প্রবীণদের সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করা সমাজের মৌলিক দায়িত্ব
প্রকাশ ঘোষ বিধান
প্রবীণদের সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করা যেকোনো সভ্য সমাজের জন্য একটি মৌলিক দায়িত্ব। যা তাদের শেষ বয়সে একটি মর্যাদাপূর্ণ ও নিরাপদ জীবনযাপনের নিশ্চয়তা দেয়। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে প্রবীণ ব্যক্তিরা প্রায়ই পরিবার ও সমাজে অবহেলা বা নির্যাতনের শিকার হন। তাদের জন্য একটি মর্যাদাপূর্ণ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
সমাজে প্রবীণরা প্রায়শই মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন, আর্থিক শোষণ এবং চরম অবহেলার শিকার হন। দেশের প্রবীণরা প্রধানত চার ধরনের নির্যাতনের মুখোমুখি হন। মানসিক নির্যাতন : তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা, হেয় প্রতিপন্ন করা এবং অবজ্ঞার চোখে দেখা। অবহেলার শিকার : সঠিক যতœ, পুষ্টি এবং পারিবারিক সাহচর্যের অভাব। আর্থিক নির্যাতন : সম্পত্তি জোরপূর্বক লিখে নেওয়া বা তাদের জমানো অর্থের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। শারীরিক নির্যাতন : বয়োবৃদ্ধ বয়সেও শারীরিক আঘাত বা নির্যাতনের শিকার হওয়া।
প্রবীণদের সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করা কোনো করুণা বা দাক্ষিণ্য নয়, বরং এটি সমাজের একটি মৌলিক এবং নৈতিক দায়িত্ব। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে প্রবীণরা যেন অবহেলা, নিপিড়ন বা বৈষম্যের শিকার না হন এবং মর্যাদার সাথে বেঁচে থাকতে পারেন, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়েরই কর্তব্য। বাংলাদেশের সংবিধানে এবং জাতীয় নীতিমালায় প্রবীণদের এই অধিকার ও সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশ্বজুড়ে এবং বাংলাদেশে প্রবীণদের মৌলিক অধিকার রক্ষা ও সুরক্ষার জন্য বিভিন্ন আইন, নীতিমালা এবং আন্তর্জাতিক নীতিমালা রয়েছে। প্রবীণদের সুরক্ষিত রাখা কোনো দয়া বা করুণা নয়, এটি তাদের মৌলিক মানবাধিকার। আজকের তরুণরাই আগামী দিনের প্রবীণ, এই সত্যটি মাথায় রেখে এখনই সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।
প্রবীণদের জন্য আয়ের বয়সসীমা দিয়ে মর্যাদা নির্ধারণ না করে সার্বজনীন সামাজিক পেনশন চালু করা। বয়স্ক ভাতার পরিমাণ ও পরিধি আরও বৃদ্ধি করা। হাসপাতালগুলোতে প্রবীণদের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসাব্যবস্থা নিশ্চিত করা। সরকারিভাবে বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে জরুরি ওষুধ ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার সুবিধা দেওয়া।
প্রতি বছর ১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস পালিত হয়। ১৯৯০ সালের ১৪ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৯১ সাল থেকে প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী এই দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। প্রবীণদের সুরক্ষা, অধিকার নিশ্চিত করা এবং বার্ধক্যের বিভিন্ন সমস্যা ও প্রতিকার নিয়ে গণসচেতনতা তৈরি করা।
প্রবীণদের আইনি সুরক্ষা দিতে বিদ্যমান আইন ও নীতিমালা আরও কঠোরভাবে কার্যকর করা এবং যেকোনো ধরণের সহিংসতা বা নির্যাতনের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি প্রতিকারের ব্যবস্থা করা। পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩ এবং ২০২৩ সালের বিধিমালার যথাযথ প্রয়োগ এবং সময়ের প্রয়োজনে এর সংশোধন নিশ্চিত করা। সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে প্রবীণদের আজীবন ভোগদখলের অধিকার নিশ্চিত করা।
প্রবীণদের প্রধান চাহিদা হলো মানসিকভাবে ভালো থাকা। পরিবারে তাদের অবহেলা বা হেয় না করে নিয়মিত সময় দেওয়া ও সম্মান প্রদর্শন করা উচিত। পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের চর্চা বাড়ানো। তাঁদের ঘরের বোঝা না ভেবে অভিজ্ঞতার পথপ্রদর্শক হিসেবে মূল্যায়ন করা। টেলিভিশন, রেডিও ও সংবাদপত্রে প্রবীণদের অধিকার রক্ষা এবং তাদের অবহেলার কুফল নিয়ে নিয়মিত প্রচারণা চালানো।
প্রবীণদের সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করা প্রতিটি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নৈতিক ও মৌলিক দায়িত্ব। সমাজে বয়সের বৈষম্য রোধ করতে এবং প্রবীণদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে সামাজিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়াতে হবে। প্রবীণদের সুরক্ষিত রাখা মানে আমাদের নিজেদের ভবিষ্যৎকেই সুরক্ষিত করা। কারণ আজকের নবীনই আগামী দিনের প্রবীণ।
প্রবীণদের সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করতে আইন ও নীতিমালার পাশাপাশি ব্যাপক সামাজিক সচেতনতা ও গণসচেতনতা তৈরি করতে হবে। প্রবীণদের অধিকার পুরোপুরি নিশ্চিত করতে কেবল আইন প্রয়োগই যথেষ্ট নয়, বরং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং প্রতিটি পরিবারে প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও ভালোবাসার পরিবেশ তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট






