মো. মামুন হাসান
সুন্দরবনের কাদামাটি মাড়িয়ে যে নৌকাটি নদীতে নামে, তার গন্তব্য হয়তো কোনো চর, কোনো খাল কিংবা ম্যানগ্রোভের গভীর ছায়া। অথচ সেই নৌকার কিনারায় বসে থাকা এক তরুণের স্বপ্নের কোনো ভৌগোলিক সীমানা নেই। তার চোখে হয়তো ভাসছে দুবাইয়ের ঝকঝকে হোটেল, সিঙ্গাপুরের কোনো রিসোর্ট, ইউরোপের পর্যটন নগরী কিংবা সমুদ্রের বুক চিরে চলা একটি ক্রুজ শিপ। স্বপ্নের সবচেয়ে আশ্চর্য ক্ষমতা বোধ হয় এটাই। পা যেখানে থাকে, স্বপ্ন সেখানে আটকে থাকে না। সাতক্ষীরার একটি সাধারণ শ্রেণিকক্ষের জানালা দিয়ে তাকিয়েও একজন তরুণ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আতিথেয়তা শিল্পের দরজা দেখতে পারে। প্রয়োজন শুধু সেই দরজায় পৌঁছানোর মতো শিক্ষা, দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস।
দার্শনিক সেনেকা বলেছিলেন, “ভাগ্য প্রস্তুত মানুষের পক্ষেই অনুকূল।” কথাটি শুধু ব্যক্তিজীবনের জন্য নয়, একটি অঞ্চলের ভবিষ্যতের ক্ষেত্রেও সত্য। সম্ভাবনা কখনো একা ইতিহাস তৈরি করে না। সম্ভাবনাকে চিনতে হয়, দক্ষতাকে তার সঙ্গে যুক্ত করতে হয়, তারপর তাকে অর্থনীতিতে রূপ দিতে হয়। সাতক্ষীরার সামনে আজ সেই কাজটিরই সুযোগ। আমাদের আছে সুন্দরবন। আছে নদী, খাল, চর, গ্রামীণ জীবন, লোকসংস্কৃতি, স্থানীয় খাবার, মানুষের আতিথেয়তা। প্রকৃতি আমাদের হাতে অনেক কিছু তুলে দিয়েছে। কিন্তু প্রকৃতি কখনো নিজে নিজে পর্যটন শিল্প তৈরি করে না। একটি নদী শুধু নদীই থাকে, যতক্ষণ না কেউ তার গল্প বলে। একটি স্থানীয় খাবার শুধু খাবারই থাকে, যতক্ষণ না কেউ তাকে পরিচিতির অংশ করে তোলে। একটি গ্রামের পুরোনো বাড়ি কেবল একটি বাড়ি, যতক্ষণ না কেউ সেখানে একজন ভ্রমণকারীর থাকার অভিজ্ঞতা দেখতে পায়। অর্থাৎ পর্যটনের আসল জাদু চোখে নয়, দৃষ্টিতে।যে চোখ শুধু দেখে, সে সৌন্দর্য উপভোগ করে। যে চোখ প্রশিক্ষিত, সে সৌন্দর্যের ভেতর সম্ভাবনা দেখতে পায়। এই দৃষ্টির নামই ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট। এই শিক্ষা কেবল হোটেলের রিসেপশনে দাঁড়িয়ে অতিথিকে স্বাগত জানানোর শিক্ষা নয়। এটি মানুষকে বোঝার শিক্ষা, সংস্কৃতিকে পড়ার শিক্ষা, সেবাকে শিল্পে পরিণত করার শিক্ষা এবং একটি স্থানকে অভিজ্ঞতায় রূপান্তর করার শিক্ষা।
একজন দক্ষ হসপিটালিটি পেশাজীবীকে কখনো কখনো একই সঙ্গে ব্যবস্থাপক, যোগাযোগকারী, সমস্যার সমাধানকারী, সেবাদাতা এবং উদ্যোক্তা হতে হয়। তাকে হাসিমুখের আড়ালে থাকা অসন্তোষ বুঝতে হয়, অপরিচিত ভাষার ভেতর থেকে প্রয়োজনের কথা শুনতে হয়, প্রযুক্তির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক তৈরি করতে হয়। তাকে জানতে হয়, একজন পর্যটক শুধু একটি বিছানা ভাড়া নেয় না, সে একটি অভিজ্ঞতা কিনে। এ কারণেই পৃথিবীর পর্যটন শিল্পে দক্ষ মানুষের চাহিদা দিন দিন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশের তরুণরা কেন