সাংবাদিকতার পরিচয় যখন প্রশ্নের মুখে
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
সাংবাদিকতা মানুষের কথা বলার পেশা। অন্যায়, অনিয়ম, দুর্নীতি ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা এবং সত্যকে মানুষের সামনে তুলে ধরাই একজন সাংবাদিকের প্রধান দায়িত্ব। অথচ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই পেশার পরিচয় ব্যবহার করে কিছু মানুষের কর্মকা- সাংবাদিকতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে। বিষয়টি শুধু সাংবাদিক সমাজের জন্য বিব্রতকর নয়, সাধারণ মানুষের কাছেও তৈরি করছে বিভ্রান্তি ও অনাস্থা।
একজন সিনিয়র সাংবাদিকের সঙ্গে আলাপচারিতায় উঠে এসেছে এমনই কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, জেলা ও উপজেলা মিলিয়ে সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহারকারী মানুষের সংখ্যা এখন অনেক। তাঁদের কেউ একসময় কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পেজ খুলে নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিচ্ছেন, আবার কেউ ইউটিউব চ্যানেল খুলেই নিজেকে গণমাধ্যমের মালিক বা সম্পাদক হিসেবে পরিচিত করছেন।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরিÑইউটিউব চ্যানেল, ফেসবুক পেজ বা অনলাইন প্ল্যাটফর্ম চালানো অপরাধ নয়। বরং এসব মাধ্যম বর্তমান সাংবাদিকতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু একটি পেজ বা চ্যানেল খুললেই সাংবাদিক হওয়া যায় না। সাংবাদিকতার জন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষণ, পেশাগত নীতি, তথ্য যাচাইয়ের সক্ষমতা, দায়িত্বশীলতা এবং সর্বোপরি সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা। সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন সাংবাদিকতার পরিচয়কে কেউ ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন।
কথিত আছে, কোনো কোনো ব্যক্তি প্রেসক্লাবে এসে নির্দিষ্ট ব্যক্তির অপেক্ষায় থাকেন, এমনকি তাঁদের সঙ্গে দেখা করতে আসা লোকজনও ভুল করে সাংবাদিকদের কাছে জানতে চানÑ‘অমুক সাংবাদিক কখন আসবেন?’ এতে প্রকৃত সাংবাদিকদের বিব্রত হতে হয়। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে সরকারি দপ্তরে গিয়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি তুলে নিজের গুরুত্ব প্রদর্শনের প্রবণতা। একজন সাংবাদিকের কাজ কর্মকর্তাদের সঙ্গে ছবি তোলা নয়; বরং কর্মকর্তাদের কাছে জনগণের প্রশ্ন তুলে ধরা।
সাংবাদিকের শক্তি তাঁর পরিচয়পত্রে নয়, তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতায়। আরও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ বা সুবিধা নেওয়ার। গ্রামে গিয়ে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখিয়ে টাকা দাবি করা, মাছের ঘের থেকে মাছ নেওয়া কিংবা বিভিন্ন উপহার গ্রহণÑএসব যদি সত্যিই ঘটে থাকে, তাহলে তা সাংবাদিকতা নয়; বরং সাংবাদিকতার পরিচয়কে অপব্যবহার করা। এর দায় কোনোভাবেই গোটা সাংবাদিক সমাজের ওপর চাপানো যায় না।
কারণ, একজন অসৎ মানুষের আচরণ দিয়ে হাজারো সৎ সাংবাদিককে বিচার করা অন্যায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দু-একজনের অপকর্মের প্রভাব পুরো পেশার ওপর পড়ে। একজন সাংবাদিক যখন মাঠে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে চান, তখন সাধারণ মানুষ তাঁকে সন্দেহের চোখে দেখেন।
কেউ ভাবেন, সংবাদ প্রকাশের নামে হয়তো টাকা চাইবেন। কেউ মনে করেন, তাঁর কাছে অভিযোগ করলে সেটিও কোনো একসময় ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহৃত হতে পারে। এই অবিশ্বাস সাংবাদিকতার জন্য ভয়ংকর। একজন প্রকৃত সাংবাদিকের কাছে মানুষের আস্থা সবচেয়ে বড় সম্পদ। সেই আস্থা এক দিনে তৈরি হয় না।
