বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩
বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩

তুমি সাধু, আমি চোর: ভাবছি কি ?

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১৩ মে, ২০২৬, ১১:২৯ অপরাহ্ণ
তুমি সাধু, আমি চোর: ভাবছি কি ?

সচ্চিদানন্দ দে সদয়
বাংলা ভাষায় কিছু কিছু বাক্য আছে, যেগুলো ছোট হলেও সমাজের গভীর বাস্তবতাকে অসাধারণ শক্তিতে প্রকাশ করে। “তুমি সাধু, আমি চোর”Ñতেমনই একটি বাক্য। এই কথার ভেতরে আছে আত্ম সমালোচনার অভাব, সামাজিক ভ-ামি, ক্ষমতার দ্বিচারিতা এবং মানুষের চিরন্তন প্রবণতাÑনিজেকে নির্দোষ আর অন্যকে অপরাধী ভাবার মানসিকতা। আজকের সমাজে এই প্রবণতা শুধু ব্যক্তিগত আচরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি পরিবার, রাজনীতি, প্রশাসন, শিক্ষা, ধর্মীয় পরিম-ল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমÑসবখানেই বিস্তৃত।আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন মানুষ সত্যের চেয়ে নিজের ভাবমূর্তি নিয়ে বেশি চিন্তিত। সমাজে কে কতটা সৎ, তার চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে কে কত সুন্দরভাবে নিজেকে সৎ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে। ফলে সততার চর্চার চেয়ে সততার অভিনয়ই বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। আর এখানেই “তুমি সাধু, আমি চোর” বাক্যটির গভীর তাৎপর্য। মানুষ সাধারণত নিজের ভুলকে পরিস্থিতির কারণে ব্যাখ্যা করতে চায়, কিন্তু অন্যের ভুলকে চরিত্রগত ত্রুটি হিসেবে দেখে। মনোবিজ্ঞানে এটিকে বলা হয় ংবষভ-ংবৎারহম নরধং। অর্থাৎ নিজের ব্যর্থতা বা অন্যায়কে যুক্তি দিয়ে বৈধতা দেওয়া এবং অন্যের ক্ষেত্রে কঠোর বিচার করা। আমাদের সমাজে এই প্রবণতা ভয়ংকর ভাবে বেড়েছে।রাস্তার এক ব্যক্তি ট্রাফিক আইন ভাঙলে নিজেকে বলেনÑ“অবস্থা এমন ছিল, না করে উপায় ছিল না।” কিন্তু অন্য কেউ একই কাজ করলে বলেনÑ“দেশটা শেষ হয়ে যাচ্ছে।” একজন ব্যবসায়ী কর ফাঁকি দিয়ে নিজেকে চালাক ভাবেন, কিন্তু অন্যের দুর্নীতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। একজন রাজনৈতিক নেতা ক্ষমতায় থাকলে ভিন্ন ভাষায় কথা বলেন, বিরোধী দলে গেলে একই কাজকে অন্যায় বলেন।এই দ্বিচারিতা সমাজে নতুন কিছু নয়। তবে এখন এর মাত্রা বেড়েছে। কারণ আমরা ক্রমে এমন এক সংস্কৃতির দিকে এগোচ্ছি, যেখানে আত্মসমালোচনা দুর্বলতা হিসেবে বিবেচিত হয়। ভুল স্বীকার করাকে ব্যর্থতা মনে করা হয়। ফলে সবাই নিজেকে “সাধু” প্রমাণ করতে ব্যস্ত, আর অন্যকে “চোর” বানাতে আগ্রহী।আজ সমাজে নৈতিকতার ভাষণ খুব বেশি শোনা যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম খুললেই দেখা যায়Ñমানবতা, নীতি, দেশপ্রেম, ধর্মীয় মূল্যবোধ নিয়ে দীর্ঘ বক্তব্য। কিন্তু বাস্তবে সেই বক্তব্যের প্রতিফলন কতটুকু? একজন ব্যক্তি অনলাইনে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন, কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে ছোটখাটো সুবিধার জন্য অনৈতিক পথ বেছে নেন। কেউ নারী অধিকারের কথা বলেন, অথচ নিজের পরিবারে নারীর মতামতকে মূল্য দেন না। কেউ ধর্মের কথা বলেন, কিন্তু মানবিকতার জায়গায় সংকীর্ণতা লালন করেন। এই বৈপরীত্য সমাজকে ধীরে ধীরে অসাড় করে দিচ্ছে। কারণ মানুষ যখন বারবার কথার সঙ্গে কাজের অমিল দেখে, তখন তারা নৈতিকতার ওপর আস্থা হারাতে শুরু করে। তখন সত্যিকারের সৎ মানুষও সন্দেহের চোখে দেখা হয়। সমস্যা হলো, আমরা এখন নৈতিকতাকে জীবনচর্চা নয়, বরং সামাজিক পরিচয়ের অংশ বানিয়ে ফেলেছি। মানুষ ভালো হওয়ার চেয়ে ভালো দেখাতে বেশি আগ্রহী। ফলে ভেতরের পরিবর্তনের চেয়ে বাইরের প্রদর্শন বড় হয়ে উঠেছে। একটি শিশুর প্রথম শিক্ষা শুরু হয় পরিবার থেকে। কিন্তু অনেক পরিবারেই শিশুকে অজান্তেই শেখানো হয় দ্বিচারিতা। তাকে বলা হয়Ñ“বাইরের মানুষের সামনে এমন কথা বলবে না”, “অতিথির সামনে ভালো ব্যবহার করো”, “মানুষ কী বলবে সেটা ভাবো।”এই শিক্ষাগুলো পুরোপুরি ভুল নয়। সামাজিক শিষ্টাচার প্রয়োজন আছে। কিন্তু সমস্যা হয় তখন, যখন শিশুকে সত্যের চেয়ে সামাজিক ভাবমূর্তিকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে শেখানো হয়। তখন সে ধীরে ধীরে বুঝতে শেখেÑভালো হওয়া জরুরি নয়, ভালো দেখানো জরুরি।অনেক পরিবারে বাবা-মা নিজেরাই নিয়ম ভাঙেন, কিন্তু সন্তানকে নিয়ম মানতে বলেন। সন্তান তখন বিভ্রান্ত হয়। সে দেখে, নীতির কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না। ফলে তার মধ্যেও দ্বৈত মানসিকতা তৈরি হয়। একসময় এই শিশুরাই বড় হয়ে সমাজের দায়িত্ব নেয়। তারা অফিসে, রাজনীতিতে, ব্যবসায় কিংবা সামাজিক জীবনে একই সংস্কৃতি বহন করে। ফলে আত্মপ্রবঞ্চনা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা জ্ঞান দিচ্ছে, দক্ষতা তৈরি করছে, কিন্তু নৈতিক সাহস গড়ে তুলতে পারছে কি? পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার চাপ এত বেশি যে, অনেক শিক্ষার্থী ছোটবেলা থেকেই প্রতিযোগিতাকে নৈতিকতার চেয়ে বড় মনে করতে শেখে।শিক্ষার্থীরা দেখেÑযে বেশি নম্বর পায়, সমাজ তাকে বেশি সম্মান দেয়। সে কীভাবে সেই নম্বর পেল, সেটি বড় প্রশ্ন নয়। ফলে অনেকেই শর্টকাট খোঁজে। কেউ নকল করে, কেউ কোচিং নির্ভর হয়ে পড়ে, কেউ মুখস্থ বিদ্যার ওপর নির্ভর করে।একটি সমাজ যখন সাফল্যকে নৈতিকতার ওপরে স্থান দেয়, তখন সেখানে সততা দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন মানুষ ভাবেÑ“সবাই করছে, আমি করলে দোষ কোথায়?” এই মানসিকতা ধীরে ধীরে পুরো সমাজকে গ্রাস করে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষা কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না। শিক্ষকদের আচরণ, প্রশাসনের স্বচ্ছতা এবং শিক্ষার পরিবেশের মধ্যেও নৈতিকতার প্রতিফলন থাকতে হবে। সত্যিকারের ধর্ম মানুষকে বিনয়ী করে। সে নিজের ভুল দেখতে শেখায়। কিন্তু যখন ধর্ম অহংকারের উপকরণ হয়, তখন মানুষ নিজেকে “সাধু” ভাবতে শুরু করে এবং অন্যকে “চোর” হিসেবে বিচার করতে থাকে। রাজনীতিতে এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। ক্ষমতায় থাকলে এক ধরনের বক্তব্য, বিরোধী দলে গেলে আরেক ধরনের বক্তব্যÑএ যেন বহু দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ। একসময় যে দল মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলেছিল, ক্ষমতায় গিয়ে তারাই সমালোচনা সহ্য করতে চায় না। যারা বিরোধী অবস্থানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়, তারাই ক্ষমতায় গিয়ে একই অভিযোগে অভিযুক্ত হয়। এতে জনগণের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। তারা মনে করতে শুরু করেÑসবাই একই। ফলে গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা দুর্বল হয়। মানুষ রাজনীতিকে সেবার জায়গা হিসেবে না দেখে ক্ষমতার খেলা হিসেবে দেখতে শুরু করে।রাজনীতির সবচেয়ে বড় সংকট এখানেইÑআদর্শের চেয়ে ক্ষমতা বড় হয়ে ওঠা। আর ক্ষমতা যখন নৈতিকতার ওপরে উঠে যায়, তখন সমাজে “তুমি সাধু, আমি চোর” সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের মতপ্রকাশের সুযোগ তৈরি করেছে, এটি ইতিবাচক দিক। কিন্তু একই সঙ্গে এটি এক ধরনের কৃত্রিম আত্মপ্রদর্শনের সংস্কৃতিও তৈরি করেছে। এখানে সবাই নিজের জীবনের সুন্দর অংশগুলো দেখাতে চায়। কেউ নিজের দুর্বলতা, ব্যর্থতা বা ভুল প্রকাশ করতে চায় না। ফলে এমন এক ভার্চ্যুয়াল বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, যেখানে সবাই সফল, সবাই সচেতন, সবাই নৈতিক।এই সংস্কৃতি মানুষকে ভেতর থেকে আরও একাকী ও ভ- করে তুলছে। কারণ বাস্তব জীবনের মানুষ আর অনলাইন পরিচয়ের মধ্যে বিশাল ফারাক তৈরি হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন নৈতিক ক্ষোভও এক ধরনের ট্রেন্ড। কোনো ঘটনা ঘটলেই মানুষ দ্রুত বিচারক হয়ে ওঠে। প্রমাণের আগেই কাউকে দোষী বানানো হয়। সবাই যেন নৈতিকতার আদালতের বিচারপতি।