ১৯৬৬ সালে মন্ট ব্লাঙ্কে বিমান দুর্ঘটনার পর হারিয়ে যাওয়া কূটনৈতিক ডাকের একটি ব্যাগ ৪৬ বছর পর, ২০১২ সালে হিমবাহ থেকে উদ্ধার হয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে। এসব ঘটনা ডাকব্যবস্থার ইতিহাসে সময়, প্রযুক্তি ও মানুষের স্মৃতির এক বিস্ময়কর অধ্যায় হয়ে আছে।

ডিজিটাল যুগে প্রশ্ন উঠতে পারেÑই-মেইল, মেসেজিং অ্যাপ ও তাৎক্ষণিক অনলাইন যোগাযোগের সময়ে ডাকব্যবস্থার প্রয়োজন কতটা? বাস্তবতা হলো, ডাকব্যবস্থা বিলীন হয়নি; বরং তার ভূমিকা পরিবর্তিত হয়েছে। ই-কমার্সের পণ্য সরবরাহ, সরকারি ও বাণিজ্যিক নথি, পার্সেল, আর্থিক সেবা এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে রাষ্ট্রের সংযোগে এর প্রয়োজনীয়তা এখনো প্রবল। ডিজিটাল বিভাজনের কারণে যাঁরা অনলাইন অবকাঠামোর পূর্ণ সুবিধা পান না, তাঁদের কাছেও ডাকঘর একটি গুরুত্বপূর্ণ জনসেবা কেন্দ্র।

অতএব, বিশ্ব ডাক দিবসের তাৎপর্য অতীতের চিঠির আবেগে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি পুরোনো প্রতিষ্ঠানকে নতুন প্রযুক্তি, নতুন অর্থনীতি ও নতুন নাগরিক প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলার আহ্বান। বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন ডাকঘরগুলোকে আরও প্রযুক্তিনির্ভর, দ্রুত, স্বচ্ছ, নিরাপদ ও গ্রাহকবান্ধব করা; একই সঙ্গে গ্রাম ও শহরের মধ্যে সেবার বৈষম্য কমানো। রানারের ঐতিহ্য থেকে ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের যুগে পৌঁছানো ডাকব্যবস্থা প্রমাণ করেছেÑপ্রযুক্তি মাধ্যম বদলায়, কিন্তু মানুষের সংযোগের প্রয়োজন কখনো শেষ হয় না।