লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দেব প্রণালি ও গালফ অব এডেন অঞ্চলে নিরাপদ নৌ-চলাচল নিশ্চিত করতে বাংলাদেশসহ ১৪টি দেশকে নিয়ে নতুন একটি বহুজাতিক সমুদ্র প্রতিরক্ষা জোট গঠন করেছে সৌদি আরব। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথগুলোর নিরাপত্তা জোরদার করাই নতুন এই জোটের প্রধান লক্ষ্য বলে জানিয়েছে রিয়াদ।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা এবং ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক হামলার কারণে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে এই নৌপথ ব্যবহারকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলো হামলা ও নিরাপত্তাঝুঁকির মুখে পড়ায় বিশ্বব্যাপী পণ্য পরিবহন, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং জ্বালানি বাণিজ্যের ওপরও এর প্রভাব পড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন এই জোট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সৌদি আরব। বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতির বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা।
জোটে বাংলাদেশসহ ১৪ দেশ
সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুযায়ী, ‘মাল্টিন্যাশনাল মেরিটাইম ডিফেন্স অ্যালায়েন্স’ নামে নতুন এই জোটে বাংলাদেশসহ মোট ১৪টি দেশ যুক্ত হয়েছে। সদস্য দেশগুলো হলো—বাংলাদেশ, সৌদি আরব, তুরস্ক, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, জর্ডান, মিসর, পাকিস্তান, জিবুতি, সোমালিয়া, ইয়েমেন, সুদান ও কোমোরোস।
ভৌগোলিক অবস্থান ও কৌশলগত গুরুত্বের দিক থেকে এসব দেশের অনেকগুলোই লোহিত সাগর, আরব সাগর, গালফ অব এডেন এবং বাব আল-মান্দেব অঞ্চলের সঙ্গে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে যুক্ত। ফলে সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এসব দেশের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণ
সৌদি আরবের নেতৃত্বে গঠিত এই জোটের মাধ্যমে সদস্য দেশগুলো নিজেদের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি সমুদ্রপথে সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় সমন্বিতভাবে কাজ করবে বলে জানানো হয়েছে।
নিরাপদ নৌ-চলাচল নিশ্চিত করাই প্রধান লক্ষ্য
সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নতুন এই জোটের প্রধান লক্ষ্য হলো বাব আল-মান্দেব প্রণালি, লোহিত সাগর এবং গালফ অব এডেন এলাকায় নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন নৌ-চলাচল নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করতেও সদস্য দেশগুলো একসঙ্গে কাজ করবে।
এ লক্ষ্যে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান, নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী যৌথ কার্যক্রম পরিচালনার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
জোটের আওতায় যৌথ সামরিক মহড়া পরিচালনার পাশাপাশি সমুদ্রপথে কোনো ধরনের নিরাপত্তা হুমকি দেখা দিলে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে দ্রুত সমন্বয় করে পরিস্থিতি মোকাবিলার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে এ জোটের সামরিক কাঠামো, নেতৃত্বের ধরন এবং সদস্য দেশগুলোর নির্দিষ্ট দায়িত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
‘কোনো দেশকে লক্ষ্য করে নয়’
সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করে জানিয়েছে, নতুন এই বহুজাতিক সমুদ্র প্রতিরক্ষা জোট সম্পূর্ণরূপে প্রতিরক্ষামূলক। এটি কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে গঠন করা হয়নি।
সৌদি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করাই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য। ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে অন্য দেশগুলোও চাইলে এই জোটে যোগ দিতে পারবে।
এতে ধারণা করা হচ্ছে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জোটটির সদস্য সংখ্যা আরও বাড়তে পারে এবং লোহিত সাগর ও আশপাশের সমুদ্রপথের নিরাপত্তায় এটি একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক সহযোগিতা কাঠামো হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
হুথি হামলায় বেড়েছে নিরাপত্তা উদ্বেগ
লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে নিরাপত্তা উদ্বেগের অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের হামলা। গাজা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে হুথিরা ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট এবং পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর দাবি করে আসছে।
এসব হামলার কারণে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে চলাচলকারী অনেক জাহাজকে বিকল্প দীর্ঘ সমুদ্রপথ ব্যবহার করতে হয়েছে। এতে জাহাজ চলাচলের সময় ও ব্যয় বেড়েছে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, এর প্রভাব ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার বাণিজ্য ব্যবস্থাতেও পড়তে পারে।
বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ
লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালি আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট। এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের মধ্যে পণ্য পরিবহনে এই নৌপথের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
সুয়েজ খাল হয়ে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে চলাচলকারী বহু বাণিজ্যিক জাহাজকে বাব আল-মান্দেব প্রণালি অতিক্রম করতে হয়। ফলে এ অঞ্চলে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহন ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও জ্বালানি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরিবহনের ক্ষেত্রেও লোহিত সাগর ও আশপাশের নৌপথ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে এই রুটে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে জ্বালানি সরবরাহের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামও অস্থির হয়ে উঠতে পারে।
সদর দপ্তর হবে সৌদি আরবে
সৌদি আরব জানিয়েছে, নতুন এই বহুজাতিক সমুদ্র প্রতিরক্ষা জোটের সদর দপ্তর সৌদি আরবেই স্থাপন করা হবে। তবে সদর দপ্তরের নির্দিষ্ট অবস্থান এবং জোটের প্রশাসনিক কাঠামো সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
এ ছাড়া সদস্য দেশগুলো কী ধরনের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে এই জোটে অংশ নেবে, কতসংখ্যক যুদ্ধজাহাজ বা বিমান মোতায়েন করা হবে কিংবা যৌথ অভিযানে কোন দেশের কী ধরনের ভূমিকা থাকবে—এসব বিষয়েও এখনো স্পষ্ট কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, জোটটি কার্যকরভাবে পরিচালিত হলে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব অঞ্চলে সামুদ্রিক নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও জোরদার হতে পারে। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সম্ভাব্য হামলার ঝুঁকি কমাতেও এটি ভূমিকা রাখতে পারে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তায় নতুন সমীকরণ
সৌদি আরবের নেতৃত্বে ১৪ দেশের এই নতুন সমুদ্র প্রতিরক্ষা জোট মধ্যপ্রাচ্য ও আশপাশের অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোয় নতুন একটি সমীকরণ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিশেষ করে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেবের মতো কৌশলগত নৌপথে নিরাপত্তা জোরদারে আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে জোটটির বাস্তব কার্যক্রম, সামরিক সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ ভূমিকা কতটা বিস্তৃত হবে, তা নির্ভর করবে সদস্য দেশগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতা ও বাস্তবসম্মত সমন্বয়ের ওপর।
এদিকে বাংলাদেশসহ ১৪টি দেশের অংশগ্রহণ নতুন এই উদ্যোগকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো সমুদ্রনির্ভর বাণিজ্যিক দেশের জন্য আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই জোটের কার্যক্রম ভবিষ্যতে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সামুদ্রিক নিরাপত্তায় কী ধরনের প্রভাব ফেলে, সেদিকে নজর থাকবে সংশ্লিষ্ট মহলের।