সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬, ৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬, ৫ শ্রাবণ ১৪৩৩

ধর্ষক, ধর্ষণ ও আমাদের বিবেক/ সচ্চিদানন্দ দে সদয়

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ২৩ মে, ২০২৬, ৫:১১ অপরাহ্ণ
ধর্ষক, ধর্ষণ ও আমাদের বিবেক/ সচ্চিদানন্দ দে সদয়

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

একটি সমাজ তখনই সভ্য বলে বিবেচিত হয়, যখন সেই সমাজে নারী, শিশু ও দুর্বল মানুষ নিরাপদে বাঁচতে পারে। কিন্তু আজ আমাদের চারপাশের বাস্তবতা বড় নির্মম। প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন, শিশু নির্যাতন কিংবা নারীর প্রতি সহিংসতার খবর আসছে। কখনো স্কুল পড়–য়া শিশু, কখনো গৃহবধূ, কখনো প্রতিবন্ধী নারীÑকেউই যেন নিরাপদ নয়। আরও ভয়াবহ হলো, এসব ঘটনা এখন মানুষের অনুভূতিকে আগের মতো নাড়া দেয় না।

 

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিছু সময়ের জন্য ক্ষোভ তৈরি হয়, কয়েকটি মানববন্ধন হয়, তারপর আবার সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যায়। অথচ প্রতিটি ধর্ষণের ঘটনা একটি রাষ্ট্র, একটি সমাজ এবং আমাদের সম্মিলিত বিবেকের ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। ধর্ষণ কেবল একটি অপরাধ নয়; এটি ক্ষমতার নগ্ন প্রদর্শন, নৈতিকতার চরম পতন এবং মানবিকতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ। একজন ধর্ষক যখন একটি মেয়ের শরীর ও আত্মমর্যাদার ওপর আঘাত করে, তখন সে শুধু একজন মানুষকে নয়, পুরো সমাজের নিরাপত্তা বোধকে ধ্বংস করে দেয়। সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলোÑআমরা ধীরে ধীরে এই ভয়াবহতা কে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নিতে শিখছি। এটাই সবচেয়ে বড় বিপদ।

 

আমাদের সমাজে ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে প্রথমেই প্রশ্ন ওঠে মেয়েটির পোশাক নিয়ে, চলাফেরা নিয়ে, সময় নিয়ে। যেন অপরাধীর চেয়ে ভুক্তভোগীকেই বেশি জবাবদিহি করতে হয়। অথচ ধর্ষণের দায় কখনোই ভুক্তভোগীর নয়। একটি শিশু, একটি বৃদ্ধা কিংবা ঘরের ভেতরে থাকা নারীও যখন ধর্ষণের শিকার হন, তখন স্পষ্ট হয়ে যায়Ñএই অপরাধের পেছনে পোশাক নয়, কাজ করে বিকৃত মানসিকতা ও ক্ষমতার দম্ভ। কিন্তু সমাজ এখনও অনেক ক্ষেত্রে ধর্ষকের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর চেয়ে ভুক্ত ভোগীকেই চুপ করিয়ে দিতে বেশি আগ্রহী।

 

এই মানসিকতা না বদলালে আইন দিয়েও অপরাধ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। ধর্ষণের পেছনে সামাজিক অবক্ষয়ের বড় ভূমিকা রয়েছে। পরিবার একসময় ছিল মূল্যবোধ শিক্ষার প্রথম বিদ্যালয়। সেখানে সন্তান শিখত সম্মান, শিষ্টাচার, মানবিকতা ও সংযম। কিন্তু আজ অনেক পরিবারে সেই শিক্ষা অনুপস্থিত। বাবা-মা সন্তানের হাতে দামি স্মার্টফোন তুলে দিচ্ছেন, কিন্তু সে কী দেখছে, কী শিখছে, কার সঙ্গে মিশছেÑসেসব বিষয়ে তেমন খোঁজ রাখছেন না।

 

প্রযুক্তি আজ আশীর্বাদ যেমন, তেমনি অপব্যবহারে ভয়াবহ অভিশাপও হতে পারে। অল্প বয়সে পর্নোগ্রাফি, অশ্লীল কনটেন্ট ও সহিংস ভিডিওর সহজলভ্যতা তরুণদের মানসিক বিকৃতি বাড়িয়ে দিচ্ছে। নারীকে মানুষ নয়, ভোগের বস্তু হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে। এতে সহিংসতা ও যৌন অপরাধ বাড়ছে। মাদকের বিস্তারও এই সংকটকে আরও গভীর করছে। ইয়াবা, গাঁজা, মাদকজাত ট্যাবলেটসহ বিভিন্ন নেশাজাতীয় দ্রব্য তরুণদের একাংশকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। মাদক মানুষের বিবেক, নিয়ন্ত্রণবোধ ও নৈতিকতা কেড়ে নেয়।

 

একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি খুব সহজেই সহিংস হয়ে উঠতে পারে। ফলে ধর্ষণ, ছিনতাই, খুনসহ নানা অপরাধ বেড়ে যায়। দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া বহু ধর্ষণের ঘটনার সঙ্গে মাদকাসক্তির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। অথচ মাদক নিয়ন্ত্রণে এখনও কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। শিক্ষাব্যবস্থার দিকেও প্রশ্ন ওঠে। আমরা সন্তানদের পরীক্ষায় ভালো ফল করতে শেখাচ্ছি, কিন্তু মানুষ হতে শেখাতে পারছি কি? নৈতিক শিক্ষা, মানবিক মূল্যবোধ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের জায়গা দিন দিন সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।

 

অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেই। নারী সহপাঠী বা সহকর্মীর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের শিক্ষা বাস্তব জীবনে কতটা কার্যকর ভাবে দেওয়া হচ্ছে, সেটিও ভাবনার বিষয়। শুধু পাঠ্যবইয়ের কিছু নীতিকথা দিয়ে মানবিক সমাজ তৈরি হয় না; প্রয়োজন বাস্তবচর্চা ও সামাজিক অনুশীলন। ধর্ষণের ঘটনায় বিচারহীনতার সংস্কৃতিও ভয়াবহ ভাবে দায়ী। বহু ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রভাবশালী অপরাধীরা রাজনৈতিক বা সামাজিক ক্ষমতার জোরে পার পেয়ে যায়। মামলার তদন্ত দীর্ঘ হয়, সাক্ষী ভয় পায়, ভুক্তভোগী পরিবার হুমকির মুখে পড়ে। ফলে অনেক পরিবার ন্যায়বিচারের আশাই ছেড়ে দেয়।

 

এই বিচারহীনতা অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তোলে। যখন একজন ধর্ষক দেখে তার শাস্তি হচ্ছে না, তখন অন্য অপরাধীরাও সাহস পায়। আইন কঠোর হলেই হবে না; তার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের সমাজে আরেকটি ভয়াবহ প্রবণতা হলো ঘটনাকে রাজনৈতিক দৃষ্টিতে দেখা। কোনো ধর্ষণের ঘটনায় অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় সামনে এলে অনেকেই দলীয় অবস্থান রক্ষায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। কেউ কেউ ঘটনাকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন। অথচ ধর্ষকের কোনো দল থাকতে পারে না।

 

একজন ধর্ষকের পরিচয় একটাইÑসে অপরাধী। সমাজ যদি দলীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে অপরাধের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে না পারে, তাহলে এই সংকট কখনো কমবে না। গণমাধ্যমের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা জনসচেতনতা তৈরি করতে পারে, অপরাধের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে পারে। কিন্তু কখনো কখনো কিছু সংবাদ মাধ্যম ধর্ষণের ঘটনাকে এমনভাবে উপস্থাপন করে, যা ভুক্তভোগীর মানসিক কষ্ট আরও বাড়িয়ে দেয়।

