সম্পাদকীয়: নদী ও দেশীয় মাছ রক্ষায় চাই সমন্বিত উদ্যোগ
সম্পাদকীয়
একসময় সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার বেতনা, কপোতাক্ষ ও খোলপেটুয়া নদী ছিল দেশীয় মাছের অফুরন্ত ভা-ার। এই নদীগুলোকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল হাজারো জেলে পরিবারের জীবন-জীবিকা। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নদীতে জাল ফেললেই ঝাঁকে ঝাঁকে মিলত টেংরা, কৈ, শোল, বোয়াল, বাইন কিংবা রূপালি চিংড়ি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, সেই চেনা ছবি এখন অতীত। দূষণ, মানবসৃষ্ট বিপর্যয়, নাব্যতা সংকট আর বিষ প্রয়োগের মতো নৃশংস অপরাধের কারণে নদীগুলো এখন প্রায় মৎস্যশূন্য। ফলে চরম সংকটে পড়েছেন স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী জেলে সম্প্রদায়।
আশাশুনির নদীগুলোর এই বিপন্ন অবস্থার প্রধান কারণ অনিয়ন্ত্রিত দূষণ ও অসচেতনতা। সরেজমিনে দেখা যায়, নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে গৃহস্থালির আবর্জনা, বাজারের বর্জ্য, পোলট্রি খামারের উচ্ছিষ্ট ও প্লাস্টিক-পলিথিন দেদার ফেলা হচ্ছে। অনেক স্থানে নর্দমার ময়লা ও পয়ঃবর্জ্য সরাসরি গিয়ে মিশছে নদীর পানিতে। এর চেয়েও ভয়াবহ বিষয় হলো, কিছু অসাধু ব্যক্তি অধিক মুনাফার আশায় নদীতে অবাধে বিষাক্ত কীটনাশক ও রাসায়নিক পদার্থ প্রয়োগ করছে। বিষের প্রভাবে মাছ অচেতন হয়ে ভেসে উঠলে তা ধরে বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। এই আত্মঘাতী প্রক্রিয়ায় শুধু বড় মাছই নয়, ধ্বংস হচ্ছে কোটি কোটি রেণু ও পোনা মাছ, যা দেশীয় মাছের বংশবিস্তারকে পুরোপুরি হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
নদীগুলোর এই দূরবস্থার পেছনে প্রকৃতির চেয়ে মানুষের দায়ই বেশি। একদিকে পলি জমে নদীগুলোর নাব্যতা কমে গেছে, জেগে উঠেছে চর; অন্যদিকে দীর্ঘদিন খনন না হওয়ায় মাছের স্বাভাবিক বিচরণ ও প্রজনন ক্ষেত্র নষ্ট হয়েছে। এর ওপর মিষ্টি পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় লবণাক্ততা বৃদ্ধি মৎস্য সংকটকে আরও তীব্র করেছে। স্থানীয় জেলেদের আকুতি—সারাদিন নদীতে জাল ফেলেও এখন সংসার চালানোর মতো মাছ মিলছে না।
এই পরিস্থিতি আর চলতে দেওয়া যায় না। শুধু আশাশুনির নয়, জেলার তথা দেশের নদীগুলোকে মৎস্যশূন্যতার হাত থেকে বাঁচাতে হলে এখনই কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। নদীতে বিষ প্রয়োগের সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে নদী অববাহিকার বাজার ও লোকালয়ের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন করতে হবে, যেন কোনো বর্জ্য নদীতে না পড়ে। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের উদ্যোগে নিয়মিত নদী খনন এবং দেশীয় মাছের পোনা অবমুক্তকরণ কর্মসূচি জোরদার করা প্রয়োজন।
নদী বাঁচলে বাঁচবে মাছ, আর মাছ বাঁচলে টিকে থাকবে হাজারো জেলের প্রাণ। প্রশাসন, মৎস্য বিভাগ এবং স্থানীয় জনসাধারণের সম্মিলিত সচেতনতা ও সমন্বিত উদ্যোগই পারে বেতনা, কপোতাক্ষ ও খোলপেটুয়া নদীকে আবারও প্রাণবন্ত ও মৎস্যসম্পদে সমৃদ্ধ করে তুলতে। এ বিষয়ে কালক্ষেপণের আর কোনো সুযোগ নেই।












