চিকিৎসালয় যখন মৃত্যুফাঁদ
নাজমুল শাহাদাৎ জাকির
হাসপাতাল হলো মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল। সুস্থ হয়ে বাঁচার আশায় মানুষ যেখানে ছুটে যায়, সেই জায়গাটিই যদি মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়—তবে এর চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি আর কী হতে পারে! সাতক্ষীরার ব্লিস হাসপাতালে ঘটে যাওয়া অগ্নিকা- আমাদের সামনে আবারও সেই পুরোনো, কিন্তু ভয়ানক এক বাস্তবতাকে নগ্নভাবে তুলে ধরেছে। এই অগ্নিকা-ে অর্ধশত মানুষ আহত হয়েছেন। ফায়ার সার্ভিসের তৎপরতায় হয়তো এবার লাশের সারি দেখতে হয়নি, কিন্তু এই ঘটনার পেছনের যে চিত্র উন্মোচিত হয়েছে, তা কোনো সাধারণ দুর্ঘটনার পর্যায়ে পড়ে না। এটি একটি সুস্পষ্ট কাঠামোগত অপরাধ।
একটি যন্ত্রের ত্রুটি বা শর্টসার্কিট থেকে আগুন লাগতেই পারে। দুর্ঘটনা সব সময়ই অনাকাঙ্ক্ষিত। কিন্তু একটি ১০তলা ভবনের জরুরি নির্গমন পথ বা ইমার্জেন্সি এক্সিট স্থায়ীভাবে বন্ধ করে সেখানে টয়লেট নির্মাণ করা কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়। এটি একটি সুপরিকল্পিত এবং চরম দায়িত্বহীন সিদ্ধান্ত।
ভবনের নকশায় যেখানে মানুষের জীবন বাঁচানোর পথ রাখা হয়েছিল, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সামান্য কিছু জায়গা বাঁচিয়ে বাণিজ্যিক সুবিধা নেওয়ার জন্য সেই পথটি রুদ্ধ করে দিয়েছে। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে দমবন্ধ করা পরিবেশে যখন রোগী ও তাদের স্বজনেরা বাঁচার জন্য ছুটে গেছেন, তখন তারা আছড়ে পড়েছেন সেই বন্ধ দেয়ালে। প্রশ্ন হলো—কয়েক বর্গফুট জায়গা আর একটি টয়লেটের কাছে কি শত শত মানুষের জীবনের মূল্য এতটা তুচ্ছ?
জানা গেছে, আগে এই ভবনটিতে ‘সিভি হাসপাতাল’ নামে একটি চিকিৎসাকেন্দ্র চলত। পরে মালিকানা বদলে এর নাম রাখা হয় ‘ব্লিস হাসপাতাল’।
আমাদের দেশে বেসরকারি সেবাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে এটি একটি সাধারণ প্রবণতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাইনবোর্ডের রং বদলায়, মালিকানা হাতবদল হয়, কিন্তু সেবার মান বা নিরাপত্তার কোনো উন্নয়ন ঘটে না। চকচকে অভ্যর্থনা কক্ষ আর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ভবনের আড়ালে লুকিয়ে থাকে এমন ভয়াবহ মৃত্যুফাঁদ। অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার ন্যূনতম মানদ- না মেনে কেবল মুনাফা লোটার এই যে সংস্কৃতি, তা আজ পুরো স্বাস্থ্যখাতকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
এই ঘটনার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কি কোনো দায় নেই? একটি ১০তলা ভবনে যখন জরুরি পথ বন্ধ করে দেয়াল তোলা হয়, তখন সেটি কি পরিদর্শকদের চোখে পড়ে না? দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশে তদারকি সংস্থাগুলোর ঘুম ভাঙে কেবল বড় কোনো ট্র্যাজেডির পর। বেইলি রোড বা নিমতলীর মতো অগ্নিকা-ের পর কিছুদিন তোড়জোড় চলে, এরপর আবার যে কে সেই। ব্লিস হাসপাতালের এই ঘটনা প্রমাণ করে, নিয়মিত পরিদর্শনের অভাব এবং জবাবদিহি না থাকার কারণে এই প্রতিষ্ঠানগুলো এতটা বেপরোয়া হওয়ার সাহস পাচ্ছে।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের সাহসিকতায় এবার হয়তো বড় কোনো প্রাণহানি ঘটেনি। কিন্তু শুধু ভাগ্য আর ফায়ার সার্ভিসের ওপর নির্ভর করে আমরা আর কতদিন এমন কাঠামোগত ঝুঁকির মধ্যে বাস করব? ব্লিস হাসপাতালের এই ঘটনাকে কেবল একটি দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ইমার্জেন্সি এক্সিট বন্ধ করার মতো হঠকারী সিদ্ধান্তের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অবিলম্বে ফৌজদারি আইনে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। শুধু তদন্ত কমিটি গঠন আর লোকদেখানো জরিমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। একইসঙ্গে, দেশের প্রতিটি বেসরকারি হাসপাতালে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখতে জরুরি অভিযান পরিচালনা করা প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে কোনো চিকিৎসাসেবা চলতে পারে না। লেখক: গণমাধ্যমকর্মী