 

ভুক্তভোগীর পরিচয় গোপন রাখা, সংবেদনশীল ভাষা ব্যবহার এবং অপরাধের সামাজিক কারণ বিশ্লেষণ করাÑএসব বিষয়ে আরও দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও দ্বৈত চিত্র দেখা যায়। একদিকে মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দ্রুত সোচ্চার হতে পারছে, অন্যদিকে অনেকেই ভুয়া তথ্য, গুজব ও বিদ্বেষ ছড়িয়ে পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। কখনো ভুক্তভোগীকেই অপমান করা হয়, কখনো ঘটনাকে হাস্যরসের বিষয় বানানো হয়। এটি একটি অসুস্থ মানসিকতার প্রতিফলন।

 

ধর্ষণ রোধে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সামাজিক প্রতিরোধ। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃত্বÑসবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই শেখাতে হবে নারীকে সম্মান করতে। ছেলেশিশুকে বলতে হবে, শক্তি মানে দখল নয়; শক্তি মানে সংযম ও দায়িত্ববোধ। মেয়ে শিশুকেও আত্মবিশ্বাস ও আত্মরক্ষার শিক্ষা দিতে হবে।

 

একই সঙ্গে সমাজকে বুঝতে হবে, নারীর স্বাধীন চলাফেরা কোনো অপরাধ নয়; নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গুলোও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মসজিদ, মন্দির, গির্জা কিংবা অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে মানবিকতা, নৈতিকতা ও আত্মসংযমের শিক্ষা জোরালো ভাবে প্রচার করা দরকার। কারণ ধর্ম কখনো নারী অবমাননা শেখায় না; বরং সম্মান ও মর্যাদার শিক্ষা দেয়। কিন্তু বাস্তবে ধর্মের শিক্ষাকে আমরা কতটা ধারণ করছি, সেটাই বড় প্রশ্ন। রাষ্ট্রের দায়িত্বও কম নয়।

 

দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল, নিরপেক্ষ তদন্ত, ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা এবং মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। ধর্ষণের মামলায় দীর্ঘসূত্রতা কমাতে হবে। একই সঙ্গে পুলিশ প্রশাসনকে আরও সংবেদনশীল ও মানবিক হতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে থানায় অভিযোগ করতে গিয়েও ভুক্তভোগীরা হয়রানির শিকার হন। এই পরিস্থিতি বদলাতে হবে। একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলোÑআমরা সন্তানদের সামনে কেমন সমাজ উপস্থাপন করছি। শিশুরা যা দেখে, তাই শেখে। পরিবারে যদি নারীকে অসম্মান করা হয়, সামাজিক পরিসরে যদি নারীর প্রতি কটূক্তি স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও সেই সংস্কৃতি ধারণ করবে। তাই পরিবর্তন শুরু করতে হবে নিজেদের ঘর থেকেই।

 

আজকের বাস্তবতায় একটি প্রশ্ন খুব গুরুত্বপূর্ণÑআমরা কি সত্যিই মানবিক মানুষ তৈরি করতে পারছি? আমরা হয়তো ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, কর্মকর্তা তৈরি করছি; কিন্তু ভালো মানুষ তৈরি করছি কতটা? একটি সমাজ তখনই নিরাপদ হয়, যখন সেখানে আইনের পাশাপাশি বিবেকও জাগ্রত থাকে। কিন্তু আজ সেই বিবেক যেন ক্রমেই নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে। ধর্ষণ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি সমাজের গভীর অসুস্থতার লক্ষণ। তাই এর সমাধানও কেবল আইনি ব্যবস্থায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।

 

