তাজমিন এর মৃত্যু: সচেতনতার পাশাপাশি প্রয়োজন সামাজিক ও রাষ্ট্রের উদ্যোগ
আজহারুল ইসলাম সাদী
কুমিল্লার লালমাইয়ে সপ্তম শ্রেণির স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমিন এর সাথে ঘটে যাওয়া নির্মম ও হৃদয়বিদারক হত্যাকান্ডটি আমাদের সমাজ, পরিবার এবং তরুণ প্রজন্মের জন্য অত্যন্ত জরুরি এবং চোখ খুলে দেওয়ার মতো কিছু শিক্ষা দিয়ে গেছে। মাত্র ১৫ বছর বয়সী এই কিশোরীকে একা পেয়ে অটোরিকশাচালক সুমন যেভাবে নির্যাতন ও হত্যা করেছে, তা পুরো দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে।
এই মর্মান্তিক ঘটনা থেকে আমাদের প্রধান শিক্ষণীয় বিষয় হলো:
১. পারিবারিক সখ্যতা ও সন্তানদের মানসিক বিকাশে খোঁজ রাখা,
কিশোর-কিশোরী বয়সে সন্তানদের মনে নানা কৌতূহল ও আবেগ তৈরি হয়। তাজমিন বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়ে ভিন্ন জায়গায় চলে গিয়েছিল। সন্তানরা কার সাথে মিশছে, পরিবারের বাইরে তাদের কোনো জগৎ তৈরি হচ্ছে কি না, এবং তারা কোনো মানসিক চাপে আছে কি না—সে বিষয়ে বাবা-মাকে সচেতন হতে হবে। সন্তানদের সাথে এমন একটি বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি করা উচিত যাতে তারা যেকোনো সমস্যা বা ভুল পদক্ষেপের কথা পরিবারের কাছে লুকাতে বাধ্য না হয়।
২. সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে সচেতনতা ও ভার্চুয়াল পরিচিতি
পুলিশি তদন্তে জানা গেছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অল্প দিনের পরিচয়ের সূত্র ধরে তাজমিন দূরবর্তী স্থানে ভ্রমণে গিয়েছিল। ভার্চুয়াল জগতের মানুষ সবসময় বাস্তব জীবনের মতো নির্ভরযোগ্য হয় না। ইন্টারনেটে পরিচিত অপরিচিত কারোর ওপর হুট করে বিশ্বাস করা যে কতটা মারাত্মক বিপদ ডেকে আনতে পারে,
সম্প্রতি কুমিল্লার এই ঘটনা তার একটি বড় প্রমাণ। কিশোর-কিশোরীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে সঠিক গাইডলাইন ও সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি।
৩. গভীর রাতে একা ভ্রমণের ঝুঁকি ও নিরাপত্তা সচেতনতা:
তাজমিন কক্সবাজার থেকে গভীর রাতে কুমিল্লায় ফিরে একা অটোরিকশায় উঠেছিল, যা অপরাধী অটোচালক সুমনকে সুযোগ করে দেয়। যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে একা দূরপাল্লার পথ পাড়ি দেওয়া বা গভীর রাতে অপরিচিত যানবাহনে ওঠার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। প্রয়োজনে পরিবারের সাহায্য নেওয়া অথবা পরিচিত ও নির্ভরযোগ্য মাধ্যমে যাতায়াত করা জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৪. অপরাধীদের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা:
এই ধরনের পৈশাচিক ঘটনা বারবার ঘটার পেছনে অন্যতম কারণ হলো অপরাধীদের পার পেয়ে যাওয়া বা বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা। এই ঘটনা শিক্ষা দেয় যে, নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং অপরাধ প্রবণতা রুখতে ধর্ষক ও খুনিদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে দৃষ্টান্তমূলক ও কঠোরতম শাস্তি দেওয়া আবশ্যক, যেন আর কোনো অপরাধী এমন সাহস না পায়।
উল্লেখ্য: সপ্তম শ্রেণীতে পড়ুয়া ১৪/১৫ বছরের মেয়েটা বর্তমান যুগের অন্য আর দশটা ছেলেমেয়ের মতো তাহমিনা নামের মেয়েটি ও মোবাইল ফোন ব্যবহার করতো।
মোবাইলে ফেসবুক মাধ্যমে খুব সহজেই যে কেউ চেনা অচেনা দেশী বিদেশী ছেলেমেয়েরা একেঅপরের সাথে বন্ধুত্ব পূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করতে পারছে।
তানজিম নামের মেয়েটি ও তেমন কারো সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করেছিলো।
কোনো কারণ বসোত চঞ্চলা ও দুরন্তপনা এই মেয়েটা পরিবারের নিষেধ অমান্য করে নিজের স্বাধীনতাকে প্রাধান্য দিয়ে জেদের বসে বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে, কক্সবাজার ভ্রমণে গিয়ে বন্ধুর সাথে দু’দিন সমুদ্র উদযাপন করে বাড়ির উদ্দেশ্যে ফিরে আসেন।
গভীর রাতে নিজ এলাকার স্ট্যান্ডে নেমে মোবাইলে চার্জ দিয়ে অটোরিকশা ঠিক করে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হয়।
এই গহিন রাতে একাকীনী একটা তরুণীকে যাত্রিবেশে পেয়ে নেশাগ্রস্থ অটোরিকশা চালকের মনে দুষ্ট বুদ্ধির উদয় হয়।
সে অনুযায়ী সে সঠিক পথ দিয়ে না গিয়ে ভিন্ন নির্জন পথ দিয়ে যেতে থাকায় কিশোরীর মেয়েটির মনে ভয় ও সন্দেহের কাজ করলে ওই গভীর রাতে তার পিতাকে লোকেশন মাধ্যমে হোয়াটসঅ্যাপ এ মাসেজ দিয়ে জানান বাবা আমি বিপদে পড়েছি আমাকে উদ্ধার করে নিয়ে যাও।
কিন্তু সে সময় তার পিতা ঘুমিয়ে থাকায় সে ম্যাসেজ না দেখতে পেয়ে মেয়ে উদ্ধার ও বাঁচাতে পারেনি।
নারকীয় মর্মান্তিকভাবে নির্যাতনের মাধ্যমে তার মৃত্যু বরণ করতে হয়।
সকালে তার পিতা মোবাইলে ম্যাসেজ দেখে মেয়েকে উদ্ধার করতে এসে দেখতে পান তার মেয়ে ইতিমধ্যে অত্যাচারের স্বীকার হয়ে হৃদয় বিদারক ভাবে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন!
আপনি একবার চিন্তা করুন তো, আপনার মাথাটা ধানক্ষেতের কাঁদার মাঝে কেউ পা দিয়ে চেপে ধরে রেখেছে। আপনি হাত পা ছুড়াছুড়ি করছেন জীবনের সব শক্তি দিয়ে। একেতো ধর্ষণের শরীর।
নাকে-মুখে-চোখে কাঁদায় একাকার। একবার নি:শ্বাস নেয়ার জন্য, বাঁচার জন্য অপ্রাণ চেষ্টা করছেন। কাঁদায় সমস্ত শরীরটা লাফালাফি করছে বাঁচার জন্য, যেভাবে মুরগী লাফায় জবাই করলে বা গরু ছাগল জবাইয়ের সময়ে। ঐদিকে শক্তিশালী নেশাগ্রস্থ নরপিশাচ অটোচালক সুমন তার পৈশাচিক সর্বশক্তি দিয়ে আপনার মৃত্যু নিশ্চিতের জন্য বিজয়ের প্রহর গুনছে। কিছুক্ষণ পর সব চুপচাপ। সমস্ত পৃথিবী উলঙ্গ হয়ে শান্ত চিত্তে পড়ে রইলো লালমাইয়ের এক অন্ধকার ধানক্ষেতের কাদামাটিতে।
নি: স্তব্ধ গভীর ওই রাতে দূরে ঝিঁঝি পোকা ডাকছে, আকাশে তখন লক্ষ তারা জ্বলজ্বল করছে, হালকা শীতের আনাগোনা, এলাকার মানুষ কেউ কেউ তখন কাঁথা গায়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, কিছুক্ষণ পর ভোর হবে, পূর্ব দিকে রক্তিম সূর্য উঠবে, আমরা ব্যস্ত হয়ে পড়ব জীবনের তাগিদে।
তারপর হঠাৎ ফেসবুকে দেখব
অচেনা একটা তরুণীর বিভৎস ও বিবস্ত্র মৃত্যু দেহ পড়ে আছে বেওয়ারিশ হিসেবে।
ফেসবুক মাধ্যমে প্রচারের পর বিভিন্ন মিডিয়ার সংবাদকর্মীরা আসবে। প্রচার হবে টিভিতে জানবে এলাকার সকল মানুষ জানবে দেশ থেকে দেশান্তরের মানুষ এমনিভাবে
তাজমিন নামের এক মেয়ের মৃতদেহ পাওয়া গেছে ধানক্ষেতে পড়েছিলেন তাহমিনা এর মরদেহ।
এমন ঘটনা এটাই প্রথম তা কিন্তু নয়?
