শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩
শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩

পাইকগাছায় নার্সারীতে গুটি কলম তৈরিতে ব্যস্ত শ্রমিক

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ২:১৯ অপরাহ্ণ
পাইকগাছায় নার্সারীতে গুটি কলম তৈরিতে ব্যস্ত শ্রমিক

প্রকাশ ঘোষ বিধান, পাইকগাছা (খুলনা): পাইকগাছার নার্সারী গুলিতে গুটি কলম তৈরীতে ব্যস্ত সময় পার করছে মালিক ও শ্রমিকরা। গুটি কলম তৈরীর উপযুক্ত সময় বর্ষাকাল। সাধারণত বৈশাখ-আষাঢ় গুটি কলম তৈরীর উপযুক্ত সময়। বর্ষার আর্দ্র আবহাওয়া ও মাটিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা থাকায় এই সময়ে কলমের ডালে খুব দ্রুত ও সফলভাবে শিকড় গজায়।

মাতৃগুণ বজায় রাখা, দ্রুত ফলন, রোগ প্রতিরোধে ক্ষমতা বাড়ানো এবং অধিক ফলন পেতে গুটিকলম ব্যবহার করা হয়। সম্পূর্ণ মাতৃগাছে গুণাগুন সমৃদ্ধ চারা করার জন্য গুটিকলম জনপ্রিয়। কাগজি লেবু, পেয়ারা, লিচু, জলপাই, ডালিম, করম চা, গোলাপ জামসহ বিভিন্ন গাছে গুটি কলম করা হয়।

উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ছোট-বড় প্রায় ৫ শতাধিত নার্সারী গড়ে উঠেছে। যার উল্লেখযোগ্য সংখ্যা রয়েছে গদাইপুর গ্রামে। বর্ষা মৌসুম শুরুতে চারা তৈরীর জন্য নার্সারী মালিক ও কর্মচারীরা গুটিকলম তৈরীতে ব্যস্ত হয়ে ওঠেছে। যে গাছের ডালে গুটি করা হবে সে ডালের বয়স কমপক্ষে ৬ মাস থেকে ২ বছর হতে হবে। গুটি কলম তৈরী করতে গাছের ডালের দুই ইঞ্চি মত ছাল পুরাটা গোল করে কেঁটে ফেলে জৈব সার মিশ্রিত মাটি দিয়ে কাঁটা অংশ ভাল করে বেঁধে গুটি করতে হবে। মাটির গুটি সবসময় ভিজা রাখতে হবে। মাটিতে পলিথিন দিয়ে শক্ত করে বেঁধে দিতে হবে। ১ মাসের মধ্যেই মাটির ভিতর থেকে শিকড় বেড় হয়।

হিতামপুর গ্রামে অবস্থিত রজনীগন্ধা নার্সারীর মালিক সুকনাথ পাল জানান, এ বছর তার নার্সারীতে ২৫ হাজার গুটি কলমের চারা তৈরী করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে মিস্টি জলপাই, মাল্টা, পেয়ারা ও লিচু।

গদাইপুর নার্সারি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কামাল সরদার জানান, তার নার্সারীতে বিভিন্ন জাতের প্রায় ৪৫ হাজার গুটি কলম তৈরী করছেন। শ্রমিকের অভাবে কলম তৈরী করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তবে কলম তৈরীর সময় পার হয়ে গেলে এ মৌসুমের আর গুটি কলম তৈরী করা যাবে না। সে কারনে কলম তৈরীতে অধিক পয়সা খরচ হচ্ছে। এছাড়া শামসুল, আক্তার, রওশনারা, মিজানুর, নাসির, নজরুল, বিল্লালসহ বিভিন্ন নার্সারি মালিক গুটি কলম তৈরি করছেন।

গদাইপুর গ্রামের গুটি কলমের অভিজ্ঞ কারিগর হামিদ মোড়ল জানান, প্রতিটি গুটি দুই টাকা দরে তৈরী করছি। গোপালপুর গ্রামের গুটি কলমের অভিজ্ঞ কারিগর মোক্তার ও সালাম বলেন, লেবু গুটি ২টাকা ও অন্য জাতের গুটি কলম ১ টাকা ৭০ পয়সা দরে তৈরী করছি।

পাইকগাছা উপজেলা নার্সারী মালিক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অশোক কুমার পাল জানান, কলম তৈরীর শ্রমিক ঠিকমত না পাওয়ায় কারণে উচ্চ মূল্যে শ্রমিক নিয়ে কলম তৈরী করতে হচ্ছে। গদাইপুর এলাকার তৈরী কলম বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, দিনাজপুর, রংপুর, সিলেট, বরিশাল, কুমিল্লা, রাজশাহী সহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ হচ্ছে। তবে ঠিকমত বাজার দর না পাওয়ায় নার্সারী মালিকরা আশানারুপ ব্যবসা করতে পারছে না।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোঃ একরামুল হোসেন জানান, পাইকগাছার নার্সারী শিল্প খুলনা জেলার শীর্ষ পর্যায়ে রয়েছে। নার্সারীতে উৎপাদিত চারা সবুজ বননায়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করছে তেমনি দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

Ads small one

বাংলাদেশের পর্যটনের মহাপরিকল্পনা: আজকের উদ্যোগ, আগামীর বাংলাদেশ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ২:১০ অপরাহ্ণ
বাংলাদেশের পর্যটনের মহাপরিকল্পনা: আজকের উদ্যোগ, আগামীর বাংলাদেশ

মো. মামুন হাসান

একটি দেশের অর্থনীতি শুধু শিল্প, কৃষি কিংবা রপ্তানির ওপর নির্ভর করে না। বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় পর্যটন এমন একটি খাত, যা একই সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে, স্থানীয় অর্থনীতিকে গতিশীল করে এবং একটি দেশের সংস্কৃতি ও পরিচয়কে বিশ্বের সামনে তুলে ধরে। বাংলাদেশও ধীরে ধীরে সেই বাস্তবতা উপলব্ধি করছে। দীর্ঘদিন ধরে বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত পর্যটন উন্নয়নের পরিবর্তে এখন একটি সমন্বিত জাতীয় মহাপরিকল্পনার মাধ্যমে আগামী কয়েক দশকের পর্যটন উন্নয়নের ভিত্তি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এটি শুধু একটি পরিকল্পনা নয়, বরং বাংলাদেশের পর্যটন অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার একটি কৌশলগত রোডম্যাপ।

সরকারের ঘোষিত লক্ষ্য দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে পর্যটনের অবদান ছয় থেকে সাত শতাংশে উন্নীত করা। এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে কেবল নতুন পর্যটন কেন্দ্র তৈরি করলেই হবে না; প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা, দক্ষ মানবসম্পদ, আন্তর্জাতিক মানের অবকাঠামো, নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং কার্যকর বিপণন।

এই বাস্তবতা বিবেচনায় ট্যুরিজম স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট বাস্তবায়নের উদ্যোগ অত্যন্ত সময়োপযোগী। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের পর্যটন খাতের প্রকৃত অর্থনৈতিক অবদান নির্ণয়ের নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাব ছিল। তথ্য ছাড়া নীতিনির্ধারণ কখনোই কার্যকর হতে পারে না। তাই পর্যটনের প্রকৃত অর্থনৈতিক মূল্য নির্ধারণ ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

জাতীয় পর্যটন মহাপরিকল্পনার অন্যতম শক্তি হলো দেশের এক হাজার চারশো আটানব্বইটি পর্যটন আকর্ষণকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনা। এতদিন দেশের পর্যটন উন্নয়ন অনেকাংশে কয়েকটি জনপ্রিয় গন্তব্যকে কেন্দ্র করেই সীমাবদ্ধ ছিল। নতুন পরিকল্পনা সেই সীমাবদ্ধতা ভেঙে অঞ্চলভিত্তিক পর্যটন উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করছে।

পর্যটন সম্পদকে তিপ্পান্নটি ক্লাস্টারে ভাগ করার সিদ্ধান্ত অত্যন্ত দূরদর্শী। কারণ প্রতিটি অঞ্চলের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, সংস্কৃতি, জীববৈচিত্র্য এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতা ভিন্ন। একই নীতিতে সব অঞ্চলের উন্নয়ন সম্ভব নয়। ক্লাস্টারভিত্তিক পরিকল্পনা স্থানীয় সম্পদকে সর্বোচ্চ ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি করবে এবং অঞ্চলভিত্তিক পর্যটন অর্থনীতির বিকাশ ঘটাবে।