প্রয়োজন সাংস্কৃতিক পরিবর্তন, নৈতিক জাগরণ এবং মানবিক শিক্ষা। আমাদের বুঝতে হবেÑএকজন ধর্ষক জন্ম গত ভাবে অপরাধী নয়; সমাজের নানা বিকৃতি তাকে সেই পথে ঠেলে দেয়। তাই অপরাধ ঘটার পর শুধু শাস্তি দিলেই হবে না, অপরাধের সামাজিক কারণ গুলোও দূর করতে হবে। সবশেষে মনে রাখতে হবে, একটি ধর্ষণের ঘটনা কেবল একজন নারীর ক্ষতি নয়; এটি পুরো সমাজের পরাজয়। যখন একটি মেয়ে ভয়ে সন্ধ্যার পর বাইরে বের হতে পারে না, যখন একজন মা সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কে থাকেন, তখন সেই সমাজকে নিরাপদ বলা যায় না।

 

তাই সময় এসেছে নীরবতা ভাঙার। শুধু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ নয়, বাস্তব প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। পরিবারকে সচেতন হতে হবে, রাষ্ট্রকে কঠোর হতে হবে, সমাজকে মানবিক হতে হবে। কারণ ধর্ষক শুধু একজন অপরাধী নয়; সে আমাদের বিবেকের আয়নায় জমে থাকা অন্ধকারের প্রতিচ্ছবি। সেই অন্ধকার দূর করতে হলে আলো জ্বালাতে হবে আমাদের নিজেদের মধ্যেই।

লেখক: সংবাদকর্মী

Ads small one

সম্পাদকীয়/প্রসঙ্গ: নদী-খাল দখলমুক্ত করার উদ্যোগ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬, ১২:৩১ পূর্বাহ্ণ
সম্পাদকীয়/প্রসঙ্গ: নদী-খাল দখলমুক্ত করার উদ্যোগ