কিন্তু প্রশ্ন হলোÑআমরা কি নিজেদের একইভাবে বিচার করি? গণমাধ্যম সমাজের দর্পণ। কিন্তু এই দর্পণও অনেক সময় প্রভাব, ব্যবসা ও রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে ঝাপসা হয়ে যায়। কোনো ঘটনা বিশেষভাবে প্রচার পায়, কোনো ঘটনা চাপা পড়ে যায়। মিডিয়া যখন নিরপেক্ষতা হারায়, তখন মানুষ সত্য সম্পর্কে বিভ্রান্ত হয়। তারা বুঝতে পারে নাÑকোনটা প্রকৃত তথ্য, আর কোনটা সাজানো বয়ান। এতে সমাজে অবিশ্বাস বাড়ে। একই সঙ্গে দর্শক বা পাঠকের মধ্যেও এক ধরনের নির্বাচিত নৈতিকতা কাজ করে। নিজের পছন্দের ব্যক্তি বা দলের ভুলকে ছোট করে দেখা হয়, অপছন্দের ব্যক্তির ভুলকে বড় করে দেখানো হয়। এই প্রবণতা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য বিপজ্জনক। কারণ তখন সত্য নয়, পক্ষপাত বড় হয়ে ওঠে। একটি সভ্য সমাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো আত্মসমালোচনার ক্ষমতা। ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রÑসবারই নিজের ভুল বিশ্লেষণ করার সাহস থাকতে হয়। কিন্তু আমাদের সমাজে আত্মসমালোচনা ক্রমেই কমে যাচ্ছে। কেউ ভুল স্বীকার করতে চায় না। কারণ ভুল স্বীকার করলে দুর্বল ভাবা হবেÑএমন ভয় কাজ করে। ফলে মানুষ আত্মরক্ষামূলক হয়ে ওঠে। সে যুক্তি দাঁড় করায়, দায় অন্যের ওপর চাপায়, পরিস্থিতিকে দোষ দেয়। কিন্তু নিজের ভেতরে তাকায় না। আত্মসমালোচনার অভাব মানুষকে উন্নতির পথ থেকেও দূরে সরিয়ে দেয়। কারণ ভুল না মানলে সংশোধনের সুযোগও থাকে না। আজকের সমাজে সত্য বলা কঠিন। কারণ সত্য অনেক সময় সুবিধার বিরুদ্ধে যায়। কর্মক্ষেত্রে সত্য বললে চাকরি ঝুঁকিতে পড়ে, রাজনীতিতে সত্য বললে হুমকি আসে, সামাজিক জীবনে সত্য বললে সম্পর্ক নষ্ট হয়। ফলে মানুষ নীরবতা বেছে নেয়। কেউ কেউ আপস করে। ধীরে ধীরে সমাজে সত্য বলার সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে পড়ে।একসময় দেখা যায়Ñমিথ্যাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে। তখন মানুষ সত্য শুনতে অস্বস্তি বোধ করে।
এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে ভয়ংকর। কারণ কোনো সমাজ যদি সত্যের জায়গা হারিয়ে ফেলে, তাহলে সেখানে ন্যায়বিচারও দুর্বল হয়ে পড়ে।সমাজে প্রকৃত ভালো মানুষ খুব বেশি প্রচার পান না। কারণ সত্যিকারের সৎ মানুষ সাধারণত নিজের সততা নিয়ে প্রচারণা চালান না। তারা নীরবে কাজ করেন।প্রকৃত ভালো মানুষ নিজের ভুল স্বীকার করতে জানেন। তিনি অন্যকে ছোট করে নিজেকে বড় করার চেষ্টা করেন না। তিনি জানেনÑমানুষ হিসেবে সবারই সীমাবদ্ধতা আছে। কিন্তু আমাদের সমাজে এখন উচ্চকণ্ঠ মানুষ বেশি দৃশ্যমান। যারা বেশি নৈতিকতার ভাষণ দেন, তাদেরই অনেক সময় বেশি সম্মান দেওয়া হয়। ফলে প্রকৃত বিনয় হারিয়ে যাচ্ছে। সমাজ পরিবর্তনের শুরু হতে হবে ব্যক্তি থেকে। প্রত্যেক মানুষকে নিজের ভেতরে তাকাতে হবে। প্রশ্ন করতে হবেÑআমি কি সত্যিই সেই মানুষ, যেভাবে নিজেকে উপস্থাপন করি? পরিবারে শিশুদের সত্য বলার সাহস শেখাতে হবে। ভুল করলে তা স্বীকার করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিকতা শুধু পাঠ্যবইয়ে নয়, বাস্তব আচরণে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।রাজনীতিতে আদর্শ ও জবাবদিহি শক্তিশালী করতে হবে। ধর্মকে বাহ্যিক পরিচয়ের বদলে মানবিকতার চর্চা হিসেবে দেখতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দায়িত্বশীল আচরণ বাড়াতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের বুঝতে হবেÑভুল করা মানবিক, কিন্তু ভুল অস্বীকার করা বিপজ্জনক। “তুমি সাধু, আমি চোর”Ñএই বাক্যটি কেবল ব্যঙ্গ নয়; এটি আমাদের সমাজের গভীর অসুখের প্রতীক। আমরা এমন এক সময়ের মধ্যে বাস করছি, যেখানে মানুষ নিজের মুখোশ রক্ষা করতে ব্যস্ত, কিন্তু আত্মার আয়নায় তাকাতে ভয় পায়।সভ্যতার অগ্রগতি প্রযুক্তি দিয়ে হয়, কিন্তু মানবিক অগ্রগতি হয় সততা দিয়ে। সমাজ তখনই সুস্থ হয়, যখন মানুষ অন্যকে বিচার করার আগে নিজের বিবেককে প্রশ্ন করে। আমাদের দরকার এমন এক সংস্কৃতি, যেখানে ভুল স্বীকার করাকে দুর্বলতা নয়, সাহস হিসেবে দেখা হবে। যেখানে মানুষ নিজেকে সাধু প্রমাণের চেয়ে ভালো মানুষ হওয়ার চেষ্টা করবে। কারণ শেষ পর্যন্ত, সমাজকে বদলানোর সবচেয়ে বড় শক্তি আইন নয়, প্রযুক্তি নয়, ক্ষমতাও নয়Ñমানুষের বিবেক। আর সেই বিবেক জাগ্রত হওয়ার প্রথম শর্ত হলো নিজের ভেতরের অন্ধকারকে স্বীকার করা।যেদিন আমরা বলতে শিখবÑ“হ্যাঁ, আমারও ভুল আছে”Ñসেদিনই হয়তো “তুমি সাধু, আমি চোর” সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে একটি সত্যভিত্তিক মানবিক সমাজ গড়ার পথ খুলে যাবে। লেখক: সংবাদকর্মী

Ads small one

সম্পাদকীয়/ প্রসঙ্গ: ডেঙ্গু সচেতনতার পাশাপাশি প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬, ৩:০০ পূর্বাহ্ণ
সম্পাদকীয়/ প্রসঙ্গ: ডেঙ্গু সচেতনতার পাশাপাশি প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ

বর্ষার স্থায়িত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খুলনার পাইকগাছায় হঠাৎ করেই ডেঙ্গু রোগীর প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসের তুলনায় জুলাই মাসে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি দাঁড়িয়েছে। হঠাৎ করে এডিস মশাবাহিত এই রোগের বিস্তার স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই তীব্র উদ্বেগ ও আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের মতে, বাসাবাড়ির আঙিনায় কিংবা আশপাশে জমে থাকা পরিষ্কার পানি—যেমন পরিত্যক্ত পাত্র, টায়ার, ড্রেন ও ডাবের খোসাই এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র হিসেবে কাজ করছে। এ ছাড়া উপজেলার বাইরে থেকেও আক্রান্ত রোগী আসার কারণে সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সচেতনতামূলক প্রচার চালানো সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। চিকিৎসকদের বক্তব্য স্পষ্ট—ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতা এবং মশারির ব্যবহার প্রাথমিক ও কার্যকর প্রতিরোধক।
তবে বাস্তবতা হলো, কেবল সচেতনতামূলক বার্তা কিংবা পরামর্শ প্রদান করে এমন জনস্বাস্থ্য সংকট পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। সাধারণ মানুষের নিজস্ব সচেতনতার পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের সমন্বিত সমন্বয় এখানে অত্যন্ত জরুরি।
পাইকগাছার বর্তমান পরিস্থিতি যেন মহামারীর দিকে মোড় না নেয়, সে জন্য অবিলম্বে কয়েকটি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। তা হলোÑ পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদগুলোর উদ্যোগে পাইকগাছার প্রতিটি ওয়ার্ডে অবিলম্বে কার্যকর ওষুধ প্রয়োগ (ফগিং ও লার্ভিসাইড স্প্রে) শুরু করতে হবে। ড্রেন, বদ্ধ জলাশয় ও জমে থাকা পানির স্থানগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিয়মিত পরিষ্কার করার ব্যবস্থা নিতে হবে। জ্বর হলেই যেন রোগীরা হাসপাতালে এসে পরীক্ষা করান, সে লক্ষ্যে চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য রাখা এবং গ্রামপর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের নজরদারি বাড়াতে হবে। কাজের তাগিদে বা ভ্রমণের কারণে যারা বাইরে থেকে উপজেলায় আসছেন, তাঁদের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত পরীক্ষার আওতায় আনতে হবে।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি জটিল রূপ নেওয়ার আগেই সমন্বিত ও দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। প্রশাসনিক তৎপরতা এবং জনসচেতনতাÑএই দুইয়ের সমন্বয় ছাড়া পাইকগাছাকে ডেঙ্গুমুক্ত রাখা সম্ভব নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অবিলম্বে মশক নিধন ও পরিচ্ছন্নতা অভিযানে জোর দেবেনÑএমনটাই প্রত্যাশা।

​মিরপুরে সাবেক গাড়িচালককে ‘হত্যার চেষ্টা’, এমপি গাজী নজরুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬, ২:৫৮ পূর্বাহ্ণ
​মিরপুরে সাবেক গাড়িচালককে ‘হত্যার চেষ্টা’, এমপি গাজী নজরুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ

Oplus_131072

​পত্রদূত ডেস্ক: ​সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অসামাজিক কার্যকলাপের গোপন তথ্য জেনে ফেলার কারণে সাবেক গাড়িচালক ও ব্যক্তিগত সহকারী ওবায়দুর রহমানকে পিটিয়ে হত্যার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটির বিচার দাবি করে এবং নিজের নিরাপত্তা চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে লিখিত আবেদন করেছেন ভুক্তভোগী ওবায়দুর রহমান। আবেদনটি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মাধ্যমে প্রেরণ করা হয়েছে।
​আবেদনে ওবায়দুর রহমান (জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর: ২৩৬৭৪৫০৬৫৩) উল্লেখ করেন, বিগত ১৪ জুলাই রাত সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর পল্লবী থানার উত্তর কালশীর আলীনগরে অবস্থিত ‘রোজ গার্ডেন টাওয়ার ২’-এর একটি ফ্ল্যাটে তাঁর ওপর অতর্কিত হামলা চালানো হয়।
​আবেদনকারীর দাবি, সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের নির্দেশে তিন ব্যক্তি লাঠিসোটা নিয়ে তাঁকে হত্যার উদ্দেশ্যে মারধর করেন। হামলার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে আবেদনে বলা হয়, ওবায়দুরের চিৎকার শুনে পাশের কক্ষ থেকে তাঁর মা ও ছোট বোন এসে তাকে উদ্ধার করেন। পরে রাত সাড়ে ১২টার দিকে তাকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে তিনি প্রাণভয়ে আত্মগোপনে রয়েছেন বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
​হামলার পেছনের কারণ হিসেবে ওবায়দুর রহমান আবেদনে দাবি করেন, তিনি এমপি গাজী নজরুলের দীর্ঘদিনের গাড়িচালক ও ব্যক্তিগত সহকারী ছিলেন। এই সুবাদে এমপির বিভিন্ন দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ব্যক্তিগত অসামাজিক কার্যকলাপের তিনি প্রত্যক্ষদর্শী।
​আবেদনে অভিযুক্ত সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে এলাকায় জমি ও বালুমহাল দখল, ঘুষ গ্রহণ এবং গ্যাং বা ‘মব’ গঠন করে সন্ত্রাসের অভিযোগ আনা হয়। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে এমপির বিতর্কিত গতিবিধির কয়েকটি নির্দিষ্ট তারিখ ও সময়ের কথা আবেদনে উল্লেখ করে তা সিসিটিভি ফুটেজ এবং ভিডিও প্রমাণের মাধ্যমে যাচাই করার দাবি জানানো হয়। ​এমপি গাজী নজরুলের আদেশে এই হামলা চালানো হয়েছে দাবি করে ওবায়দুর রহমান অভিযুক্ত হামলাকারী এবং নির্দেশদাতার বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি নিজের জীবনের নিরাপত্তার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছেন।
এদিকে বিতর্কের মুখেই ২১ জুলাই নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে একটি লিখিত বিবৃতি দিয়ে ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়েছেন সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম। লিখিত বিবৃতিতে তিনি অভিযোগ করেন, ঘটনাটি গত ১৩ জুলাইয়ের এবং এর পেছনে তাঁর নিজস্ব গাড়িচালকের সুপরিকল্পিত ব্ল্যাকমেইলিং ও চাঁদাবাজির নীল নকশা রয়েছে।
বিবৃতিতে ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি জানান, গত ১৩ জুলাই তিনি তাঁর প্রথমা স্ত্রী মোসাম্মৎ মাকছুদা বেগম, দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম বেগম এবং গাড়িচালক ওবায়দুল্লাহকে সঙ্গে নিয়ে মগবাজারে অবস্থিত দ্বিতীয় স্ত্রীর পিতা মো. মাসুম বিল্লাহর ব্যবসায়িক কার্যালয়ে যান। সেখানে তাঁরা আনুমানিক সোয়া এক ঘণ্টা অবস্থান করেন। অবস্থানকালে গাড়িচালক ওবায়দুল্লাহ সুকৌশলে ৬ থেকে ৭ জন অপরিচিত ব্যক্তিকে ওই কার্যালয়ে ঢোকার ব্যবস্থা করে দেয়।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ওই অপরিচিত ব্যক্তিরা কক্ষে ঢুকে তাঁর ও পরিবারের সদস্যদের পরিচয় জানতে চেয়ে চরম হেনস্তা করে। একপর্যায়ে তাঁদের কার্যালয়ের নিচে একটি চায়ের দোকানে নিয়ে গিয়ে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। সে সময় তাৎক্ষণিকভাবে কিছু টাকা প্রদান করার পরই তাঁরা সেখান থেকে রেহাই পান।
ঘটনার পরবর্তী পরিস্থিতিতে গাজী নজরুল ইসলাম জানতে পারেন যে, এই পুরো ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন তাঁর গাড়িচালক ওবায়দুল্লাহ, যিনি সম্পর্কে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীর মামা। সংসদ সদস্য জানান, তাঁর শ্বশুর মাসুম বিল্লাহর সঙ্গে ওবায়দুল্লাহর দুলাভাইয়ের পারিবারিক পূর্বশত্রুতা ছিল। ঘটনার দিন রাত আনুমানিক ১০টার দিকে ওবায়দুল্লাহ তাঁর কাছে ৫ লাখ টাকা এবং মাসুম বিল্লাহর কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানো হলে অফিসের সিসিটিভি ফুটেজ ব্যবহার করে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করা এবং পরিবারের ক্ষতি করার সরাসরি হুমকি দেওয়া হয়।

দেশের সীমানা পেরিয়ে বিবিসির খবরেও এমপি গাজী নজরুল

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬, ২:৫০ পূর্বাহ্ণ
দেশের সীমানা পেরিয়ে বিবিসির খবরেও এমপি গাজী নজরুল

Oplus_131072

ভিডিওতে ভাইরাল, জামায়াত এখন কী করবে
পত্রদূত রিপোর্ট: সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজী নজরুল ইসলামের একটি ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনাটি কেন্দ্র করে সংসদ সদস্য, তাঁর প্রথম স্ত্রী, দ্বিতীয় স্ত্রী, শ্বশুর ও দলীয় নেতাদের কাছ থেকে নানা ব্যাখ্যামূলক ও পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া গেছে। পাশাপাশি ইন্টারনেটে দ্বিতীয় স্ত্রীর একটি বিতর্কিত জীবনবৃত্তান্ত (বায়োডাটা) ও কাবিননামা ছড়িয়ে পড়ায় বিষয়টি নতুন মোড় নিয়েছে। বিষয়টি মঙ্গলবার টক অব দ্য কান্ট্রিতে পরিণত হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় ওঠে। দেশের সীমানা পেরিয়ে বিবিসির খবরেও স্থান পায় এমপি গাজী নজরুল ইসলাম। বিবিসির খবরে বলা হয়Ñ এক তরুণীর সাথে নিজের ‘ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের একটি ভিডিও’ সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম বলছেন, ওই তরুণী তার দ্বিতীয় স্ত্রী। তার দাবি, তিনি তার প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে গত ১৭ই জুন ওই তরুণীকে বিয়ে করেছেন।
যদিও সামাজিক মাধ্যমে ওই তরুণীর একটি জীবন বৃত্তান্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এতে সবুজ কালির কলমে ‘জোর সুপারিশ করছি’ লিখে স্বাক্ষর করেছেন মি. ইসলাম, যাতে তারিখ উল্লেখ আছে ২২শে জুন ২০২৬। ওই জীবন বৃত্তান্তে তরুণীটির বৈবাহিক অবস্থা ‘অবিবাহিত’ উল্লেখ রয়েছে।
ভাইরাল হয়ে পড়া ওই জীবন বৃত্তান্ত অনুযায়ী তরুণীটি ২০০৮ সালের ২২শে মে জন্মগ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ ৭৭ বছর বয়েসি মি. ইসলামের দাবি অনুযায়ী ১৭ই জুন বিয়ে হলে ওই দিন তরুণীটির বয়স ছিল ১৮ বছর ২৬দিন।
গাজী নজরুল ইসলাম এর আগে পঞ্চম ও অষ্টম জাতীয় সংসদে জামায়াত দলীয় সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। সম্প্রতি জাতীয় সংসদের স্পীকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদে জানিয়েছিলেন যে, মি ইসলাম একজন মুক্তিযোদ্ধা।
এদিকে তরুণীর সাথে ঘনিষ্ঠতার ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর ‘মেয়েদের শালীনভাবে চলাফেরা ও মাথায় পর্দা রাখার পরামর্শ’ দেওয়া নিয়ে মি. ইসলামের একটি বক্তব্যের পুরনো ভিডিও নতুন করে সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসিকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারের সময় তিনি ওই মন্তব্য করেছিলেন।
জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন যে ঘটনাটির দিকে তারা দলীয়ভাবে নজর রাখছেন এবং বেআইনি বা অবৈধ কিছুর প্রমাণ পেলে সে অনুযায়ী দল ব্যবস্থা নিবে বলে জানিয়েছেন তিনি। তার দল জামায়াতে ইসলামীর দিক থেকেও একই বক্তব্য দিয়ে বিবৃতি দেওয়া হয়েছে।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে পাঞ্জাবি পরিহিত অবস্থায় গাজী নজরুল ইসলামকে সালোয়ার কামিজ পরিহিত এক তরুণীর সাথে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখা গেছে। তার এই ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও ধারণ ও ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য মি. ইসলাম ওই তরুণীর এক মামাকে দায়ী করেছেন।
