পর্যটন মানব ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চালিকাশক্তি
প্রকাশ ঘোষ বিধান
বিশ্ব পর্যটন মানব ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চালিকাশক্তি। এটি কেবল এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ভ্রমণ নয়, বরং বিভিন্ন সংস্কৃতি ও মানুষের মধ্যে বন্ধন সৃষ্টির এক শক্তিশালী মাধ্যম। বিশ্বব্যাপী পর্যটনের উন্নয়ন ও সচেতনতা বৃদ্ধিতে জাতিসংঘের বিশেষায়িত সংস্থা বিশ্ব পর্যটন সংস্থা অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে।
বিশ্ব পর্যটন দিবস প্রতি বছর ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্বজুড়ে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পালন করা হয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে পর্যটনের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মূল্য সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করাই এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য। ১৯৭০ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের বিশ্ব পর্যটন সংস্থার সংবিধি বা সংবিধিবদ্ধ আইন গৃহীত হয়েছিল। এই ঐতিহাসিক দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতেই পরবর্তীতে ২৭ সেপ্টেম্বরকে পর্যটন দিবস হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। জাতিসংঘের বিশ্ব পর্যটন সংস্থা এর উদ্যোগে ১৯৮০ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই দিবসটি উদযাপিত হয়ে আসছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন এবং বিভিন্ন পর্যটন ভিত্তিক সংগঠন নানা কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি উদযাপন করে থাকে।
পর্যটন খাত বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। বহু দেশ তাদের জাতীয় আয়ের একটি বড় অংশ পর্যটকদের মাধ্যমে অর্জন করে। হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, গাইড এবং স্থানীয় হস্তশিল্পের মতো অসংখ্য খাতে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। পর্যটন কেন্দ্রগুলোকে কেন্দ্র করে রাস্তাঘাট, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং স্থানীয় সুযোগ-সুবিধার দ্রুত আধুনিকায়ন ঘটে, যা সামগ্রিক অঞ্চলের অর্থনীতিকে গতিশীল করে।
পর্যটন মানব ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মকান্ড, যা মানবসভ্যতার বিকাশ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে গভীর প্রভাব ফেলে আসছে। পর্যটন শিল্পের বিকাশের ফলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আয় বৃদ্ধি পায়, যা তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে সাহায্য করে। বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের সাথে মেলামেশার ফলে পারস্পরিক কুসংস্কার দূর হয় এবং মানুষের মধ্যে সহানুভূতি ও মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটে।
পর্যটকদের আকর্ষণের জন্য স্থানীয় প্রাচীন স্থাপত্য, লোকশিল্প, উৎসব এবং ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো সংরক্ষণ করা হয়। এর ফলে বিলুপ্তপ্রায় অনেক ঐতিহ্য পুনরুজ্জীবিত হয়। পর্যটনের মাধ্যমে এক দেশের সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস, ভাষা ও শিল্পকলা অন্য দেশের মানুষের কাছে পৌঁছায়, যা বিশ্বজুড়ে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করে।
ভ্রমণের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের মানুষ একে অপরের ঐতিহ্য, খাবার ও ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারে। স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহাসিক স্থানগুলো সংরক্ষণে পর্যটন জনসচেতনতা ও আর্থিক সহায়তা জোগায়। দেশের কৃষ্টি ও পরিচিতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ছড়িয়ে পড়ে।
পর্যটন খাতের টানে সরকার ও বেসরকারি উদ্যোগে রাস্তাঘাট, বিমানবন্দর ও আধুনিক হাসপাতাল গড়ে ওঠে। পর্যটকদের খরচ করা অর্থ সরাসরি স্থানীয় ও জাতীয় অর্থনীতিতে যুক্ত হয়ে মোট দেশজ উৎপাদনে বড় ভূমিকা রাখে। পর্যটন মানব ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চালিকাশক্তি, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে শতভাগ এর বেশি অবদান রাখে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বড় ভূমিকা পালন করে।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক বৈচিত্র্য বিশ্ব পর্যটন মানচিত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করার ক্ষমতা রাখে। পৃথিবীর দীর্ঘতম প্রাকৃতিক বালুকাময় সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার এবং বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন এ দেশের প্রধান আকর্ষণ। এছাড়া সিলেটের পাহাড়ি অঞ্চল, রাঙামাটি-বান্দরবানের ভূ-প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং এ দেশের প্রাচীন প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করে।
অজানাকে জানার স্বভাবজাত আকাঙ্খা থেকে পর্যটন একটি বৃহৎ বৈশ্বিক শিল্পে রূপ নিয়েছে। উত্তর গোলার্ধে যখন পর্যটনের প্রধান মৌসুম শেষ হয়, ঠিক তখনই দক্ষিণ গোলার্ধে পর্যটন মৌসুমের শুরু হয়। ফলে বিশ্বজুড়ে পর্যটকদের মাঝে এটি একটি দারুণ সংযোগ তৈরি করে। তবে বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, তেলের দামের ওঠানামা, বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি এবং আবাসন ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাওয়া পর্যটন খাতের প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে কাজ করছে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট









