বুধবার, ১৩ মে ২০২৬, ৩০ বৈশাখ ১৪৩৩
বুধবার, ১৩ মে ২০২৬, ৩০ বৈশাখ ১৪৩৩

তুমি সাধু, আমি চোর: ভাবছি কি ?

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১৩ মে, ২০২৬, ১১:২৯ অপরাহ্ণ
তুমি সাধু, আমি চোর: ভাবছি কি ?

সচ্চিদানন্দ দে সদয়
বাংলা ভাষায় কিছু কিছু বাক্য আছে, যেগুলো ছোট হলেও সমাজের গভীর বাস্তবতাকে অসাধারণ শক্তিতে প্রকাশ করে। “তুমি সাধু, আমি চোর”Ñতেমনই একটি বাক্য। এই কথার ভেতরে আছে আত্ম সমালোচনার অভাব, সামাজিক ভ-ামি, ক্ষমতার দ্বিচারিতা এবং মানুষের চিরন্তন প্রবণতাÑনিজেকে নির্দোষ আর অন্যকে অপরাধী ভাবার মানসিকতা। আজকের সমাজে এই প্রবণতা শুধু ব্যক্তিগত আচরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি পরিবার, রাজনীতি, প্রশাসন, শিক্ষা, ধর্মীয় পরিম-ল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমÑসবখানেই বিস্তৃত।আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন মানুষ সত্যের চেয়ে নিজের ভাবমূর্তি নিয়ে বেশি চিন্তিত। সমাজে কে কতটা সৎ, তার চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে কে কত সুন্দরভাবে নিজেকে সৎ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে। ফলে সততার চর্চার চেয়ে সততার অভিনয়ই বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। আর এখানেই “তুমি সাধু, আমি চোর” বাক্যটির গভীর তাৎপর্য। মানুষ সাধারণত নিজের ভুলকে পরিস্থিতির কারণে ব্যাখ্যা করতে চায়, কিন্তু অন্যের ভুলকে চরিত্রগত ত্রুটি হিসেবে দেখে। মনোবিজ্ঞানে এটিকে বলা হয় ংবষভ-ংবৎারহম নরধং। অর্থাৎ নিজের ব্যর্থতা বা অন্যায়কে যুক্তি দিয়ে বৈধতা দেওয়া এবং অন্যের ক্ষেত্রে কঠোর বিচার করা। আমাদের সমাজে এই প্রবণতা ভয়ংকর ভাবে বেড়েছে।রাস্তার এক ব্যক্তি ট্রাফিক আইন ভাঙলে নিজেকে বলেনÑ“অবস্থা এমন ছিল, না করে উপায় ছিল না।” কিন্তু অন্য কেউ একই কাজ করলে বলেনÑ“দেশটা শেষ হয়ে যাচ্ছে।” একজন ব্যবসায়ী কর ফাঁকি দিয়ে নিজেকে চালাক ভাবেন, কিন্তু অন্যের দুর্নীতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। একজন রাজনৈতিক নেতা ক্ষমতায় থাকলে ভিন্ন ভাষায় কথা বলেন, বিরোধী দলে গেলে একই কাজকে অন্যায় বলেন।এই দ্বিচারিতা সমাজে নতুন কিছু নয়। তবে এখন এর মাত্রা বেড়েছে। কারণ আমরা ক্রমে এমন এক সংস্কৃতির দিকে এগোচ্ছি, যেখানে আত্মসমালোচনা দুর্বলতা হিসেবে বিবেচিত হয়। ভুল স্বীকার করাকে ব্যর্থতা মনে করা হয়। ফলে সবাই নিজেকে “সাধু” প্রমাণ করতে ব্যস্ত, আর অন্যকে “চোর” বানাতে আগ্রহী।আজ সমাজে নৈতিকতার ভাষণ খুব বেশি শোনা যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম খুললেই দেখা যায়Ñমানবতা, নীতি, দেশপ্রেম, ধর্মীয় মূল্যবোধ নিয়ে দীর্ঘ বক্তব্য। কিন্তু বাস্তবে সেই বক্তব্যের প্রতিফলন কতটুকু? একজন ব্যক্তি অনলাইনে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন, কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে ছোটখাটো সুবিধার জন্য অনৈতিক পথ বেছে নেন। কেউ নারী অধিকারের কথা বলেন, অথচ নিজের পরিবারে নারীর মতামতকে মূল্য দেন না। কেউ ধর্মের কথা বলেন, কিন্তু মানবিকতার জায়গায় সংকীর্ণতা লালন করেন। এই বৈপরীত্য সমাজকে ধীরে ধীরে অসাড় করে দিচ্ছে। কারণ মানুষ যখন বারবার কথার সঙ্গে কাজের অমিল দেখে, তখন তারা নৈতিকতার ওপর আস্থা হারাতে শুরু করে। তখন সত্যিকারের সৎ মানুষও সন্দেহের চোখে দেখা হয়। সমস্যা হলো, আমরা এখন নৈতিকতাকে জীবনচর্চা নয়, বরং সামাজিক পরিচয়ের অংশ বানিয়ে ফেলেছি। মানুষ ভালো হওয়ার চেয়ে ভালো দেখাতে বেশি আগ্রহী। ফলে ভেতরের পরিবর্তনের চেয়ে বাইরের প্রদর্শন বড় হয়ে উঠেছে। একটি শিশুর প্রথম শিক্ষা শুরু হয় পরিবার থেকে। কিন্তু অনেক পরিবারেই শিশুকে অজান্তেই শেখানো হয় দ্বিচারিতা। তাকে বলা হয়Ñ“বাইরের মানুষের সামনে এমন কথা বলবে না”, “অতিথির সামনে ভালো ব্যবহার করো”, “মানুষ কী বলবে সেটা ভাবো।”এই শিক্ষাগুলো পুরোপুরি ভুল নয়। সামাজিক শিষ্টাচার প্রয়োজন আছে। কিন্তু সমস্যা হয় তখন, যখন শিশুকে সত্যের চেয়ে সামাজিক ভাবমূর্তিকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে শেখানো হয়। তখন সে ধীরে ধীরে বুঝতে শেখেÑভালো হওয়া জরুরি নয়, ভালো দেখানো জরুরি।অনেক পরিবারে বাবা-মা নিজেরাই নিয়ম ভাঙেন, কিন্তু সন্তানকে নিয়ম মানতে বলেন। সন্তান তখন বিভ্রান্ত হয়। সে দেখে, নীতির কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না। ফলে তার মধ্যেও দ্বৈত মানসিকতা তৈরি হয়। একসময় এই শিশুরাই বড় হয়ে সমাজের দায়িত্ব নেয়। তারা অফিসে, রাজনীতিতে, ব্যবসায় কিংবা সামাজিক জীবনে একই সংস্কৃতি বহন করে। ফলে আত্মপ্রবঞ্চনা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা জ্ঞান দিচ্ছে, দক্ষতা তৈরি করছে, কিন্তু নৈতিক সাহস গড়ে তুলতে পারছে কি? পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার চাপ এত বেশি যে, অনেক শিক্ষার্থী ছোটবেলা থেকেই প্রতিযোগিতাকে নৈতিকতার চেয়ে বড় মনে করতে শেখে।শিক্ষার্থীরা দেখেÑযে বেশি নম্বর পায়, সমাজ তাকে বেশি সম্মান দেয়। সে কীভাবে সেই নম্বর পেল, সেটি বড় প্রশ্ন নয়। ফলে অনেকেই শর্টকাট খোঁজে। কেউ নকল করে, কেউ কোচিং নির্ভর হয়ে পড়ে, কেউ মুখস্থ বিদ্যার ওপর নির্ভর করে।একটি সমাজ যখন সাফল্যকে নৈতিকতার ওপরে স্থান দেয়, তখন সেখানে সততা দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন মানুষ ভাবেÑ“সবাই করছে, আমি করলে দোষ কোথায়?” এই মানসিকতা ধীরে ধীরে পুরো সমাজকে গ্রাস করে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষা কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না। শিক্ষকদের আচরণ, প্রশাসনের স্বচ্ছতা এবং শিক্ষার পরিবেশের মধ্যেও নৈতিকতার প্রতিফলন থাকতে হবে। সত্যিকারের ধর্ম মানুষকে বিনয়ী করে। সে নিজের ভুল দেখতে শেখায়। কিন্তু যখন ধর্ম অহংকারের উপকরণ হয়, তখন মানুষ নিজেকে “সাধু” ভাবতে শুরু করে এবং অন্যকে “চোর” হিসেবে বিচার করতে থাকে। রাজনীতিতে এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। ক্ষমতায় থাকলে এক ধরনের বক্তব্য, বিরোধী দলে গেলে আরেক ধরনের বক্তব্যÑএ যেন বহু দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ। একসময় যে দল মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলেছিল, ক্ষমতায় গিয়ে তারাই সমালোচনা সহ্য করতে চায় না। যারা বিরোধী অবস্থানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়, তারাই ক্ষমতায় গিয়ে একই অভিযোগে অভিযুক্ত হয়। এতে জনগণের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। তারা মনে করতে শুরু করেÑসবাই একই। ফলে গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা দুর্বল হয়। মানুষ রাজনীতিকে সেবার জায়গা হিসেবে না দেখে ক্ষমতার খেলা হিসেবে দেখতে শুরু করে।রাজনীতির সবচেয়ে বড় সংকট এখানেইÑআদর্শের চেয়ে ক্ষমতা বড় হয়ে ওঠা। আর ক্ষমতা যখন নৈতিকতার ওপরে উঠে যায়, তখন সমাজে “তুমি সাধু, আমি চোর” সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের মতপ্রকাশের সুযোগ তৈরি করেছে, এটি ইতিবাচক দিক। কিন্তু একই সঙ্গে এটি এক ধরনের কৃত্রিম আত্মপ্রদর্শনের সংস্কৃতিও তৈরি করেছে। এখানে সবাই নিজের জীবনের সুন্দর অংশগুলো দেখাতে চায়। কেউ নিজের দুর্বলতা, ব্যর্থতা বা ভুল প্রকাশ করতে চায় না। ফলে এমন এক ভার্চ্যুয়াল বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, যেখানে সবাই সফল, সবাই সচেতন, সবাই নৈতিক।এই সংস্কৃতি মানুষকে ভেতর থেকে আরও একাকী ও ভ- করে তুলছে। কারণ বাস্তব জীবনের মানুষ আর অনলাইন পরিচয়ের মধ্যে বিশাল ফারাক তৈরি হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন নৈতিক ক্ষোভও এক ধরনের ট্রেন্ড। কোনো ঘটনা ঘটলেই মানুষ দ্রুত বিচারক হয়ে ওঠে। প্রমাণের আগেই কাউকে দোষী বানানো হয়। সবাই যেন নৈতিকতার আদালতের বিচারপতি।কিন্তু প্রশ্ন হলোÑআমরা কি নিজেদের একইভাবে বিচার করি? গণমাধ্যম সমাজের দর্পণ। কিন্তু এই দর্পণও অনেক সময় প্রভাব, ব্যবসা ও রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে ঝাপসা হয়ে যায়। কোনো ঘটনা বিশেষভাবে প্রচার পায়, কোনো ঘটনা চাপা পড়ে যায়। মিডিয়া যখন নিরপেক্ষতা হারায়, তখন মানুষ সত্য সম্পর্কে বিভ্রান্ত হয়। তারা বুঝতে পারে নাÑকোনটা প্রকৃত তথ্য, আর কোনটা সাজানো বয়ান। এতে সমাজে অবিশ্বাস বাড়ে। একই সঙ্গে দর্শক বা পাঠকের মধ্যেও এক ধরনের নির্বাচিত নৈতিকতা কাজ করে। নিজের পছন্দের ব্যক্তি বা দলের ভুলকে ছোট করে দেখা হয়, অপছন্দের ব্যক্তির ভুলকে বড় করে দেখানো হয়। এই প্রবণতা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য বিপজ্জনক। কারণ তখন সত্য নয়, পক্ষপাত বড় হয়ে ওঠে। একটি সভ্য সমাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো আত্মসমালোচনার ক্ষমতা। ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রÑসবারই নিজের ভুল বিশ্লেষণ করার সাহস থাকতে হয়। কিন্তু আমাদের সমাজে আত্মসমালোচনা ক্রমেই কমে যাচ্ছে। কেউ ভুল স্বীকার করতে চায় না। কারণ ভুল স্বীকার করলে দুর্বল ভাবা হবেÑএমন ভয় কাজ করে। ফলে মানুষ আত্মরক্ষামূলক হয়ে ওঠে। সে যুক্তি দাঁড় করায়, দায় অন্যের ওপর চাপায়, পরিস্থিতিকে দোষ দেয়। কিন্তু নিজের ভেতরে তাকায় না। আত্মসমালোচনার অভাব মানুষকে উন্নতির পথ থেকেও দূরে সরিয়ে দেয়। কারণ ভুল না মানলে সংশোধনের সুযোগও থাকে না। আজকের সমাজে সত্য বলা কঠিন। কারণ সত্য অনেক সময় সুবিধার বিরুদ্ধে যায়। কর্মক্ষেত্রে সত্য বললে চাকরি ঝুঁকিতে পড়ে, রাজনীতিতে সত্য বললে হুমকি আসে, সামাজিক জীবনে সত্য বললে সম্পর্ক নষ্ট হয়। ফলে মানুষ নীরবতা বেছে নেয়। কেউ কেউ আপস করে। ধীরে ধীরে সমাজে সত্য বলার সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে পড়ে।