বাংলাদেশ ২০২৬: উন্নয়নের পথে এক নবযাত্রার সম্ভাবনা-চার
পরিবর্তন-পর্ব ৩৯
আশরাফ রহিম
পরিবর্তন-৩৮ আলোচনায় প্রধান বিষয় ছিল যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান কেন্দ্রিক মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি-যা আমাদের জন্য এক অশনি সংকেত। জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি, বিশ্ববাজারে অস্থিরতা এবং আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি-সব মিলিয়ে এর প্রভাব পড়বে পরিবহন, কৃষি ও নিত্যপণ্যের বাজারে। অর্থাৎ, এর সরাসরি চাপ পড়বে সাধারণ মানুষের জীবনে।
সম্ভাব্য প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন অন্যতম। ইদানীং লোডশেডিং নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। আমরা অবশ্যই এই সমস্যার সমাধান চাই-এবং চাই একটি স্থায়ী সমাধান। এই সমাধান দুই ধাপে অর্জন করা সম্ভব:
১) ২০২৬-২৭ অর্থবছরকে সামনে রেখে তাৎক্ষণিক বা স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ;
২) দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ-অর্থাৎ স্বল্পমেয়াদি কার্যক্রমের পাশাপাশি দেশের উপযোগী একটি টেকসই পরিকল্পনা প্রণয়ন।
স্বল্পমেয়াদি কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়নের পরপরই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এগিয়ে যেতে হবে।
আগেও বলেছি, আবারও বলছি-বাংলাদেশের মানুষের পক্ষে অসম্ভব বলে কিছু নেই। ১৯৭১ সালে আমরা তার প্রমাণ দিয়েছি। এই সংকটের সমাধানও বাংলাদেশের মানুষই করতে সক্ষম। প্রয়োজন অগণিত “আলোকিত মানুষ”-যাদের সততা, কঠোর পরিশ্রম, নিষ্ঠা ও ত্যাগ অন্যদের অনুপ্রাণিত করবে। আমাদের দরকার আত্মবিশ্বাসী ও উদ্যমী মানুষ-যারা বিশ্বাস করে, আমাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ আমরাই গড়ে তুলবো।
আজকের আলোচনায় তুলে ধরা হলো এমন কিছু কার্যকর পদক্ষেপ, যা এখনই শুরু করা যেতে পারে। উল্লেখ্য, এখানে প্রস্তাবিত কিছু বিষয়ের ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) সহায়তা নেওয়া হয়েছে। মনে রাখতে হবে, নিরবচ্ছিন্ন ও স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে আমাদের উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত হবে।
বাংলাদেশে জ্বালানি সংকট-সম্ভাব্য সমাধান
বাংলাদেশ বর্তমানে একটি গুরুতর জ্বালানি সরবরাহ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নতুন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াবে-এটি সত্য। তবে মূল প্রশ্ন হলো, কীভাবে দেশে নিরবচ্ছিন্ন ও স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়?
বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট কোনো একক কারণে সৃষ্টি হয়নি; বরং এটি জ্বালানির উপর অতিনির্ভরতা, সঞ্চালন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, অর্থায়ন সংকট এবং চাহিদার দ্রুত বৃদ্ধির সম্মিলিত ফল। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র অবশ্যই সহায়ক হবে, তবে এটিকে একমাত্র সমাধান হিসেবে দেখা বাস্তবসম্মত নয়। সমাধান হতে হবে বহুমাত্রিক ও বাস্তবভিত্তিক।
নি¤েœ কিছু কার্যকর দিক তুলে ধরা হলো-
১) গ্রিড ও অবকাঠামো শক্তিশালীকরণ (সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার)
বাংলাদেশে অনেক সময় পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন থাকা সত্ত্বেও সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে বিভ্রাট ঘটে।
⦁ সঞ্চালন লাইনের উন্নয়ন করে জট ও ক্ষতি কমানো
⦁ স্মার্ট গ্রিড প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ (রিয়েল-টাইম পর্যবেক্ষণ ও ত্রুটি শনাক্তকরণ)
⦁ সিস্টেম লস কমানো
এই খাতের উন্নয়ন ছাড়া নতুন উৎপাদন নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে পারবে না।
২) জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য আনা (গ্যাস নির্ভরতা হ্রাস)
বর্তমানে বাংলাদেশ প্রাকৃতিক গ্যাস ও আমদানিকৃত জ্বালানির উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। একটি ভারসাম্যপূর্ণ জ্বালানি মিশ্রণে থাকা উচিতÑ
⦁ সৌর শক্তি (ছাদভিত্তিক ও শিল্প খাতে)
⦁ এলএনজি (স্বল্পমেয়াদে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে)
⦁ পারমাণবিক শক্তি (বেসলোড)
⦁ আঞ্চলিক জলবিদ্যুৎ আমদানি (নেপাল, ভুটান, ভারত থেকে)
৩) কৌশলগতভাবে সৌর শক্তিতে বিনিয়োগ
জমির সীমাবদ্ধতা বিবেচনায়Ñ
⦁ কারখানা ও বাণিজ্যিক ভবনে ছাদভিত্তিক সৌর ব্যবস্থা
⦁ জলাশয়ে ভাসমান সৌর প্রকল্প
⦁ গ্রামীণ ও দ্বীপ অঞ্চলে সৌর মাইক্রোগ্রিড
এতে কেন্দ্রীয় গ্রিডের উপর চাপ কমবে।
৪) জ্বালানি সংরক্ষণ (Energy Storage) বৃদ্ধি
⦁ ব্যাটারি স্টোরেজে বিনিয়োগ
⦁ পাম্পড হাইড্রো স্টোরেজ (যেখানে সম্ভব)
⦁ শহরাঞ্চলে গ্রিড-স্কেল স্টোরেজ
৫) জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার (স্বল্পমেয়াদে জরুরি)
⦁ দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) চুক্তি
⦁ কৌশলগত জ্বালানি মজুদ
⦁ সরবরাহ উৎসের বৈচিত্র্য
৬) চাহিদা ব্যবস্থাপনা (দ্রুত ফলপ্রসূ)
⦁ সময়ভিত্তিক বিদ্যুৎ মূল্য নির্ধারণ
⦁ জ্বালানি সাশ্রয়ী যন্ত্রে প্রণোদনা
⦁ শিল্পে অফ-পিক সময় ব্যবহার
মাত্র ৫-১০% পিক চাহিদা কমানো গেলে লোডশেডিং উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেতে পারে।
৭) আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্য সম্প্রসারণ
⦁ নেপাল ও ভুটান থেকে জলবিদ্যুৎ আমদানি
⦁ ভারতের সাথে গ্রিড সংযোগ বৃদ্ধি
৮) সুশাসন ও দক্ষতা বৃদ্ধি
⦁ প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্নীতি ও বিলম্ব হ্রাস
⦁ ইউটিলিটি ব্যবস্থার আর্থিক দক্ষতা বৃদ্ধি
⦁ বেসরকারি বিনিয়োগে সহায়ক নীতি
৯) পারমাণবিক শক্তির বাস্তবসম্মত ব্যবহার
রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র বেসলোড সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ হলেও-
⦁ এটি ব্যয়বহুল
⦁ দ্রুত সম্প্রসারণযোগ্য নয়
⦁ শক্তিশালী নিরাপত্তা কাঠামো প্রয়োজন
সারসংক্ষেপ (Bottom Line)
বাংলাদেশে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে কোনো একক সমাধান যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগÑ
⦁ শক্তিশালী গ্রিড অবকাঠামো
⦁ বহুমুখী জ্বালানি উৎস
⦁ নবায়নযোগ্য শক্তি ও সংরক্ষণ প্রযুক্তির সমন্বয়
⦁ আঞ্চলিক সহযোগিতা
⦁ দক্ষ ও সচেতন বিদ্যুৎ ব্যবহার
এই সমন্বিত পথই বাংলাদেশকে একটি টেকসই, নির্ভরযোগ্য এবং ভবিষ্যতমুখী জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে নিতে পারে-এটাই আমার দৃঢ় বিশ্বাস। অবশ্যই মনে রাখতে হবে, নিরবচ্ছিন্ন ও স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে আমাদের উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত হবে। (চলবে…)