সাতক্ষীরা জেলার দীর্ঘস্থায়ী ও অভিশাপতুল্য জলাবদ্ধতা সংকটের মূল উৎস নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ রুদ্ধ হওয়া। কপোতাক্ষ, ইছামতি ও বেতনার মতো প্রবাহমান নদীসহ অসংখ্য সরকারি খাল বছরের পর বছর ধরে প্রভাবশালী দখলদারদের পেটে চলে গেছে। নদী ও খালের জমি গিলে খেয়ে গড়ে তোলা হয়েছে ইটভাটা, শিল্পকারখানা, মাছের ঘের এবং পাকা বসতবাড়ি। এর মাশুল গুণতে হচ্ছে সাধারণ জনগণকে—সামান্য বৃষ্টিতেই জলজটে অচল হয়ে পড়ে জীবনযাত্রা, দেখা দেয় তীব্র মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়। এই বাস্তবতায় জেলা প্রশাসন কর্তৃক ৩০২ জন অবৈধ দখলদারের চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত এবং ৫০ দিনের বিশেষ ‘ক্র্যাশ’ অভিযানের পরিকল্পনা নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী ও আশাব্যঞ্জক পদক্ষেপ।
জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, সদর উপজেলার বাবুলিয়া মৌজায় নদী দখল করে গড়ে ওঠা ইটভাটা কিংবা বিনেরপোতায় বেতনা নদীর সীমানার ভেতরে নির্মাণাধীন বিনোদন ও প্রক্রিয়াজাত অবকাঠামো স্পষ্ট করে দেয়, কী পরিমাণ বেপরোয়াভাবে নদীকে লুণ্ঠন করা হয়েছে। কোথাও কোথাও সরকারি খালের অস্তিত্বই মানচিত্র থেকে মুছে যাওয়ার উপক্রম। সাতক্ষীরাবাসীর বহুদিনের দাবি ছিলÑপানির প্রবাহ সুগম করতে এই ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
তবে আশঙ্কার জায়গাটি হলো অতীতেও এমন বহু তালিকা প্রণয়ন ও অভিযানের উদ্যোগ আমরা দেখেছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক ছত্রছায়া, আইনি জটিলতা কিংবা অদৃশ্য প্রভাবে সেই অভিযানগুলো ছোটখাটো দখলদারদের ওপর দিয়ে গিয়েই শেষ হয়ে গেছে; ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছে প্রভাবশালী শ্রেণি। ফলে এবার জেলা প্রশাসনের এই অভিযান যেন আর ১০টি ‘লোকদেখানো’ উদ্যোগের মতো মুখ থুবড়ে না পড়ে, তা নিশ্চিত করা জরুরি। আইনের প্রয়োগ হতে হবে সার্বজনীন ও বৈষম্যহীন।
অভিযানের পাশাপাশি কিছু বাস্তবভিত্তিক চ্যালেঞ্জও সামনে আসবে। বিশেষ করে লজিস্টিক সহায়তা নিশ্চিত করা, প্রশাসনিক সমন্বয় এবং খাসের জমিতে বাস করা প্রকৃত ভূমিহীন পরিবারগুলোর টেকসই পুনর্বাসনের বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করতে হবে। ভূমিহীনদের অজুহাতে যেন কোনো শিল্পপতি বা প্রভাবশালী পার না পায়, আবার অভিযান চালাতে গিয়ে যেন কোনো হতদরিদ্র পরিবারকে আশ্রয়হীন করা না হয়Ñএই ভারসাম্যের প্রতি সংবেদনশীল থাকা প্রয়োজন।
নদী ও খাল বাঁচলে সাতক্ষীরা বাঁচবে। তাই নদী রক্ষা কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী ক্র্যাশ অভিযান সফলভাবে সম্পন্ন করার মাধ্যমে কপোতাক্ষ, বেতনা ও ইছামতিকে মুক্ত করার কোনো বিকল্প নেই। জেলা প্রশাসনের এই উদ্যোগে শুধু সাময়িক উচ্ছেদ নয়, উচ্ছেদকৃত জমি যাতে পুনরায় হাতছাড়া না হয়, তার জন্য স্থায়ী তদারকি ও সীমানা নির্ধারণ প্রয়োজন। সাতক্ষীরার লাখ লাখ মানুষ জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছেন; জেলা প্রশাসন এবার তাদের প্রতিশ্রুতির পূর্ণ বাস্তবায়নে দৃঢ় ও আপসহীন থাকবেÑএটাই আমাদের প্রত্যাশা।

 

