প্রাণবৈচিত্র্যসমৃদ্ধ কৃষি খামার গড়ে স্বাবলম্বী উপকূলের চন্দনা রানী
রনজিৎ বর্মন, সুন্দরবনাঞ্চল (শ্যামনগর): “আমরা নিজেরা বিষ খাই না, অপরকেও বিষ খাওয়াইতে চাই না। সাহস আর আত্মবিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে গেলে উন্নয়ন সম্ভব”Ñএভাবেই নিজের কাজের কথা বলছিলেন চন্দনা রানী। অদম্য সাহস ও উদ্যোগী শক্তির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছেন উপকূলের এই নারী। জলবায়ুসহনশীল কৃষি চর্চার মাধ্যমে প্রাণবৈচিত্র্যসমৃদ্ধ কৃষি খামার তৈরি করে আর্থসামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রেখে চলেছেন তিনি।
উপকূলীয় সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার সুন্দরবনসংলগ্ন বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের কদমতলা গ্রামের বাসিন্দা চন্দনা রানী (৩০)। স্বামী রঞ্জন ম-ল (৩৪) পেশায় একজন দিনমজুর। ৩০ শতক জমির ওপর তাঁদের বসবাস। চার সদস্যের পরিবারে ছেলে সজীব ম-ল (৯) ও মেয়ে ধৃতি ম-লকে (৩) নিয়ে তাঁদের সংসার।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঘাত-প্রতিঘাত মোকাবিলা করে উপজেলায় এক ব্যতিক্রমী প্রাণবৈচিত্র্যসমৃদ্ধ কৃষি খামার গড়ে তুলেছেন চন্দনা। স্থানীয় প্রযুক্তি ও অভিযোজন চর্চার মাধ্যমে জলবায়ুসহিষ্ণু ফসল চাষাবাদের পাশাপাশি নিজের বাড়িটিকে জলবায়ুসহনশীল কৃষি শিখনকেন্দ্রে রূপান্তর করেছেন তিনি। তাঁর বাড়িতে রয়েছে স্থানীয় জাতের হাঁস-মুরগি, ছাগল, গরু, মৌসুমভিত্তিক সবজি চাষ, পুকুরে স্থানীয় প্রজাতির মাছ চাষ, অচাষকৃত উদ্ভিদবৈচিত্র্য, ঔষধি গাছের বাগান এবং ফলজ ও বনজ বৃক্ষ।
একই সঙ্গে এলাকার নারীদের নিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন একটি সংগঠন, যার মাধ্যমে নানা মানবিক ও পরিবেশ উন্নয়নমূলক কর্মকা- বাস্তবায়ন করা হয়। তাঁর এই কর্মকা- দেখে উৎসাহিত হয়ে পার্শ্ববর্তী বাসিন্দা তুলশী রানী, অঞ্জলী রানী, ডলি রানী, পার্বতী রানী, আছিয়া পারভীন, সীতা রানী ও রেনুকাসহ অনেকেই খামার গড়ে তুলেছেন বা তোলার চেষ্টা করছেন।
চন্দনা রানীর কৃষিবাড়িতে প্রথম দর্শনেই চোখে পড়ে সারিসারি বস্তায় আদা চাষ, ক্যারেট বা ফেলে দেওয়া পাত্রে মরিচ চাষ, মাচা ও বেড পদ্ধতিতে সবজি চাষ, দেশীয় চারা উৎপাদনের নার্সারি, তিন স্তরবিশিষ্ট ফসল চাষ এবং পুকুরের পাড়ে ফলজ বৃক্ষ। তিনি জ্বালানি সাশ্রয়ী পরিবেশবান্ধব চুলা ব্যবহার করেন এবং মাটির তৈরি ‘হাজল’ ব্যবহারের মাধ্যমে হাঁস-মুরগির ডিম ফোটান। নিজ উদ্যোগে গড়ে তোলা দেশীয় বীজ ব্যাংকের মাধ্যমে তিনি বীজ সংরক্ষণ ও বিনিময় করছেন।
পাশাপাশি বৃষ্টিকাতর উপকূলীয় এলাকায় বৃষ্টির পানি ধরে রাখার পদ্ধতিও রয়েছে তাঁর বাড়িতে।
সম্পূর্ণ জৈব পদ্ধতিতে ও জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করে উৎপাদিত এসব পণ্য তিনি স্থানীয় সাপ্তাহিক বাজারে বিক্রি করেন। নিজের বাড়িতে সেলাইয়ের কাজ করেও অতিরিক্ত আয় করছেন চন্দনা।
চন্দনা রানী বলেন, “এখন আমার পরিবারের সচ্ছলতা ফিরে এসেছে। সঞ্চয়ের উদ্দেশ্যে ব্যাংকে একটি হিসাব খুলেছি এবং একটি বেসরকারি সংস্থাতেও জমা করছি।” ভবিষ্যতে বসতঘরটি সুন্দর করা এবং দুই সন্তানকে লেখাপড়া শেখানোর স্বপ্ন দেখেন তিনি।
উপজেলা কৃষি অফিসের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা চন্দনা রানীর খামারটি পরিদর্শন করে বিভিন্ন পরামর্শ দিয়েছেন। তবে খামারটি আরও উন্নত করতে প্রশিক্ষণ ও সরকারি-বেসরকারি উপকরণ সহায়তার জোর দাবি জানিয়েছেন এই নারী উদ্যোক্তা।







