বিশ্ব পর্যটন দিবস: দিগন্ত জুড়ে প্রযুক্তির ছোঁয়া
সাকিবুর রহমান বাবলা
প্রতিবছর ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব পর্যটন দিবস। পর্যটনের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব সম্পর্কে আন্তর্জাতিক জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং মানুষের মধ্যে দেশ-দেশান্তরের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের পরিচয় ঘটানো এ দিবসের অন্যতম উদ্দেশ্য। ১৯৭০ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব পর্যটন সংস্থার সংবিধি গৃহীত হওয়ার দিনটিকে স্মরণীয় করে ২৭ সেপ্টেম্বর তারিখটি নির্ধারণ করা হয়। ১৯৭৯ সালে দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং ১৯৮০ সালে প্রথমবার আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ব পর্যটন দিবস পালিত হয়।
২০২৬ সালের বিশ্ব পর্যটন দিবসের প্রতিপাদ্যÑ’পর্যটন পুনর্গঠনে ডিজিটাল এজেন্ডা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’। এ প্রতিপাদ্য পর্যটন ব্যবস্থাপনা, ভ্রমণ পরিকল্পনা, তথ্যপ্রাপ্তি, সেবা ও পর্যটকের অভিজ্ঞতায় ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (চ্যাটবট, স্মার্ট বুকিং, ভার্চুয়াল ট্যুর) ক্রমবর্ধমান ভূমিকার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। ইউএন ট্যুরিজমের সাধারণ পরিষদ উক্ত প্রতিপাদ্য গ্রহণের পাশাপাশি এল সালভাদরকে আনুষ্ঠানিক আয়োজক দেশ হিসেবে নির্ধারণ করেছে। সার্ফ সিটি ও সংস্কার করা ঐতিহাসিক কেন্দ্রকে ঘিরে ২৬ ও ২৭ সেপ্টেম্বর বিভিন্ন কর্মসূচিতে পর্যটনমন্ত্রী, শিল্পের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিত্ব এবং প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন। এল সালভাদর ইউএন ট্যুরিজমের ‘ফ্যামিলি ফ্রেন্ডলি সিল’ অর্জনকারী প্রথম দেশ হিসেবেও উল্লেখযোগ্য।
পর্যটন বলতে সাধারণ পরিবেশের বাইরে সাময়িকভাবে ভ্রমণ ও অবস্থানকে বোঝায়। অবকাশ ও বিনোদন, ব্যবসা, চিকিৎসা, শিক্ষা, ধর্মীয় উদ্দেশ্য কিংবা রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতাÑবিভিন্ন কারণে মানুষ ভ্রমণ করে। নিজের দেশের ভেতরে ভ্রমণ অভ্যন্তরীণ পর্যটন এবং দেশের সীমানা অতিক্রম করে অন্য দেশে যাওয়া আন্তর্জাতিক পর্যটনের অন্তর্ভুক্ত। ফলে পর্যটন শুধু অবকাশযাপন নয়; এটি মানুষের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও পারস্পরিক পরিচয় বিস্তারের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
বিশ্ব অর্থনীতিতেও পর্যটনের ভূমিকা ব্যাপক। ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক পর্যটন থেকে প্রাপ্ত আয় প্রায় ১.৭৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছায়। একই বছরে আন্তর্জাতিক পর্যটন-আয়ে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ২১৫ বিলিয়ন, স্পেন ১০৬.৫ বিলিয়ন এবং যুক্তরাজ্য ৮৪.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করে। পর্যটন হোটেল, মোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, গাইড, হস্তশিল্প ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। স্থানীয় পণ্য ও সংস্কৃতির বাজারও সম্প্রসারিত হয়।
কম্বোডিয়ার অঙ্কোর ওয়াট প্রাচীন স্থাপত্য, পেরুর মাচু পিচুর ইনকা সভ্যতার নিদর্শন এবং ভারতের তাজমহলের মুঘল স্থাপত্য ইতিহাস, শিল্প ও সংস্কৃতির সঙ্গে পর্যটনের গভীর সম্পর্ককে তুলে ধরে। বাংলাদেশেও পর্যটনের সম্ভাবনা বিস্তৃত। কক্সবাজারের দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত, সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বন, সাজেক ও বান্দরবানের পাহাড়-ঝরনা, সিলেটের চা-বাগান, রাতারগুল ও জাফলং, কুয়াকাটার সমুদ্রসৈকত, নওগাঁর পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার এবং বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করে। স্থানীয় খাবার, জামদানি, পাটজাত পণ্য, হস্তশিল্প ও অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী পণ্য পর্যটনকেন্দ্রিক অর্থনীতি, সংস্কৃতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও সম্প্রীতিকে আরো বিস্তৃত করে।
আমাদের দেশে পর্যটন ও আতিথেয়তা ব্যবস্থাপনা বিষয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগও রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট পড়াশোনার পাশাপাশি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট কোর্স এবং বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের ন্যাশনাল হোটেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ট্রেনিং ইনস্টিটিউট থেকে রান্না, বেকিং, ট্রাভেল এজেন্সি ও ফ্রন্ট অফিস ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষণের সুযোগ রয়েছে। পর্যটন তাই একটি উন্মুক্ত শ্রেণিকক্ষও। পাহাড়, নদী, বন, প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন, জাদুঘর ও ঐতিহাসিক স্থাপনা সরাসরি দেখার মাধ্যমে ইতিহাস, ভূগোল, পরিবেশ, সংস্কৃতি ও প্রতœতত্ত্ব সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান অর্জন করা যায়। শিক্ষা সফর শিক্ষার্থীদের বইয়ের জ্ঞানকে বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করে এবং গবেষণার নতুন ক্ষেত্র তৈরি করে।
বিশ্ব পর্যটন দিবসের মূল বার্তা তাই শুধু ভ্রমণের আনন্দে সীমাবদ্ধ নয়। পর্যটন অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান বাড়াতে পারে, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে সহায়তা করতে পারে, পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করতে পারে এবং মানুষের মধ্যে পারস্পরিক পরিচয় ও সম্প্রীতির সেতু গড়ে তুলতে পারে। আর ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা আরও বিস্তৃত হচ্ছে। প্রযুক্তির সুফল মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়ে প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষা করা গেলে পর্যটন হয়ে উঠতে পারে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও মানবিক সংযোগের শক্তিশালী মাধ্যম।