বছরের পর বছর সততা, নিরপেক্ষতা ও দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে একজন সাংবাদিককে তা অর্জন করতে হয়। আবার কয়েকজনের অনৈতিক কর্মকা- সেই অর্জিত আস্থাকে মুহূর্তেই ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এ কারণে সাংবাদিক সমাজের ভেতর থেকেই আত্মশুদ্ধির উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রেসক্লাব কোনো ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তারের জায়গা নয়।
এটি সাংবাদিকদের পেশাগত আলোচনা, মতবিনিময়, প্রশিক্ষণ ও পারস্পরিক সহযোগিতার স্থান। সেখানে কে কোন রাজনৈতিক মতাদর্শের, কে কত বড় গাড়িতে চলেন কিংবা কার সঙ্গে কত বড় কর্মকর্তার ছবি আছেÑএসব দিয়ে সাংবাদিকতার মান নির্ধারিত হওয়ার কথা নয়। একইভাবে সরকারি অফিসেও সাংবাদিকের পরিচয় যেন কখনো চাপ সৃষ্টি বা সুবিধা আদায়ের মাধ্যম না হয়।
সাংবাদিক প্রশ্ন করবেন, তথ্য চাইবেন, নথি যাচাই করবেন এবং প্রয়োজনে কর্তৃপক্ষের বক্তব্যও প্রকাশ করবেন। কিন্তু কোনো কর্মকর্তার ওপর ব্যক্তিগত প্রভাব খাটানো বা ভয় দেখানো সাংবাদিকতার অংশ হতে পারে না। প্রশ্ন হলোÑতাহলে প্রকৃত সাংবাদিক কে? সহজ উত্তর হলো, যিনি সত্য জানার চেষ্টা করেন, তথ্য যাচাই করেন, ভুল হলে সংশোধন করেন, ক্ষমতাবান ও সাধারণ মানুষের জন্য একই মাপকাঠি ব্যবহার করেন এবং নিজের পেশাগত পরিচয়কে ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়ের জন্য ব্যবহার করেন নাÑতিনিই প্রকৃত সাংবাদিকতার চর্চা করেন। সাংবাদিকতার জগতে নতুন মানুষ আসবেন, নতুন প্রযুক্তি আসবে, নতুন মাধ্যম তৈরি হবেÑএটাই স্বাভাবিক।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও সাংবাদিকতার পরিসর বাড়িয়েছে। তাই নতুন প্রজন্মের অনলাইন সাংবাদিকদের সবাইকে এক কাতারে ফেলে দেখা ঠিক হবে না। অনেক তরুণ সাংবাদিক অত্যন্ত নিষ্ঠা ও সাহসের সঙ্গে কাজ করছেন। তাঁদের কাজকে উৎসাহ দেওয়া প্রয়োজন। তবে একই সঙ্গে পেশার নামে যারা ভয় দেখান, সুবিধা নেন কিংবা সাংবাদিকতার পরিচয়কে ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করেন, তাঁদের বিরুদ্ধে সাংবাদিক সমাজকেই সোচ্চার হতে হবে।
‘সাংবাদিক’ পরিচয়টি কোনো ঢাল নয়, কোনো লাইসেন্সও নয়। এটি একটি দায়িত্ব। এই পরিচয় যত বড়, দায়িত্বও তত বড়।সেই সিনিয়র সাংবাদিকের আক্ষেপÑ‘নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিতে এখন ভয় লাগে, পাছে কেউ আবার আমাকেও তাদের কাতারে ফেলে’Ñএই কথার মধ্যে একজন পেশাদার সাংবাদিকের গভীর কষ্ট লুকিয়ে আছে। তাঁর এই কষ্টকে ব্যক্তিগত অভিযোগ হিসেবে দেখলে সমস্যার সমাধান হবে না। বরং এটি সাংবাদিক সমাজের জন্য একটি আত্মজিজ্ঞাসার বিষয়।
আমরা কি এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে পারি না, যেখানে সাংবাদিক পরিচয় শুনে মানুষ ভয় পাবে না, বরং আস্থা পাবে? যেখানে সাংবাদিকের আগমন মানেই কারও কাছ থেকে চাঁদা বা সুবিধা চাওয়ার আশঙ্কা হবে না; বরং মানুষ ভাববেÑনিজের কথা বলার একজন মানুষ এসেছে।
সাংবাদিকতা তখনই মর্যাদা ফিরে পাবে, যখন সাংবাদিকের পরিচয় হবে তাঁর আচরণ, তাঁর অনুসন্ধান, তাঁর সত্যনিষ্ঠা এবং তাঁর মানুষের পাশে থাকার ইতিহাস। কিছু ‘সাংবাদিক’কে ঘিরে যে অভিযোগগুলো উঠছে, সেগুলোর সত্যতা যাচাই ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সংশ্লিষ্ট সংগঠন ও কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।
তবে অভিযোগের আড়ালে যেন প্রকৃত সাংবাদিকরা অপমানিত না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ সাংবাদিকতা কোনো ব্যক্তির সম্পত্তি নয়। এটি সমাজের প্রতি একটি অঙ্গীকার। এই অঙ্গীকারকে যারা কলুষিত করছেন, তাঁদের থেকে পেশাকে মুক্ত করার দায়িত্বও সাংবাদিকদেরই।
আর সেই কাজ শুরু হতে পারে একটি ছোট প্রশ্ন দিয়েÑআমি কি সত্যিই সাংবাদিকের দায়িত্ব পালন করছি, নাকি শুধু সাংবাদিকের পরিচয় ব্যবহার করছি? এই আত্মজিজ্ঞাসাটিই হয়তো সাংবাদিকতার মর্যাদা রক্ষার প্রথম পদক্ষেপ।
লেখক: সংবাদকর্মী









