জলাতঙ্ক রোগের লক্ষণ একবার প্রকাশ পেলে শতভাগ প্রাণঘাতী
প্রকাশ ঘোষ বিধান
জলাতঙ্ক রোগের লক্ষণ একবার প্রকাশ পেলে তা প্রায় শতভাগ (৯৯.৯%) প্রাণঘাতী হয়ে থাকে। রেবিস ভাইরাসের আক্রমণে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর চিকিৎসকদের আর বিশেষ কিছু করার থাকে না এবং কয়েক দিনের মধ্যেই রোগীর মৃত্যু অনিবার্য হয়ে পড়ে।
জলাতঙ্কের ভাইরাসটি শরীরে প্রবেশ করার পর স্নায়ুর মাধ্যমে সরাসরি মস্তিষ্কে চলে যায়। সেখানে এটি তীব্র প্রদাহ তৈরি করে এবং মস্তিষ্কের কোষগুলোকে ধ্বংস করে দেয়। মস্তিষ্ক আক্রান্ত হওয়ার ফলে শ্বাসপ্রশ্বাস ও হৃদযন্ত্রের স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণ নষ্ট হয়ে যায়। ফলে লক্ষণ প্রকাশের মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই রোগী মারা যান।
জলাতঙ্ক বা র্যাবিস রোগের লক্ষণ একবার প্রকাশ পেলে এটি প্রায় শতভাগ প্রাণঘাতী এবং এর কোনো সুনির্দিষ্ট বা কার্যকর চিকিৎসা নেই। জলাতঙ্ক সৃষ্টিকারী রেবিজ ভাইরাস সরাসরি কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র ও মস্তিষ্কের কোষগুলো দ্রুত ধ্বংস করে দেয়। একবার লক্ষণ প্রকাশ পেলে এই স্নায়বিক ক্ষতি আর ঠিক করা সম্ভব হয় না এবং একপর্যায়ে শ্বাসকষ্ট বা অঙ্গহানি ঘটে রোগীর মৃত্যু হয়। তবে প্রাণী কামড়ানোর পরপরই টিকা নিলে এই রোগ শতভাগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
প্রতি বছর ২৮ সেপ্টেম্বর বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস পালিত হয়। ফরাসি বিজ্ঞানী লুই পাস্তুর প্রথম জলাতঙ্কের টিকা আবিষ্কার করেন। তাঁর মৃত্যুর দিনটিকে স্মরণ করে এই তারিখ নির্ধারণ করা হয়। ২০০৭ সাল থেকে গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর র্যাবিস কন্ট্রোল এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এর উদ্যোগে এই দিবসটি পালন শুরু হয়। এর মূল উদ্দেশ্য জলাতঙ্ক রোগ সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা এবং গৃহপালিত প্রাণীকে টিকা দেওয়ার মাধ্যমে এই রোগ নির্মূল করা।
কুকুরের কামড় বা আঁচড়ের মাধ্যমেই মানুষের শরীরে রেবিস বা জলাতঙ্ক ভাইরাস ছড়ায়। এটি রেবিস নামক একটি নিউরোট্রপিক ভাইরাসের কারণে ঘটে থাকে। শুধু কুকুর নয়, বিড়াল, শিয়াল, বেজি বা বানরের মতো অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর মাধ্যমেও এটি ছড়াতে পারে। আক্রান্ত প্রাণীর লালায় এই ভাইরাসটি থাকে। যখন তারা কামড়ায় বা আঁচড় দেয়, তখন লালাটি মানুষের রক্ত বা ক্ষতের সংস্পর্শে এসে শরীরে প্রবেশ করে।
কুকুর, বিড়াল বা বন্য প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ের সাধারণত ১ থেকে ৩ মাস পর (ইনকিউবেশন পিরিয়ড) লক্ষণ দেখা দেয়। জ্বর, মাথাব্যথা, চরম ক্লান্তি, কামড়ের স্থানে অবশ ভাব, চুলকানি বা সুঁই ফোটার মতো অনুভূতি হওয়া। অতিরিক্ত লালা ক্ষরণ, তীব্র মানসিক উত্তেজনা বা উগ্রতা, হ্যালুসিনেশন, পানি দেখলেই আতঙ্ক তৈরি হওয়া (হাইড্রোফোবিয়া বা জলাতঙ্ক) এবং বাতাসের ঝাপটায় আতঙ্ক লাগা (অ্যারোফোবিয়া)। শেষ পর্যায়ে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে শ্বাসকষ্টের কারণে রোগীর মৃত্যু হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইউএস সিডিসি এর তথ্য অনুযায়ী, লক্ষণ প্রকাশের পর এই রোগ থেকে বেঁচে যাওয়ার ঘটনা চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল।
কুকুর বা অন্য কোনো প্রাণী কামড়ানোর সাথে সাথে ক্ষতস্থানটি অন্তত ১৫ মিনিট ধরে ক্ষারযুক্ত সাবান এবং চলমান পরিষ্কার পানি দিয়ে ভালো করে ধুয়ে ফেলতে হবে। এতে ক্ষতস্থানে থাকা ভাইরাসের একটি বড় অংশ দূর হয়ে যায়। ধোয়ার পর ক্ষতস্থানে আয়োডিন বা টিংচার বেনজোইন-এর মতো অ্যান্টিসেপটিক লোশন বা ক্রিম লাগাতে হবে। কামড়ের স্থানটি সাধারণত ব্যান্ডেজ দিয়ে শক্ত করে বাঁধা উচিত নয়। ক্ষত উন্মুক্ত রাখা ভালো।
প্রাথমিক চিকিৎসার পরই যত দ্রুত সম্ভব নিকটস্থ সরকারি হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে হবে। অ্যান্টি-রেবিস ভ্যাকসিন লক্ষণ প্রকাশের আগে পোস্ট-এক্সপোজার প্রোফাইল্যাক্সিস বা জলাতঙ্কের প্রতিষেধক টিকা নেওয়া শুরু করতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী টিকার সম্পূর্ণ ডোজ শেষ করা বাধ্যতামূলক। কুকুরের কামড়ে ব্যাকটেরিয়া বা টিটেনাসের ঝুঁকি থাকে, তাই প্রয়োজন হলে ডাক্তার টিটেনাস শট বা অ্যান্টিবায়োটিক দিতে হয়।
জলাতঙ্ক রোগের লক্ষণ একবার প্রকাশ পেয়ে গেলে এর কোনো সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই এবং এটি শতভাগ প্রাণঘাতী। তাই কামড় বা আঁচড় লাগার পর অবহেলা না করে দ্রুত টিকা নেওয়াই একমাত্র জীবন রক্ষাকারী উপায়। লক্ষণ শুরু হওয়ার পর এই ভাইরাস ধ্বংস করার মতো কোনো কার্যকর চিকিৎসা বা ওষুধ চিকিৎসা বিজ্ঞানে এখনও আবিষ্কার হয়নি। লক্ষণ প্রকাশের আগেই দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন ও ইমিউনোগ্লোবিন নিতে হবে। একবার লক্ষণ প্রকাশ পেলে টিকা বা চিকিৎসায় আর জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয় না।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট












