জাতিসংঘে বাংলাদেশের কণ্ঠস্বর কতটা জোরালো?
গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ
জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনের উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্কে বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানেরা বৈশ্বিক শান্তি, যুদ্ধ-সংঘাত, জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসন, অর্থনৈতিক বৈষম্য, প্রযুক্তি ও মানবিক সংকট নিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছেন। ৮ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া এবারের অধিবেশনের প্রতিপাদ্য-‘আস্থা পুনর্গঠন, পরিবর্তন ব্যবস্থাপনা: সবার জন্য কার্যকর একটি জাতিসংঘ’।
২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে বাংলায় বক্তব্য দেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা, অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন, বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, রোহিঙ্গা সংকট, প্রযুক্তির ন্যায়সঙ্গত ব্যবহার এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার সংস্কারের মতো বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। রোহিঙ্গা সংকটের ক্ষেত্রে তিনি বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের ওপর জোর দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। তবে একজন নাগরিক ও সচেতন পর্যবেক্ষক হিসেবে এখানেই প্রশ্ন শেষ হয়ে যায় না, বরং শুরু হয়।
বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশ কী বলছে তার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, সেই বক্তব্যের পেছনে আমাদের জাতীয় স্বার্থের কতটা সুস্পষ্ট রূপরেখা রয়েছে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তা বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব? জাতিসংঘ বিশ্বশান্তি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অন্যতম প্রধান মঞ্চ। কিন্তু যুদ্ধ, দখল, বাস্তুচ্যুতি ও মানবিক সংকটের ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদের ভেটোব্যবস্থা এবং বড় শক্তিগুলোর স্বার্থের সংঘাত অনেক সময় আন্তর্জাতিক উদ্যোগকে জটিল করে তোলে। ফলে প্রশ্ন থেকে যায়, বিশ্বের অপেক্ষাকৃত দুর্বল ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর অধিকার রক্ষায় জাতিসংঘকে কীভাবে আরও কার্যকর করা যায়? ফিলিস্তিনের প্রশ্নটি এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অবস্থান হলো ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায্য অধিকার এবং স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে থাকা। তবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির বৃহত্তর কাঠামোতে এই অবস্থানের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং সব নিপীড়িত মানুষের ন্যায্য অধিকারের প্রশ্নেও ধারাবাহিকতা থাকা প্রয়োজন। কোনো একটি সংকট নয়, আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নে বাংলাদেশের অবস্থান যেন নীতিনির্ভর ও সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, এটাই প্রত্যাশা। এরপর আসে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক বহুমাত্রিক সীমান্ত, পানি, বাণিজ্য, যোগাযোগ, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা সবকিছুই এর সঙ্গে যুক্ত। তাই এই সম্পর্ককে শুধু আবেগ দিয়ে দেখা যেমন বাস্তবসম্মত নয়, তেমনি বন্ধুত্বের নামে জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নগুলোকে উপেক্ষা করাও সমীচীন নয়।
সীমান্তে প্রাণহানি, অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন, বাণিজ্যিক ভারসাম্য এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের যে প্রত্যাশা রয়েছে, সেগুলোকে কূটনৈতিক আলোচনায় যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কোনো বাংলাদেশি নাগরিক সীমান্তে প্রাণ হারালে ঘটনার তদন্ত, জবাবদিহি এবং প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক উদ্যোগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একই সঙ্গে এসব স্পর্শকাতর বিষয়ে দায়িত্বশীল ভাষা ও বাস্তবসম্মত কূটনৈতিক কৌশল বজায় রাখাও জরুরি।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হলো ভাষা ও সংস্কৃতির সম্পর্ক। পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরাসহ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের বাংলাভাষী মানুষের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের রয়েছে ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ঐতিহাসিক যোগাযোগ। এই সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করা যেতে পারে শিক্ষা, গবেষণা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, পর্যটন ও বৈধ বাণিজ্যিক যোগাযোগের মাধ্যমে। তবে সাংস্কৃতিক নৈকট্যকে কোনোভাবেই অন্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব বা ভূখন্ডগত অখন্ডতার প্রশ্নের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়। বরং আন্তর্জাতিক আইন ও পারস্পরিক সম্মানকে ভিত্তি করে সীমান্তের দুই পাশের মানুষের বৈধ যোগাযোগ বাড়ানোই হতে পারে অধিক টেকসই পথ। এতে সাংস্কৃতিক সম্পর্ক যেমন গভীর হবে, তেমনি রাষ্ট্রীয় সম্পর্কও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি রোহিঙ্গা সংকট। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘে স্পষ্ট করে বলেছেন, সংকটের উৎস মিয়ানমারে এবং সমাধানও সেখানেই নিহিত। এই অবস্থান বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মানবিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বাংলাদেশের অর্থনীতি, পরিবেশ, নিরাপত্তা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপও তৈরি হচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে শুধু ত্রাণ ও মানবিক সহায়তা নয়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ, স্বেচ্ছামূলক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ প্রত্যাশিত।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রশ্নেও বাংলাদেশের দাবি স্পষ্ট হওয়া দরকার। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য অস্তিত্বের প্রশ্ন হয়ে উঠতে পারে। জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপ ও জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। এখানে বাংলাদেশের কূটনীতির সামনে একটি বড় সুযোগ রয়েছে।
জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে বাংলাদেশ যদি ক্ষতিপূরণ, জলবায়ু অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও অভিযোজন সহায়তার বিষয়ে ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি করতে পারে, তাহলে তা দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জীবপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল প্রযুক্তি অর্থনীতি ও সমাজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে। প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ন্যায়সঙ্গত ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
বাংলাদেশের জন্য তাই প্রযুক্তিকে শুধু উন্নত দেশের সম্পদ হিসেবে দেখলে চলবে না। প্রযুক্তিতে ন্যায্য প্রবেশাধিকার, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, গবেষণা এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের সুযোগ নিশ্চিত করার প্রশ্নটি আন্তর্জাতিক কূটনীতির অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়া প্রয়োজন। একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতি শুধু বক্তৃতার ভাষায় পরিমাপ করা যায় না। তার প্রকৃত মূল্যায়ন হয় জাতীয় স্বার্থ কতটা রক্ষা হলো, নাগরিকের অধিকার কতটা প্রতিষ্ঠিত হলো এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের অবস্থান কতটা কার্যকরভাবে এগিয়ে নেওয়া গেল তার ভিত্তিতে।
জাতিসংঘে বাংলাদেশের কণ্ঠস্বর তাই শুধু আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকুক এমনটা নয়। চাই বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশ শান্তি, ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পক্ষে কথা বলুক, একই সঙ্গে নিজের জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নেও থাকুক স্পষ্ট, বাস্তববাদী ও ধারাবাহিক।
প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক হোক পারস্পরিক সম্মান ও সমতার ভিত্তিতে। রোহিঙ্গা সংকটে বাংলাদেশ পাক আন্তর্জাতিক সমর্থন। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় পাওয়া যাক ন্যায্য সহায়তা। প্রযুক্তির নতুন বিশ্বে বাংলাদেশের তরুণদের জন্য খুলে যাক সুযোগের দরজা। জাতিসংঘের মঞ্চে বাংলাদেশের বক্তব্য তখনই অর্থবহ হয়ে উঠবে, যখন সেই বক্তব্যের প্রতিফলন দেখা যাবে বাস্তব কূটনীতি ও জাতীয় জীবনে।
লেখক: গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ, সাবেক ছাত্রনেতা ও উদ্যোক্তা