কিছুদিন পূর্বে রামিসা নামের ৮বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে, অপ্রতিম নামের এক কিশোরকে মাথা থেঁতলে ছিন্নভিন্ন করা হয়েছে। শেয়াল শরীরের মাংস নিয়ে টানাহেঁচড়া করছে। গা ছমছম করে উঠবে এমন বিভিৎস কাহিনী শুনে, শরীরে কাঁপুনি দিবে। চোখে মনের অজান্তেই জল জমতে থাকবে।
অথবা, মনে মনে বলবেন, ঠিকই আছে। এই বয়সে আইফোন!! টিকটক বানাস.! বাইক চালাস.! এই বয়সে কক্সবাজার..! রেইপ করেছে, ঠিকই আছে। ওড়না পড়স না, ধর্ষণ তো করবেই!
কিন্তু এর বিপরীতে যদি বলা হয়, অপরাধের সম্পূর্ণ দায় এবং দোষ একমাত্র অপরাধীর (ধর্ষকের)। কোনো মানুষের পোশাক, বয়স বা সে কী অ্যাপ ব্যবহার করছে বা কোথায় ঘুরতে যাচ্ছে-সেটি কোনোভাবেই অন্য একজন মানুষকে অপরাধ করার লাইসেন্স বা অধিকার দেয় না। অপরাধ ঘটে অপরাধীর বিকৃত মানসিকতা এবং সদিচ্ছার কারণে, ভুক্তভোগীর আচরণের জন্য নয়।
একটি স্বাধীন সমাজে প্রত্যেকেরই নিজস্ব পছন্দ অনুযায়ী চলার, পোশাক পরার বা ঘুরে বেড়ানোর অধিকার রয়েছে। এর বিপরীতে যুক্তি দেওয়া হয় যে, কাউকে হেনস্তা বা আক্রমণ না করে কেউ যদি নিজের মতো জীবনযাপন করে, তবে তাকে কোনো অপরাধের শিকার হতে হবে-এই ধারণাটি মৌলিক মানবাধিকারের পরিপন্থী।
পোশাক বা আচরণের অজুহাত দিয়ে অপরাধকে হালকা করার বিপরীতে বলা হয়, রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব হলো প্রতিটি নাগরিকের (সে যেভাবে বা যে বয়সেই চলুক না কেন) নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অপরাধকে জাস্টিফাই বা বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করলে সমাজে অপরাধীদের সাহস আরও বেড়ে যায় এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হয়।
শুধু পারিবারিক সচেতনতা ও শাসনে এটা সম্ভব নয়, যেমন তাজমিন পারিবারিক শাসনকে তোয়াক্কা না করে বাড়ি থেকে মিথ্যা কথা বলে, বন্ধুর সাথে কয়েকদিনের ভ্রমণে যাওয়ায়, তার সাথে নির্মম ঘটে যাওয়া, অনাকাঙ্খিত নির্যাতন ও মর্মান্তিক হৃদয় বিদারক মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।
এর জন্য পারিবারিক সচেতনতার পাশাপাশি প্রয়োজন সামাজিক ও রাষ্ট্রের উদ্যোগ।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।