সেই পৃথিবীর অংশ হবে না? আমরা কেন শুধু পর্যটক পাঠাব, পেশাজীবী পাঠাব না? কেন আমাদের তরুণ একজন বিদেশি হোটেলের অতিথি হবে, কিন্তু সেই হোটেলের ম্যানেজার হবে না? কেন সে অন্য দেশের রিসোর্টে ঘুরতে যাবে, কিন্তু নিজের হাতে কোনো রিসোর্ট পরিচালনা করবে না? কেন সে বিদেশি পর্যটনের গল্প শুনবে, কিন্তু একদিন নিজেই সুন্দরবনের গল্প পৃথিবীকে শোনাবে না? এই প্রশ্নগুলোই আজ নতুন করে ভাবতে হবে। বিশেষ করে সাতক্ষীরায়। কারণ সুন্দরবনের পাশে দাঁড়িয়ে আমাদের পর্যটন ভাবনা যদি শুধু পর্যটক আনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে আমরা প্রকৃত সম্ভাবনার অর্ধেকও ব্যবহার করতে পারব না। আমাদের প্রয়োজন এমন একটি প্রজন্ম, যারা সুন্দরবনকে শুধু দেখবে না, বুঝবে।
নদীকে শুধু নদী হিসেবে দেখবে না, পর্যটনপথ হিসেবে ভাববে। স্থানীয় খাবারকে শুধু পারিবারিক রান্না হিসেবে দেখবে না, সম্ভাব্য গ্যাস্ট্রোনমিক ব্র্যান্ড হিসেবে চিনবে। গ্রামের জীবনকে শুধু পশ্চাৎপদতা হিসেবে দেখবে না, সেখানে খুঁজে নেবে গ্রামীণ পর্যটনের নতুন অভিজ্ঞতা। একজন প্রশিক্ষিত তরুণের কাছে একটি গ্রামও হতে পারে একটি গল্প। একটি নৌকাও হতে পারে একটি অভিজ্ঞতা। একটি স্থানীয় খাবারও হতে পারে একটি ব্র্যান্ড। একটি পুরোনো বাড়িও হতে পারে একটি হোমস্টে। একটি লোকউৎসবও হতে পারে একটি পর্যটন পণ্য। এখানেই শিক্ষা বদলে দেয় দৃষ্টিভঙ্গি, আর দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিতে পারে অর্থনীতি।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির।” আজকের শিক্ষার ক্ষেত্রেও ভয়শূন্যতার প্রয়োজন আছে। আমাদের তরুণদের বলতে হবে, পৃথিবী অনেক বড়। নিজের জেলার সীমানা দিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ মাপতে নেই। সাতক্ষীরায় পড়াশোনা করে সাতক্ষীরাতেই কাজ করতে হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। বরং সাতক্ষীরায় শিখে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে নিজের দক্ষতার পরিচয় দেওয়া যায়, এটাই আধুনিক কারিগরি শিক্ষার সৌন্দর্য।
ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট সেই সম্ভাবনার একটি বাস্তব দরজা। একজন শিক্ষার্থী এখানে শুধু একটি ডিপ্লোমা ডিগ্রি অর্জন করে না। সে ভাষা শেখে, যোগাযোগ শেখে, ব্যবস্থাপনা শেখে, সেবার মান শেখে, পর্যটন পণ্য সম্পর্কে ধারণা পায়, মানুষের আচরণ বুঝতে শেখে এবং সবচেয়ে বড় কথা, নিজের চারপাশকে নতুন চোখে দেখতে শেখে। তারপর সেই দক্ষতার গন্তব্য হতে পারে হোটেল, রিসোর্ট, রেস্টুরেন্ট, ট্রাভেল কোম্পানি, এয়ারলাইনস, ক্রুজ শিপ, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান কিংবা নিজের উদ্যোক্তা জীবন।
