তেলের লাইনেই সেই বাঘ বিধবা মাহফুজার শেষ ‘ভরসা’
পীযূষ বাউলিয়া পিন্টু, মুন্সিগঞ্জ (শ্যামনগর): শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জ ডেলমা ফিলিং স্টেশনের সামনে এখন দীর্ঘ সারি। কেউ এসেছেন গাবুরা থেকে, কেউ বুড়িগোয়ালিনী। জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে মোটরসাইকেল চালকদের অপেক্ষা চলে দিনের পর দিন। প্রখর রোদে তৃষ্ণার্ত মানুষ আর রাতভর অপেক্ষায় থাকা ক্লান্ত চালকদের কাছে এখন একমাত্র আশ্রয়ের নাম মাহফুজা খাতুন। এক হাতে চায়ের কাপ আর অন্য হাতে জীবনযুদ্ধের লড়াই নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই ‘বাঘ বিধবা’ এখন শত শত মানুষের ভরসা।
২০০২ সালের এক বিষাদময় দিনে সুন্দরবনে মাছ ধরতে গিয়ে বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারান মাহফুজার স্বামী সাত্তার। দুই সন্তানকে নিয়ে অকূল পাথারে পড়েন তিনি। এক সময় লোকলজ্জা আর পর্দার আড়ালে থাকা মানুষটি সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে নেমে পড়েন সুন্দরবনের নদীতে। তপ্ত রোদে জাল টেনে, দিনমজুর খেটে কোনোমতে পার করেছেন দীর্ঘ দুই দশক। সম্প্রতি মুন্সিগঞ্জ বাজারে স্বামীর ভিটায় ঠাঁই মিললেও অভাব তার পিছু ছাড়েনি।
জ্বালানি সংকটের এই সময়ে প্রশাসন ও সুন্দরবন প্রেসক্লাবের সিদ্ধান্তে নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট ইউনিয়নের জন্য তেল বরাদ্দ করা হচ্ছে। সিরিয়াল ধরতে চালকরা আগের রাত থেকেই ভিড় করেন ফিলিং স্টেশনের সামনে। নির্জন এই এলাকায় রাত বিরেতে ক্ষুধা আর তৃষ্ণা মেটানোর কোনো জায়গা ছিল না। সেই সুযোগ ও প্রয়োজনকেই নিজের বেঁচে থাকার অবলম্বন করে নিয়েছেন মাহফুজা।
ছেলে মাহফুজুর রহমানকে সাথে নিয়ে ফিলিং স্টেশনের সামনে পলিথিনের একটি অস্থায়ী ছাউনি দিয়েছেন তিনি। গভীর রাত থেকে শুরু করে পরের দিন রাত ১০টা পর্যন্ত চলে তার বেচাকেনা। চা, বিস্কুট, কলা, কেক আর সিদ্ধ ডিম বিক্রি করে প্রতিদিন তার ২ থেকে ৩ হাজার টাকা আয় হচ্ছে। গত দুই সপ্তাহ ধরে এভাবেই চলছে তার নতুন সংসার।
মাঠে ঘাটে লড়াই করা মাহফুজা আজ তৃষ্ণার্ত মানুষের সেবা দিচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু পুঁজির অভাবে চাহিদা মেটাতে পারছেন না। মাহফুজা বলেন,
“এই প্রচ- গরমে মানুষের সবচেয়ে বেশি চাহিদা পানি আর স্যালাইনের। পাশের বাড়িতে গেলেও কেউ পানি দিতে চায় না। কিন্তু আমার দোকানে পর্যাপ্ত মালামাল তোলার মতো টাকা নেই। মানুষের কাছে ধার নিয়ে কোনোমতে কিছু রসদ জোগাড় করেছি।”
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘সিডিও’র নির্বাহী পরিচালক গাজী আল ইমরান মনে করেন, বাঘ বিধবা মাহফুজার এই লড়াই অত্যন্ত সাহসের এবং মানবিক। তিনি বলেন, “এই দুসময়ে একজন সংগ্রামী নারী যেভাবে শত শত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, তার কর্মসংস্থানের স্থায়ী সুযোগ করে দেওয়া সরকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর দায়িত্ব।”
গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক-এর কর্মকর্তা মফিজুর রহমানও একই মত পোষণ করেন। তার মতে, পাম্পের আশেপাশে অন্য দোকান না থাকায় মাহফুজার দোকানটি এখন চালকদের জন্য অপরিহার্য। সামান্য সরকারি বা বেসরকারি সহায়তা পেলে তিনি দোকানটি আরও গুছিয়ে নিতে পারতেন।
মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম পল্টু বলেন, “মাহফুজা আমার ওয়ার্ডেরই মানুষ। বাঘ বিধবাদের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় আনতে আমরা চেষ্টা করছি। মাহফুজা যাতে আরও ভালোভাবে দোকানটি চালাতে পারেন, সে বিষয়ে ব্যক্তিগতভাবে আমি সহযোগিতা করব।”
স্বামীকে হারানোর পর নদী আর জালের সাথে লড়াই করে মাহফুজা আজ জনসম্মুখে এসে দাঁড়িয়েছেন। তেলের লাইনে অপেক্ষমাণ মানুষের ক্লান্তি দূর করার পাশাপাশি তিনি এখন নিজের ভাগ্য বদলানোর স্বপ্ন দেখছেন। সামান্য একটু সহযোগিতাই পারে এই লড়াকু নারীর জীবনের গল্পটি বদলে দিতে।