পরাজিত হলেও প্রতিশ্রুতির ১২ অঙ্গীকার পূরণে কাজ করার ঘোষণা বিএনপি প্রার্থীর

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬, ১১:৩০ অপরাহ্ণ
পরাজিত হলেও প্রতিশ্রুতির ১২ অঙ্গীকার পূরণে কাজ করার ঘোষণা বিএনপি প্রার্থীর

শ্যামনগর প্রতিনিধি: নির্বাচনে জয়ী হতে না পারলেও উপকূলীয় এলাকার উন্নয়নে দেওয়া প্রাক্-নির্বাচনী ১২টি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছেন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ড. মো. মনিরুজ্জামান। সোমবার বেলা ১১টায় শ্যামনগর উপজেলা প্রেসক্লাব কার্যালয়ে স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে ‘উপকূলীয় জনপদ, হতে হবে নিরাপদ’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় এই কথা বলেন তিনি।
সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান অভিযোগ করে বলেন, সরকারের এক প্রভাবশালী আমলার হস্তক্ষেপের কারণেই নিশ্চিত জয় হাতছাড়া করে তাঁকে আইনসভায় যাওয়া থেকে বঞ্চিত হতে হয়েছে। ভোটাররা প্রতিপক্ষকে তাঁর চেয়ে যোগ্য মনে করেছেন বলেই জয়ী হয়েছেন—এমন মন্তব্য করলেও তিনি জানান, এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে প্রতিশ্রুতি পূরণে তিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
মনিরুজ্জামান উল্লেখ করেন, সরকারি স্বাস্থ্যসেবার স্থবিরতা কাটাতে শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নতুন ভবন নির্মাণের প্রক্রিয়া ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। এ ছাড়া দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় এই জনপদের যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের উন্নয়নে কাজ চলছে। সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে পর্যটন শিল্প বিকাশ, ফিশ প্রসেসিং সেন্টার ও পরিবেশবান্ধব শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার ব্যাপারেও সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে যোগাযোগ বজায় রাখা হচ্ছে। একই সঙ্গে স্থানীয় মধু শিল্পের সম্প্রসারণ এবং এলাকার একমাত্র উচ্চমাধ্যমিক নারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি জাতীয়করণের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান তিনি।
প্রেসক্লাবের সভাপতি সহকারী অধ্যাপক সামিউল মনিরের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা কামালের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সোলায়মান কবির, সাবেক যুগ্ম সম্পাদক আশেক-ই এলাহী মুন্না ও ডাকসুর সাবেক নেতা অধ্যাপক আবু সাঈদ।

