মায়ের আঁচল”
ফারুক আহম্মেদ জীবন
আট বছরের ছেলে নয়ন। পাঁচ বছরের মেয়ে মণি কে নিয়ে। রেদোয়ান আর মমতার ছোট্ট সুখের সংসার। অর্থ বিত্ত ধনসম্পদ না থাকলেও ভালোবাসায় ভরা ছিল রেদোয়ান মমতার কুঁড়ে ঘরটি জুড়ে।
খুবই অল্প বেতনে দারোয়ানের চাকুরী করে রেদোয়ান। তার সেই অতি স্বল্প বেতনের টাকায়। একটু কষ্ট হলেও বাচ্চাদের পড়িয়ে ডাল ভাত খেয়ে বেশ সুখি ওরা।
নয়ন ক্লাস টু তে পড়ে। আর মণি পড়ে শিশু ওয়ানে। ঢাকা বাড্ডা এলাকায় ছোট্ট একটা ভাড়ার ঘরে থাকে
ওরা। বাচ্চা দুটোর হাসি ঝরা চাঁদ মুখ দেখলে রেদোয়ানের সারাদিনের ক্লান্তি যেনো মুহুর্তে ভুলে যায়।
মমতা ভুলে যায় সংসারের পরিশ্রম অভাব কষ্টের কথা। নয়ন মণির কচি মুখে যেনো মিষ্টি কথার খৈ ফোটে সারাটাক্ষণ। আজ ছুটির পর রেদোয়ান এক ছাড়া পাকা কলা। কয়েকটি ডিম, তরকারি মাছ নিয়ে বাসায় ফিরেছে। মমতা তখন রান্না করছিল। নয়ন মণি তাদের বাবাকে ফিরতে দেখে। আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে বললো। আম্মু আম্মু দেখো আব্বু বাড়ি এসেছে। তারপর ছুটে গেলো ওদের আব্বুর কাছে। রেদোয়ান বাজার-সদাই রেখে নয়ন মণিকে কোলে তুলে নিল। মমতা প্যাকেটে কলা, ডিম, মাছ আনতে দেখে বললো। অভাবের সংসার এসব আবার আনতে গেলে কেনো? রেদোয়ান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো। টাকার অভাবে বাচ্চা দুটোর তো আপেল, বেদানা, আঙ্গুর, কমলালেবু, ওসব দামী ফল খাওয়াতে পারিনে তাই আনলাম। কলা, ডিম, মাছ এসব খেলেও ওদের শরীর ভালো থাকবে। মমতা হেসে বললো আচ্ছা যাও হাতমুখ ধুয়ে এসো খাবার দিচ্ছি।
তারপর মমতা প্যাকেট থেকে বের করে নয়ন মণির হাতে কলা দিলো। তাতেই অনেক খুশি ওরা। খাওয়া শেষে শোয়ার সময় নয়ন বললো। জানো আব্বু আমি পড়ালেখা ভালো করি বলে স্কুলের স্যার ম্যাডামরা আমাকে অনেক ভালোবাসে। মণি হেসে বললো আমি পড়াশোনা করে বড় হয়ে স্কুলের ম্যাডাম হব। রেদোয়ান বললো, তাই বুঝি মা? মণি বললো, হুম দেখো। নয়ন বললো আমি বড় হয়ে পুলিশ হব। চোর মাস্তানদের ধরে এমন শিক্ষা দেবো আর কখনো অপরাধ করবে না। মমতা আর রেদোয়ান ওদের কচি মুখে ওসব কথা শুনে
কপালে চুম্বন দিয়ে কোলে টেনে নিয়ে বললো। আচ্ছা বেশ হইও। তারজন্য তো ভালো করে পড়াশোনা করতে হবে। এখন ঘুমিয়ে পড়। কাল সকালে আবার তোমরা স্কুলে যাবে।
এই সুখ বেশিদিন ওদের ভাগ্যে সইলো না। অচিরেই দুঃখের অমানিশার অন্ধকার নেমে আসলো ওদের জীবনে।একদিন সকালে রেদোয়ান তার স্ত্রী সন্তানদের কাছ থেকে হাসিমুখে বিদায় নিয়ে কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিল। টেক্সি থেকে নেমে রোড পার হয়ে অফিস গেটে যাওয়ার সময় হঠাৎএকটা ট্রাক এসে সজোরে ধাক্কা দিল রেদোয়ানকে। আশপাশের লোকজন ছুটে এসে রেদোয়ানকে দেখে চিনতে পেরে অফিসের মালিকের কাছে এ সংবাদ পৌঁছে দিলো। মালিক রাব্বি খুবই ভালো মনের উদার মানবিক আর দয়ালু মানুষ। সে দ্রুত ফোন করে একটা এম্বুলেন্স ডেকে নিঃসাড়ে রক্তাক্ত দেহে পড়ে থাকা রেদোয়ানকে হাসপাতালে নিয়ে গেলো। আর একজনকে দিয়ে রেদোয়ানের স্ত্রীর কাছে সংবাদ পাঠালো।
মমতা নয়ন মণিকে স্কুলে পাঠানোর জন্য। তাদের জামা কাপড় পরিয়ে মাথার চুল আঁচড়িয়ে গুছিয়ে দিচ্ছিলো। লোকটার মুখে সংবাদটা শুনেই মমতার দু,চোখে যেনো অন্ধকার নেমে এলো। মাথা চক্কর দিতে লাগলো তার।
মমতা কেঁদে বলে উঠলো না..এমনটা হতে পারে না। সে চিৎকার করে কেঁদে ওঠে নয়ন মণিকে নিয়ে ছুটে গেল হাসপাতালে। ততক্ষণে সব শেষ হয়ে গেছে। রেদোয়ানের পুরো দেহটা সাদা কাপড় দিয়ে ঢাকা।