একসময় দেখা যায়Ñমিথ্যাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে। তখন মানুষ সত্য শুনতে অস্বস্তি বোধ করে।
এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে ভয়ংকর। কারণ কোনো সমাজ যদি সত্যের জায়গা হারিয়ে ফেলে, তাহলে সেখানে ন্যায়বিচারও দুর্বল হয়ে পড়ে।সমাজে প্রকৃত ভালো মানুষ খুব বেশি প্রচার পান না। কারণ সত্যিকারের সৎ মানুষ সাধারণত নিজের সততা নিয়ে প্রচারণা চালান না। তারা নীরবে কাজ করেন।প্রকৃত ভালো মানুষ নিজের ভুল স্বীকার করতে জানেন। তিনি অন্যকে ছোট করে নিজেকে বড় করার চেষ্টা করেন না। তিনি জানেনÑমানুষ হিসেবে সবারই সীমাবদ্ধতা আছে। কিন্তু আমাদের সমাজে এখন উচ্চকণ্ঠ মানুষ বেশি দৃশ্যমান। যারা বেশি নৈতিকতার ভাষণ দেন, তাদেরই অনেক সময় বেশি সম্মান দেওয়া হয়। ফলে প্রকৃত বিনয় হারিয়ে যাচ্ছে। সমাজ পরিবর্তনের শুরু হতে হবে ব্যক্তি থেকে। প্রত্যেক মানুষকে নিজের ভেতরে তাকাতে হবে। প্রশ্ন করতে হবেÑআমি কি সত্যিই সেই মানুষ, যেভাবে নিজেকে উপস্থাপন করি? পরিবারে শিশুদের সত্য বলার সাহস শেখাতে হবে। ভুল করলে তা স্বীকার করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিকতা শুধু পাঠ্যবইয়ে নয়, বাস্তব আচরণে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।রাজনীতিতে আদর্শ ও জবাবদিহি শক্তিশালী করতে হবে। ধর্মকে বাহ্যিক পরিচয়ের বদলে মানবিকতার চর্চা হিসেবে দেখতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দায়িত্বশীল আচরণ বাড়াতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের বুঝতে হবেÑভুল করা মানবিক, কিন্তু ভুল অস্বীকার করা বিপজ্জনক। “তুমি সাধু, আমি চোর”Ñএই বাক্যটি কেবল ব্যঙ্গ নয়; এটি আমাদের সমাজের গভীর অসুখের প্রতীক। আমরা এমন এক সময়ের মধ্যে বাস করছি, যেখানে মানুষ নিজের মুখোশ রক্ষা করতে ব্যস্ত, কিন্তু আত্মার আয়নায় তাকাতে ভয় পায়।সভ্যতার অগ্রগতি প্রযুক্তি দিয়ে হয়, কিন্তু মানবিক অগ্রগতি হয় সততা দিয়ে। সমাজ তখনই সুস্থ হয়, যখন মানুষ অন্যকে বিচার করার আগে নিজের বিবেককে প্রশ্ন করে। আমাদের দরকার এমন এক সংস্কৃতি, যেখানে ভুল স্বীকার করাকে দুর্বলতা নয়, সাহস হিসেবে দেখা হবে। যেখানে মানুষ নিজেকে সাধু প্রমাণের চেয়ে ভালো মানুষ হওয়ার চেষ্টা করবে। কারণ শেষ পর্যন্ত, সমাজকে বদলানোর সবচেয়ে বড় শক্তি আইন নয়, প্রযুক্তি নয়, ক্ষমতাও নয়Ñমানুষের বিবেক। আর সেই বিবেক জাগ্রত হওয়ার প্রথম শর্ত হলো নিজের ভেতরের অন্ধকারকে স্বীকার করা।যেদিন আমরা বলতে শিখবÑ“হ্যাঁ, আমারও ভুল আছে”Ñসেদিনই হয়তো “তুমি সাধু, আমি চোর” সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে একটি সত্যভিত্তিক মানবিক সমাজ গড়ার পথ খুলে যাবে। লেখক: সংবাদকর্মী

Ads small one

সম্পাদকীয়: প্রসঙ্গ: রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের রক্ত ও আমাদের দায়

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০২৬, ১২:৩৪ পূর্বাহ্ণ
সম্পাদকীয়: প্রসঙ্গ: রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের রক্ত ও আমাদের দায়

একদিকে ঋণের পাহাড়, অন্যদিকে সচ্ছলতার রঙিন স্বপ্নÑএই দুইয়ের দোলাচলে পড়ে প্রতিবছর হাজার হাজার বাংলাদেশি তরুণ পাড়ি জমান প্রবাসে। সাতক্ষীরার শফিকুল ইসলাম, নাহিদুল ইসলাম এবং শুভ কুমার দাসও সেই মিছিলেই শামিল হয়েছেন। কিন্তু লেবাননের নাবাতিয়েহ ও মাইফাদুন এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনীর ড্রোন হামলায় তাঁদের সেই স্বপ্ন এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। যে পরিবারগুলো শেষ সম্বল বসতভিটা বিক্রি করে কিংবা চড়া সুদে ঋণ নিয়ে তাঁদের বিদেশে পাঠিয়েছিল, আজ তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক অনিশ্চিত ও অন্ধকার ভবিষ্যৎ।
এই মৃত্যুগুলো কেবল একেকটি সংখ্যা নয়; বরং আমাদের ভঙ্গুর প্রবাসী সুরক্ষা ব্যবস্থার এক একটি ক্ষত। নিহতদের পারিবারিক চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাঁরা প্রায় প্রত্যেকেই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জক্ষম ব্যক্তি। শফিকুল ১০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে বিদেশ গিয়েছিলেন মাত্র তিন মাস আগে। নাহিদুল আড়াই মাস আগে জমি বিক্রি করে গিয়েছিলেন পরিবারের অভাব মুছতে। আর শুভ নিজের বসতভিটাটুকু বেচে দিয়েছিলেন এক টুকরো সুখের আশায়। এখন এই নিঃস্ব পরিবারগুলোর মাথার ওপর কেবল ঋণের বোঝাই পাহাড় সমান নয়, বরং তাদের ভবিষ্যৎ শিক্ষা ও জীবনযাপনের পথও রুদ্ধ হয়ে গেছে।
লেবাননের মতো সংঘাতময় এলাকায় বাংলাদেশি প্রবাসীরা অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেন। আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিকতার তোয়াক্কা না করে যেভাবে বেসামরিক আবাসস্থলে ড্রোন হামলা চালানো হচ্ছে, তা কেবল নিন্দনীয়ই নয়, বরং চরম জঘন্য অপরাধ। বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং মরদেহ ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু কেবল নিন্দা বা লাশ ফিরিয়ে আনা কি এই সর্বস্বান্ত পরিবারগুলোর জন্য যথেষ্ট?
সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা হলোÑকোনো ধরনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ছাড়াই সরকারি খরচে অতি দ্রুত এই তিনজনের মরদেহ পরিবারের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। পরিবারগুলো যে বিপুল অংকের ঋণের জালে আটকে আছে, তা পরিশোধের জন্য প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা এনজিওর মাধ্যমে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। শফিকুলের দুই মেধাবী মেয়ের পড়াশোনা এবং শুভর ভূমিহীন বাবার আশ্রয়ের দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে। প্রবাসী কল্যাণ তহবিল থেকে তাঁদের জন্য এককালীন বড় অংকের অনুদান ও দীর্ঘমেয়াদী ভাতার ব্যবস্থা করা উচিত। লেবাননে অবস্থানরত অন্যান্য বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বৈরুত দূতাবাসের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে এবং আন্তর্জাতিক মহলে এই হত্যাকা-ের প্রতিবাদ জোরালো করতে হবে।
দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখেন যে রেমিট্যান্স যোদ্ধারা, বিদেশের মাটিতে তাঁদের এই অসহায় মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না। শফিকুল, নাহিদুল ও শুভর মতো তরুণদের রক্ত যেন কেবল শোকের দলিলে সীমাবদ্ধ না থাকে। রাষ্ট্র যদি আজ এই নিঃস্ব পরিবারগুলোর পাশে না দাঁড়ায়, তবে তা হবে আমাদের সামগ্রিক মানবিক ব্যর্থতা। আমরা আশা করি, সরকার দ্রুততম সময়ে এই পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে প্রবাসীদের প্রতি তার প্রকৃত দায়বদ্ধতার প্রমাণ দেবে।

 

১০টি পয়েন্টে টেকসই বেড়িবাঁধের দাবিতে সাংসদের ডিও লেটার

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০২৬, ১২:২৭ পূর্বাহ্ণ
১০টি পয়েন্টে টেকসই বেড়িবাঁধের দাবিতে সাংসদের ডিও লেটার

আশাশুনি প্রতিনিধি: আশাশুনি উপজেলার ১০টি জনগুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে মারাত্মক নদী ভাঙন রোধে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের আবেদন জানিয়েছেন সাতক্ষীরা-৩ আসনের সংসদ সদস্য হাফেজ মুহাদ্দিস রবিউল বাশার। গত ১১ মে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) খুলনার অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী বরাবর এ সংক্রান্ত একটি ডিও লেটার (আধা-সরকারি পত্র) প্রদান করেন তিনি।
ডিও লেটারে সাংসদ উল্লেখ করেন, আশাশুনি উপজেলা মারাত্মক নদী ভাঙনকবলিত এলাকা। টেকসই বাঁধের অভাবে অনেক জনপদ বিলীন হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে আশাশুনি সদর, প্রতাপনগরের কুড়িকাউনিয়া ও হরিশখালি, আনুলিয়ার মনিপুর ও বিছট, বুধহাটা বাজার এলাকা এবং বড়দলের গোয়ালডাঙ্গাসহ ১০টি পয়েন্টে দ্রুত স্থায়ী সংস্কার প্রয়োজন। ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর আশা, এই আবেদন বাস্তবায়িত হলে তারা ভিটেমাটি হারানোর দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পাবেন এবং দীর্ঘদিনের মানবেতর জীবনের অবসান ঘটবে।

একমাত্র মাথা গোঁজার ঠাঁই বেচে ছেলেকে পাঠিয়েছিলেন লেবানন, ফিরছে লাশ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০২৬, ১২:২৫ পূর্বাহ্ণ
একমাত্র মাথা গোঁজার ঠাঁই বেচে ছেলেকে পাঠিয়েছিলেন লেবানন, ফিরছে লাশ