কিন্তু ওই তরুণী তার বিবাহিত স্ত্রী হয়ে থাকলে তার মামা কেন এটি করবে সেই প্রশ্নের কোনো জবাব আসেনি কোনো পক্ষ থেকে।
সোমবার বিকেল থেকেই ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়াতে শুরু করলে প্রথম দিকে ফেসবুকে তার সমর্থকরা এটি ‘এআই ব্যবহার করে করা হয়েছে’ উল্লেখ করে পাল্টা প্রচারণা শুরু করে। কিন্তু মঙ্গলবার সকাল নাগাদ কয়েকটি ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠান দাবি করে যে ভিডিও এআই দিয়ে বানানো নয়।
এসব নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই মঙ্গলবার বেলা ১২টা ০১ মিনিটে নিজের ফেসবুক পাতায় একটি বিবৃতি দিয়েছেন গাজী নজরুল ইসলাম।
এতে তিনি দাবি করেন, গত ১৭ই জুন পারিবারিকভাবে তার প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে দ্বিতীয় স্ত্রীর পিতার বাসভবনে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। ফলে তার বিরুদ্ধে ‘প্রচারিত অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের কোনো সত্যতা নেই’ বলে দাবি করেন তিনি।
বিবৃতিতে তিনি দাবি করেন যে, গত ১৩ জুলাই, ২০২৬ ইং তারিখে তিনি তার প্রথমা ও দ্বিতীয় স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে রাজধানীর মগবাজারে তার দ্বিতীয় স্ত্রীর পিতার ব্যবসায়িক অফিসে যান।
“সেখানে আমরা আনুমানিক সোয়া এক ঘণ্টা অবস্থান করি। আমরা উক্ত অফিসে অবস্থানকালে যোহরের নামাজ আদায়ের পূর্বে আমার গাড়িচালক ও আমার দ্বিতীয় স্ত্রীর মামা ওবায়দুল্লাহ গাড়ি দেখার কথা বলে বাইরে যায়। পরবর্তীতে সে ৫/৭ জন অপরিচিত ব্যক্তিকে নিয়ে আমাদের কক্ষে প্রবেশ করে এবং আমাদের জিম্মি করে ১ লক্ষ টাকা আদায় করে”।
তিনি ওই বিবৃতিতে আরও বলেন, “আমি চলাচলের জন্য যে ভাড়াকৃত গাড়িটি ব্যবহার করি, ওবায়দুল্লাহর যোগসাজশে পরবর্তীতে সেটিও আটকে রেখে দফায় দফায় আমাদের কাছে কয়েক লক্ষ টাকা দাবি করা হয়। আমরা টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে আমাদের বিভিন্ন ধরনের হুমকি দেওয়া হয়। আমি এসময় জানতে পারি, আমার দ্বিতীয় স্ত্রীর পিতা মোঃ মাসুম বিল্লাহর সঙ্গে ওবায়দুল্লাহর পূর্বশত্রুতা ও পারিবারিক বিরোধের জের ধরেই এই ষড়যন্ত্রের ঘটনা ঘটানো হয়েছে।
‘’পরবর্তীতে, হিংসা ও ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে ওবায়দুল্লাহ আমাদের স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত ও ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ভিডিও ধারণ করে ও ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কতিপয় অসাধু ব্যক্তি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভিডিওটিকে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের ঘটনা হিসেবে প্রচার করছে, যা সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত”।
কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জামায়াতের একজন এমপিকে তার বৈধ দ্বিতীয় স্ত্রীর মামা বা তার লোকেরা জিম্মি করে টাকা আদায় করবেন- এ দাবি কতটা যৌক্তিক তাও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
নজরুল ইসলামের দাবি অনুযায়ী ঘটনাটি ঘটেছে মগবাজারে, যেটি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের কাছেই। সাধারণত ওই এলাকায় জামায়াতের বহু কর্মী সমর্থকের উপস্থিতি থাকে।
সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আজিজুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলছেন, “কথাটা হয়তো যৌক্তিক মনে হচ্ছে না কিন্তু এমপি সাহেব আমাদের জানিয়েছেন যে তিনি তার স্ত্রীদের নিয়েই সেখানে গিয়েছিলেন। তার স্ত্রীরাও সামাজিক মাধ্যমে বলেছেন। তারপরেও আমরা সাংগঠনিকভাবে দেখবো যে তাকে হেয় করার চেষ্টা হয়েছে নাকি অন্য কিছু হয়েছে। সেটি দেখে সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নিবো আমরা”।