ডাক্টার বললো সরি অনেক রক্ত ক্ষরণ আর বুকে প্রচন্ড আঘাত লাগার কারণে উনি ঘটনা স্থলেই মারা গেছেন। পাশেই মলিন মুখে দাঁড়িয়ে অফিসের মালিক রাব্বি।
মুখের উপর থেকে কাপড় সরাতেউ মমতা। ও আল্লাহ আমার এ কি হয়ে গেলো বলে কেঁদে ফিটের পর ফিট হতে লাগলো। সেই সাথে নয়ন মণি কাঁদছে আর ওদের আব্বু রেদোয়ানকে ডেকে চলেছে সমানে। হাসপাতাল, আর দাফন কাফনের সকল খরচ বহন করলো অফিসের মালিক রাব্বি। কিছু টাকাও দিল মমতাকে ছেলেমেয়ে মানুষ করার জন্য। মমতা হারিয়ে তার বেঁচে থাকার ঢাল রক্ষা কারী স্বামীকে। যে ছিল তার সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় স্থল। আর নয়ন মণি হারিয়েছে তাদের বাবাকে। যে ছিল তাদের জন্য বটবৃক্ষের ছায়ার মতো।
কিন্তু না, মমতা ভেঙ্গে না পড়ে। স্বামী হারানোর শোক অনেক কষ্টে কাটিয়ে আজ শক্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে সে। তার ছেলেমেয়েকে যে মানুষের মতো মানুষ করতে হবে। তাইতো তার স্বামী রেদোয়ানের অফিসের মালিকের দেওয়া সেই সামান্য কয়েক হাজার টাকা দিয়ে সে ছোট খাটো একটা মানেেুষর খাওয়ার হোটেলের ব্যবসা শুরু করলো। মাঝেমধ্যে নয়ন-মণিও হোটেলের কাজে মাকে সাহায্য করতে লাগলো। মমতা পরম আদর স্নেহ ভালোবাসা আর মায়া ভরা তার মমতার আঁচল তোলে রেখে। নয়ন মণিকে কোনোরূপ বাবার অভাব বুঝতে না দিয়ে। মমতা দিনের পর দিন। মাসের পর মাস। এভাবে বছরের পর বছর জীবনের সাথে কঠিন সংগ্রাম করে নয়ন মণিকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষের মতো মানুষ করে তুলেছে। নয়ন এখন নামকরা মস্ত বড় পুলিশ অফিসার। আর মণি হয়েছে ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের অধ্যাপক।আজ মমতার সেই ছোট্ট ভাতের হোটেলটা সময়ের সাথে ব্যবসা প্রসারিত হয়ে নাম করা
রেস্টুরেন্ট হয়েছে। রোজ একশোজন কর্মচারী খাটে তার রেস্টুরেন্টে। একদিন দুপুরে হঠাৎ রাব্বি অফিসের কয়েকজন কর্মচারী নিয়ে মমতার রেস্টুরেন্টে খেতে গেলো। সেসময় মমতা গাড়ি থেকে নেমে ছেলে নয়ন আর নয়নের বউ আঁখি। সাথে মেয়ে মণি আর মণির হাসবেন্ড চয়নকে নিয়ে দরজা ঠেলে হোটেলের ভিতরে এলো। রাব্বি খাওয়া শেষে বিল দেওয়ার জন্য এগিয়ে আসতেই মমতা চিনতে পারলো। সে বললো ভাইজান আমাকে চিনতে পেরেছেন? রাব্বি বললো, না ঠিক মনে করতে পারছি না। তবে আপনাকে কোথাও যেনো দেখেছি। তখন মমতা কল্পনায় অনেক বছর আগের পূর্বের ঘটনা সব বললো।
রাব্বি বললো, ও হ্যা..হ্যা..মনে পড়েছে। তখন মমতা পরিবারের সবার সাথে উনার পরিচয় করিয়ে দিল। মমতা বললো, আপনি হয়তো খেয়াল করেননি। এই রেস্টুরেন্টের নামটা আমার স্বামী রেদোয়ানের নামে।
জানেন ভাইজান। আজ যাকিছু করেছি। এর পিছনের সবকিছু অবদান যে আপনার। আপনার দেওয়া সেই টাকা কাজে লাগিয়ে আজ এপর্যন্ত এসেছি। শুনে খুব খুশি হলো রাব্বি। বললো, আপনি যে মনে রেখেছেন সেই সামান্য কটা টাকার কথা এটাই তো আশ্চর্যের বিষয়। মমতা বললো, ভাইজান ভুলে গেলে যে অকৃতজ্ঞ হয়ে যাবো। আর আল্লাহ অকৃতজ্ঞকে ভালোবাসেন না।
ক্যাশে বসা লোকটিকে বললো ভাইজানের কাছ থেকে বিলটা নিয়েন না কেমন। সে মাথা নেড়ে হ্যাঁ সূচক জবাব দিল। রাব্বি বললো, না..না.. তাই কি হয়। এটা একটা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। মমতা বললো ঠিক আছে ভাইজান এরপর যখন আমার রেস্টুরেন্টে খেতে আসবেন তখন না হয় দিয়েন। আজকের বিলটা মনে করেন আমি দিলাম। আর হ্যাঁ, সময় করে একদিন পরিবারের সবাইকে নিয়ে আমাদের বাড়িতে বেড়াতে আসবেন কেমন। রাব্বি বললো, আচ্ছা ঠিক আছে বোন একদিন সময় করে বাড়ির সবাইকে নিয়ে তোমাদের বাড়িতে যাবো। তারপর রাব্বি দরজা দিয়ে রেস্টুরেন্টের বাইরে চলে গেলো।