আসাদুজ্জামান সরদার: সুরঞ্জন দাসের এখন আর কোনো নিজের জমি নেই। তিন বছর আগে সাতক্ষীরার কলারোয়া পৌরসভার শ্রীপতিপুর গ্রামে তাঁর একমাত্র মাথা গোঁজার ঠাঁইÑএক শতক বসতভিটাটুকুও বিক্রি করে দিয়েছিলেন। লক্ষ্য ছিল একটাই, মেজ ছেলে শুভ দাসকে (২৫) লেবাননে পাঠিয়ে সংসারের অভাব ঘোচানো। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন চিতাভস্ম হওয়ার পথে। গত সোমবার রাতে লেবাননের মাইফাদুন এলাকায় ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছেন শুভ।
বুধবার সকালে শ্রীপতিপুর গ্রামে সুরঞ্জনের ভাড়া বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। জরাজীর্ণ ঘরের দাওয়ায় বসে ডুকরে কাঁদছেন মা শিখা দাস। একটি ভ্যানের উপর বসে নির্বাক হয়ে বসে আছেন বৃদ্ধ বাবা সুরঞ্জন। তার পাশে বসে সান্ত¦না দিচ্ছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি শাহাদাত হোসেনসহ কয়েকজন প্রতিবেশি। প্রতিবেশী ও স্বজনদের ভিড়ে বাড়িটি শোকাতুর হয়ে উঠেছে। সবার চোখেমুখে একটাই আকুতিÑছেলের মুখটা শেষবারের মতো দেখা।
পেশায় ভ্যানচালক সুরঞ্জন দাস জানান, বাড়ি বিক্রি করেও শেষ রক্ষা হয়নি। চড়া সুদে এনজিও ও স্থানীয়দের কাছ থেকে আরও চার লাখ টাকা ঋণ নিয়ে শুভকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। ভিটে হারিয়ে গত তিন বছর ধরে সপরিবারে এক হাজার টাকা ভাড়ার একটি বাসায় থাকছেন তিনি। প্রতি মাসে শুভ ৩৫ হাজার টাকা করে পাঠাতেন। সেই টাকা দিয়েই ঋণের কিস্তি শোধ আর ছোট দুই ভাই-বোনের পড়াশোনা চলছিল।
বিলাপ করতে করতে মা শিখা রানী দাস বলেন, “সংসারের হাল ফেরাতে ছেলেটা বিয়েও করেনি। বলেছিল আরও কিছুদিন থেকে টাকা জমিয়ে বাড়ি ফিরে ঘর বাঁধবে। ভগবান কেন আমাদের কপাল পুড়িয়ে দিল? এখন ঋণের টাকা কে শোধ করবে, আর আমার মানিককেই বা কই পাব?”
শুভর ছোট বোন সাধনা দাস কলারোয়া সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের নবম শ্রেণিতে পড়ে। কান্নারত কণ্ঠে সে বলে, “রবিবার রাতে দাদার সাথে শেষ কথা হয়েছিল। দুই মাস টাকা পাঠাতে পারেনি বলে দাদা খুব আফসোস করছিল। দাদাই আমাদের পড়াশোনার খরচ চালাত। দাদাকে তো আর ফিরে পাব না, কিন্তু এখন আমরা থাকব কোথায়? আমাদের পড়াশোনাই বা হবে কীভাবে?”
প্রতিবেশী সুমন দাস বলেন, শুভ খুব শান্ত স্বভাবের ছেলে ছিল। এলাকার সবার সাথে তার সুসম্পর্ক ছিল। তার এই অকাল মৃত্যু পুরো গ্রামকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।
শুভসহ গত দুই দিনে লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় সাতক্ষীরার মোট তিনজন প্রবাসী নিহত হয়েছেন। তাঁদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা এখন পরিবারের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
স্থানীয় ইউপি মেম্বর শাহাদাত হোসেন বলেন, সুরঞ্জন দাসের এখন আর কোনো নিজের জমি নেই। তিনি এখন পরিবার নিয়ে থাকেন ধানের চাতালের ফেলে রাখা খুপড়ি ঘরে। তিন বছর আগে সাতক্ষীরার কলারোয়া পৌরসভার শ্রীপতিপুর গ্রামে তাঁর একমাত্র মাথা গোঁজার ঠাঁইÑএক শতক বসতভিটাটুকুও বিক্রি করে দিয়েছিলেন। চড়া সুদে এনজিও ও স্থানীয়দের কাছ থেকে আরও চার লাখ টাকা ঋণ নিয়ে শুভকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। সেই শুভ ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় মারা যাওয়ার খবরে গোটা এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে শুভ’র মরদেহ যেন দেশে আনা হয়Ñআমরা সরকারের কাছে সেই দাবি জানাচ্ছি। একইসাথে এই অসহায় পরিবারটি যেন মাথা গোজার ঠাঁই পায় সে ব্যাপারেও সরকার যেন সহায়তা করেন।
কলারোয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফুল ইসলাম বলেন, “ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। শুভর পরিবার যাতে দ্রুত মরদেহ ফিরে পায়, সে জন্য আমরা কনস্যুলেট ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ করছি। একই সঙ্গে সরকারিভাবে সব ধরণের আর্থিক সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।”
সাতক্ষীরার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) বিষ্ণুপদ পাল জানিয়েছেন, প্রবাসীদের মরদেহ ফিরিয়ে আনার আইনি প্রক্রিয়া ও যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
অভাবের তাড়নায় যে ছেলেকে ভিনদেশে পাঠিয়েছিলেন সুরঞ্জন দাস, এখন সেই ছেলের নিথর দেহটুকু ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় কাটছে তাঁর প্রতিটি প্রহর। ঋণের বোঝা আর শোকÑদুইয়ের ভারে ন্যুব্জ এই পরিবারটির ভবিষ্যৎ এখন সম্পূর্ণ অনিশ্চিত।