আখলাকুর রহমান
ধরুন একটি সকাল। শীতের কুয়াশা তখনও কাটেনি সম্পূর্ণ। আপনার ছোট্ট সন্তানটি ঘুম থেকে উঠে বাথরুমে গিয়েছে, প্রতিদিনের মতোই ব্রাশ হাতে নিয়েছে, টুথপেস্ট লাগিয়েছে, দাঁত মেজেছে। আপনি রান্নাঘরে ব্যস্ত, চা বসিয়েছেন, ভাবছেন আজকের দিনটা কেমন যাবে। কিছুদিন পর লক্ষ করলেন সন্তানটির পেটে মাঝেমধ্যেই ব্যথা হয়, খাবারে অরুচি, কখনো কখনো ত্বকে র্যাশ দেখা দেয়। ডাক্তারের কাছে ছোটাছুটি করলেন। নানারকম পরীক্ষা হলো। শেষে যে কারণটি বের হলো তা শুনে আপনি হয়তো বিশ্বাসই করতে পারবেন না প্রথমে। ডাক্তার বললেন, প্রতিদিন সকালে যে টুথপেস্টটি সে ব্যবহার করছে, তার ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক অদৃশ্য শত্রু। নাম তার মাইক্রোপ্লাস্টিক।
এই গল্পটি কল্পনা নয়। আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন, প্রতিদিন সকালে ও রাতে যে পেস্টটুকু আপনি নিজের ও সন্তানের ব্রাশে তুলে দিচ্ছেন, তার ভেতরে আসলে কী আছে? সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে বাজারে প্রচলিত অসংখ্য টুথপেস্টে অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা মিশে থাকে, যাদের বলা হয় মাইক্রোবিডস বা মাইক্রোপ্লাস্টিক। এই কণাগুলো এত ছোট যে খালি চোখে দেখা যায় না, অথচ প্রতিদিন দুবেলা এগুলো আমাদের মুখগহ্বরে প্রবেশ করছে, রক্তে মিশছে, শরীরের ভেতরে জমা হচ্ছে। শিশুদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি, কারণ তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তখনও পূর্ণাঙ্গভাবে গড়ে ওঠেনি।
মাইক্রোপ্লাস্টিক আসলে কী, আর কেন তা এত বিপজ্জনক?
মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো পাঁচ মিলিমিটারের চেয়েও ছোট প্লাস্টিক কণা। টুথপেস্ট প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো একসময় দাঁত পরিষ্কারের ক্ষমতা বাড়াতে এবং টুথপেস্টের গঠন আকর্ষণীয় করতে এই পলিইথিলিন কণা ব্যবহার শুরু করেছিল। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, যে জিনিস আমরা খাই না অথচ প্রতিদিন মুখে নিয়ে কুলকুচি করি, তা যদি অংশত গিলেই ফেলি, তবে কী হতে পারে? গবেষকরা দেখেছেন এই কণাগুলো দাঁতের ফাঁকে, মাড়ির কিনারে আটকে মাড়ির প্রদাহ ঘটায়, দাঁতের ক্ষয় বাড়িয়ে দেয়। গিলে ফেলা কণাগুলো পাকস্থলীতে গিয়ে হজমে ব্যাঘাত ঘটায়, অন্ত্রের স্বাভাবিক ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য নষ্ট করে। দীর্ঘমেয়াদে এই প্লাস্টিক কণা হরমোনজনিত সমস্যা, প্রদাহজনিত রোগ, এমনকি রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণ হতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
শিশুরা প্রতিদিন গড়ে দুবার ব্রাশ করে, বছরে প্রায় সাতশো বার। এই সাতশো বারের প্রতিবারে সামান্য পরিমাণ প্লাস্টিক যদি শরীরে প্রবেশ করে, বছর শেষে তার পরিমাণটা কি সত্যিই নগণ্য থাকে? আমরা যারা অভিভাবক, আমরা প্রতিদিন সন্তানকে যতœ করে খাওয়াই, রোদ থেকে বাঁচাই, অসুখ হলে ছুটে যাই ডাক্তারের কাছে, তবে প্রতিদিন সকালে যে টিউব থেকে পেস্ট বের করে দিচ্ছি সন্তানের ব্রাশে, তার উপাদান নিয়ে আমরা কি কখনো প্রশ্ন তুলেছি?
উত্তরটা হলো, না। মানুষ বহু হাজার বছর ধরে দাঁতের পরিচর্যা করে আসছে ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে। প্রাচীন মিশরীয়রা প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগে এক ধরনের গুঁড়ো তৈরি করত, যাতে থাকত ষাঁড়ের খুরের ছাই, পোড়া ডিমের খোসা এবং ঝামা পাথরের গুঁড়ো। প্রাচীন গ্রিক ও রোমানরা দাঁত পরিষ্কারের জন্য ব্যবহার করত হাড়ের গুঁড়ো এবং ঝিনুকের খোসা। ভারতীয় উপমহাদেশে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসাশাস্ত্রে নিম, বাবলা এবং বিভিন্ন গাছের ছাল দিয়ে দাঁত মাজার প্রচলন ছিল বহু শতাব্দী ধরে।
তাহলে মাইক্রোপ্লাস্টিক কীভাবে ঢুকে পড়ল আমাদের দৈনন্দিন জীবনে?
আধুনিক টুথপেস্টের যাত্রা শুরু হয় উনিশ শতকে, চক পাউডার, সাবান ও নানারকম প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ফ্লোরাইড যুক্ত হলো, দাঁতের ক্ষয় রোধে যা কার্যকর প্রমাণিত হলো। কিন্তু এরপর বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো টুথপেস্টকে করে তুলল আরও রঙিন, আরও সুগন্ধি, আরও চকচকে। প্রশ্ন হলো, এই চকচকে ভাব আনতে গিয়ে আমরা কি আসলে স্বাস্থ্যের বিনিময়ে সৌন্দর্য কিনে নিলাম?
