বিশ্ব তুলা দিবস: সাদা তন্তুর বিশ্ব অর্থনীতির বুনন
সাকিবুর রহমান বাবলা
তুলা শুধু একটি প্রাকৃতিক তন্তু বা পোশাক তৈরির কাঁচামাল নয়; বিশ্ব অর্থনীতি, কৃষি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, শিল্প ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্য। সাদা রঙের এই আঁশ তাই বিশ্বজুড়ে ‘সাদা সোনা’ নামে পরিচিত। প্রতি বছর ৭ অক্টোবর বিশ্ব তুলা দিবস পালিত হয়। তুলা উৎপাদনকারী কৃষক, শ্রমিক, শিল্পোদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর অবদান তুলে ধরা এবং তুলাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও উন্নয়নের সুযোগ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোই এ দিবসের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।
বিশ্ব তুলা দিবসের উদ্যোগের পেছনে রয়েছে আফ্রিকার চারটি তুলা উৎপাদনকারী দেশ—বেনিন, বুরকিনা ফাসো, চাদ ও মালি। সম্মিলিতভাবে পরিচিত ‘কটন ফোর’ দেশগুলো তুলার বৈশ্বিক গুরুত্ব তুলে ধরতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দিবসটি পালনের উদ্যোগ নেয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৯ সালের ৭ অক্টোবর সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সদর দপ্তরে প্রথম বিশ্ব তুলা দিবস পালিত হয়। পরে ২০২১ সালের আগস্টে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ৭৫/৩১৮ নম্বর প্রস্তাবের মাধ্যমে ৭ অক্টোবরকে বিশ্ব তুলা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ফলে দিবসটি জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক দিবসের ক্যালেন্ডারে স্থায়ী স্থান পায়।
বিশ্বের ৮০টিরও বেশি দেশে তুলা চাষ হয়। প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় ২৫ থেকে ২৭ মিলিয়ন টন তুলা উৎপাদিত হয়। চীন, ভারত, ব্রাজিল ও যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের প্রধান তুলা উৎপাদক দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে। কাঁচা তুলার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও ব্রাজিল, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তুলা চাষ ও এর সঙ্গে যুক্ত সরবরাহব্যবস্থায় বিশ্বের বিপুলসংখ্যক কৃষক, শ্রমিক ও পরিবার জীবিকার সঙ্গে সম্পৃক্ত।
তুলার ব্যবহারও বহুমুখী। পোশাক ও বস্ত্রশিল্পে তুলার আঁশ সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হলেও তুলাবীজ থেকে তেল ও পশুখাদ্য উৎপাদিত হয়। চিকিৎসা ও কাগজ শিল্পেও তুলার ব্যবহার রয়েছে। ফলে তুলা একটি কৃষিপণ্য থেকে জিনিং, সুতা উৎপাদন, বয়ন, পোশাক তৈরি ও রপ্তানি পর্যন্ত দীর্ঘ শিল্পকৃঙ্খল তৈরি করেছে। এ কৃঙ্খলে কৃষক থেকে শুরু করে শিল্পশ্রমিক—বহু মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
তুলা উৎপাদনের সঙ্গে কৃষকের জীবন ও শ্রম সরাসরি যুক্ত। বীজ বপন, পরিচর্যা, আগাছা নিয়ন্ত্রণ, রোগ-পোকা দমন এবং তুলা সংগ্রহ-প্রতিটি ধাপে শ্রমের প্রয়োজন হয়। একই সঙ্গে তুলা উৎপাদনে উন্নত বীজ, সেচ, সার, নিরাপদ কীটনাশক ব্যবহার, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ এবং আধুনিক কৃষিপদ্ধতির গুরুত্ব রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, খরা, পানির প্রাপ্যতা ও উৎপাদন ব্যয় তুলা চাষের ওপর প্রভাব ফেলছে। তুলার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব ও জৈব তুলা উৎপাদনের প্রতিও বিশ্বে আগ্রহ বাড়ছে।
বাংলাদেশের জন্য বিশ্ব তুলা দিবসের গুরুত্ব বিশেষ। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও বস্ত্রশিল্প দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। কিন্তু বিশাল এই শিল্পের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল তুলার বড় অংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। দেশে প্রতিবছর প্রায় ৮৫ লাখ বেল তুলার চাহিদার বিপরীতে স্থানীয় উৎপাদন প্রায় ২ লাখ বেল। ফলে দেশের চাহিদার মাত্র প্রায় ৩ শতাংশ স্থানীয় উৎপাদন থেকে আসে এবং প্রায় ৯৭ শতাংশ চাহিদা আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়।
