সচ্চিদানন্দ দে সদয়
উনিশ শতকের বাংলা ছিল এক গভীর বৈপরীত্যের সময়। একদিকে ঔপনিবেশিক শাসনের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে গ্রামবাংলার অভ্যন্তরে জমিদারি শোষণ, নীলকরদের নির্যাতন এবং সাধারণ মানুষের নিঃশব্দ যন্ত্রণা। এই দুই বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে কিছু মানুষ সময়কে শুধু দেখেননি, তারা সময়কে প্রশ্ন করেছেন, পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছেন। সেই বিরল মানুষের মধ্যে অন্যতম কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার-গ্রামীণ সাংবাদিকতার এক অগ্রগামী কণ্ঠ।
কুষ্টিয়ার কুমারখালীর এক দরিদ্র পরিবারে ১৮৩৩ সালে তাঁর জন্ম। জীবনের শুরু থেকেই দারিদ্র্য ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। শৈশবে কুমারখালী বাজারের একটি কাপড়ের দোকানে সামান্য মজুরিতে কাজ করতে হয়েছে তাঁকে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ সীমিত হলেও জ্ঞানার্জনের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল গভীর ও অবিচল।
এই আত্মশিক্ষার পথই তাঁকে পরিণত করে এক স্বতন্ত্র চিন্তাশীল মানুষে, যিনি পরবর্তীতে সমাজ ও সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক অনন্য অবস্থান তৈরি করেন। তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় নীলকুঠিতে শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা। সেখানে তিনি সরাসরি দেখেন কৃষক-রায়তদের ওপর নীলকরদের নির্মম অত্যাচার, জমিদারদের দমননীতি এবং সাধারণ মানুষের অসহায়তা। এই বাস্তবতা তাঁর ভেতরে এক গভীর নৈতিক প্রশ্ন তৈরি করে-এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে কি কেউ কথা বলবে না? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তিনি বেছে নেন সাংবাদিকতার পথ। ১৮৬৩ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’।
এটি শুধু একটি সংবাদপত্র ছিল না; এটি ছিল এক সামাজিক বিপ্লবের মাধ্যম। কলকাতাকেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যমের বাইরে দাঁড়িয়ে এই পত্রিকা প্রথমবারের মতো গ্রামবাংলার বাস্তবতাকে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে আনার চেষ্টা করে। গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকায় উঠে আসত কৃষকের দুর্দশা, শ্রমজীবী মানুষের বঞ্চনা, জমিদারদের শোষণ এবং নীলকরদের অত্যাচারের বিবরণ। সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে এটি ছিল অত্যন্ত সাহসী ও ঝুঁকিপূর্ণ উদ্যোগ। কারণ, সরাসরি ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে কথা বলা মানে ছিল বিপদের মুখোমুখি হওয়া।
এই সাহসের মূল্যও তাঁকে দিতে হয়েছে। তাঁর মুদ্রণযন্ত্র বাজেয়াপ্ত করা হয়, পত্রিকা বন্ধের চাপ আসে, আর্থিক সংকট তীব্র হয়ে ওঠে। এক পর্যায়ে তিনি চরম নিঃস্বতায় পতিত হন। তবুও তিনি থামেননি। স্থানীয় সমাজের সহায়তায় প্রেস পুনরুদ্ধার হলেও তাঁর জীবন ক্রমেই দারিদর্্েযর গভীরে নিমজ্জিত হতে থাকে। এই নিঃস্বতাই তাঁকে ইতিহাসে “কাঙ্গাল” পরিচয়ে চিহ্নিত করে দেয়। তবে হরিনাথ কেবল সাংবাদিক ছিলেন না। তিনি ছিলেন সাহিত্যিক, সমাজচিন্তক এবং সংগীতসাধক।
তাঁর লেখা উপন্যাস ‘বিজয় বসন্ত’, বিভিন্ন প্রবন্ধ ও রচনায় সমাজের বাস্তবতা ও মানবিক বোধের গভীর প্রতিফলন পাওয়া যায়। তিনি প্রায় এক হাজার বাউল গান রচনা করেন, যেখানে মানবতাবাদ, আধ্যাত্মিকতা এবং সমাজচেতনার মিশ্রণ লক্ষ করা যায়। তিনি লালন শাহের দর্শনের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত ছিলেন। বাউল চিন্তায় তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন মানুষের ভেতরের সত্য, যা ধর্মীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে। তাঁর গান ও চিন্তায় ঈশ্বরের চেয়ে মানুষ বড় হয়ে উঠেছে। এই মানবতাবাদী দর্শনই তাঁকে কেবল একজন সাংবাদিক নয়, বরং একজন দার্শনিক চিন্তাবিদে পরিণত করেছে। তাঁর সমাজচিন্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল শিক্ষা।
১৮৫৪ সালে তিনি কুমারখালীতে একটি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। সেই সময়ের সমাজে নারীশিক্ষা ছিল অত্যন্ত সংবেদনশীল ও অনেক ক্ষেত্রে বিরোধিতার বিষয়। তবুও তিনি বিশ্বাস করতেন, নারীকে শিক্ষিত না করলে সমাজ কখনো পূর্ণতা পাবে না। এই উদ্যোগ তাঁকে নারীশিক্ষার অগ্রদূতদের একজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। হরিনাথের সাংবাদিকতা ও সমাজসংস্কার কখনো আলাদা ছিল না। তাঁর কাছে সংবাদপত্র ছিল সমাজের আয়না, আর সমাজ ছিল তাঁর লেখার প্রধান বিষয়।
‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ ছিল এক অর্থে প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর। যেখানে কেন্দ্র নয়, প্রান্তই ছিল আলোচনার মূল জায়গা। এই পত্রিকা দেখিয়ে দিয়েছিল, সাংবাদিকতা কেবল শহরকেন্দ্রিক অভিজাত চর্চা নয়; বরং গ্রাম থেকেও জাতীয় চেতনা তৈরি করা সম্ভব। আজকের ভাষায় যাকে বলা হয় “গ্রাসরুট জার্নালিজম”, তার অন্যতম প্রাথমিক উদাহরণ এই পত্রিকা। তাঁর সাংবাদিকতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল নৈতিক অবস্থান।
তিনি কখনো নিরপেক্ষতার নামে অন্যায়ের পাশে দাঁড়াননি। বরং তিনি বিশ্বাস করতেন-অন্যায়ের সামনে নীরবতা নিজেই এক ধরনের পক্ষপাত। এই অবস্থান তাঁকে বারবার বিপদের মুখে ফেলেছে। মুদ্রণযন্ত্র বাজেয়াপ্ত হওয়া, আর্থিক সংকট, সামাজিক চাপ-সবকিছু মিলিয়ে তাঁর জীবন ছিল এক অবিরাম সংগ্রাম। কিন্তু এই সংগ্রামই তাঁকে ইতিহাসে অমর করে রেখেছে। ১৮৯৬ সালের ১৬ এপ্রিল তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
জীবনের শেষ দিনগুলো তিনি কাটান তাঁর জন্মস্থান কুমারখালীতেই। মৃত্যুর পর তাঁকে তাঁর নিজ গৃহেই সমাহিত করা হয়। আজও সেই স্থান ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বর্তমানে কুমারখালীতে তাঁর স্মৃতিরক্ষায় কাঙ্গাল কুঠি এবং কাঙ্গাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘর গড়ে তোলা হয়েছে। সেখানে সংরক্ষিত রয়েছে তাঁর ব্যবহৃত মুদ্রণযন্ত্র, ধাতব টাইপ, পত্রিকার ঐতিহাসিক দলিল এবং নানা স্মারক।
এগুলো কেবল বস্তু নয়, বরং একটি যুগের সাক্ষ্য। তবে প্রশ্ন হলো-শুধু স্মৃতি সংরক্ষণ কি যথেষ্ট? নাকি তাঁর আদর্শকে বর্তমান জীবনে ধারণ করাই আসল দায়িত্ব? আজকের সাংবাদিকতা অনেক বেশি প্রযুক্তিনির্ভর, দ্রুত এবং বিস্তৃত। তথ্য এখন মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু একই সঙ্গে সাংবাদিকতা আজ নানা সংকটে জর্জরিত-ভুয়া তথ্যের বিস্তার, করপোরেট প্রভাব, রাজনৈতিক চাপ এবং বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট।
এই বাস্তবতায় কাঙ্গাল হরিনাথের জীবন নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। কারণ তিনি আমাদের শেখান-সাংবাদিকতা মানে ক্ষমতার পাশে থাকা নয়, বরং সত্যের পাশে দাঁড়ানো। সাংবাদিকতা মানে কেবল তথ্য পরিবেশন নয়, বরং নৈতিক অবস্থান গ্রহণ। সাংবাদিকতা মানে প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠা। তিনি দেখিয়ে গেছেন, গ্রাম থেকেও জাতীয় চেতনা তৈরি করা যায়। কলম হতে পারে প্রতিরোধের অস্ত্র। আর একজন মানুষ চাইলে পুরো সমাজের চেতনায় আলো জ্বালাতে পারেন। তাঁর জীবন আমাদের আরও একটি গভীর সত্য মনে করিয়ে দেয়-সত্য বলা সহজ নয়, কিন্তু সেটিই সবচেয়ে জরুরি।
আর সেই সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে হলে প্রয়োজন সাহস, ত্যাগ এবং মানবিক দায়বদ্ধতা। কাঙ্গাল হরিনাথ তাই কেবল ইতিহাসের একটি নাম নন। তিনি একটি চলমান প্রশ্ন, একটি নৈতিক মানদ- এবং একটি চেতনা। তিনি বেঁচে আছেন প্রতিটি সেই লেখায়, যেখানে সত্য উচ্চারিত হয়; প্রতিটি সেই কণ্ঠে, যেখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ওঠে; এবং প্রতিটি সেই বিবেকে, যা ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেয়।
লেখক: সংবাদকর্মী