সম্পাদকীয়/ভবদহের স্থায়ী অভিশাপ ও আমলাতান্ত্রিক ব্যর্থতা: টিআরএম বাস্তবায়নই একমাত্র পথ
যশোরের মনিরামপুরে মুক্তেশ্বরী নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে নতুন করে ছয়টি গ্রাম প্লাবিত হওয়া এবং ভবদহ অঞ্চলে অর্ধশতাধিক গ্রামের অন্তত এক লাখ মানুষের পানিবন্দী হয়ে পড়া দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এক চিরচেনা করুণ চিত্রকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। টানা বৃষ্টি আর উজানের ঢলে কোটি টাকার কোটি টাকার অবকাঠামো ও মাছের ঘের ভেসে গেছে, বন্ধ হয়ে গেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও যোগাযোগের পথ। একের পর এক কোটি টাকার নদী খনন প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও ভবদহ অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য যে একটুও বদলায়নিÑএই বাঁধ ভাঙা ও জলাবদ্ধতা যেন তারই এক জলজ্যান্ত প্রমাণ।
কৃত্রিম এবং আংশিক নদী খননের যে প্রকল্পগুলো একের পর এক হাতে নেওয়া হচ্ছে, তার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা এখন সময়ের দাবি। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে নদী ও খালের ৮১.৫ কিলোমিটার খননকাজ বাস্তবায়ন করছে, অথচ একটি নদীতে বাঁধ দিয়ে খননকাজের প্রভাবেই উজান পলি জমে শত শত গ্রাম নতুন করে তলিয়ে যাচ্ছে। পাম্প বসিয়ে বা আংশিক ড্রেজিং করে কোটি কোটি টাকার নদী খনন যে শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ ও অপচয়মূলক পদক্ষেপে পরিণত হয়, তার প্রমাণ ভবদহবাসী গত কয়েক দশক ধরে হাড়েনাতে পেয়ে আসছে। নাব্য হারানো নদীগুলোতে যে হারে পলি জমা হয়, তাতে কৃত্রিম ড্রেজিং কিংবা স্বল্পমেয়াদি খনন প্রকৃতিকে জয় করতে পারে না।
ভবদহ সমস্যার স্থায়ী ও প্রকৃতিবান্ধব সমাধান সবারই জানা—তা হলো টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট বা টিআরএম (জোয়ারাধার ব্যবস্থাপনা) পদ্ধতি বাস্তবায়ন। ভবদহ পানি সংগ্রাম কমিটি এবং স্থানীয় ভুক্তভোগীরা দীর্ঘ দিন ধরে জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক গতিকে কাজে লাগিয়ে পলি ব্যবস্থাপনার এই বৈজ্ঞানিক ও টেকসই পদ্ধতির দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু অদৃশ্য কারণে আমলাতান্ত্রিক ও প্রকল্পনির্ভর মানসিকতার কাছে এই জনদাবি বার বার উপেক্ষিত হয়েছে। টিআরএম কার্যকর না করে কেবল যান্ত্রিক উপায়ে নদী পরিষ্কার বা সেচ পাম্প বসিয়ে এই বিস্তীর্ণ প্লাবন সামাল দেওয়া অসম্ভব।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এই বিশাল জনগোষ্ঠীর মানবিক সংকট ও অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি রুখতে হলে সরকারকে অবশ্যই দীর্ঘমেয়াদি ও জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে। দ্রুততম সময়ে মনিরামপুরের ভাঙা বেড়িবাঁধ সংস্কার ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মানবিক সাহায্য সুনিশ্চিত করার পাশাপাশি টিআরএম প্রকল্প বাস্তবায়নে অবিলম্বে দৃশ্যমান রূপরেখা প্রণয়ন করা প্রয়োজন। আংশিক প্রকল্পের নামে রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা অপচয় বন্ধ করে প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম ও ভুক্তভোগী মানুষের মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে ভবদহের দীর্ঘদিনের অভিশাপ চিরতরে দূর করা হোক।