আমাদের দাদা পরদাদার আমলে টুথপেস্টের প্রচলন ছিল না বললেই চলে। গ্রামবাংলার মানুষ দাঁত মাজত নিমের ডাল দিয়ে। ভোরবেলা উঠে নিমগাছ থেকে একটি সরু ডাল ভেঙে তার আগা চিবিয়ে ব্রাশের মতো তৈরি করে দাঁত মাজতেন তারা। নিমের রয়েছে প্রাকৃতিক জীবাণুনাশক গুণ, যা মুখগহ্বরের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করত। অনেকে ব্যবহার করতেন কাঠ কয়লার গুঁড়ো, যা দাঁতের হলদেটে দাগ তুলতে সাহায্য করত। কেউ কেউ সরিষার তেলের সঙ্গে সামান্য লবণ মিশিয়ে আঙুল দিয়ে মাড়িতে মালিশ করতেন, যা মাড়ি শক্ত করত এবং দাঁতের গোড়া মজবুত রাখত।
মধ্যপ্রাচ্যে এবং মুসলিম বিশ্বে বহু শতাব্দী ধরে প্রচলিত ছিল মেসওয়াক বা দাঁতনের ব্যবহার। আরাক গাছের শিকড় বা ডাল থেকে তৈরি এই মেসওয়াকে প্রাকৃতিকভাবেই থাকে ফ্লোরাইড, ট্যানিন এবং জীবাণুনাশক উপাদান। তাহলে প্রশ্ন জাগে, আধুনিক বিজ্ঞান যে ফ্লোরাইডকে টুথপেস্টে রাসায়নিকভাবে যোগ করছে, তা কি প্রকৃতি বহু আগেই একটি সাধারণ গাছের ডালে দিয়ে রেখেছিল?
তবে কি আমাদের পূর্বপুরুষদের দাঁত সত্যিই বেশি মজবুত ছিল?
প্রবীণদের মুখে এখনো শোনা যায়, আশি নব্বই বছর বয়সেও তাদের বাবা দাদারা শক্ত সুপারি চিবিয়ে খেতেন, দাঁত পড়ত না সহজে। তাহলে কারণটা কী? শুধুই প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার, নাকি তাদের খাদ্যাভ্যাসও এর পেছনে ভূমিকা রেখেছিল? চিনিযুক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার তখন ছিল না বললেই চলে, আঁশযুক্ত খাবার বেশি খাওয়া হতো, যা দাঁত ও মাড়ি প্রাকৃতিকভাবে পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করত।
প্রশ্ন হলো, আমরা কি আবার সম্পূর্ণভাবে সেই পুরনো অভ্যাসে ফিরে যাব? বাস্তবতা হলো আধুনিক জীবনযাত্রায় সম্পূর্ণভাবে ফিরে যাওয়া কঠিন, তবে কিছু অভ্যাস কি আমরা চাইলেই মিশিয়ে নিতে পারি না দৈনন্দিন জীবনে? বাজারে এখন মাইক্রোপ্লাস্টিকমুক্ত টুথপেস্ট পাওয়া যায়, প্যাকেটের গায়ে খুঁজে দেখা যেতে পারে পলিইথিলিন বা মাইক্রোবিড উপাদান আছে কিনা। সপ্তাহে দুই একদিন নিমের ডাল বা মেসওয়াক ব্যবহার করলে কি ঐতিহ্যকে ধরে রাখার পাশাপাশি মুখগহ্বরের স্বাস্থ্যও রক্ষা করা যায় না? শিশুদের ছোটবেলা থেকেই আঁশযুক্ত ফলমূল ও সবজি খাওয়ার অভ্যাস করানো গেলে তাদের দাঁত ও মাড়ি কি স্বাভাবিকভাবেই মজবুত থাকবে না?
আমরা যা কিছু আমাদের সন্তানের মুখে তুলে দিচ্ছি, তার প্রতিটি উপাদান সম্পর্কে জানার অধিকার কি আমাদের নেই? টুথপেস্টের প্যাকেটের গায়ে লেখা উপাদানের তালিকাটুকু কি একবার পড়ে দেখা যায় না? শুধু বিজ্ঞাপনের চাকচিক্যে মুগ্ধ না হয়ে প্রশ্ন তোলা কি উচিত নয়, এই পেস্ট আসলে কী দিয়ে তৈরি?
সেই সকালের গল্পে ফিরে আসি। যে মা তার সন্তানের অসুখের কারণ খুঁজে পেয়েছিলেন টুথপেস্টে, তিনি সেদিন থেকে বদলে ফেলেছিলেন তাদের দৈনন্দিন অভ্যাস। ঘরে ফিরিয়ে এনেছিলেন নিমের ডাল, বেছে নিয়েছিলেন সতর্কতার সঙ্গে টুথপেস্ট। প্রকৃতি আমাদের যা দিয়েছে, তা কি সত্যিই ফেলনা? আধুনিকতাকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান নয়, বরং প্রাচীন প্রজ্ঞা আর বর্তমান বিজ্ঞানকে একসঙ্গে মিলিয়ে চলাই কি হতে পারে না প্রকৃত সমাধান? আমাদের সন্তানদের জন্য এই সচেতনতা আজই কি জরুরি নয়, কালকের অপেক্ষায় থাকলে হয়তো দেরি হয়ে যাবে বলে?
লেখক : একজন উদ্যোক্তা