গুড়পুকুরের মেলায় নাগরদোলা-ঘোড়া-ট্রেনে মেতে উঠেছে শিশুরা
মিলন বিশ্বাস: জমে উঠেছে সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী গুড়পুকুর মেলা। সকাল থেকে মেলার মাঠে বাড়তে থাকে দর্শনার্থীদের ভিড়। তবে মেলার সবচেয়ে বেশি আনন্দ যেন শিশুদের চোখেমুখে। নাগরদোলা, ঘোড়া, শিশুদের ট্রেন, রঙিন খেলনা আর বেলুন-সবকিছু ঘিরেই তাদের উচ্ছ্বাস।
নাগরদোলা ঘুরছে আপন গতিতে। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটছে শিশুদের আনন্দ। কেউ বাবার হাত ধরে টানছে, ‘ওইটাতে উঠব।’ কেউ মায়ের কাছে আবদার করছে পছন্দের খেলনা কিনে দেওয়ার জন্য। কোথাও ঘোড়ার টগবগ ছুট, কোথাও শিশুদের ট্রেনের হুইসেল। চারপাশে রঙিন বেলুন, খেলনা ও বাহারি পণ্যের সমাহার। সব মিলিয়ে যেন শিশুদের জন্য তৈরি হয়েছে এক অন্যরকম আনন্দের জগৎ।
দুই বছর পর আবারও বসেছে গুড়পুকুর মেলা। ১ অক্টোবর শুরু হওয়া এ মেলা চলবে ২০ অক্টোবর পর্যন্ত। চতুর্থ দিনে এসে মেলার বিভিন্ন আয়োজন আরও জমে উঠেছে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দূর-দূরান্ত থেকে আসা শিশুরা ঘুরে দেখছে মেলার বিভিন্ন স্টল ও বিনোদনের আয়োজন।
বিনেরপোতা থেকে বাবার হাত ধরে মেলায় এসেছে সুমাইয়া ইয়াসমিন (৯)। একের পর এক আয়োজন দেখছিল সে। তবে নাগরদোলার সামনে এসে থমকে যায় তার চোখ। মেলার কোন জিনিসটি সবচেয়ে ভালো লেগেছে জানতে চাইলে সুমাইয়া জানায়, নাগরদোলায় চড়ার আনন্দই তার কাছে সবচেয়ে বেশি। সঙ্গে পছন্দের একটি খেলনা নিয়ে বাড়ি ফেরার ইচ্ছাও রয়েছে তার।
শিশু শোভন (৭)-এর আবার নাগরদোলার চেয়ে বেশি পছন্দ শিশুদের ট্রেন। ট্রেনে ওঠার জন্য সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল সে। নিজের পালা আসতেই আনন্দে চড়ে বসে। ট্রেন চলতে শুরু করলে চারপাশ দেখতে দেখতে হাত নাড়ছিল। তার কাছে মেলার সবচেয়ে মজার বিষয়—একসঙ্গে এত কিছু দেখা আর ঘুরে বেড়ানো।
তাবাচ্ছুম আক্তার (১৪) মেলায় এসেই ছুটে যায় খেলনার দোকানে। নানা রঙ ও আকৃতির খেলনা দেখে একটির পর একটি হাতে নিয়ে দেখছিল সে। শেষ পর্যন্ত পছন্দের খেলনা হাতে পেয়ে মুখে ফুটে ওঠে তৃপ্তির হাসি। এরপর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঘুরে দেখে মেলার অন্যান্য আয়োজন।
দেবহাটা থেকে আসা চুমকির পছন্দ নাগরদোলা ও রঙিন খেলনা। মেলার আলো, মানুষের ভিড় আর সারি সারি খেলনা দেখে তার চোখেমুখে ছিল বিস্ময়। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মেলার বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে দেখার আবদারও করছিল সে।
শিশুদের এই আনন্দের অংশীদার অভিভাবকেরাও। সন্তানদের হাত ধরে মেলার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরছেন তাঁরা। কেউ সন্তানের পছন্দের খেলনা কিনে দিচ্ছেন, কেউ নাগরদোলায় তুলে দিচ্ছেন, আবার কেউ শিশুদের ট্রেনের টিকিট কাটতে ব্যস্ত।
শহরের লস্করপাড়া থেকে আসা হোসনে আরা বলেন, সন্তানদের আনন্দ দেখতেই মেলায় এসেছেন। দীর্ঘদিন পর মেলা হওয়ায় বাচ্চাদের আগ্রহও অনেক বেশি। মেলায় এসে তাদের আনন্দ করতে দেখে ভালো লাগছে।
বাঁশদহা থেকে আসা বিলকিস খাতুন বলেন, বাচ্চাদের আনন্দ দেখে নিজের ছোটবেলার কথা মনে পড়ছে। ছোটবেলায় বাবা-মায়ের সঙ্গে এভাবেই মেলায় এসে ঘুরে বেড়াতেন তাঁরা। এখন সন্তানদের হাত ধরে সেই একই মেলায় আসতে পেরে ভালো লাগছে।
আশাশুনি থেকে পরিবার নিয়ে মেলায় এসেছেন ওকালত হোসেন। তিনি বলেন, ছোটদের জন্য মেলার আনন্দই আলাদা। দুই বছর পর মেলা হওয়ায় এবার পরিবারের সবাইকে নিয়ে এসেছেন। সন্তানদের মুখে হাসি দেখলেই বোঝা যায়, তারা কতটা আনন্দ করছে।
গুড়পুকুর মেলা শুধু কেনাকাটা কিংবা বিনোদনের আয়োজন নয়, নতুন প্রজন্মের কাছে এটি ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ারও একটি সুযোগ। বাবা-মায়ের হাত ধরে মেলার মাঠে ঘুরতে ঘুরতে শিশুরা দেখছে বহুদিনের পুরোনো এই আয়োজন। নাগরদোলার ঘূর্ণন, ট্রেনের হুইসেল আর শিশুদের উচ্ছ্বাসে যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে গুড়পুকুর মেলা।
চতুর্থ দিনে এসে শিশুদের হাসি-আনন্দে আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে মেলার মাঠ। দুই বছর পর ফিরে আসা এই আয়োজন যেন পুরোনো ঐতিহ্যের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের আনন্দেরও এক সুন্দর মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।