মঙ্গলবার দুপুরের পর পর গাজী নজরুল ইসলামের প্রথম স্ত্রী পরিচয় দিয়ে মাকসুদা ইসলাম একটি ভিডিও বার্তা দিয়েছেন সামাজিক মাধ্যমে। সেখানে তাকে লিখিত বিবৃতি পড়তে দেখা গেছে।
এতে তিনি বলেছেন, “আমার স্বামী গাজী নজরুল ইসলামের সহিত মরিয়মের (দ্বিতীয় স্ত্রী) সাথে বিবাহ হয়েছে। যারা এটা নিয়ে কুৎসা রটাচ্ছে তীব্র প্রতিবাদ জানাই। এ থেকে বিরত না থাকলে আমি আইনগত ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবো”।
এরপর নিজেকে গাজী নজরুল ইসলামের স্ত্রী পরিচয় দিয়েও আরেকটি বক্তব্য দেন গাজী নজরুল ইসলামের সাথে দেখা যাওয়া তরুণী। এই ভিডিওতে তাকে মুখে মাস্ক পরা দেখা গেছে। সেখানে ওই তরুণী বলেছেন, “আমার স্বামী সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে যে ভিডিও বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালানো হচ্ছে সে বিষয়ে আমি দেশবাসীর সামনে প্রকৃত ঘটনা সংক্ষেপে তুলে ধরতে চাই।’’
তিনি বলেন, “প্রথমত আমাদের বিয়ে কোনো গোপন বা অনৈতিক বিষয় নয়। ২০২৬ সালের ১৭ই জুন সাতক্ষীরার শ্যামনগর আমার বাবার বাসায় উভয় পরিবারের সম্মতিতে বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। এ সময় আমার স্বামীর প্রথম স্ত্রীও উপস্থিত ছিলেন। তেরই জুলাই গাজী নজরুল ইসলাম তার দুই স্ত্রীকে নিয়ে মগবাজারে আমার বাবার অফিসে যান”।
জামায়াতের নায়েবে আমির ও সংসদীয় দলের উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বিবিসি বাংলাকে বলছেন, বিষয়টি তাদের দৃষ্টিতে এসেছে এবং তারা এ বিষয়ে নজর রাখছেন।
“সামাজিক মাধ্যমে বিষয়টি নানাভাবে এসেছে। ওনার ও তার স্ত্রীদের বক্তব্যও এসেছে। তিনি যদি বেআইনি ও অবৈধ কিছু না করেন তাহলে সেটি তার ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু তিনি যদি বেআইনি ও অবৈধ কিছু করে থাকেন তাহলে অবশ্যই জামায়াত দল হিসেবে ব্যবস্থা নিবে,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।
সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আজিজুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলছেন, “এমপি সাহেব বলেছেন সাথে তার স্ত্রী ছিল। এখন সেই ভিডিও কিভাবে ভাইরাল হলো সেই তথ্য উদঘাটন করতে হবে। এটি কী তাকে হেয় করার চেষ্টা নাকি অন্য কোনো বিষয় সেটি সাংগঠনিকভাবে দেখে, শুনে ও বুঝে আমরা পদক্ষেপ নিব”।
গাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে তুমুল শোরগোলের মধ্যেই জামায়াতে ইসলামী বিবৃতি দিয়ে বলেছে যে, “গাজী নজরুল ইসলামকে জড়িয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত খবরের দিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নজর রাখছে”।
বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের সাতক্ষীরা-৪ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য জনাব গাজী নজরুল ইসলাম কে জড়িয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেসব খবরাখবর প্রচারিত হয়েছে তার প্রেক্ষিতে আজ ২১শে জুলাই (মঙ্গলবার) এক বিবৃতি প্রদান করেছেন।
তিনি বলেন, “অতি সম্প্রতি সাতক্ষীরা-৪ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে জড়িয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত খবরের দিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নজর রাখছে”।
“ইতোমধ্যেই বিষয়টি নিয়ে জনাব গাজী নজরুল ইসলামের নিজের বিবৃতি, তার প্রথম ও দ্বিতীয় স্ত্রী এবং দ্বিতীয় স্ত্রীর পিতার ভিডিও বক্তব্য মিডিয়াতে প্রকাশিত হয়েছে। এ বিষয়ে আরও খোঁজখবর নিয়ে এবং প্রকৃত ঘটনার তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সাংগঠনিক নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে,” বিবৃতিতে দলটি বলেছে।