দুয়ারে দাঁড়িয়ে আশ্বিন/ সচ্চিদানন্দ দে সদয়
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
দুয়ারে দাঁড়িয়ে আশ্বিন। বর্ষার দীর্ঘ সিক্ততা পেরিয়ে বাংলার আকাশে এখন শরতের নীল। সাদা মেঘের ভেলা, মাঠের পাশে কাশফুল, ভোরের ঘাসে শিশির আর শিউলির সুবাসÑসব মিলিয়ে প্রকৃতি যেন নতুন করে সাজছে। দূরে কোথাও ঢাকের আওয়াজ। পূজার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।
মানুষের মনে উৎসবের উচ্ছ্বাস। কিন্তু এই সৌন্দর্যের দিকে তাকিয়ে একটি প্রশ্ন কি আমরা নিজেদের করতে পারিÑযে শরৎকে আমরা এত ভালোবাসি, সেই শরৎ কি আগের মতো আছে?বাংলার ঋতুচক্র বদলাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে বৃষ্টির ধরন বদলেছে, ঋতুর স্বাভাবিক ছন্দে এসেছে অস্থিরতা। কখনো অতি বৃষ্টি, কখনো দীর্ঘ অনাবৃষ্টি। কোথাও জলাবদ্ধতা, কোথাও পানির সংকট। উপকূলীয় জনপদে তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লবণাক্ততা। ফলে আশ্বিনের নীল আকাশের নিচেও মানুষের জীবন অনেক সময় অনিশ্চয়তার কালো মেঘে ঢাকা থাকে। বিশেষ করে সাতক্ষীরার মতো উপকূলীয় এলাকায় শরৎ মানেই আর শুধু বর্ষা বিদায়ের স্বস্তি নয়। অনেক জায়গায় বর্ষার পানি আশ্বিনেও থেকে যায়। কোথাও রাস্তা পানিতে ডুবে থাকে, কোথাও খাল-নদীর পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ। আবার অন্যদিকে লবণাক্ততার কারণে সুপেয় পানির সংকট তীব্র হয়। একই জনপদে কখনো পানি বেশি, কখনো পানযোগ্য পানি নেইÑএ এক নির্মম বৈপরীত্য।
দীর্ঘদিন ধরে নদী-খাল দখল, জলাশয় ভরাট, অপরিকল্পিত বাঁধ, দুর্বল পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা এবং পরিবেশ বিধি না মানার কারণে আমরা নিজেরাই অনেক সমস্যাকে জটিল করেছি। যে খাল একসময় বর্ষার পানি বহন করত, আজ কোথাও তা দখল ও পলি জমে সংকুচিত। যে জলাভূমি অতিরিক্ত পানি ধরে রাখত, সেখানে উঠেছে স্থাপনা। ফলে অল্প বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা, আবার পানি নেমে গেলে শুরু হয় পানির সংকট। আশ্বিন কৃষকের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ সময়। আমন ধানের মাঠে তখন সবুজের সমারোহ। কৃষকের চোখে নতুন ফসলের স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্নের সঙ্গে উদ্বেগও আছে।
বৃষ্টি ঠিকমতো হবে কি না, অতিরিক্ত পানি ধান নষ্ট করবে কি না, লবণাক্ত পানি ঢুকবে কি না, উৎপাদন খরচের তুলনায় ধানের দাম মিলবে কি নাÑএসব প্রশ্ন কৃষকের ঘুম কেড়ে নেয়। আমরা শহর থেকে শরতের সৌন্দর্য দেখি; কৃষক মাঠে দাঁড়িয়ে শরতের ঝুঁকি দেখেন। এটাই বাস্তবতার পার্থক্য। কৃষি শুধু খাদ্য উৎপাদনের বিষয় নয়; এর সঙ্গে দেশের অর্থনীতি, গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও মানুষের জীবনযাত্রা জড়িত। অথচ কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়ে, শ্রমিকের মজুরি বাড়ে, সার-বীজ-কীটনাশকের দাম বাড়েÑকিন্তু বাজারে কৃষক ন্যায্য দাম পাবেন কি না, তার নিশ্চয়তা সবসময় থাকে না।
মধ্য স্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য থাকলে উৎপাদকের ঘাম আর ভোক্তার পকেটÑদুইয়ের মাঝখানে তৈরি হয় এক অস্বচ্ছ ব্যবধান। আশ্বিনের উৎসবের বাজারও এই বাস্তবতার বাইরে নয়। দুর্গাপূজা সামনে। প্রতিমাশিল্পী ব্যস্ত। ম-প সাজানোর কাজ চলছে। নতুন পোশাক, কেনাকাটা, আলোকসজ্জাÑসব মিলিয়ে বাজারে বাড়ছে ব্যস্ততা। উৎসব মানুষের মধ্যে আনন্দ আনে, স্থানীয় অর্থনীতিতেও গতি আনে। কিন্তু দ্রব্যমূল্যের চাপে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য উৎসবের আনন্দের সঙ্গে হিসাবের খাতাও বড় হয়ে ওঠে। একটি উৎসব তখনই সার্থক, যখন তার আনন্দ সমাজের সর্বস্তরে পৌঁছায়। আর এখানেই আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন আসে।
বাংলাদেশের হাজার বছরের সংস্কৃতিতে উৎসব মানুষের মধ্যে দূরত্ব কমানোর একটি বড় মাধ্যম। দুর্গাপূজা হোক কিংবা অন্য কোনো ধর্মীয় উৎসবÑউৎসবের মূল শক্তি মানুষের অংশগ্রহণে। পাড়া-প্রতিবেশী একে অপরের পাশে দাঁড়াবে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, সম্প্রীতির পরিবেশ তৈরি করবেÑএটাই হওয়া উচিত উৎসবের চেতনা। উৎসবকে কেন্দ্র করে বিভাজন নয়, সংহতি তৈরি হওয়া প্রয়োজন।আশ্বিন আমাদের এ কথাও মনে করিয়ে দেয়Ñপ্রকৃতির সৌন্দর্য রক্ষা করতে হলে শুধু কবিতা লিখলে হবে না, বাস্তব কাজও করতে হবে। কাশফুলের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে আমরা শরৎকে ভালোবাসার দাবি করতে পারি; কিন্তু একই সঙ্গে যদি খাল ভরাট করি, নদীর তীর দখল করি, জলাভূমি ধ্বংস করি, নির্বিচারে গাছ কাটিÑতাহলে সেই ভালোবাসা কতটা সত্য? পরিবেশ রক্ষার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা সৌন্দর্যের প্রশংসায় নয়, ব্যবহারে। আমাদের নদী ও খালকে বাঁচাতে হবে। দখলদারদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
পানি নিষ্কাশনের পথ সচল রাখতে হবে। উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় শুধু প্রকল্প নয়, প্রকল্পের সঠিক বাস্তবায়ন ও জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ উন্নয়ন যদি মানুষের বসবাসের পরিবেশকে ধ্বংস করে, তাহলে সেই উন্নয়নের অর্থ নতুন করে ভাবতে হবে। আজকের আশ্বিন আমাদের সামনে একটি আয়না ধরে। সেখানে একদিকে দেখা যায় বাংলাদেশের চিরচেনা শরৎÑনীল আকাশ, সাদা মেঘ, কাশবন ও শিউলি।
অন্যদিকে দেখা যায় জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ, লবণাক্ততার কষ্ট, কৃষকের অনিশ্চয়তা, নদীর মরণদশা এবং মানুষের ক্রমবর্ধমান জীবনযুদ্ধ। এই দুই ছবির মধ্যে কোনো একটি বেছে নেওয়ার সুযোগ নেই। আমাদের একই সঙ্গে সৌন্দর্য ও সংকটÑদুটিই দেখতে হবে। শরৎ শুধু প্রকৃতির ঋতু নয়; এটি আমাদের আত্মসমালোচনারও সময় হতে পারে। আমরা কী রেখে যাচ্ছি আগামী প্রজন্মের জন্য? নদীহীন ভূখ-? ভরাট খাল? লবণাক্ত কৃষিজমি? জলাবদ্ধ জনপদ? নাকি এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে নদী প্রবাহিত হবে, কৃষকের মাঠ সবুজ থাকবে, মানুষ নিরাপদ পানি পাবে এবং উৎসব হবে সবার আনন্দের? এই সিদ্ধান্ত কেবল সরকারের নয়। জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, স্থানীয় প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত দায়িত্ব রয়েছে এখানে।
দুয়ারে দাঁড়িয়ে আশ্বিন। সে আমাদের কাছে কোনো অলৌকিক পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে আসেনি। বরং নীরবে বলে যাচ্ছেÑপ্রকৃতির ভাষা বুঝুন, মানুষের কষ্ট দেখুন, ভুলগুলো স্বীকার করুন। শরতের নীল আকাশ আমাদের চোখকে স্বস্তি দিক, কিন্তু সেই স্বস্তি যেন বিবেককে ঘুম পাড়িয়ে না দেয়। কাশফুল ফুটুক। শিউলি ঝরুক। ঢাক বাজুক। পূজার আলোয় আলোকিত হোক জনপদ। কিন্তু সেই আলোর বাইরে যেন কোনো মানুষের ঘর অন্ধকারে না থাকে। আশ্বিন আসুক নতুন আশার বার্তা নিয়ে। নদীতে ফিরুক প্রাণ, খালে ফিরুক প্রবাহ, কৃষকের মুখে ফুটুক স্বস্তির হাসি, উপকূলের মানুষ পাক নিরাপদ পানি, আর উৎসব হয়ে উঠুক সত্যিকারের সম্প্রীতির উৎসব। দুয়ারে দাঁড়িয়ে আশ্বিন। এবার শুধু তাকে স্বাগত জানালেই হবে নাÑতার বার্তাটিও শুনতে হবে।
লেখক: সংবাদকর্মী












