গাজী আজিজুর রহমান : প্রান্তিক জনপদের সাহিত্যজন
মনিরুজ্জামান মুন্না

ফুলফুঁটেছে ফুল; চিনতে যাকে আমরা আজ কেউ করেনি ভুল। পাঁপড়িভরা মনোহরা সুবাস পাগলপারা; গদ্যসুধার ধারক সে যে সুনাম সীমাহারা। অর্থ নয় বিত্ত নয় নয়কো অলংকার; এ জনপদে ফুলটি সবার গর্বের অহংকার। ফুলটি আজি অদম্য আশি শোভিত দুর্বার, অনন্য হয়ে বনানীর কোলে জাগে বারংবার। নামটি হয়েছে কালজয়ী নদী এক প্রবাহমান; কালিগঞ্জের ছেলে তিনি গাজী আজিজুর রহমান।
গাজী আজিজুর রহমানের জন্ম ১৯৪৭ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ভারতের দার্জিলিংয়ে। তার বাবা কাসেম আলী গাজী এবং মা করিমন্নেসা। তিনি ১৯৬৪ সালে সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলার নলতা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, ১৯৬৬ সালে সাতক্ষীরা কলেজ থেকে এইচএসসি, ১৯৬৯ সালে জগন্নাথ কলেজ থেকে বিএ এবং ১৯৭২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। কালীগঞ্জ মহাবিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন ১৯৭৫ সালে। অধ্যাপক পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন ২০১০ সালে। এসময়ে নিজেকে সম্পূর্ণ নিয়োজিত করেছেন গবেষণাকর্ম ও সংস্কৃতি সেবায়। কালীগঞ্জে বসে কাজ করলেও তার গবেষণাকর্ম ঢাকা-কোলকাতা পর্যন্ত বিস্তৃত এবং সমাদৃত।
ক্রমাগত মৃত্যুর দিকে ধাবিত হওয়ার নামই জীবন। বছরান্তে জন্মদিন তার একটা অংশ বা অনুষঙ্গ মাত্র। সম্পূর্ণ জীবন প্রবাহ যদি একটা ফুল হয়, তবে প্রতিটি জন্মদিন তার একটি পাঁপড়ির মতো। একটা জন্মদিন চলে গেল তো জীবন প্রবাহের নির্ধারিত ও পরিবেষ্টিত পাঁপড়ি থেকে একটি পাঁপড়ি ঝরে গেল। এভাবে পাঁপড়িগুলো ঝরতে ঝরতে একদিন পৌঁছে যাবে জীবনের অন্তিমে। তবুও কষ্টের সে বার্তাকে অতিক্রম করে জন্মদিনের তিথিকৃত্য আমাদের সবারই ভালো লাগে। ভালো লাগে কোন আনন্দ আয়োজনের মাধ্যমে আলোচনা ও শুভেচ্ছা-প্রীতির ভাব বিনিময়ে। জন্মতীথিকে উপলক্ষ করে হৃদয়ের গহীনে সাহিত্য-সংস্কৃতি ও শিল্প-শৈলীর ব্যঞ্জনায় একাকার করে নিতে।
জন্মই আজন্ম ঘটনার সূত্রপাত। বছরের অন্য যে কোন বিশেষ উৎসবমুখর দিন-ক্ষণের সাথে যার একটা চমৎকার মিল থাকে। যেমন নববর্ষ। জন্মের পর থেকে প্রথম জন্মদিনের মতো প্রথম যে নববর্ষকে আমরা দেখি, সেখান থেকে আর একটি নববর্ষকে দেখতে দেখতে জানিনা কোনটির অন্তর্বর্তীকালে জীবনের আবসান ঘটে যাবে। কত ফুল ফোঁটে, কত ফুল ঝরে যায়। কত তারা জ্বলে, কত তারা নিভে যায়। পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চে ফোঁটাফুল আর নিভে যাওয়া তারার মতো মানব জীবন যেন এক পুতুল নাচের ইতিহাস। জীবন একটাই, তাও আবার স্বল্প দিনের। একমাত্র কর্মই পৃথিবীতে আয়ুষ্কালের পরিসীমা অতিক্রম করে মানুষকে অমরত্ব দিতে পারে। মানুষ হতে পারে কাল-মহাকালের আলোক অভিসারী। তখন শুধু বেঁচে থাকা অবদিই শুধু নয়, মৃত্যুর পরও শত শত বছর ধরে আড়ম্বর উৎসব আয়োজনে পালিত হতে থাকে জন্মদিন বা জন্মজয়ন্তী। যার আমেজ, মর্যাদা, গুরুত্ব ও গ্রহণযোগ্যতা তাকে অনন্য, অসাধারণ আর কালজয়ী কোন মানুষের ইতিহাসে অন্তর্ভূক্ত করে। গাজী আজিজুর রহমান তেমনই একজন অনন্য মর্যাদাবান মানুষ।
অধ্যাপক গাজী আজিজুর রহমান সাতক্ষীরার সাহিত্য-সংস্কৃতি ও সুধী-সুশীল মহলে এক অপরিহার্য নাম। একজন নিষ্ঠাবান কর্মযোগি মানুষ। সর্বমহলে যার সহজ-সরল, সাবলিল উপস্থাপন সকলকে আকৃষ্ট করে। জীবনের জটিল সংগ্রাম ও কষ্টের বহুমাত্রিক পরীক্ষায় তিনি পরাস্ত হননি। জীবন সংগ্রামের আগুন তাকে পলে-পলে দগ্ধ করায় চেহারায় বিদগ্ধ পোড় খাওয়া মানুষের উজ্জ্বল্যতা লক্ষনীয়। শিক্ষাকতা পেশার বাহিরে তিনি মূলত সাহিত্য কর্মের মাধ্যমে নিজেকে উপস্থাপন করেন। তিনি সাতক্ষীরার শিক্ষা-স্বাস্থ্য, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি, সাংবদিকতা ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করেন। এর জন্য সংশ্লিষ্ট নানান সংগঠন বা সংস্থার সমৃদ্ধিতে সম্পৃক্ত হয়ে সফলতার সাক্ষ্য রেখেছেন। বহুমাত্রিক নিমগ্ন সংগঠক হয়ে মানব সমাজে আদর্শ ও মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি শিক্ষাকতার মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেওয়ার মহান ব্রতে নিয়েজিত থেকে তিনি আমাদের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গণকে সমৃদ্ধ করেছেন। আট দশক আয়ুষ্কালে অব্যাহতভাবে পেশাদারী কর্মকা-ের সাথে ব্যক্তি, সমাজ, সভ্যতা, মানবিক ও অত্মিক উন্নয়নে নিবেদিত। যদিও তার পরিচয়ধর্মী ব্যাপৃত জীবনচরিত ও প্রতিভার ভা-ার সম্পর্কে আমি পুরোপুপি অকিবহাল নই। তবুও স্নেহধন্য ক্ষুদ্রতম অনুজ হিসেবে এবং আশির্বাদের পরিধিতে সাময়িক বসবাসের সুযোগ পেয়ে আমার যতটুকু জানা-শোনা তা বেশ প্রশংসার যোগ্য। আজ স্যারের আশিতম জন্মবার্ষিকীতে স্বত:প্রণাদিত হয়ে কৃতজ্ঞচিত্তে হাতে কলম তুলে নেওয়া।
শৈশব-কৈশরের স্বর্গীয়ভাব, আনন্দ-কাকলী ব্যাতিরেখে পরিবারের ভিত টিকিয়ে রাখার জন্য নানামুখী ঘাত-প্রতিঘাত ও প্রতিকুলতার বিরুদ্ধে অনর্গল লড়াই করে নিজেকে ও সমাজকে আলোকিত করেছেন নিজস্ব আলোকছটায়। চিরায়ত সত্য-সুন্দরের বিজয় নিশানে তার নিরন্তর অভিযাত্রা। গাজী আজিজুর রহমান এর সংস্পর্শে একদিকে যেমন তৈরী হয়েছে নানান ধরনের উন্নত পেশাধারী ব্যক্তিত্ব, অন্যদিকে তেমনি তৈরী হয়েছে