প্রবীণদের হালচাল: রাষ্ট্রের করণীয়
মো. ফজলুর রহমান
মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ তার অভিজ্ঞতা। বয়সের ভারে কর্মক্ষমতা কিছুটা শিথিল হলেও জীবনের দীর্ঘ অভিযাত্রা, অর্জিত জ্ঞান, প্রজ্ঞা আর মূল্যবোধের মহিমা বিন্দুমাত্র কমে না। বরং পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং শিকড়কে টিকিয়ে রাখতে প্রবীণদের ভূমিকা অপরিসীম। অথচ নির্মম বাস্তবতা হলো, জীবনের সোনালি দিনগুলো যে প্রবীণরা উৎসর্গ করেছেন অনাবিল সেবায়, বার্ধক্যে এসে তারাই মুখোমুখি হন নানামুখী সংকট ও অনিশ্চয়তার। আর্থিক অনটন, নিঃসঙ্গতা, স্বাস্থ্যঝুঁকি, পারিবারিক অবহেলা আর সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা তাদের জীবনকে করে তোলে বিষাদময়।
বাংলাদেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। গড় আয়ু বৃদ্ধি, আধুনিক চিকিৎসার প্রসার ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের ফলে মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ জুড়ে এখন প্রবীণরা। ফলে বিষয়টি এখন আর কেবল পারিবারিক দায়িত্বের গ-িতে সীমাবদ্ধ নেই; এটি পরিণত হয়েছে রাষ্ট্রীয় নীতি ও সামাজিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান শর্তে। একটি রাষ্ট্র কতটা মানবিক ও সুশাসিত, তা পরিমাপের অন্যতম মাপকাঠি হলো প্রবীণদের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন নিশ্চিত করার সক্ষমতা।
প্রবীণ জীবনের অন্যতম প্রধান সংকট অর্থনৈতিক অসংগতি। কর্মজীবন শেষে আয়ের পথ বন্ধ হয়ে গেলে অধিকাংশ প্রবীণকে সন্তান বা স্বজনদের মুখাপেক্ষী হতে হয়। সরকারি চাকরিজীবীদের একটি অংশ পেনশন সুবিধা পেলেও বিপুলসংখ্যক মানুষ, যারা অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেছেন, তাদের কোনো অবসরকালীন আর্থিক সুরক্ষা থাকে না। বার্ধক্যের ভার সামলে জীবনের মৌলিক চাহিদা মেটাতে অনেককেই শেষ বয়সেও কঠোর পরিশ্রমে বাধ্য হতে হয়। এটি দেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতাকেই স্পষ্টভাবে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় প্রবীণদের ভাতা প্রদান একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। ভাতার পরিমাণ বৃদ্ধি, প্রকৃত অভাবগ্রস্ত প্রবীণদের অন্তর্ভূক্তি, সহজ প্রাপ্তি এবং প্রশাসনিক জটিলতা নিরসন করা জরুরি। প্রযুক্তির এই যুগে ডিজিটাল সেবার আওতায় প্রবীণদের আনা হলেও, প্রযুক্তিগত অজ্ঞতার কারণে কোনো প্রবীণ যেন তার অধিকার থেকে বঞ্চিত না হন, সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন।
স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে প্রবীণরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, দৃষ্টিহীনতা, মানসিক অবসাদ ও দীর্ঘমেয়াদি জটিল রোগ প্রবীণদের সার্বক্ষণিক সঙ্গী। অথচ আমাদের সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে প্রবীণবান্ধব বিশেষ সেবার ব্যবস্থা অত্যন্ত সীমিত। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট কাটা, দূরবর্তী হাসপাতালে যাতায়াত এবং চড়া দামের ওষুধ কেনা বহু সাধারণ পরিবারের জন্য অসম্ভব বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে শুরু করে জেলা হাসপাতালে প্রবীণদের জন্য পৃথক সেবা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, বিনামূল্যে প্রয়োজনীয় ওষুধ, ফিজিওথেরাপি ও মানসিক চিকিৎসাসেবা জোরদার করতে হবে। সম্ভব হলে অসহায় প্রবীণদের জন্য হোম-সেবা বা প্রাতিষ্ঠানিক পরিচর্যা নিশ্চিত করা দরকার।
শারীরিক অসুস্থতার চেয়েও প্রবীণদের বেশি কুঁড়ে কুঁড়ে খায় মানসিক একাকিত্ব। অবসর গ্রহণের পর সামাজিক প্রাসঙ্গিকতা কমে যাওয়া, একক পরিবারের প্রবণতা বৃদ্ধি এবং প্রিয়জনদের অনুপস্থিতি তাদের গভীর হতাশায় নিমজ্জিত করে। এই একাকিত্ব দূর করতে প্রতিটি সামাজিক ও রাজনৈতিক উদ্যোগে প্রবীণদের সম্পৃক্ত করা উচিত। কমিউনিটি সেন্টার, পাঠচক্র, সামাজিক সংগঠন ও বিনোদনমূলক কর্মকা-ের সুযোগ বাড়ানো হলে তাদের জীবনের গতি ফিরতে পারে।
পরিবারই প্রবীণদের সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থল। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটায় অনেক প্রবীণ অবহেলা, মানসিক যন্ত্রণা, এমনকি আর্থিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। প্রবীণ নারীদের অবস্থা আরও করুণ; সম্পত্তি ও উত্তরাধিকার সংক্রান্ত অজ্ঞতা এবং সামাজিক ও আর্থিক নির্ভরশীলতা তাদের চরম ঝুঁকির মুখে ফেলে। প্রবীণদের আইনি সুরক্ষা প্রদানের পাশাপাশি সমাজে প্রবীণদের অধিকার ও মর্যাদার বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করা আবশ্যক। এছাড়া ফুটপাত দখল মুক্ত করা, ট্রাফিক ব্যবস্থাকে প্রবীণবান্ধব করা এবং নিরাপদ পথচারী চলাচলের সুবিধা প্রদান করা নগরায়নের অন্যতম অংশ হওয়া উচিত।
প্রবীণদের অভিজ্ঞতাকে স্রেফ স্মৃতির খাতায় জমা না রেখে দেশের উন্নয়নে কাজে লাগানো যেতে পারে। প্রবীণ শিক্ষক, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, গবেষক বা প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতাকে নতুন প্রজন্মের দিকনির্দেশনায় এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি পরামর্শক প্যানেলে কাজে লাগানো হলে দেশ ও সমাজ ব্যাপকভাবে উপকৃত হবে।
আজকের কর্মক্ষম যুবকই আগামী দিনের প্রবীণ। তাই প্রবীণদের কল্যাণ সুনিশ্চিত করার অর্থ হলো নিজেদের ভবিষ্যৎ নিরাপদ করা। রাষ্ট্র ও সমাজকে একযোগে কাজ করতে হবে যেন প্রবীণরা সমাজের বোঝা না হয়ে প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতার সুবাস ছড়িয়ে মর্যাদার সাথে বেঁচে থাকতে পারেন।
লেখক: মো. ফজলুর রহমান, বিশিষ্ট সমাজসেবক, আজীবন সদস্য, সিনিয়র সিটিজেন ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন, সাতক্ষীরা












