বিশ্ব গর্ভনিরোধ দিবস: সচেতন পরিবার পরিকল্পনা, নিরাপদ মাতৃত্ব ও প্রজননস্বাস্থ্য
সাকিবুর রহমান বাবলা
প্রতিবছর ২৬ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব গর্ভনিরোধ দিবস। পরিবার পরিকল্পনা, গর্ভনিরোধক পদ্ধতি ও প্রজননস্বাস্থ্য সম্পর্কে সঠিক তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া, অনাকাঙ্খিত গর্ভধারণ কমানো এবং জ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়াই এর মূল উদ্দেশ্য। দিবসটির সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি হলো-প্রতিটি গর্ভধারণ যেন পরিকল্পিত ও প্রত্যাশিত হয়। ২০০৭ সালে প্রথম পালিত এ বৈশ্বিক প্রচারণা বর্তমানে আন্তর্জাতিক সংস্থা, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও চিকিৎসা সংগঠনের সমন্বয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনে রূপ নিয়েছে।
২০২৬ সালের দিবসটির প্রতিপাদ্য-‘কোনো বাধা নয়, শুধুই পছন্দ: এখনই গর্ভনিরোধকের সহজলভ্যতা নিশ্চিত হোক’। তথ্যের ঘাটতি, সামাজিক কুসংস্কার, ভুল তথ্য, অর্থনৈতিক বাধা ও সেবার অপ্রতুলতা দূর করে নির্ভরযোগ্য তথ্য ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়াই এবারে মূল গুরুত্ব পেয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নীতিমালা অনুযায়ী, গর্ভনিরোধক ব্যবহার করা এবং পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণ করা মানুষের একটি মৌলিক মানবাধিকার।
পরিবার পরিকল্পনা বলতে দম্পতির সন্তান নেওয়ার সংখ্যা, সময় ও ব্যবধান সম্পর্কে স্বাধীন ও দায়িত্বশীল সিদ্ধান্তকে বোঝায়, যার সঙ্গে প্রজননস্বাস্থ্য, নিরাপদ মাতৃত্ব ও মা-শিশুর সুস্থতা যুক্ত। আর গর্ভনিরোধ হলো অনাকাঙ্খিত গর্ভধারণ প্রতিরোধের বিভিন্ন পদ্ধতি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও পরিবার পরিকল্পনাকে সন্তান সংখ্যা ও ব্যবধান নির্ধারণের সঙ্গে যুক্ত করেছে। অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণ প্রতিরোধ করা গেলে মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য সুরক্ষার পাশাপাশি পরিবারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনাও সুদৃঢ় হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২১ সালের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে ১৫–৪৯ বছর বয়সী প্রজননক্ষম ১.১ বিলিয়ন নারীর পরিবার পরিকল্পনার প্রয়োজন ছিল। তাদের মধ্যে ৮৭৪ মিলিয়ন আধুনিক গর্ভনিরোধক ব্যবহার করলেও ১৬৪ মিলিয়নের অপূর্ণ চাহিদা ছিল। কেবল পদ্ধতির অভাব নয়; তথ্যের ঘাটতি, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ভয়, সামাজিক বাধা ও মানসম্মত সেবার অভাবই এই অপূর্ণ চাহিদার প্রধান কারণ।
আধুনিক পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে কনডম, মুখে খাওয়ার বড়ি, ইনজেকশন, ইমপ্ল্যান্ট, আইইউডি এবং স্থায়ী পদ্ধতি। বয়স ও শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে সঠিক পদ্ধতি বেছে নেওয়া উচিত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, গর্ভধারণ প্রতিরোধের পাশাপাশি এইচআইভিসহ যৌনবাহিত সংক্রমণ প্রতিরোধে কনডমের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। তবে জরুরি গর্ভনিরোধক নিয়মিত পদ্ধতির বিকল্প নয়, তা কেবল বিশেষ পরিস্থিতিতে ব্যবহারযোগ্য।
গর্ভনিরোধ সম্পর্কে সামাজিক সংকোচ ও ভুল তথ্য দূর করতে দরকার সঠিক স্বাস্থ্যশিক্ষা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, বৈষম্যহীন ও মানসম্মত সেবা। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল প্রজননস্বাস্থ্যসেবা ও অধিকারভিত্তিক প্রসারে কাজ করে। ১৯৯৪ সালের আন্তর্জাতিক জনসংখ্যা ও উন্নয়ন সম্মেলন এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার এসডিজি ৩.৭ মূল লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে পরিবার পরিকল্পনা ও প্রজননস্বাস্থ্যসেবায় সর্বজনীন প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা। এখানে মূল নীতি হলো-সিদ্ধান্ত হতে হবে স্বেচ্ছামূলক, অবহিত ও জবরদস্তিমুক্ত।
বাংলাদেশ পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দেশে মোট প্রজনন হার ২.৭ থেকে কমে ২.১৫-এ নেমেছে এবং গর্ভনিরোধক ব্যবহারের হার ৫৬.১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। একই সময়ে অপূর্ণ চাহিদা ১৭ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নেমেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে ২০২২ অনুযায়ী, বিবাহিত নারীদের পরিবার পরিকল্পনার মোট চাহিদা ছিল ৭৪ শতাংশ এবং অপূর্ণ চাহিদা ছিল ১০ শতাংশ (যার ৫ শতাংশ সন্তান জন্মের ব্যবধান এবং ৫ শতাংশ সন্তানসংখ্যা সীমিত করার সঙ্গে সম্পর্কিত)।
এই অগ্রগতি সত্ত্বেও দুর্গম এলাকা, দরিদ্র পরিবার ও তরুণ জনগোষ্ঠীর কাছে মানসম্মত সেবা পৌঁছানোর কাজ অব্যাহত রাখতে হবে। গর্ভনিরোধের আলোচনা শুধু সন্তান নেওয়ার ওপর নির্ভর করে না; এর সঙ্গে ব্যক্তি ও দম্পতির মর্যাদা, সমতা ও মানবাধিকার জড়িত। একই সঙ্গে প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ গ্রহণ এবং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া প্রয়োজন। সঠিক তথ্য, গুণগত সেবা ও স্বাধীনভাবে উপযুক্ত পদ্ধতি বেছে নেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করাই বিশ্ব গর্ভনিরোধ দিবসের প্রকৃত তাৎপর্য।