আমাদের তাই হয়তো প্রশ্নটিও বদলাতে হবে। “এই বিষয়ে পড়লে চাকরি কী?” প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হতে পারে, “এই শিক্ষা আমাদের সন্তানকে কত দূর যেতে শেখাবে?” আর শিক্ষার্থীদেরও শুধু বলতে হবে না, “আমরা কোথায় চাকরি পাব?” তাদের বলতে হবে “আমরা কী তৈরি করতে পারি?” কারণ ভবিষ্যতের পৃথিবী শুধু চাকরিপ্রার্থী তৈরি করবে না। ভবিষ্যৎ চাইবে অভিজ্ঞতা নির্মাতা, সেবা উদ্ভাবক, পর্যটন উদ্যোক্তা এবং দক্ষ পেশাজীবী। সাতক্ষীরার ভবিষ্যৎও সেই পরিবর্তনের বাইরে নয়।
একদিন হয়তো কোনো বিদেশি পর্যটক সুন্দরবনে এসে শুধু বাঘ দেখতে চাইবে না। সে চাইবে নদীর ভোর দেখতে, স্থানীয় খাবারের স্বাদ নিতে, কোনো গ্রামের উঠানে বসে মানুষের গল্প শুনতে, নৌকার মাঝির মুখে নদীর ইতিহাস জানতে। সে হয়তো একটি স্থানীয় উৎসবে অংশ নিতে চাইবে, কোনো পরিবারের রান্নাঘরে গিয়ে ঐতিহ্যবাহী খাবার তৈরির গল্প শুনতে চাইবে। সেই অভিজ্ঞতার প্রতিটি স্তরে যদি সাতক্ষীরার প্রশিক্ষিত তরুণেরা যুক্ত থাকে, তাহলে পর্যটন শুধু পর্যটকের ভ্রমণ থাকবে না, এটি হয়ে উঠবে মানুষের জীবনের সঙ্গে অর্থনীতির সংযোগ।
তখন সুন্দরবন শুধু একটি বন থাকবে না। তার চারপাশে তৈরি হবে দক্ষতার একটি বলয়। সৃষ্টি হবে নতুন কর্মসংস্থান।জন্ম নেবে নতুন উদ্যোক্তা। স্থানীয় সংস্কৃতি পাবে নতুন বাজার। গ্রামীণ জীবন পাবে নতুন মূল্য। আর সবচেয়ে বড় কথা, একটি প্রজন্ম নিজের জন্মভূমির সম্ভাবনাকে নতুন করে চিনতে শিখবে। হয়তো এই পরিবর্তনের শুরু কোনো বিশাল ভবন দিয়ে হবে না। হয়তো শুরু হবে একটি ছোট শ্রেণিকক্ষ থেকে। একটি ল্যাব থেকে। একটি ব্যবহারিক ক্লাস থেকে। একটি ভর্তি ফরম থেকে। অথবা কোনো এক ভোরে, সুন্দরবনের নদীর ধারে দাঁড়িয়ে থাকা এক তরুণের মনে জন্ম নেওয়া একটি অসম্ভব স্বপ্ন থেকে।
কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়, “যে পথে চলে না কেউ, সে পথের পথিক হতে হয়।” পর্যটন শিক্ষার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্যও সম্ভবত এখানেই। প্রচলিত পথের পাশে দাঁড়িয়ে নতুন পথ চিনতে শেখা। সাতক্ষীরা কি শুধু সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার হয়েই থাকবে? নাকি একদিন এটি দক্ষ পর্যটন পেশাজীবী তৈরিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূখন্ড হয়ে উঠবে?
সিদ্ধান্তটি শুধু কোনো প্রতিষ্ঠানের নয়। সিদ্ধান্তটি আমাদেরও। কারণ একটি অঞ্চলের ভবিষ্যৎ শুধু তার নদী, বন কিংবা মাটিতে লেখা থাকে না। ভবিষ্যৎ লেখা থাকে তার তরুণদের চোখে। আর সেই চোখ যদি স্বপ্ন দেখতে শেখে, দক্ষতা অর্জন করতে শেখে এবং নিজের মাটির সম্ভাবনাকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে শেখে, তাহলে সুন্দরবনের কাদামাটি থেকে উঠে আসা একটি নৌকাও একদিন পৃথিবীর বহু দূরের বন্দরে পৌঁছাতে পারে।সেদিন হয়তো আমরা আর প্রশ্ন করব না, সাতক্ষীরার তরুণ কোথায় যাবে। বরং পৃথিবীই প্রশ্ন করবে, সাতক্ষীরার সেই তরুণ কবে আসবে?
লেখক: মো. মামুন হাসান, ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।