 

সাপ্তাহিক ‘বেগম’: বাঙালি নারীর কণ্ঠস্বর ও জাগরণের প্রতীক

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬, ১১:২৬ অপরাহ্ণ
সাপ্তাহিক ‘বেগম’: বাঙালি নারীর কণ্ঠস্বর ও জাগরণের প্রতীক

সাকিবুর রহমান বাবলা
২০ জুলাই বাংলা সাংবাদিকতা, সাহিত্য ও নারী জাগরণের ইতিহাসে এক স্মরণীয় দিন। ১৯৪৭ সালের এই দিনে কলকাতার ওয়েলেসলি স্ট্রিট থেকে প্রকাশিত হয় বাংলা ভাষার প্রথম সচিত্র নারী সাপ্তাহিক ‘বেগম’। দেশভাগের প্রাক্কালে যখন নারীদের শিক্ষা, সাহিত্যচর্চা ও জনজীবনে অংশগ্রহণ ছিল অত্যন্ত সীমিত, তখন ‘সওগাত’-এর সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের দূরদর্শী উদ্যোগে প্রকাশিত এই পত্রিকা নারী সমাজের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে। তৎকালীন প্রতিকূল সামাজিক পরিস্থিতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মুসলিম নারীদের শিক্ষার আলোয় আনার লক্ষ্যেই ছিল। পত্রিকার প্রথম সংখ্যার প্রচ্ছদে স্থান পেয়েছিল নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের ছবি। মাত্র ৫০০ কপি মুদ্রিত চার আনা মূল্যের সেই সংখ্যাই পরবর্তীকালে একটি ঐতিহাসিক আন্দোলনের ভিত্তি রচনা করে।
পত্রিকাটির প্রথম সম্পাদক ছিলেন কবি ও সমাজনেত্রী বেগম সুফিয়া কামাল। তিনি প্রথম চার মাস সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তখন বিএ শ্রেণির ছাত্রী নূরজাহান বেগম শুরু থেকেই ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে যুক্ত ছিলেন। সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুল ও লেডি ব্রেবোর্ন কলেজের একদল তরুণী শিক্ষার্থীর সক্রিয় অংশগ্রহণে গড়ে ওঠে ‘বেগম’-এর প্রাথমিক কর্মপরিসর। পরবর্তীকালে নূরজাহান বেগম সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করে প্রায় ছয় দশক ধরে পত্রিকাটিকে সফলভাবে পরিচালনা করেন। সম্পাদকীয় বিভাগে ফজলে লোহানীরও গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতা ছিল।
দেশভাগের পর ১৯৫০ সালে ‘বেগম’-এর কার্যালয় ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়। সে সময় নারীদের ছবি প্রকাশ করা অনেক ক্ষেত্রেই সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য ছিল না। রক্ষণশীল সমাজে অনেক নারী ছদ্মনামে লিখতেন, কিন্তু ‘বেগম’ তাঁদের নিজস্ব নাম ও ছবিসহ লেখা প্রকাশের জন্য উৎসাহিত করত। এটি ছিল তৎকালীন সময়ে এক বৈপ্লবিক ঘটনা। এর ফলে অসংখ্য নারী প্রথমবারের মতো জনপরিসরে নিজেদের পরিচয় তুলে ধরার সুযোগ পান।
নারী সাংবাদিকতার বিকাশে ‘বেগম’-এর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৪৮ ও ১৯৪৯ সালে প্রকাশিত বিশেষ সংখ্যাগুলোও পাঠকমহলে ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং নারীদের লেখালেখির পরিসর সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখে। এটি শুধু সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রই তৈরি করেনি, বরং নারী সাংবাদিক, সম্পাদক ও সাহিত্যিক তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবেও গড়ে উঠেছিল। সুফিয়া কামাল, শামসুন্নাহার মাহমুদ, জাহানারা আরজু, নীলিমা ইব্রাহিম, রাজিয়া খাতুন, প্রতিভা গাঙ্গুলী, সেলিনা পান্নি এবং পরবর্তীকালে সেলিনা হোসেনসহ বহু বিশিষ্ট লেখকের সাহিত্যজীবনের সঙ্গে ‘বেগম’-এর নিবিড় সম্পর্ক ছিল।
বেগম’ কেবল একটি পত্রিকা ছিল না, বরং তা তৎকালীন পাঠিকাদের কাছে একটি ‘পরিবার’-এর মতো হয়ে উঠেছিল। ডাকযোগে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পত্রিকা পৌঁছানো এবং পাঠিকাদের চিঠি ও লেখা প্রকাশের মাধ্যমে এটি শহর ও গ্রামের নারীদের মধ্যে একটি শক্তিশালী যোগাযোগসূত্র গড়ে তোলে, যা ‘বেগম-পাঠিকা সভা’ নামেও পরিচিতি পায়। এই সংযোগ নারীদের একাকীত্ব দূর করে তাঁদের আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। সাহিত্য ও সামাজিক বিষয়ের পাশাপাশি পরিবার ও জীবনযাপনভিত্তিক নানা বিষয়ও নিয়মিত প্রকাশিত হতো।
১৯৫৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয় ‘বেগম ক্লাব’। শামসুন্নাহার মাহমুদ ছিলেন এর সভাপতি, নূরজাহান বেগম সেক্রেটারি এবং সুফিয়া কামাল অন্যতম উপদেষ্টা ছিলেন। এটি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম নারী সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ক্লাব হিসেবে বিশেষ মর্যাদা লাভ করে। ষাট ও সত্তরের দশকে ‘বেগম’ জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে। নারী শিক্ষা, আইনি অধিকার, সামাজিক বৈষম্য, কুসংস্কার দূরীকরণ ও আত্মনির্ভরতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়মিত স্থান পেত এর পাতায়।
বর্তমানে ‘বেগম’ মাসিক পত্রিকা হিসেবে প্রকাশিত হচ্ছে এবং এর প্রচ্ছদমূল্য ৫০ টাকা। নূরজাহান বেগমের মৃত্যুর পর তাঁর জ্যেষ্ঠ কন্যা ফ্লোরা নাসরিন খান পত্রিকাটির দায়িত্ব পালন করছেন। ডিজিটাল যুগে মুদ্রিত পত্রিকার নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও ‘বেগম’ তার ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। একই সঙ্গে, সাত দশকের সমৃদ্ধ আর্কাইভ ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ করা সময়ের দাবি, যা নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রেরণা যোগাবে। বাংলা সাংবাদিকতা ও নারী জাগরণের ইতিহাসে ‘বেগম’ কেবল একটি পত্রিকা নয়; এটি নারী আত্মপ্রকাশ, আত্মমর্যাদা ও সামাজিক অগ্রগতির এক ঐতিহাসিক প্রতীক।