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৪৫ হাজার হেক্টর জমিতে তুলা চাষ হয়। যশোর, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, রাজশাহী, বগুড়া, রংপুর, ঠাকুরগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকায় এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে তুলা চাষের বিস্তার রয়েছে। ঝিনাইদহ দেশের অন্যতম প্রধান তুলা উৎপাদনকারী জেলা। দোআঁশ ও বেলে দোআঁশ মাটি তুলা চাষের জন্য উপযোগী। সাধারণত আগস্ট-সেপ্টেম্বরে বীজ বপন এবং জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে তুলা সংগ্রহ করা হয়।
দেশে তুলা উৎপাদন বৃদ্ধির দায়িত্বে রয়েছে তুলা উন্নয়ন বোর্ড। ১৯৭২ সালে গঠিত এ প্রতিষ্ঠান দেশীয় তুলা উৎপাদন সম্প্রসারণ, উন্নত জাতের বীজ সরবরাহ, কৃষকদের প্রশিক্ষণ এবং গবেষণামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। চরাঞ্চল, বরেন্দ্র অঞ্চল ও উপকূলীয় লবণাক্ত এলাকায় তুলা চাষ সম্প্রসারণের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে উন্নত বীজ, আধুনিক প্রযুক্তি, কৃষক প্রশিক্ষণ ও গবেষণার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হলেও তুলা উৎপাদনে অবস্থান তুলনামূলকভাবে নিচে। দেশের স্পিনিং ও টেক্সটাইল শিল্পের প্রয়োজন মেটাতে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ কাঁচা তুলা আমদানি করা হয়। ব্রাজিল, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশের তুলার অন্যতম উৎস। এ আমদানিতে প্রতিবছর কয়েক বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়।
তুলা শিল্পের সঙ্গে শ্রমিকের জীবনও নিবিড়ভাবে জড়িত। মাঠের কৃষিশ্রমিক থেকে জিনিং, স্পিনিং ও টেক্সটাইল কারখানার শ্রমিক-বিস্তৃত কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে এ খাতে। শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ, কর্মঘন্টা, ন্যায্য মজুরি এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। তুলার ধুলাবালি ও কৃষিতে ব্যবহৃত রাসায়নিকের সংস্পর্শে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম, নিরাপদ কর্মপদ্ধতি ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বিশ্ব তুলা দিবস তাই শুধু একটি কৃষিপণ্যের দিবস নয়; এটি কৃষক, শ্রমিক, শিল্প, বাণিজ্য ও অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত একটি বৈশ্বিক দিবস। তুলার ন্যায্য মূল্য, কৃষকের উৎপাদন সক্ষমতা, শ্রমিকের অধিকার, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, গবেষণা, আধুনিক প্রযুক্তি ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদনব্যবস্থার গুরুত্ব এ দিবসে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়।
বাংলাদেশের জন্যও এ দিবস একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। দেশীয় তুলা উৎপাদন বাড়ানো, অনাবাদি ও বিকল্প জমিতে চাষ সম্প্রসারণ, উন্নত জাতের বীজ ও প্রযুক্তি ব্যবহার, কৃষকের প্রশিক্ষণ এবং গবেষণা জোরদারের মাধ্যমে আমদানিনির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। তুলা উৎপাদন বাড়লে দেশের কৃষক যেমন উপকৃত হবেন, তেমনি বস্ত্র ও পোশাকশিল্পের কাঁচামাল সরবরাহেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। আর সেই সম্ভাবনার কেন্দ্রেই রয়েছে সাদা তুলার ছোট্ট আঁশ-
যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষকের শ্রম, শ্রমিকের জীবন, শিল্পের গতি এবং বিশ্ব অর্থনীতির বিশাল এক প্রবাহ।