দায়-দায়িত্বশীল সেবক, উন্নয়ন ও সাহিত্য-সংস্কৃতিক কর্মী। নানা রকমের নিছক মতবিরোধ বা আপত: টানাপোড়ন নিয়েও তার সাথে সর্বত্র সহঅবস্থান সুখকর। জীবনঘনিষ্ঠ ঐতিহ্যপ্রিয় এই ঋদ্ধ মানুষটি স্বাতন্ত্র্য ব্যক্তিত্ব, মুক্তবুদ্ধি ও প্রগতিশীল চিন্তাচেতনার আতœপ্রত্যয়ে সমৃদ্ধ। বিনয়, অমায়িকতা ও সুসংস্কৃতির দিলখোলা মানুষ হওয়ায় তার লোকপ্রিয়তার ব্যাপ্তী অনেক। কখনও কখনও জীবন জটিলতায় মসৃণ স্বপ্ন হোচট খায়। তবু জমা-খরচের হালখাতায় দেউলিয়া হয়ে যাননি। তাই স্বপ্নীল প্রত্যাশা থেকে চুড়ান্ত প্রাপ্তির অংকটা ঘুরে ফিরে মিলে যায়। মানুষ ও মানুষ পাঠের নিমগ্ন সাধক হয়ে ওঠায় তার অর্জনের ফলাফল তাকে যথেষ্ট শ্রদ্ধা, সম্মান, ভালোবাসা আর মর্যাদার আসনে আসীন করেছে। অনেকটা নিরিবিলি অথচ সৃজনশীল বলে তার উপস্থিতি সরব ও মহিমান্বিত। অন্যদের তুলনায় কম কথা বললেও যতটুকু বলেন তা গুরুত্বপূর্ণ ও পরিণত সুরে। তাই ততোটুকুই মরুভূমিতে মরুদ্যানের মতো প্রশান্তি বিলিয়েছে। বৈশাখের রোদে পোড়া মাঠের কৃষকের মত ফলিয়েছে স্বর্ণালী ফসল। লোভ, কপটতা কিংবা বিলাস তাকে কখনো আকৃষ্ট করেনি। থাকেন সাধারণ তবু অসাধারন সে ব্যক্তি সত্ত্বার অপরূপ রূপ।
সৃষ্টির প্রতিশ্রুত পথে হেঁটে হেঁটে পরিশ্রান্ত পথিকে মননী মগ্নে চলেছেন বিজয় আনন্দে। স্বপ্নডানায় উড়ে বেড়ায় প্রমুক্ত সৃজনী। কাঙ্খিত আকাঙ্খা সাবলীল উন্মোচনে ঠিকানা পায় গতি-প্রগতির অনন্ত ধারায়। আকাশ যেমন তার সমস্ত কথা জল হয়ে লিখে দেয় পৃথিবীর গায়, ঠিক তেমনি মননের জমিনে সাহিত্য-শব্দের বৃষ্টি ঝরিয়ে একের পর এক রচনা করেন জীবন ঘনিষ্ঠ বিশ্লেষনে অনন্ত সৃষ্টির শ্লোগান। আজ অদম্য আশি’তে কুয়াশা ভেজা বাতাসে দুলে ওঠে পুরোনো দিনের স্মৃতি। সে নাম বার বার উচ্চারিত হয় সাহিত্যের পাতায়, জলসায় কিম্ব অন্য কোন শিল্পনিলয়। কিছু অপেক্ষা, কিছু অভিমান, কিছু বিশ্বাস মেঘের মতোই ফিরে ফিরে আসে বিস্ময় নিয়ে। তবুও আমরা শুধু শুনে যাইÑ মাটির গন্ধে লেখা এক অনন্ত জীবনের গান। কখনও ভোর, কখনও দুপুর কখনও রাত। আলো-আধরীর পট পরিবর্তনে মেঘ জমবে, সরেও যাবে। বর্ষা নামবে, খরাও হবে। কিন্তু সকল চড়াই-উতরাই পার করে অনবদ্য গদ্য-পদ্যের জন্মদাতায় তিনি থেকে যাবেন স্বরবে, সপ্তর্ষীর অগ্নিস্বরে, বর্ষার বারিধারা হয়ে। জন্মদিনের পরাগ মেখে তব করিতকর্মায় শুভেচ্ছা জানায়Ñ নভোনীল, বিলঝিল, শঙ্খচিল, মানবকুল, কাশফুল, গানের বুলবুল। তাদের সাথে সাথে আমিও জানাই শুভেচ্ছা, অভিনন্দন। অন্য ভূবনে, অন্য আলোয় জড়তা আর অভিমানের হিমবাহ গলে অনুরাগের ক্ষুধা-তৃষ্ণা, প্রীতি-অপ্রীতি, গতি-প্রকৃতি, পরিণতি স্বপ্নময়তার সম্মোহনে ঠিকানা