জাকারিয়ার রক্তের দায়/ সচ্চিদানন্দ দে সদয়
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
মানুষের বিপদে মানুষ এগিয়ে যাবেÑসভ্য সমাজের এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। বিপদে পড়া কাউকে সাহায্য করা, দুই পক্ষের বিবাদ থামানোর চেষ্টা করা কিংবা অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমাদের সামাজিক মূল্যবোধেরই অংশ। কিন্তু জাকারিয়ার মৃত্যু সেই স্বাভাবিক মানবিকতার সামনে এক কঠিন প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছেÑঅন্যের বিপদে এগিয়ে গিয়ে যদি নিজের জীবনই দিতে হয়, তাহলে আগামী দিনে মানুষ কি আর কারও বিপদে এগিয়ে আসবে? জাকারিয়া এগিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য কী ছিল-একটি বিবাদ থামানো, বিপদগ্রস্ত কাউকে সহায়তা করা, নাকি পরিস্থিতি শান্ত করা-তা তদন্তেই স্পষ্ট হবে। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট: তিনি আর বেঁচে নেই। অন্যের বিপদের মুহূর্তে পাশে দাঁড়ানোর পরিণতিতে তাঁকে প্রাণ হারাতে হয়েছে। একটি পরিবারের স্বজন, একজন মানুষের জীবন এবং একটি পরিবারের ভবিষ্যতের স্বপ্ন-সবকিছুই মুহূর্তে বদলে গেছে।
জাকারিয়ার মৃত্যু তাই শুধু একটি হত্যাকা- নয়; এটি আমাদের সামাজিক সম্পর্ক, পারস্পরিক আস্থা এবং মানবিক মূল্যবোধ নিয়েও ভাবতে বাধ্য করে। একসময় পাড়া-মহল্লা বা গ্রামে কারও বিপদ হলে মানুষ ছুটে যেত। কারও বাড়িতে আগুন লাগলে সবাই মিলে আগুন নেভাত, কেউ অসুস্থ হলে কয়েকজন মিলে হাসপাতালে নিয়ে যেত, দুই পক্ষের বিবাদ হলে এলাকার প্রবীণরা এগিয়ে এসে তা থামানোর চেষ্টা করতেন। প্রতিবেশীর বিপদকে নিজের বিপদ মনে করার এই সংস্কৃতিই ছিল আমাদের সামাজিক শক্তি। আজ সেই জায়গায় পরিবর্তন এসেছে। মানুষ ক্রমেই ব্যক্তি কেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিরাপত্তার ভয়। অন্যের সমস্যায় জড়িয়ে গিয়ে নিজেই বিপদে পড়ার আশঙ্কা অনেককে পিছিয়ে দেয়। জাকারিয়ার মতো মানুষের করুণ পরিণতি সেই ভয়কে আরও গভীর করতে পারে। আজ একজন ভাববেন, ‘আমি কেন যাব?’ কাল আরেকজন বলবেন, ‘নিজের জীবন আগে।’
এভাবে একসময় বিপদগ্রস্ত মানুষ চারপাশে অনেক মানুষ দেখেও কাউকে পাশে নাও পেতে পারেন। এটাই সবচেয়ে ভয়ংকর দিক। কারণ অপরাধ শুধু একজন মানুষের জীবন কেড়ে নেয় না; কখনো কখনো একটি সমাজের সাহসও কেড়ে নেয়। মানুষ যদি অন্যায়ের সামনে দাঁড়াতে ভয় পায়, বিপদে কাউকে সাহায্য করতে ভয় পায়, তাহলে অপরাধী আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। আর সাধারণ মানুষ ধীরে ধীরে নীরব দর্শকে পরিণত হয়।
নীরবতা তখন শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত থাকে না, তা সামাজিক অভ্যাসে পরিণত হয়।আমরা নিশ্চয়ই এমন সমাজ চাই না। তবে মানবিকতার অর্থ নিজের জীবনকে অযথা ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া নয়। সশস্ত্র বা উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে সরাসরি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়া কোনো সমাধান হতে পারে না। এমন অবস্থায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে খবর দেওয়া, আহত ব্যক্তিকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া, চিকিৎসার ব্যবস্থা করা কিংবা প্রয়োজনীয় সহায়তা সংগঠিত করাও মানবিক দায়িত্বের অংশ। কিন্তু এসব কাজ করার নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রধান দায়িত্ব রাষ্ট্রের। সেখানেই জাকারিয়ার মৃত্যুর পর গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন সামনে আসে।
একটি বিরোধ কীভাবে প্রাণঘাতী হয়ে উঠল? এর আগে কোনো বিরোধ বা উত্তেজনা ছিল কি? স্থানীয়ভাবে তা মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল কি? সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পর্কে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আগে কোনো তথ্য পেয়েছিল কি না? এমন ঘটনা ঠেকাতে আগে থেকে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি। কারণ শুধু হত্যাকারী শনাক্ত করলেই একটি ঘটনার বিচার সম্পূর্ণ হয় না; ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা কীভাবে প্রতিরোধ করা যাবে, সেই শিক্ষাটিও বের করে আনতে হয়। জাকারিয়া হত্যার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। তদন্ত হতে হবে নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য। অপরাধীর পরিচয়, সামাজিক অবস্থান বা প্রভাব যেন তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে না পারে। শুধু গ্রেপ্তার নয়, যথাযথ তদন্ত শেষে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করাও জরুরি। কারণ ন্যায়বিচার এখানে শুধু জাকারিয়ার পরিবারের দাবি নয়; এটি সামাজিক আস্থার প্রশ্ন।
মানুষ যখন দেখে অপরাধের দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার হয়, তখন আইনের ওপর আস্থা বাড়ে। বিপরীতে অপরাধী প্রভাব বা সময়ের সুযোগে পার পেয়ে গেলে মানুষের মধ্যে জন্ম নেয় ভয় ও হতাশাÑআইন কি সত্যিই সবার জন্য সমান? এই প্রশ্নের উত্তর রাষ্ট্রকে তার কার্যকর কর্মকা-ের মাধ্যমে দিতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধ প্রতিরোধের ব্যবস্থাও শক্তিশালী করতে হবে। ছোট বিরোধ বড় সংঘর্ষে রূপ নেওয়ার আগেই তা শনাক্ত করতে হবে। জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় প্রশাসন, সমাজের প্রবীণ ব্যক্তি ও নাগরিক প্রতিনিধিদের দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন। কোথাও উত্তেজনা তৈরি হলে সেটিকে ‘স্থানীয় ব্যাপার’ বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ ছোট একটি বিরোধ কখন যে প্রাণঘাতী সংঘাতে পরিণত হবে, তার নিশ্চয়তা নেই।
জাকারিয়ার পরিবার আজ যে শূন্যতার মধ্যে পড়েছে, কোনো বিচারই তা পূরণ করতে পারবে না। একজন মানুষের মৃত্যু মানে শুধু একজন স্বজনকে হারানো নয়; একটি পরিবারের দৈনন্দিন জীবন, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও নিরাপত্তা বোধও বদলে যায়। তাই তাঁদের প্রতি সহমর্মিতার পাশাপাশি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই হবে রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব। জাকারিয়ার মৃত্যু আমাদের সামনে দুটি পথের প্রশ্ন রেখেছে। আমরা কি এমন সমাজের দিকে যাব, যেখানে মানুষ অন্যের বিপদ দেখেও নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে থাকবে? নাকি এমন ব্যবস্থা গড়ে তুলব, যেখানে মানবিকতার সঙ্গে মানুষের নিরাপত্তারও নিশ্চয়তা থাকবে? উত্তরটি আমাদের সামাজিক ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
মানুষের বিপদে মানুষ এগিয়ে আসবে-এই ন্যূনতম সামাজিক আস্থাটুকু যেন আমরা হারিয়ে না ফেলি। এ জন্য জাকারিয়া হত্যার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে দ্রুত শনাক্ত করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে; স্থানীয় বিরোধ ও সংঘাতের আগাম ঝুঁকি চিহ্নিত করে কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে; এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এমনভাবে সক্রিয় রাখতে হবে, যাতে কোনো বিবাদ সহিংসতায় রূপ নেওয়ার আগেই তা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের জন্যও নিরাপদভাবে সহায়তা করার পথ তৈরি করতে হবে। জাকারিয়ার মৃত্যু যেন মানুষের মানবিকতাকে ভীত করে পিছু হটিয়ে না দেয়; বরং তাঁর হত্যার দ্রুত বিচার, সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রকে প্রমাণ করতে হবেÑঅন্যের পাশে দাঁড়ানো কোনো মানুষের জন্য মৃত্যুফাঁদ হতে পারে না।
লেখক: সংবাদকর্মী