তবে এই মহাপরিকল্পনার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ পরিকল্পনা নয়, বাস্তবায়ন।পর্যটন এমন একটি খাত, যেখানে একক কোনো মন্ত্রণালয় সফল হতে পারে না। সড়ক, রেল, নৌপরিবহন, বিমান, স্থানীয় সরকার, পরিবেশ, বন, প্রতœতত্ত্ব, সংস্কৃতি, আইনশৃঙ্খলা এবং তথ্য প্রযুক্তিসহ বহু প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া টেকসই পর্যটন গড়ে তোলা সম্ভব নয়। অতীতে সমন্বয়ের অভাবই বহু সম্ভাবনাময় প্রকল্পকে কাঙ্খিত সফলতা থেকে বঞ্চিত করেছে। তাই এই মহাপরিকল্পনার সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করবে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় ব্যবস্থার কার্যকারিতার ওপর।

কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক পর্যটন হাবে রূপান্তরের উদ্যোগ বাংলাদেশের পর্যটন ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, বিশ্বমানের পর্যটন অবকাঠামো এবং পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে বিনিয়োগ আকর্ষণের পরিকল্পনা কেবল কক্সবাজারকেই নয়, সমগ্র দক্ষিণ উপকূলীয় অর্থনীতিকে নতুন সম্ভাবনার দিকে নিয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে সিলেট, খুলনা এবং অন্যান্য অঞ্চলে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন সুবিধা ড়ে তোলার উদ্যোগ দেশের পর্যটনকে বহুকেন্দ্রিক করে তুলবে। এর ফলে কক্সবাজারের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমবে এবং দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পাবে।

এই পরিকল্পনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানবসম্পদ উন্নয়ন।বিশ্বের কোনো পর্যটন শিল্পই দক্ষ জনবল ছাড়া সফল হয়নি। আধুনিক পর্যটন শিল্পে শুধু হোটেল নির্মাণই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দক্ষ ফ্রন্ট অফিস কর্মী, শেফ, হাউসকিপিং বিশেষজ্ঞ, ট্যুর গাইড, পর্যটন উদ্যোক্তা এবং ডিজিটাল মার্কেটিং বিশেষজ্ঞ। জাতীয় হোটেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক মানের নতুন প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান নির্মাণ ভবিষ্যতের জন্য একটি ইতিবাচক বিনিয়োগ।

এক্ষেত্রে দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট এবং কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও আরও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। পর্যটন শিক্ষাকে শ্রমবাজারের চাহিদাভিত্তিক করতে পারলে দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি অনেকাংশে পূরণ হবে।
ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারও আগামী দিনের পর্যটনের অন্যতম ভিত্তি হতে যাচ্ছে। ভার্চুয়াল ট্যুর, স্মার্ট ট্যুরিস্ট ইনফরমেশন সেন্টার, অনলাইন বুকিং, ডিজিটাল গাইডিং সিস্টেম এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পর্যটন সেবা বাংলাদেশের পর্যটনকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে নিতে পারে। ভবিষ্যতের পর্যটক প্রথমে ইন্টারনেটে ভ্রমণ করেন, পরে বাস্তবে গন্তব্যে পৌঁছান। তাই ডিজিটাল ব্র্যান্ডিং এখন আর বিলাসিতা নয়, এটি একটি অপরিহার্য বিনিয়োগ।

তবে অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। পৃথিবীর বহু পর্যটন গন্তব্য অতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণের ফলে তাদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য হারিয়েছে। বাংলাদেশের সুন্দরবন, সেন্ট মার্টিন, পার্বত্য অঞ্চল, হাওর, নদী এবং উপকূলীয় পরিবেশ অত্যন্ত সংবেদনশীল। তাই ইকো ট্যুরিজম, কমিউনিটি ট্যুরিজম এবং জলবায়ু সহনশীল পর্যটন উন্নয়নকে এই মহাপরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে।