খুঁজে নেয় প্রচ্ছন্ন দূতিকায়। অস্তিত্বের সন্ধানে অবরুদ্ধ সুখ স্বাধীনতার অবগহনে অকপটে তা জানান দেয় বিভ্রমের স্বর্ণালী বিকেল। বয়স শুধু কালক্ষেপণ নয়Ñ কর্ম কালের সাক্ষী হয়ে গতিময় ছন্দে, সৃষ্টি সুখের উল্লাসে প্রেরণা জাগরুখ থাকুক আনন্দের সানন্দ অভিলাষে। সেই বিশ্লেষিত বিশেষনে আত্মজার আত্মার ইতিহাসে গাজী আজিজুর রহমান স্যার শতায়ু নিয়ে আমাদের মাঝে থেকে যাবেন অন্বেষণ এবং প্রাপ্তির নিবেদিত বৃত্তান্তে।
প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ- প্রবন্ধ গবেষণা : সাহিত্যে সমাজ বাস্তবতার ধারা (১৯৯২, পুনর্মুদ্রণ ২০১৪), স্বেচ্ছামৃত্যুর করতলে কবি (১৯৯৬, পুনর্মুদ্রণ ২০১৫), সাহিত্য ও সিংহাসন (১৯৯৯), নোবেল সাহিত্য পুরস্কারের শতবর্ষ (২০০১), সাতক্ষীরার ভাষা ও শব্দকোষ (২০০৪), আধুনিক বাংলা উপন্যাসের বিষয় ও শিল্পরূপ (২০০৯), কবিদের কবি (২০১০) এবং কালীগঞ্জের ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধ (২০১৪) ইত্যাদি। প্রকাশনা ও সম্পাদনার কাজেও তার মুন্সিয়ানা রয়েছে। একক সম্পাদনা : মরণরে তুহু মম (২০০৪) এবং খান আনসার উদ্দীন আহমেদ রচনাবলী (১৯৯৯), ১৯৮৩ সাল থেকে সম্পাদনা করে যাচ্ছেন ‘নদী’ নামে একটি সাহিত্যপত্র। অন্যান্য প্রকাশনা : বজ্রের বাঁশি (উপন্যাস), কালো সূর্যের নীচে (নাটক), সক্রেটিস (নাটক), যোদ্ধার জতুগৃহ (উপন্যাস) ইত্যাদি। পরিশ্রমী কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ বেশ কয়েকটি সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- সাতক্ষীরা সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার (১৯৯৫), ম্যান অব দি ইয়ার, বায়োগ্রাফিক্যাল ইনস্টিটিউট (যুক্তরাষ্ট্র, (১৯৯৮), কবি জসীম উদ্দীন সাহিত্য পুরস্কার (২০০১), শিমুল-পলাশ সাহিত্য পুরস্কার (কলকাতা, ২০০৪), বাংলা ভাষা সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চাকেন্দ্র পুরস্কার (২০০৭), লিনট পদক পুরস্কার (২০০৮), সিকান্দার আবু জাফর পদক (২০১২) ও কবি সুকান্ত পুরস্কার (কলকাতা, ২০১৫) ইত্যাদি।
গাজী আজিজুর রহমান প্রতিভার সপ্তপর্ণা মণি ধারণ করে বাংলা সাহিত্যের রস ভা-ার পূর্ণ করে চলেছেন। তিনি কম লিখলেও যা লেখেন ভেবেচিন্তে লেখেন এবং অনেক সমৃদ্ধ করেন। মৃত্যু, আত্মহত্যা এবং কবিতা বিষয়ক তার লেখাগুলো পাঠককে বার বার ভাবিত করে। এছাড়া বিশ্বসাহিত্য, ইতিহাস, আধুনিকতা তার লেখালেখির অন্যতম বিষয়। সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়ে তার দীর্ঘ তিন দশকের লেখা পাঠককে জুগিয়েছে নবভাবনার খোরাক।
লেখক : সাধারণ সম্পাদক, সাতক্ষীরা সিকান্দার একাডেমি












