কাজের খোঁজে অনিশ্চয়তায় কয়রার যুবসমাজ, টিটিসি স্থাপনে ঘুচতে পারে বেকারত্ব
0-3840x2160-0-0-{}-0-12#
কয়রা (খুলনা) প্রতনিধি: খুলনার উপকূলীয় উপজেলা কয়রায় বেকারত্ব সমস্যা দিন দিন তীব্র আকার ধারণ করছে। বারবার আঘাত হানা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত এই দুর্গম অঞ্চলে কর্মসংস্থানের অভাবে স্থানীয় বাসিন্দারা চরম অভাব-অনটনে দিন কাটাচ্ছেন। বিশেষ করে তরুণ ও যুবসমাজ কাজের অভাবে গভীর অনিশ্চয়তায় ভুগছে, যা এলাকায় সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা বাড়িয়ে তুলছে। এমন পরিস্থিতিতে এলাকায় আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে কয়রায় একটি সরকারি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) স্থাপনের দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সুন্দরবনসংলগ্ন কয়রা উপজেলা ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে থাকা একটি এলাকা। এখানকার অধিকাংশ মানুষের জীবিকা কৃষি, মৎস্য ও সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। তবে ফসলি জমিতে নোনাপানির ঘেরের আধিক্যের কারণে এখন কর্মসংস্থানের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। ফলে জীবিকার তাগিদে বছরের একটি বড় সময় এ অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষকে অন্য জেলার ইটভাটায় শ্রমিকের কাজ করতে যেতে হয়। এতে বিঘিœত হচ্ছে সন্তানদের পড়াশোনা, অনেকেই ঝরে পড়ছে বিদ্যালয় থেকে। অন্যদিকে, কর্মসংস্থানের অভাবে উচ্চশিক্ষিত বহু নারী-পুরুষকেও এখানে দিনমজুরের কাজ করতে হচ্ছে। উপযুক্ত কাজের অভাবে যুবসমাজের একটি বড় অংশ বেকারত্বের অভিশাপ নিয়ে মাদক ও জুয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ছে।
স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, উপজেলাটিতে কোনো সরকারি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নেই। ফলে ডিপ্লোমা কোর্স সম্পন্নকারী কিংবা অনার্স-মাস্টার্স পাস করা শিক্ষার্থীরাও ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছেন না। তাত্ত্বিক জ্ঞান থাকলেও বাস্তবমুখী দক্ষতার অভাবে তারা চাকরির বাজারে পিছিয়ে পড়ছেন, বঞ্চিত হচ্ছেন আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ থেকেও।
বাংলাদেশ মানবাধিকার ব্যুরো কয়রা উপজেলা শাখার সহসভাপতি জি এম মোনায়েম বলেন, “কয়রার মতো দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় বেকারত্ব এখন মানবিক সংকটে পরিণত হয়েছে। কর্মসংস্থানের অভাবে মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ কাজে লিপ্ত হচ্ছে এবং শিশুশ্রম বাড়ছে।”
এদিকে, উপকূল ও সুন্দরবন সংরক্ষণ আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম একটি ভিন্ন ও গুরুত্বপূর্ণ সংকটের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দুর্যোগের কারণে প্রতি বছরই কয়রায় বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করতে হয়। কিন্তু এসব কাজে মাটির কাটার জন্য স্কেভেটর কিংবা কার্পেটিং সড়ক নির্মাণের রোলার চালক ও দক্ষ কর্মী বাইরে থেকে আনতে হয়। অথচ প্রশিক্ষণের অভাবে স্থানীয় মানুষ কর্মহীন বসে আছেন। তাঁর মতে, “কয়রাতেই যদি স্কেভেটর ও রোলার ড্রাইভিং, গাড়ি মেরামত কিংবা আইটি খাতের ওপর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যায়, তবে স্থানীয় যুবকদের কর্মসংস্থান যেমন হবে, তেমনি দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্গঠনের কাজও দ্রুত ও কম খরচে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।”
কয়রা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ইমতিয়াজ উদ্দিন জানান, দুর্যোগ ও লবণাক্ততার কারণে কৃষি ও মৎস্য খাত বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পরিবারগুলো টেকসই আয়ের পথ হারিয়েছে। প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ এলাকা ছেড়ে ইটভাটা ও বঙ্গোপসাগর কেন্দ্রিক অস্থায়ী শ্রমিকের কাজে চলে যাওয়ায় পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে এবং শিশুরা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
তবে আশার কথা শুনিয়েছেন কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)। তিনি জানান, কয়রায় কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের প্রাথমিক কার্যক্রম ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলার লক্ষ্যে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) কর্মকর্তারা সম্ভাব্য স্থান পরিদর্শন করেছেন।
স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, “উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর টেকসই উন্নয়নের জন্য সরকার বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। কয়রায় একটি টিটিসি স্থাপনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। দক্ষ জনশক্তি গড়তে এই প্রতিষ্ঠানটি ভূমিকা রাখবে এবং এটি চালু হলে স্থানীয় যুবকদের জন্য কর্মসংস্থানের নতুন দুয়ার উন্মোচিত হবে।”
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিএমইটি-এর আওতাধীন ‘উপজেলা পর্যায়ে ৫০টি টিটিসি স্থাপন’ শীর্ষক প্রকল্পের উপ-প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন সম্প্রতি কয়রায় সম্ভাব্য স্থান পরিদর্শন করে এর গুরুত্ব উল্লেখপূর্বক একটি প্রস্তাবনা জমা দিয়েছেন।
প্রস্তাবিত এই কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি স্থাপিত হলে ড্রাইভিং, ইলেকট্রিক্যাল, মেকানিক্যাল, ওয়েল্ডিং, গার্মেন্টস ও নির্মাণসহ বিভিন্ন ট্রেডে যুবকেরা হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ নিতে পারবেন। এতে দেশ ও বিদেশের বাজারে তাঁদের কর্মসংস্থানের সুযোগ যেমন বাড়বে, তেমনি কমবে দারিদ্র্য। এছাড়া দুর্যোগপ্রবণ এলাকা হওয়ায় এই বহুতল ভবনটিকে দুর্যোগের সময়ে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহার করা যাবে, যা স্থানীয় জনগণের জানমালের নিরাপত্তায় বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।