স্থানীয় জনগণকে বাদ দিয়ে কোনো পর্যটন উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে সফল হয় না। বরং স্থানীয় মানুষকে উদ্যোক্তা, গাইড, হোমস্টে পরিচালনাকারী, কারুশিল্প উৎপাদক এবং সাংস্কৃতিক উপস্থাপক হিসেবে যুক্ত করতে পারলে পর্যটনের অর্থনৈতিক সুফল সরাসরি গ্রামীণ অর্থনীতিতে পৌঁছে যাবে।

বাংলাদেশের সামনে এখন একটি ঐতিহাসিক সুযোগ রয়েছে। বিশ্বের পর্যটন বাজার দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রকৃতি, সংস্কৃতি, অভিজ্ঞতাভিত্তিক ভ্রমণ এবং টেকসই পর্যটনের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। বাংলাদেশের নদী, বন, সমুদ্র, পাহাড়, লোকসংস্কৃতি, গ্রামীণ জীবন এবং আতিথেয়তার ঐতিহ্য এই পরিবর্তিত বাজারে একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারে।
তবে মহাপরিকল্পনা সফল হবে তখনই, যখন এটি কেবল একটি সরকারি নথি হয়ে থাকবে না; বরং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন, বেসরকারি বিনিয়োগ, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাস্তবে রূপ পাবে।

আজ যে মহাপরিকল্পনার সূচনা হয়েছে, সেটি যদি ধারাবাহিকতা, স্বচ্ছতা এবং সমন্বয়ের সঙ্গে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে আগামী দুই দশকে পর্যটন শুধু বাংলাদেশের একটি সম্ভাবনাময় খাতই থাকবে না; এটি দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি, ব্যাপক কর্মসংস্থানের উৎস, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের শক্তিশালী মাধ্যম এবং বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের নতুন পরিচয়ের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

লেখক: মো. মামুন হাসান,ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ,সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।

 

বিশ্ব জুড়ে আদিবাসী জনগোষ্ঠী ক্রমাগত ঝুঁকিতে

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ২:০১ অপরাহ্ণ
বিশ্ব জুড়ে আদিবাসী জনগোষ্ঠী ক্রমাগত ঝুঁকিতে

প্রকাশ ঘোষ বিধান

বিশ্বজুড়ে আদিবাসী জনগোষ্ঠী তাদের ভূমি অধিকার হরণ, জলবায়ু পরিবর্তন, ভাষার বিলুপ্তি, প্রান্তিকীকরণ এবং সাংস্কৃতিক বিলুপ্তির মতো মারাত্মক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে। আধুনিকায়নের চাপে এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে তাদের নিজস্ব ভাষা, ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান ও সাংস্কৃতিক পরিচয় দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে।

আদিবাসী জনগোষ্ঠী আধুনিক উন্নয়ন ও বন ধ্বংসের ফলে তাদের ঐতিহ্যবাহী জীবনযাত্রা ও অস্তিত্ব আজ মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন ও বৈশ্বিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৬.২ শতাংশ আদিবাসী। বিশ্বের ৯০টি দেশে প্রায় ৫০ কোটি আদিবাসী বসবাস করলেও তারা ক্রমাগত তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

১৯৯২ সালে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের উন্নয়ন ও সংরক্ষণ উপকমিশনের কর্মকর্তারা তাদের প্রথম সভায় বিশ্ব আদিবাসী দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৯৩ সালকে জাতিসংঘ প্রথমবার বিশ্বে আদিবাসী বর্ষ ঘোষণা করে। পরের বছর ১৯৯৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রতি বছর ৯ আগস্টকে বিশ্ব আদিবাসী দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ১৯৯৪ সালে বিশ্বে প্রথমবারের মতো আদিবাসী দিবসটি পালিত হয়। বিশ্বের সব আদিবাসীর অধিকার, শত বছরের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে সুরক্ষার লক্ষ্যে প্রতি বছর দিবসটি পালন করা হয়।

আদিবাসী জনগোষ্ঠী বলতে কোনো একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে বা ভূখন্ডে উপনিবেশ স্থাপন বা অন্য কোনো অঞ্চলের মানুষের অভিবাসনের পূর্বে যারা প্রথাগতভাবে সেখানে বসবাস করে আসছে, তাদের বংশধরদের বোঝায়। এরা সাধারণত নিজস্ব সংস্কৃতি, সামাজিক নিয়ম, ভাষা এবং ঐতিহ্যের অধিকারী হয়ে থাকে।

বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীবাংলাদেশ এবং প্রাচীন বাংলার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে বিভিন্ন সমৃদ্ধ আদিবাসী বা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সন্ধান পাওয়া যায়। ভৌগোলিক অবস্থানভেদে এদের প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন পাহাড় ও সমতাল। পার্বত্য অঞ্চলের আদিবাসীরা চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, ম্রো, বম, পাংখোয়া, খিয়াং, খুমি, লুসাই এবং চাক। সমতল অঞ্চলের আদিবাসীরা সাঁওতাল, গারো, খাসিয়া, মুন্ডা, ওরাওঁ, হাজং, রাজবংশী, কোচ, কোল এবং ডালু।

বাংলাদেশে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো, সাঁওতাল, মণিপুরি, ম্রো, তঞ্চঙ্গা প্রভৃতি ১৪ জনগোষ্ঠী প্রাচীনকাল থেকেই আদিবাসী হিসেবে বিশ্বে পরিচিত। কিন্তু বর্তমান সরকার সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আদিবাসী শব্দকে বিলুপ্ত করে ৫০টি জাতিগোষ্ঠীকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সম্প্রতি গেজেট প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ সরকারের তালিকা অনুযায়ী বর্তমানে দেশে ৫০ জাতের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী রয়েছেন। তারা হলো চাকমা,ওরাঁও, কোচ, কোল, খাসিয়া বা খাসি, খিয়ং, খুমি, গারো, চাক, ডালু, তঞ্চঙ্গা, ত্রিপুরা, পাংখোয়া বা পাংখো, বর্মণ, বম, মণিপুরী, মারমা, পাহাড়ি বা মালপাহাড়ি, মুন্ডা, ম্রো, রাখাইন, লুসাই, সাঁওতাল, হাজং, মাহাতো বা কুর্মি মাহাতো বা বেদিয়া মাহাতো, কন্দ, কড়া, গঞ্জু, গড়াইত, গুর্খা, তেলী, তুরি, পাত্র, বাগদী, বানাই, বড়াইক বা বাড়াইক, বেদিয়া, ভূমিজ ভূইমালী, ডিল, মালো বা ঘাসিমালো, মাহালী, মুসহর, রাজোয়াড়, লোহার, শবর, হুদি, হো, খারিয়া বা খাড়িয়া এবং খারওয়ার বা খেড়োয়ার। এসব নৃগোষ্ঠী বা আদিবাসী লোকজনের অধিকাংশই পাহাড়ে ও সামান্য কিছু সমতলে নানা বঞ্চনা ও হয়রানির শিকার হয়ে যুগ যুগ ধরে বসবাস করছে। তবে সংবিধানে উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী শব্দগুলো পরিবর্তন করে সরাসরি আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি এখনও জোরালো।

জল, জঙ্গল আর পাহাড়ের সাথে তাদের জীবন ও অর্থনীতি নিবিড়ভাবে জড়িত। অধিকাংশ সম্প্রদায়েরই নিজস্ব মৌখিক বা লিখিত মাতৃভাষা রয়েছে। বিজু, সাংগ্রাই, ওয়ানগালা, সোহরাই ইত্যাদি তাদের নিজস্ব প্রধান উৎসব। নিজস্ব সমাজ পরিচালনা ও বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য প্রথাগত রাজা বা হেডম্যান ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকে। বর্তমান প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহভূমির অধিকার সংকট, প্রথাগত জমির মালিকানা হারানো এবং উচ্ছেদ হওয়া বর্তমান সময়ের অন্যতম বড় সমস্যা। নিজস্ব ভাষার লিখিত রূপের অভাব এবং চর্চা কমে যাওয়ায় অনেক ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে।

বিশ্বব্যাপী আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রধান প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো হলো; বহুজাতিক কর্পোরেশন ও প্রভাবশালী মহলের কারণে আদিবাসীরা তাদের পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি হারাচ্ছে। অনেক দেশে আদিবাসীদের প্রথাগত ভূমি অধিকারের কোনো আইনি দলিল বা স্বীকৃতি নেই। আধুনিকতার চাপ এবং রাষ্ট্রীয় অবহেলার কারণে আদিবাসীদের নিজস্ব মাতৃভাষা ও মৌখিক ঐতিহ্য দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। মূলধারার সংস্কৃতির আধিপত্যের কারণে তরুণ আদিবাসীরা তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।

গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও আলাস্কার মতো অঞ্চলের উপকূলীয় ক্ষয় আদিবাসীদের বাস্তুচ্যুত করছে। আমাজনের দাবানল ও নির্বিচারে বন উজাড়ের কারণে আদিবাসীরা তাদের জীবন ধারণের মূল উৎস হারাচ্ছে। শিক্ষা, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপদ কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে তারা চরমভাবে বঞ্চিত। বিশ্বজুড়ে আদিবাসী জনগোষ্ঠী সাধারণ জনসংখ্যার তুলনায় অনেক বেশি দারিদ্র্যের মধ্যে জীবনযাপন করে।

এই বৈশ্বিক সংকটগুলোর সমাধানে প্রতি বছর ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালনের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে সচেতনতা বৃদ্ধির চেষ্টা করা হয়। বিশ্ব জুড়ে আদিবাসী জনগোষ্ঠী তাদের জমি ও সম্পদ নিয়ে হুমকি, তাদের অধিকার ক্ষুণ্ণতার চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। তারা সাংস্কৃতিক বিলুপ্তি, প্রান্তিকীকরণ ও বর্জনের ক্রমাগত ঝুঁকিতে থাকে। বিশ্বজুড়ে আদিবাসী দিবসের আলোচনা ও বৈশ্বিক ফোরামগুলোতে তাদের সুরক্ষার বিষয়টি এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

 

আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ২০২৬: বাংলাদেশের আদিবাসীদের দূর্গম পথচলা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ১:৪৯ অপরাহ্ণ
আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ২০২৬: বাংলাদেশের আদিবাসীদের দূর্গম পথচলা

নিকোলাস বিশ্বাস

আদিবাসী জনগণের অধিকার সংরক্ষণ এবং তাদের নানামূখী চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতি বছর ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালিত হয়। এ দিবসটি সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, ঐতিহ্যগত জ্ঞান, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং পরিবেশগত টেকসই উন্নয়নে আদিবাসী জনগণের অসামান্য অবদানকেও স্বীকৃতি জানায়। ২০২৬ সালের জাতিসংঘের প্রতিপাদ্য: “জীবন রক্ষা ও সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতকরণে আদিবাসী ধাত্রীদের অনন্য অবদানকে সম্মান জানানো” যা মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, কল্যাণ ও ঐতিহ্যগত জ্ঞানের সংরক্ষণ নিশ্চিতকরণের ওপর আলোকপাত করে।

বাংলাদেশে আদিবাসী জনগণের বর্তমান পরিস্থিতি
বাংলাদেশ তার সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও সামাজিক সম্প্রীতির জন্য বিশ্বজুড়ে সুপরিচিত। এ দেশ বৈচিত্র্যময় জাতিগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক অনন্য আবাসস্থল। সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি এখানে ৫৪টিরও বেশি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস, যারা অন্তত ৩৫টি ভিন্ন ভাষায় কথা বলে। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, দেশে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ১৬ লাখ ৫০ হাজার, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ১ শতাংশ। তবে আদিবাসী সংগঠনগুলোর মতে, প্রকৃত সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখের কাছাকাছি। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা, ম্্েরা, বম, সাঁওতাল, ওরাঁও, গারো, মাহাতো, পাংখোয়া, রাখাইন, মুন্ডা, মণিপুরীসহ বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠী যুগ-যুগ ধরে তাদের স্বতন্ত্র ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বজায় রেখে বসবাস করে আসছে।

আমাদের সংবিধান ও সমঅধিকারের অঙ্গীকার
বাংলাদেশের সংবিধান সমতা ও ন্যায়বিচারের একটি শক্তিশালী ভিত্তি প্রদান করেছে। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে সকল নাগরিকের আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং আইনের সমান সুরক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। ২৮ অনুচ্ছেদে ধর্ম, বর্ণ, জাত, লিঙ্গ কিংবা জন্মস্থানের ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং জনজীবনের সকল ক্ষেত্রে নারীর সমঅধিকার স্বীকৃত হয়েছে। তবে আরও স্পষ্টীকরণের জন্য সংবিধানে ‘জাতিসত্তা কিংবা আদিবাসী’ শব্দটির অন্তর্ভুক্তি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

বাংলাদেশ ১৯৭২ সালে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কনভেনশন নং ১০৭ অনুসমর্থন করলেও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় এখনো উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। ২০১১ সালের সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে দেশের জাতিগত বৈচিত্র্য স্বীকৃত হলেও আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘আদিবাসী জনগণ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। যদিও কিছু সাংস্কৃতিক অধিকার স্বীকৃত হয়েছে, ভূমির মালিকানা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং অর্থনৈতিক অধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এখনো পুরোপুরি সমাধান হয়নি। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা, বিশেষ করে আইএলও -এর (সিইএসিআর), বার বার গুরুত্বারোপ করেছে যে, এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে; যেখানে আদিবাসী জনগণ তাদের মৌলিক অধিকার পূর্ণাঙ্গভাবে ভোগ করতে পারেন।

আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা
সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, বাংলাদেশে আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা এখনও একটি গুরুতর মানবাধিকার সংকট। কাপায়েং ফাউন্ডেলম-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৩২ জন আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুকে কেন্দ্র করে মোট ২৯টি সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে ধর্ষণ, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, ধর্ষণের চেষ্টা, হত্যা, নির্যাতন এবং যৌন হয়রানির মতো অপরাধ অন্তর্ভুক্ত ছিল। এসব ঘটনা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আদিবাসী নারীদের চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার প্রতিফলন। তবে প্রকৃত ঘটনার সংখ্যা আরো অনেক বেশি বলে ধারণা করা হয়।

প্রতিশোধের আশঙ্কা, সামাজিক কলঙ্ক, ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা, আইনি সহায়তা ও সহায়ক সেবায় সীমিত প্রবেশাধিকার এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী ও বিচারিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থাহীনতার কারণে আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতার বহু ঘটনাই নথিভুক্ত হয় না। এসব প্রতিবন্ধকতা শুধু ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করে না; বরং সহিংসতা, প্রান্তিকীকরণ এবং বৈষম্যের চক্রকে দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে। তাই জরুরি ভিত্তিতে আরও শক্তিশালী আইনি সুরক্ষা, দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, কার্যকর বিচারিক প্রক্রিয়া, ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক সহায়তা ব্যবস্থা এবং অর্থবহ প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তা না হলে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর এ অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব হবে না।

বিচার বিলম্বিত মানেই বিচার থেকে বঞ্চিত
“বিচার বিলম্বিত মানেই বিচার থেকে বঞ্চিত” – এই বহুল প্রচলিত উক্তিটি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। সহিংসতার অসংখ্য বেঁচে থাকা মানুষের জন্য বিচার শুধু ধীরগতির নয়, অনেক ক্ষেত্রেই তা অধরাই থেকে যায়। তদন্তে বিলম্ব, দীর্ঘসূত্রিতাপূর্ণ বিচারিক প্রক্রিয়া, যথাযথ প্রমাণ সংগ্রহে ব্যর্থতা, ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং বহু ক্ষেত্রে অপরাধীদের জবাবদিহিতার অভাব বিচারপ্রাপ্তিকে বাধাগ্রস্ত করে। এর ফলে বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা তৈরী ও ভুক্তভোগীরা অভিযোগ জানাতে নিরুৎসাহিত হন। এতে দায়মুক্তির সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হয়।

পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি: ঊনত্রিশ বছরের অপূর্ণ বাস্তবায়ন
১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের প্রায় তিন দশক পরও এর বহু গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। এই চুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল অধিকতর স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা, ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধের কার্যকর সমাধান এবং পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠনের মাধ্যমে একটি স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করা। পরবর্তী বিভিন্ন সরকার চুক্তির বিভিন্ন ধারা বাস্তবায়নে অগ্রগতির কথা উল্লেখ করলেও আদিবাসী প্রতিনিধিদের মতে, অর্থবহ বিকেন্দ্রীকরণ, কার্যকর ভূমি কমিশন প্রতিষ্ঠা এবং দীর্ঘদিনের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তিসহ বেশ কয়েকটি মৌলিক প্রতিশ্রুতি এখনো অপূর্ণ রয়ে গেছে। এই বাস্তবায়ন ঘাটতি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে অনিশ্চয়তা ও অবিশ্বাসকে আরও গভীর করেছে।

অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপের এক নতুন সুযোগ
সম্প্রতি সমতলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সংরক্ষিত মহিলা আসন ১৯ -এর সংসদ সদস্য আন্না মিনজের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটি সাক্ষাতে অংশ নেয়। বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিষয়ক মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে প্রতিনিধিরা তাদের ন্যায্য দাবিসমূহ তুলে ধরে একটি সুপারিশপত্র প্রধানমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করেন। আদিবাসী নেতৃবৃন্দের এই উদ্যোগ নতুন করে দেশের জাতীয় আলোচনায় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বিষয়টিকে সামনে নিয়ে এসেছে।

অন্তর্ভুক্তিমূলক ভবিষ্যৎ নির্মাণ
সংলাপ, সহনশীলতা এবং সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশ বহু জাতীয় সংকট সফলভাবে মোকাবিলা করেছে। একই অঙ্গীকার এখন প্রয়োজন, যাতে আদিবাসী জনগোষ্ঠীও সংবিধানের পূর্ণ সুরক্ষা এবং অন্যান্য নাগরিকের মতো সমান সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারে। তাদের কল্যাণে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো দ্রুত বিবেচনার দাবি রাখে:

ভূমি বিরোধের সমাধান: আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য সরকারকে একটি কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একইসঙ্গে সমতলের আদিবাসীদের জন্য একটি পৃথক ভূমি কমিশন গঠন করা জরুরি।

ন্যায়বিচারকে শক্তিশালী করা: আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুর ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে বিশেষায়িত আইনি সহায়তা, সুরক্ষা, দ্রুত তদন্ত এবং কার্যকর বিচারিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে।

শিক্ষা ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্তি: জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় আদিবাসী ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক সংরক্ষণ ও বিকাশ নিশ্চিত করতে হবে।

প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি: জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে এমনভাবে শক্তিশালী করতে হবে যাতে তারা আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় মানবাধিকার পরিস্থিতির নিয়মিত ও স্বাধীন পর্যবেক্ষণ পরিচালনা করতে পারে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন: পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির কার্যকর বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করতে সকল অংশীজনের মধ্যে নতুন করে গঠনমূলক সংলাপ শুরু করা অপরিহার্য।

বৈচিত্র্যের মধ্য দিয়েই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিকাশ
বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠী এ দেশের বাইরের কেউ নয়; বরং তারা এই রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম অংশীদার। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বহু সদস্য বাঙালি সহযোদ্ধাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছেন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন। দেশের প্রতি তাদের এই অবদান শুধু আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির মাধ্যমে নয়, বরং তাদের অধিকার, মর্যাদা এবং সমান নাগরিকত্ব নিশ্চিতকারী নীতিমালার মাধ্যমে যথাযথভাবে মূল্যায়িত হওয়া উচিত।

বাংলাদেশের শক্তি কখনোই সাংস্কৃতিক একরূপতার ওপর নির্ভর করেনি। বরং এর প্রকৃত শক্তি নিহিত রয়েছে বৈচিত্র্যের সমৃদ্ধিতে এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষায়। তাই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি এবং পূর্বপুরুষের ভূমি রক্ষা করা কোনো সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর প্রতি দয়া প্রদর্শন নয়; বরং এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং টেকসই ভবিষ্যতের প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ।

নিকোলাস বিশ্বাস একজন উন্নয়নকর্মী এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএফপিএ) মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত লেখক। যোগাযোগ: gonomaddyom@gmail.com